বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট কী? আইনস্টাইনের ‘ভৌতিক’ আপত্তি ও বিজ্ঞানের উত্তর

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট কী? আইনস্টাইনের ‘ভৌতিক’ আপত্তি ও বিজ্ঞানের উত্তর
দূরত্ব পেরিয়েও সম্পর্কিত দুই কণার ফল

ধরা যাক, একটি পরীক্ষাগারে দুটি কণা তৈরি করে বিপরীত দিকে পাঠানো হলো। একটি কণা ঢাকায়, অন্যটি বহু দূরের আরেক পরীক্ষাগারে পৌঁছাল। এখন প্রথম কণার কোনো বৈশিষ্ট্য মাপলে দ্বিতীয়টির পরিমাপের ফলের সঙ্গে বিশেষ সম্পর্ক পাওয়া গেল। দূরত্ব বাড়লেও সেই সম্পর্ক হারাল না। শুনে মনে হতে পারে, প্রথম কণা নিশ্চয়ই দ্বিতীয়টিকে গোপনে খবর পাঠিয়েছে। কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের বিস্ময় এখানেই: পরীক্ষায় দূরের কণাগুলোর ফলের মধ্যে গভীর সম্পর্ক দেখা যায়, অথচ ঘটনাটি দিয়ে ইচ্ছেমতো তাৎক্ষণিক বার্তা পাঠানো যায় না।

বাংলায় এনট্যাঙ্গলমেন্টকে ‘কোয়ান্টাম জড়াজড়ি’ বা ‘জড়িত অবস্থা’ বলা যায়। দুটি কণা উপযুক্তভাবে তৈরি বা পরস্পরের সঙ্গে ক্রিয়া করলে তাদের যৌথ অবস্থাকে এমনভাবে বর্ণনা করতে হয় যে একটির সম্পূর্ণ বিবরণ অন্যটি থেকে আলাদা করে দেওয়া যায় না। তারা পরে দূরে সরে গেলেও যৌথ অবস্থার বিশেষ সম্পর্ক পরিমাপের ফলে প্রকাশ পেতে পারে। এখানে ‘জড়িত’ মানে কণাদুটি অদৃশ্য সুতো দিয়ে বাঁধা আছে, এমন নয়। এটি তাদের পরিমাপযোগ্য বৈশিষ্ট্যের সম্ভাবনা ও পারস্পরিক সম্পর্ক বোঝানোর বৈজ্ঞানিক ধারণা।

বিষয়টি ধরতে কণার একটি বৈশিষ্ট্য কল্পনা করা যাক, যার পরিমাপে দুটি সম্ভাব্য ফল পাওয়া যায়। পরীক্ষায় এমন একজোড়া কণা তৈরি করা সম্ভব, যেখানে দুটিকে একইভাবে মাপলে ফল বিপরীত হবে। প্রথমটির ফল যদি এক রকম আসে, দ্বিতীয়টির ফল অন্য রকম আসবে। তবে পরিমাপের আগে প্রথম কণার ফলটি ইচ্ছেমতো নির্দিষ্ট করে দেওয়া যায় না। একইভাবে দূরে থাকা গবেষকও শুধু নিজের কণাটি মেপে বুঝতে পারবেন না, অন্য পরীক্ষাগারে ঠিক কখন বা কী ফল পাওয়া গেছে। দুই পক্ষ পরে ফল মিলিয়ে দেখলেই সম্পর্কটি স্পষ্ট হয়।

এখানে সাধারণ জীবনের একটি তুলনা বিভ্রান্ত করতে পারে। একটি বাক্সে লাল বল, অন্যটিতে নীল বল রেখে দুটি বাক্স দূরে পাঠালে প্রথম বাক্স খুলেই দ্বিতীয়টির রং জানা যায়। কিন্তু বাক্স দুটি পাঠানোর আগেই বলের রং নির্দিষ্ট ছিল। কোয়ান্টাম পরীক্ষায় প্রশ্ন হলো, জড়িত কণাগুলোর সব সম্ভাব্য পরিমাপের ফলও কি আগে থেকেই একইভাবে নির্দিষ্ট থাকে? যদি থাকে, তাহলে আগেভাগে লেখা কোনো গোপন নির্দেশনাই কি দূরের ফলের সম্পর্ক ব্যাখ্যা করতে পারে? এই প্রশ্নটিই আইনস্টাইনের আপত্তি থেকে পরবর্তী পরীক্ষার কেন্দ্রে এসেছে।

আইনস্টাইন কোয়ান্টাম তত্ত্বের গুরুত্ব অস্বীকার করেননি। তাঁর নিজের কাজও কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের বিকাশে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তবে কণার বৈশিষ্ট্য পরিমাপের আগে কী অবস্থায় থাকে এবং দূরের কোনো কিছুর বাস্তব অবস্থার ওপর স্থানীয় পরিমাপের প্রভাব কীভাবে বোঝা উচিত—এসব নিয়ে তাঁর আপত্তি ছিল। তাঁর কাছে প্রকৃতির পূর্ণ বিবরণ এমন হওয়া দরকার ছিল, যেখানে দূরে থাকা দুটি ব্যবস্থার প্রত্যেকটির নিজস্ব বাস্তব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা পাওয়া যায়। কোয়ান্টাম তত্ত্বের প্রচলিত ব্যাখ্যা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সহজে মেলেনি।

১৯৩৫ সালে আইনস্টাইন, বরিস পোডলস্কি এবং নাথান রোজেন একটি গবেষণাপত্রে এই সমস্যাকে ধারালো প্রশ্ন হিসেবে তুলে ধরেন। তাঁদের যুক্তিতে, যদি দুটি কণা পরস্পর থেকে দূরে থাকে, তাহলে একটির ওপর করা পরিমাপ অন্যটির বাস্তব অবস্থাকে মুহূর্তে পাল্টে দেওয়ার কথা নয়। অথচ কোয়ান্টাম তত্ত্বের যৌথ অবস্থার সাহায্যে প্রথমটির পরিমাপ থেকে দ্বিতীয়টি সম্পর্কে নির্দিষ্ট পূর্বানুমান করা যায়। এই টানাপোড়েন থেকে তাঁরা প্রশ্ন তোলেন, কোয়ান্টাম তত্ত্ব কি বাস্তবতার পূর্ণ বিবরণ দিচ্ছে, নাকি তাতে কিছু তথ্য অনুপস্থিত?

জনপ্রিয় ব্যাখ্যায় আইনস্টাইন যেন দুটি কণার ঘূর্ণনের দিক নিয়ে একটি পরীক্ষা দেখে সঙ্গে সঙ্গে ‘ভৌতিক’ কথাটি বলেছিলেন। ইতিহাসটি তেমন সরল নয়। তাঁর ও সহকর্মীদের মূল গবেষণাপত্রে অবস্থান ও ভরবেগের মতো রাশির সাহায্যে যুক্তি গড়া হয়েছিল। পরে কণার ঘূর্ণনসংক্রান্ত বৈশিষ্ট্য ব্যবহার করে সমস্যাটি আরও সহজভাবে ব্যাখ্যা করা হয়। ‘দূর থেকে ভৌতিক ক্রিয়া’ কথাটি আইনস্টাইনের অস্বস্তির পরিচিত প্রকাশ: তিনি এমন ব্যাখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছিলেন, যাতে এক স্থানের পরিমাপকে দূরের কণার সঙ্গে তাৎক্ষণিকভাবে যুক্ত মনে হয়।

‘ভৌতিক’ শব্দটি শুনে তিনি ঘটনাটিকে ভূতুড়ে বা অলৌকিক বলে বিশ্বাস করতেন, এমন ধারণা করা ভুল। তাঁর আপত্তি ছিল তত্ত্বটির ব্যাখ্যা এবং বাস্তবতার স্বরূপ নিয়ে। আপেক্ষিকতার তত্ত্বে আলোর চেয়ে দ্রুত কোনো কার্যকর সংকেত পাঠানোর সীমা আছে। যদি দূরে থাকা কণার অবস্থা এখানে নেওয়া সিদ্ধান্তে তাৎক্ষণিকভাবে নিয়ন্ত্রিত হয়, তাহলে সেই সীমার সঙ্গে সম্পর্ক কী—প্রশ্নটি গুরুতর। আইনস্টাইন চেয়েছিলেন এমন একটি ব্যাখ্যা, যাতে দূরের বস্তু সম্পর্কে সিদ্ধান্ত নিতে রহস্যময় তাৎক্ষণিক প্রভাব ধরে নিতে না হয়।

দীর্ঘদিন এই বিতর্ককে মূলত দার্শনিক প্রশ্ন মনে করা হতো। পরিবর্তন আসে পদার্থবিজ্ঞানী জন বেলের কাজে। তিনি দেখান, দূরের ঘটনাগুলোতে আলোর চেয়ে দ্রুত প্রভাব না রেখে এবং পরিমাপের ফল আগেই নির্ধারিত থাকে—এমন কিছু অনুমান একসঙ্গে মেনে নিলে কণাদুটির ফলের পারস্পরিক সম্পর্কের একটি নির্দিষ্ট সীমা থাকবে। সেই সীমা গাণিতিকভাবে প্রকাশ করা যায়। অন্যদিকে কোয়ান্টাম তত্ত্ব কিছু বিশেষ জড়িত অবস্থায় এই সীমা অতিক্রমের পূর্বাভাস দেয়। ফলে আগের তর্ক পরীক্ষাগারে যাচাই করার পথ খুলে যায়।

এ ধরনের পরীক্ষায় শুধু একই ধরনের একটি পরিমাপ করলে চলে না। দুই পাশে গবেষকেরা আলাদাভাবে বিভিন্ন কোণে পরিমাপযন্ত্র বসান এবং বহু জোড়া কণার ফল সংগ্রহ করেন। পরে দেখা হয়, যন্ত্রের কোণের বিভিন্ন সমন্বয়ে ফলের সম্পর্ক কতটা শক্তিশালী। যদি কণাগুলো আগে থেকে সব সম্ভাব্য প্রশ্নের উত্তর লিখে নিয়ে চলত এবং দূরের পরিমাপের সঙ্গে কোনো অতিরিক্ত সম্পর্ক না থাকত, তাহলে বেলের নির্ধারিত সীমা মানার কথা। বাস্তবে বহু পরীক্ষায় সেই সীমা লঙ্ঘন করে কোয়ান্টাম তত্ত্বের পূর্বাভাসের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ফল পাওয়া গেছে।

প্রথম দিকের পরীক্ষাগুলো গুরুত্বপূর্ণ হলেও সেগুলোর পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তোলার কিছু সুযোগ ছিল। উদাহরণস্বরূপ, পরিমাপের জন্য সব কণা ধরা পড়ছে কি না অথবা এক পাশের পরীক্ষার তথ্য অন্য পাশে পৌঁছাতে পারছে কি না, তা নিশ্চিত করা জরুরি। পরবর্তী দশকগুলোতে গবেষকেরা পরীক্ষার নকশা উন্নত করেছেন এবং এসব ফাঁক একসঙ্গে কমানোর চেষ্টা করেছেন। বেলের অসমতা লঙ্ঘনের পরীক্ষামূলক প্রমাণ কোয়ান্টাম পদার্থবিজ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। জড়িত আলোককণা নিয়ে পরীক্ষার জন্য ২০২২ সালে জন ক্লাউজার, আলাঁ আসপে ও আন্তন জাইলিঙ্গার পদার্থবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান।

এই ফলের অর্থ কী, তা সাবধানে বলা দরকার। পরীক্ষাগুলো দেখায়, আগে থেকেই নির্ধারিত স্থানীয় নির্দেশনা দিয়ে জড়িত কণাগুলোর সব পর্যবেক্ষিত সম্পর্ক ব্যাখ্যা করা যায় না। কিন্তু শুধু এই ফল থেকে ‘একটি কণা অন্যটিকে আলোর চেয়ে দ্রুত বার্তা পাঠিয়েছে’—এমন সিদ্ধান্ত আসে না। কোয়ান্টাম তত্ত্ব কীভাবে বাস্তবতাকে বর্ণনা করছে, সে বিষয়ে একাধিক ব্যাখ্যা রয়েছে। পরীক্ষায় পাওয়া পরিসংখ্যানগত ফল সম্পর্কে পদার্থবিজ্ঞানীদের ঐকমত্য অনেক শক্তিশালী; ফলটির গভীর দার্শনিক অর্থ নিয়ে আলোচনা এখনও চলে।

দ্রুত বার্তা পাঠানো যায় না কেন? ধরুন, ঢাকার গবেষক নিজের কণা মেপে অন্য শহরে একটি নির্দিষ্ট সংকেত পাঠাতে চান। তিনি চাইলেই নিজের পরিমাপের ফল ‘হ্যাঁ’ বা ‘না’ নির্ধারণ করতে পারবেন না; ফল আসে সম্ভাবনামাফিক। দূরের গবেষক নিজের পরিমাপের তালিকা দেখেও বুঝতে পারবেন না, ঢাকায় কোন ফল এসেছে বা আদৌ পরিমাপ হয়েছে কি না। পরে প্রচলিত যোগাযোগব্যবস্থায় দুই পক্ষ তাদের নথি মিলিয়ে দেখলে জড়িত অবস্থার বিশেষ সম্পর্ক ধরা পড়ে। সেই নথি পাঠানোর যোগাযোগ আলোর গতির সীমা অতিক্রম করতে পারে না।

এই সূক্ষ্ম পার্থক্যটি এড়িয়ে গেলে এনট্যাঙ্গলমেন্টকে জাদুকরি যোগাযোগব্যবস্থা মনে হয়। দুই পাশে ফল সম্পর্কিত হওয়া এবং এক পাশ থেকে ইচ্ছেমতো তথ্য অন্য পাশে পৌঁছানো আলাদা ব্যাপার। একই কারণে ‘কোয়ান্টাম টেলিপোর্টেশন’ নামের প্রযুক্তিতেও মানুষ বা বস্তু চোখের পলকে দূরে চলে যায় না। নির্দিষ্ট কোয়ান্টাম অবস্থার তথ্য স্থানান্তরের পদ্ধতিতে জড়িত অবস্থা কাজে লাগে, কিন্তু প্রক্রিয়াটি সম্পূর্ণ করতে সাধারণ যোগাযোগেরও প্রয়োজন হয়। বিজ্ঞানের ব্যবহৃত আকর্ষণীয় নামের আড়ালে বাস্তব নিয়মগুলো বোঝা জরুরি।

জড়িত অবস্থা তৈরি করাও সব পরিস্থিতিতে সহজ নয়। বাইরের পরিবেশের সঙ্গে কণার অনিয়ন্ত্রিত মিথস্ক্রিয়ায় কাঙ্ক্ষিত কোয়ান্টাম সম্পর্ক নষ্ট হতে পারে। আলো, তাপ, কম্পন বা অন্য কণার প্রভাব থেকে পরীক্ষার ব্যবস্থা যতটা সম্ভব পৃথক রাখতে হয়। গবেষকেরা আলোককণা, পরমাণু ও অন্যান্য ক্ষুদ্র ব্যবস্থা নিয়ে নানা ধরনের পদ্ধতি তৈরি করেছেন। এই নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা মৌলিক পরীক্ষা ছাড়াও নিরাপদ যোগাযোগের কিছু পদ্ধতি, সূক্ষ্ম পরিমাপ এবং কোয়ান্টাম গণনার গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ।

আইনস্টাইনের আপত্তি এবং পরবর্তী পরীক্ষাগুলোকে তাই ‘আইনস্টাইন সবকিছুতে ভুল ছিলেন’—এমন বাক্যে সীমাবদ্ধ করা যায় না। তাঁর প্রশ্নই বিষয়টিকে এমনভাবে স্পষ্ট করেছিল যে পরে বেল পরীক্ষাযোগ্য পার্থক্য বের করতে পেরেছিলেন। কোয়ান্টাম তত্ত্বের পূর্বাভাস যে শক্তিশালীভাবে পরীক্ষায় টিকে আছে, তা তাঁর উত্থাপিত সমস্যার গুরুত্ব কমায় না। বরং তাঁর অস্বস্তি দেখায়, প্রতিষ্ঠিত তত্ত্বও বাস্তবতা সম্পর্কে কত কঠিন প্রশ্ন তুলতে পারে এবং একটি গভীর তাত্ত্বিক বিরোধ কীভাবে পরীক্ষাগারের কাজে রূপ নিতে পারে।

কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্টের মূল বিস্ময় হলো, দূরে থাকা দুটি কণাকে সব সময় দুটি সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র বস্তুর মতো বর্ণনা করলে তাদের পরিমাপের সম্পর্ক বোঝা যায় না। তাদের যৌথ ইতিহাস ও যৌথ কোয়ান্টাম অবস্থা হিসাবের অংশ হয়ে থাকে। আইনস্টাইনের কাছে এই সম্পর্কের প্রচলিত ব্যাখ্যা ‘ভৌতিক’ মনে হয়েছিল, কারণ তা দূরত্ব, বাস্তবতা এবং পরিমাপ সম্পর্কে পরিচিত ধারণাকে চ্যালেঞ্জ করে। আজকের পরীক্ষা সেই অস্বাভাবিক সম্পর্ককে নিশ্চিত করেছে, কিন্তু আলোর চেয়ে দ্রুত ইচ্ছেমতো খবর পাঠানোর পথ খোলেনি। প্রকৃতি এখানে রহস্যময় গল্পের চেয়েও বেশি আকর্ষণীয়: এর আচরণ অপ্রত্যাশিত, তবু বারবার পরীক্ষা করে নির্ভুলভাবে যাচাই করা যায়।