বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

তুর্কমেনিস্তানের ‘ডোর টু হেল’: দারভাজা আগুনের গর্তের আসল ইতিহাস

তুর্কমেনিস্তানের ‘ডোর টু হেল’: দারভাজা আগুনের গর্তের আসল ইতিহাস
মরুভূমির আগুনের নিচে লুকানো ইতিহাস

তুর্কমেনিস্তানের কারাকুম মরুভূমিতে একটি গর্তের ভেতর বহু বছর ধরে আগুন জ্বলছে। চারপাশে জনবসতি কম, দূর পর্যন্ত শুষ্ক ভূমি; সন্ধ্যার পর গর্তের তলা থেকে ওঠা শিখা অন্ধকারে অস্বাভাবিক দৃশ্য তৈরি করে। এই কারণেই দারভাজা গ্যাসগর্ত ‘ডোর টু হেল’ বা ‘নরকের দরজা’ নামে পরিচিত হয়েছে। নামটি যত নাটকীয়, এর আসল ইতিহাস ততটাই জটিল। বহুল প্রচলিত গল্পে একটি দুর্ঘটনা, একটি সিদ্ধান্ত এবং কয়েক দিনের ভুল হিসাবের কথা বলা হয়। কিন্তু পুরোনো নথি ও উপগ্রহের ছবি মিলিয়ে দেখলে সেই গল্পের গুরুত্বপূর্ণ অংশ নিশ্চিত করা যায় না।

দারভাজা গর্তটি তুর্কমেনিস্তানের রাজধানী আশগাবাত থেকে প্রায় আড়াইশ কিলোমিটার উত্তরে কারাকুম মরুভূমিতে অবস্থিত। এর ব্যাস আনুমানিক ষাট থেকে সত্তর মিটার এবং গভীরতা প্রায় ত্রিশ মিটার বলে বিভিন্ন হিসাবে উল্লেখ করা হয়। উপর থেকে দেখলে এটি বড় একটি বৃত্তাকার ধসের মতো। আগুন শুধু একটি জায়গায় মশালের মতো জ্বলে না; গর্তের ভেতরের বিভিন্ন ফাটল ও নির্গমনপথে শিখা দেখা যায়। গর্তটির আকার আর অন্ধকারে সেই বিচ্ছিন্ন শিখাগুলোর সম্মিলিত আলো থেকেই এর ভয়াল খ্যাতি।

এই আগুনের জ্বালানি মাটির নিচের প্রাকৃতিক গ্যাস, যার প্রধান উপাদান মিথেন। কারাকুম অঞ্চলের ভূগর্ভে গ্যাসসমৃদ্ধ স্তর রয়েছে। কোথাও কোথাও শিলাস্তরের গঠন ও ফাটল গ্যাসকে আটকে রাখে; কোনো পথ খুলে গেলে তা ওপরের দিকে আসতে পারে। দারভাজার গর্তের তলা ও কিনারার বিভিন্ন অংশ দিয়ে গ্যাস বেরিয়ে আগুনের সংস্পর্শে জ্বলে। তাই এটি লাভা উঠে আসা কোনো আগ্নেয়গিরির মুখ নয়। গর্তটি দেখতে আগ্নেয়গিরির মতো নাটকীয় হলেও আগুনের উৎস হলো দাহ্য গ্যাসের ধারাবাহিক সরবরাহ।

দারভাজা সম্পর্কে সবচেয়ে বেশি শোনা গল্পটি শুরু হয় ১৯৭১ সালে। কথিত আছে, সোভিয়েত ভূতাত্ত্বিকেরা প্রাকৃতিক গ্যাস খুঁজতে গিয়ে ভূগর্ভের ফাঁপা বা দুর্বল অংশে খননযন্ত্র বসিয়েছিলেন। পরে মাটি ধসে বড় গর্ত তৈরি হয় এবং গ্যাস বের হতে থাকে। আশপাশে গ্যাস ছড়ানোর আশঙ্কায় তাঁরা আগুন ধরিয়ে দেন, ভেবেছিলেন মজুত গ্যাস কয়েক দিনের মধ্যেই শেষ হবে। গল্পটি সহজে মনে থাকে। কিন্তু দুর্ঘটনার নির্দিষ্ট দিন, কারা আগুন ধরিয়েছিলেন এবং তাঁরা কত দিনে আগুন নিভবে বলে ধারণা করেছিলেন—এসব বিষয়ে নির্ভরযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণ স্পষ্ট নয়।

গর্ত তৈরির সময় নিয়েও মতভেদ আছে। কিছু বিবরণে উনিশশো ষাটের দশকের একটি অনুসন্ধানকাজের কথা বলা হয়েছে; অন্যগুলোতে উনিশশো একাত্তর সালের ঘটনা উল্লেখ করা হয়। এত দিন ধরে প্রচলিত বিবরণে গর্ত সৃষ্টি এবং আগুন লাগাকে একই বছরের ঘটনা হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। কিন্তু দুটি ঘটনা এক সময়ে ঘটেছিল কি না, সেটিই এখন বড় প্রশ্ন। দূরবর্তী অঞ্চলের পুরোনো অনুসন্ধানকাজের নথি সহজলভ্য নয়। ফলে পরবর্তী সময়ে বলা গল্পকে সরাসরি প্রত্যক্ষ ঘটনার বিবরণ হিসেবে গ্রহণ করা কঠিন।

পুরোনো উপগ্রহচিত্র এই অনিশ্চয়তার একটি অংশ দূর করেছে। উনিশশো বাহাত্তর সালের অক্টোবর মাসে তোলা ছবিতে দারভাজার গর্তের অস্তিত্ব শনাক্ত করা যায়। এর অর্থ, গর্তটি ওই সময়ের আগেই তৈরি হয়েছিল। কিন্তু ছবিটি গর্তের নির্দিষ্ট জন্মদিন বলে দেয় না। এটি উনিশশো একাত্তরে তৈরি হয়ে থাকতে পারে, আবার তারও আগে হতে পারে। ছবির নিশ্চিত তথ্য শুধু এটুকু: বাহাত্তর সালের অক্টোবরের মধ্যে সেখানে গর্ত ছিল। ইতিহাসের বাকি অংশ বোঝার জন্য অন্য সময়ের পর্যবেক্ষণ দরকার।

আগুন লাগার সময় সম্পর্কে উপগ্রহের আরও নতুন বিশ্লেষণ প্রচলিত গল্পটিকে বড়ভাবে বদলে দিয়েছে। গবেষকেরা পুরোনো ছবিতে গর্তের তাপের চিহ্ন খুঁজে দেখেছেন। তাঁদের বিশ্লেষণে উনিশশো সাতাশি সালের সেপ্টেম্বরের একটি ছবিতে স্থায়ী আগুনের চিহ্ন পাওয়া যায়নি; উনিশশো আটাশি সালের ফেব্রুয়ারির ছবিতে তা স্পষ্ট দেখা যায়। ফলে গবেষণাটি আগুনের সূচনা ওই দুই সময়ের মাঝামাঝি কোনো পর্যায়ে ঘটেছিল বলে নির্দেশ করে। গর্ত আগে থেকেই ছিল, কিন্তু আগুনের পরিচিত দৃশ্য সম্ভবত আরও অনেক পরে শুরু হয়েছে।

এখানে ‘সম্ভবত’ শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। উপগ্রহচিত্রের মাঝখানের প্রতিটি দিনের সরাসরি ছবি নেই; গবেষকেরা শেষ যে ছবিতে আগুন দেখা যায়নি এবং প্রথম যে ছবিতে দেখা গেছে, তার মধ্যবর্তী সময় নির্ধারণ করেছেন। এই প্রমাণ প্রচলিত ‘১৯৭১ সাল থেকে একটানা জ্বলছে’ বক্তব্যের সঙ্গে মেলে না। তবে এটি কে, ঠিক কোন দিনে এবং কী উদ্দেশ্যে আগুন ধরিয়েছিল, তার উত্তরও দেয় না। আগুন ইচ্ছাকৃতভাবে লাগানো হয়েছিল, নাকি অন্যভাবে শুরু হয়েছিল—এই প্রশ্নে নিশ্চিত প্রত্যক্ষ নথি এখনও প্রয়োজন।

গ্যাস বের হতে থাকলে আগুন ধরিয়ে তা পোড়ানোর একটি বাস্তব উদ্দেশ্য থাকতে পারে। সরাসরি বাতাসে ছড়ানো মিথেন দাহ্য এবং জলবায়ুর জন্য শক্তিশালী উষ্ণায়নকারী গ্যাস। নিয়ন্ত্রিতভাবে পোড়ালে মিথেনের বড় অংশ অন্য গ্যাসে রূপান্তরিত হয়। কিন্তু দারভাজার ক্ষেত্রে ঠিক কোন সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে, কোন পদ্ধতিতে এবং কারা আগুন জ্বালিয়েছিলেন, তা প্রতিষ্ঠিত ইতিহাস হিসেবে বলা যায় না। ‘গ্যাস কয়েক দিনের মধ্যে শেষ হয়ে যাবে’—এই বহুল প্রচলিত কথাটিও যাচাই করা কঠিন। ব্যাখ্যা হিসেবে তা আকর্ষণীয় হলেও প্রমাণিত ঘটনার মর্যাদা দেওয়া উচিত নয়।

এত বছর আগুন জ্বলার কারণও কেবল ‘একটি বিশাল গ্যাসের থলি এখনও ফুরায়নি’ বলে শেষ করা যায় না। মাটির নিচে পলিস্তর, জলধারক স্তর, ঘন শিলা ও ফাটলের জটিল বিন্যাস রয়েছে। বিভিন্ন পথ দিয়ে গ্যাস গর্তে পৌঁছাতে পারে। শিখার অবস্থান ও তীব্রতা সময়ের সঙ্গে বদলায়, কারণ গ্যাসের নির্গমন সব স্থানে এক রকম নয়। কোথাও আগুন জ্বলছে মানে নিচের সব গ্যাস একই পথ দিয়ে বেরোচ্ছে—এমনও নয়। দারভাজাকে একটি খোলা মুখের নিচে রাখা একক পাত্রের বদলে জটিল ভূগর্ভস্থ গ্যাসব্যবস্থার প্রকাশ হিসেবে দেখা বেশি যথাযথ।

দারভাজার সবচেয়ে অস্বস্তিকর বাস্তবতা হলো, দৃশ্যমান আগুন সমস্ত নির্গত গ্যাস পুড়িয়ে ফেলছে না। সাম্প্রতিক উপগ্রহ পর্যবেক্ষণে গর্তের অঞ্চল থেকে মিথেনের নির্গমন শনাক্ত হয়েছে। গবেষকেরা কয়েক বছরে বহু পৃথক মিথেনের বিস্তার চিহ্নিত করেছেন। অর্থাৎ গর্তের ভেতরে শিখা জ্বললেও কিছু গ্যাস না পুড়েই বাতাসে পৌঁছাতে পারে। এই পার্থক্য চোখে ধরা পড়ে না। রাতে আগুন কতটা উজ্জ্বল দেখাচ্ছে, শুধু তা দেখে মিথেন নির্গমনের পরিমাণ নির্ধারণ করা যায় না।

মিথেনের এই দিকটি দারভাজার ইতিহাসকে পরিবেশের প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত করে। মিথেন বায়ুমণ্ডলে তাপ ধরে রাখার ক্ষমতাসম্পন্ন গ্যাস। আগুন জ্বললে যে মিথেন পুড়ে যায়, তার পাশাপাশি ফাটল বা অন্য পথ দিয়ে বেরিয়ে যাওয়া অপরিশোধিত গ্যাস আলাদা সমস্যা তৈরি করে। আবার গ্যাস পুড়লেও দহনের ফলে কার্বন ডাই-অক্সাইড উৎপন্ন হয় এবং মূল্যবান জ্বালানি ব্যবহার না হয়েই নষ্ট হয়। তাই আগুনের গর্তটি কেবল বিস্ময়কর পর্যটনস্থল নয়; জ্বালানি অনুসন্ধানের দীর্ঘস্থায়ী পরিবেশগত ফলের একটি উদাহরণ।

দুই হাজার তেইশ সালের পর গর্তের আগুনের তীব্রতা কমার লক্ষণ গবেষকেরা পর্যবেক্ষণ করেছেন। তুর্কমেনিস্তানও গর্তের আগুন কমানো এবং গ্যাসের প্রবাহ নিয়ন্ত্রণের উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। সাম্প্রতিক ছবিতে অতীতের তুলনায় কম অংশে শিখা দেখা যাওয়ার বিবরণ রয়েছে। তবে শিখা কমে যাওয়া আর ভূগর্ভ থেকে গ্যাস বের হওয়া বন্ধ হওয়া একই কথা নয়। উপগ্রহভিত্তিক গবেষণায় আগুনের দৃশ্যমান তীব্রতা কমার সঙ্গে মিথেন নির্গমন একই অনুপাতে কমেছে—এমন স্পষ্ট সম্পর্ক পাওয়া যায়নি। সুতরাং গর্ত অন্ধকার হতে থাকলেও গ্যাসের পথগুলো পর্যবেক্ষণ করা জরুরি।

আগুন পুরোপুরি নেভানোও শুধু ওপর থেকে মাটি ফেলে ঢেকে দেওয়ার মতো সরল কাজ নয়। যদি নিচ থেকে চাপের কারণে গ্যাস আসতে থাকে, একটি পথ বন্ধ হলে তা অন্য ফাটল দিয়ে বেরোতে পারে। গ্যাস কোথা থেকে আসছে, কীভাবে ভূগর্ভে চলেছে এবং কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার পর তা অন্য স্থানে ছড়াচ্ছে কি না, বুঝতে হবে। জ্বালানি সংগ্রহের সুযোগ থাকলেও তার জন্য উপযুক্ত অনুসন্ধান ও অবকাঠামো দরকার। গর্তের ওপরের আগুন আর নিচের গ্যাসপ্রবাহকে একসঙ্গে বিবেচনা না করলে দৃশ্য বদলাতে পারে, কিন্তু সমস্যাটি থেকে যেতে পারে।

দারভাজার খ্যাতির আরেক কারণ মরুভূমির পরিবেশ। দিনের আলোয় এটি একটি বড় ধসগর্ত বলে মনে হতে পারে; রাতে আগুনের আলো চারপাশের অন্ধকার বালুময় ভূমির বিপরীতে অনেক বেশি নাটকীয় দেখায়। সেই ছবি ও ‘নরকের দরজা’ নাম দ্রুত ছড়িয়েছে। পর্যটকদের আকর্ষণের সঙ্গে বিপদও রয়েছে: গর্তের কিনারা, তাপ এবং গ্যাস নির্গমনের অঞ্চলকে নিরাপদ প্রদর্শনীমঞ্চ ভাবার সুযোগ নেই। স্থানটির সৌন্দর্য তার ভূতাত্ত্বিক ও শিল্প অনুসন্ধানের ইতিহাস থেকে আলাদা নয়।

সবচেয়ে গ্রহণযোগ্য সংক্ষিপ্ত ইতিহাস তাই এমন: কারাকুম মরুভূমির গ্যাসসমৃদ্ধ অঞ্চলে একটি বড় ধসগর্ত উনিশশো বাহাত্তর সালের আগেই তৈরি হয়েছিল; তার নির্দিষ্ট বছর এখনও নিশ্চিত নয়। বহুল প্রচলিত বিবরণে সোভিয়েত অনুসন্ধানকাজকে এর কারণ বলা হয়, কিন্তু দুর্ঘটনা ও আগুন ধরানোর খুঁটিনাটি প্রমাণিত নয়। উপগ্রহচিত্রের নতুন বিশ্লেষণ নির্দেশ করে, স্থায়ী দৃশ্যমান আগুন শুরু হয় উনিশশো সাতাশি সালের শেষ থেকে উনিশশো আটাশি সালের শুরুর মধ্যে। এরপর দশকের পর দশক গ্যাসের সরবরাহ আগুনকে ধরে রেখেছে, যদিও সাম্প্রতিক সময়ে শিখা কমেছে।

দারভাজার আসল বিস্ময় তাই শুধু বহুদিন ধরে জ্বলা আগুন নয়; এক জনপ্রিয় গল্পকে কীভাবে নতুন প্রমাণ সংশোধন করতে পারে, সেটিও। গর্তের উৎপত্তির সঠিক দিন এখনও অজানা, কিন্তু তার অস্তিত্ব ও আগুনের শুরুর সময় সম্পর্কে এখন আগের চেয়ে নির্দিষ্টভাবে কথা বলা যায়। একই সঙ্গে উজ্জ্বল শিখার আড়ালে অদৃশ্য মিথেন নির্গমনের প্রশ্ন রয়ে গেছে। কারাকুমের এই গর্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, কোনো জায়গার সবচেয়ে বিখ্যাত ছবিটি তার সম্পূর্ণ ইতিহাস বা পরিবেশগত বাস্তবতা প্রকাশ করে না।


আপনার পছন্দ হতে পারে