আবিষ্কারের পরও পেনিসিলিন কেন এক দশক চিকিৎসায় আসেনি?
সিরিজ: পেনিসিলিন আবিষ্কার
আবিষ্কার থেকে ওষুধ—দীর্ঘ অপেক্ষা
ডিশে কাজ করা সেই নাজুক পদার্থকে কীভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে? আগের নিবন্ধের শেষে উঠে আসা এই প্রশ্নই পেনিসিলিনের ইতিহাসের পরবর্তী এক দশককে বুঝতে সাহায্য করে। ১৯২৮ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ছত্রাকের পাশে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থেমে যেতে দেখেছিলেন। ১৯২৯ সালে তিনি ফলটি প্রকাশও করেন। কিন্তু একজন রোগীর গুরুতর সংক্রমণ সারানোর মতো বিশুদ্ধ, নির্ভরযোগ্য এবং পর্যাপ্ত পেনিসিলিন তখন তাঁর হাতে ছিল না। পেট্রি ডিশে একটি পদার্থের ক্ষমতা দেখা আর সেটিকে ব্যবহারযোগ্য ওষুধে পরিণত করা এক কাজ নয়।
পেনিসিলিন ‘অবহেলিত’ ছিল—কথাটি আংশিক সত্য। ফ্লেমিং তাঁর আবিষ্কার গোপন করেননি, এবং সবাই একযোগে সেটি ভুলেও যাননি। তিনি ব্যাকটেরিয়ার ওপর পদার্থটির প্রভাব পরীক্ষা করেছিলেন; অন্য কয়েকজনও সীমিত পরিসরে এর সম্ভাবনা অনুসন্ধান করেন। তবু ১৯৩০-এর দশকের অধিকাংশ সময়ে পেনিসিলিনকে কার্যকর চিকিৎসা হিসেবে গড়ে তোলার জন্য প্রয়োজনীয় বড়, ধারাবাহিক গবেষণা এগোয়নি। আবিষ্কারটি হারিয়ে যায়নি; আটকে ছিল পরীক্ষাগারের ফল থেকে চিকিৎসার উপযোগী পদার্থ তৈরির কঠিন ধাপে।
প্রথম সমস্যা ছিল ছত্রাক চাষের তরলে পেনিসিলিনের স্বল্প উপস্থিতি। ফ্লেমিং যে তরল নিয়ে পরীক্ষা করছিলেন, সেটি শুধু সক্রিয় পেনিসিলিন দিয়ে তৈরি ছিল না। তাতে ছিল ছত্রাকের বৃদ্ধির মাধ্যম, বিভিন্ন দ্রবীভূত উপাদান এবং অবাঞ্ছিত পদার্থ। ব্যাকটেরিয়াকে বাধা দেওয়ার ক্ষমতা দেখা গেলেও কোন অংশে কতটা পেনিসিলিন রয়েছে, তা নির্ভুলভাবে আলাদা করা কঠিন হচ্ছিল। রোগীর শরীরে দেওয়ার আগে এমন তরলকে বিশুদ্ধ ও নির্দিষ্ট শক্তির প্রস্তুতিতে রূপ দিতে হয়। একটি নমুনা কাজে লাগলেই পরের নমুনাও একই শক্তির হবে—এ নিশ্চয়তা তখন দেওয়া যাচ্ছিল না।
ফ্লেমিং তাঁর সহকর্মী স্টুয়ার্ট ক্র্যাডক ও ফ্রেডেরিক রিডলিকে সক্রিয় পদার্থটি আলাদা করার কাজে যুক্ত করেছিলেন। তাঁরা অপরিশোধিত দ্রবণ পেয়েছিলেন, কিন্তু সহজে সংরক্ষণযোগ্য বিশুদ্ধ পেনিসিলিন পাননি। নিষ্কাশন ও বিশুদ্ধকরণের সময় পদার্থটির কার্যকারিতা ধরে রাখাও সমস্যা ছিল। ফলে পরীক্ষায় যতটুকু প্রভাব দেখা যাচ্ছিল, তার ভিত্তিতে হাসপাতালে নিয়মিত ব্যবহারের পরিকল্পনা করা সম্ভব হচ্ছিল না। যে রাসায়নিক পদার্থকে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ ও স্থিতিশীল রাখা যায় না, তার চিকিৎসাগত সম্ভাবনা প্রমাণ করাও কঠিন।
দ্বিতীয় বাধা ছিল পরীক্ষার ধরন। পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার ওপর পেনিসিলিনের প্রভাব সরাসরি দেখা যায়। কিন্তু শরীরের ভেতর সংক্রমণ অনেক জটিল। ওষুধটি রক্ত বা আক্রান্ত টিস্যুতে কতটা পৌঁছাবে, সেখানে কতক্ষণ কার্যকর থাকবে, কী পরিমাণে দিতে হবে এবং রোগীর জন্য নিরাপদ কি না—প্রতিটি প্রশ্নের উত্তর দরকার। গুরুতর সংক্রমণ সারানোর দাবি প্রতিষ্ঠা করতে প্রাণীর ওপর পরীক্ষা এবং পরে সতর্কভাবে রোগীর চিকিৎসায় ফল দেখতে হতো। ফ্লেমিংয়ের প্রাথমিক গবেষণা এসব ধাপ সম্পন্ন করেনি। তাই তাঁর প্রকাশিত ফল গুরুত্বপূর্ণ হলেও চিকিৎসকদের সামনে তখনই প্রস্তুত চিকিৎসাপদ্ধতি তুলে ধরতে পারেনি।
ফ্লেমিং তাঁর গবেষণাপত্রে পেনিসিলিনের একটি তাৎক্ষণিক পরীক্ষাগারগত ব্যবহারও দেখিয়েছিলেন। কোনো নমুনায় একাধিক ধরনের জীবাণু থাকলে পেনিসিলিনের সাহায্যে সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আটকে অন্য জীবাণুকে আলাদা করে শনাক্ত করা সহজ হতে পারে। এই ব্যবহারটি সেই সময়ের হাতে থাকা পদার্থ দিয়ে পরীক্ষা করা সম্ভব ছিল। বিপরীতে, শরীরের গভীর সংক্রমণ সারাতে লাগত অনেক বেশি পরিমাণে বিশুদ্ধ পেনিসিলিন। ফলে আবিষ্কারটির পরীক্ষাগারগত মূল্য বোঝা গেলেও চিকিৎসায় তার পূর্ণ সম্ভাবনা তখন প্রতিষ্ঠিত হয়নি। প্রথমে যা পাওয়া গিয়েছিল তা ছিল শক্তিশালী একটি সূত্র, সম্পূর্ণ চিকিৎসার প্রমাণ নয়।
তবে ‘এক দশক কেউ পেনিসিলিন রোগীর ওপর ব্যবহার করেনি’ বলাও ভুল হবে। ফ্লেমিংয়ের সাবেক ছাত্র সিসিল জর্জ পেইন ১৯৩০ সালে শেফিল্ডে ছত্রাক চাষ থেকে পাওয়া অপরিশোধিত পেনিসিলিনযুক্ত তরল দিয়ে কয়েকটি চোখের সংক্রমণের চিকিৎসা করেন। কিছু ক্ষেত্রে, বিশেষ করে নবজাতকের চোখের সংক্রমণে, ফল ভালো হয়েছিল। চোখের ওপর সরাসরি তরল প্রয়োগ করা আর শরীরজুড়ে ছড়িয়ে পড়া সংক্রমণের চিকিৎসা করা অবশ্য এক নয়। এই সীমিত ব্যবহার পেনিসিলিনের সম্ভাবনা দেখালেও সেটিকে বৃহত্তর চিকিৎসাব্যবস্থায় নিয়ে যাওয়ার মতো উৎপাদনপদ্ধতি বা ধারাবাহিক পরীক্ষার কর্মসূচি তৈরি করতে পারেনি।
তখনকার গবেষণার পরিবেশও বিবেচনায় রাখতে হয়। বিভিন্ন জীবাণুর বিরুদ্ধে প্রভাব দেখায় এমন একটি পদার্থ পেলেই তার উৎপাদনে বড় দল, বিশেষ যন্ত্রপাতি ও অর্থ বিনিয়োগ করা সহজ সিদ্ধান্ত ছিল না। পদার্থটি বিশুদ্ধ করা যাচ্ছে না, পরীক্ষায় ব্যবহারের জন্য যথেষ্ট পরিমাণও মিলছে না—এ অবস্থায় আরও গভীর গবেষণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ জোগাড় করা কঠিন। ফ্লেমিং নিজেও অন্য গবেষণায় কাজ চালিয়ে যান। তাঁর প্রকাশিত প্রবন্ধ বৈজ্ঞানিক নথিতে রয়ে যায়, কিন্তু পেনিসিলিন নিয়ে টানা কাজ করার মতো সমন্বিত উদ্যোগ তখন গড়ে ওঠেনি।
এর অর্থ এই নয় যে চিকিৎসাবিজ্ঞান ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের সমাধান খুঁজছিল না। ১৯৩০-এর দশকে অন্য ধরনের জীবাণুবিরোধী ওষুধ, বিশেষ করে সালফা ওষুধ, চিকিৎসায় গুরুত্ব পেতে শুরু করে। সেগুলোর উপস্থিতি পেনিসিলিন গবেষণা থেমে যাওয়ার একমাত্র কারণ ছিল না; বিশুদ্ধকরণ ও উৎপাদনের বাস্তব বাধাই ছিল বড় সমস্যা। কিন্তু সময়ের এই প্রেক্ষাপট দেখায়, গবেষক ও চিকিৎসকদের সামনে একাধিক সম্ভাব্য পথ ছিল। পেনিসিলিনের অসাধারণ ভবিষ্যৎ আজ আমাদের জানা বলে ১৯৩০-এর দশকের শুরুতে সেটিও সবার কাছে সমান স্পষ্ট ছিল—এমন ধরে নেওয়া ঠিক হবে না।
এই অপেক্ষার অবসান শুরু হয় অক্সফোর্ডে। আর্নস্ট চেইন ফ্লেমিংয়ের প্রকাশিত গবেষণায় আবার নজর দেন এবং হাওয়ার্ড ফ্লোরির সঙ্গে পেনিসিলিনকে আরও গভীরভাবে পরীক্ষার উদ্যোগ নেন। তাঁদের লক্ষ্য শুধু ছত্রাকের পাশে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত বলয় দেখা ছিল না। সক্রিয় পদার্থটি আলাদা করা, তার ক্ষমতা যাচাই করা এবং শরীরের সংক্রমণে কাজ করতে পারে কি না, তা পরীক্ষা করা ছিল জরুরি। এই কাজে নরম্যান হিটলিসহ গবেষকদলের অন্য সদস্যদের দক্ষতা একত্র হয়। ফ্লেমিং যে প্রশ্ন রেখে গিয়েছিলেন, অক্সফোর্ডের দল সেটিকে পরীক্ষামূলক চিকিৎসার পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার কাজ শুরু করে।
সুতরাং পেনিসিলিনের এক দশকের গল্প নিছক অমনোযোগের গল্প নয়। ফ্লেমিংয়ের পর্যবেক্ষণ যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ ছিল বলেই তা প্রকাশিত হয়েছিল এবং পরের গবেষকেরা সেখানে ফিরে যেতে পেরেছিলেন। একই সঙ্গে প্রাথমিক পরীক্ষার সীমা, পদার্থটির স্বল্প পরিমাণ, বিশুদ্ধকরণের অসুবিধা এবং বড় পরিসরে কাজের অভাব আবিষ্কারটিকে চিকিৎসা থেকে দূরে রেখেছিল। শেফিল্ডের সীমিত চিকিৎসা চেষ্টা প্রমাণ করে যে এই সময়ে কাজ পুরোপুরি থামেনি; অক্সফোর্ডের উদ্যোগ দেখায়, কেন সেই বিচ্ছিন্ন প্রচেষ্টার পরও নতুন গবেষণা দলের প্রয়োজন হয়েছিল।
১৯২৮ সালের দূষিত ডিশ তাই কোনো প্রস্তুত ওষুধের জন্মদৃশ্য ছিল না; সেটি ছিল দীর্ঘ অনুসন্ধানের শুরু। পরবর্তী বছরগুলোতে পেনিসিলিনের সম্ভাবনা টিকে ছিল ফ্লেমিংয়ের প্রকাশিত ফল, সংরক্ষিত ছত্রাক এবং অল্প কিছু গবেষণার মধ্যে। অক্সফোর্ডের দল সেই সম্ভাবনাকে হাতে নিয়ে এবার আরও কঠিন পরীক্ষার সামনে দাঁড়াল: ছত্রাকের তরল থেকে পাওয়া পদার্থ কি জীবন্ত শরীরের গুরুতর সংক্রমণও দমন করতে পারবে?
পেনিসিলিন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছে? নোবেল পুরস্কার ও প্রতিরোধের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন কীভাবে শুরু হয়েছিল?
Augmented Reality কী? বাস্তব পৃথিবীর ওপর ডিজিটাল জগত বসানোর প্রযুক্তি
টিকা কীভাবে শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায়?