বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফ্লোরি ও চেইন কীভাবে পেনিসিলিনকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধে রূপ দিলেন?

সিরিজ: পেনিসিলিন আবিষ্কার

ফ্লোরি ও চেইন কীভাবে পেনিসিলিনকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধে রূপ দিলেন?
পরীক্ষাগার থেকে রোগীর শয্যায়

ছত্রাকের তরল থেকে পাওয়া পদার্থ কি জীবন্ত শরীরের গুরুতর সংক্রমণও দমন করতে পারবে? আগের নিবন্ধে পেনিসিলিনের গল্প এই প্রশ্নে এসে থেমেছিল। আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের পেট্রি ডিশে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়ার দৃশ্য ছিল চমকপ্রদ, কিন্তু রোগীর চিকিৎসার জন্য তা যথেষ্ট প্রমাণ ছিল না। প্রয়োজন ছিল সক্রিয় পদার্থটিকে ছত্রাকের চাষের তরল থেকে আলাদা করা, তার শক্তি পরিমাপ করা, পর্যাপ্ত পরিমাণ তৈরি করা এবং শরীরের ভেতরেও সেটি কাজ করে কি না পরীক্ষা করা। ১৯৩০-এর দশকের শেষ দিকে অক্সফোর্ডে হাওয়ার্ড ফ্লোরি, আর্নস্ট চেইন এবং তাঁদের সহকর্মীরা এই কঠিন কাজগুলো হাতে নেন।

ফ্লোরি ছিলেন অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার উইলিয়াম ডান স্কুল অব প্যাথলজির প্রধান। তাঁর গবেষণার আগ্রহ ছিল সংক্রমণের বিরুদ্ধে কাজ করতে পারে এমন প্রাকৃতিক পদার্থে। জার্মানি থেকে ব্রিটেনে আসা প্রাণরসায়নবিদ আর্নস্ট চেইন ফ্লেমিংয়ের ১৯২৯ সালের পেনিসিলিনবিষয়ক গবেষণায় নতুন সম্ভাবনা দেখেন। কিন্তু পুরোনো প্রবন্ধটি আবার পড়লেই সমস্যার সমাধান হতো না। ফ্লেমিংয়ের অপরিশোধিত তরল দিয়ে ব্যাকটেরিয়া দমন করা গেলেও গুরুতর সংক্রমণের রোগীকে দেওয়ার মতো বিশুদ্ধ ও পর্যাপ্ত পেনিসিলিন তখনো তৈরি হয়নি। অক্সফোর্ডের দলের লক্ষ্য ছিল পর্যবেক্ষণকে পরিমাপযোগ্য চিকিৎসার পরীক্ষায় রূপ দেওয়া।

এই কাজে নরম্যান হিটলির ভূমিকা ছিল বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ছত্রাককে বাড়ানোর জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা, চাষের তরল থেকে সক্রিয় পদার্থ সংগ্রহের পদ্ধতি এবং তার কার্যকারিতা যাচাইয়ের পরীক্ষায় তিনি কাজ করেন। অল্প তরল থেকে সামান্য পেনিসিলিন পাওয়া গেলে একটি পরীক্ষা করা যায়; রোগীকে বারবার ওষুধ দিতে হলে লাগবে অনেক বেশি। তাই দলটিকে একই সঙ্গে দুটি প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হয়েছিল: কীভাবে আরও বেশি ছত্রাক চাষ করা যাবে, আর উৎপন্ন পেনিসিলিন নষ্ট না করে কীভাবে আলাদা করা যাবে?

ছত্রাক চাষের পাত্রে পেনিসিলিন মিশে থাকত তরল মাধ্যমে। সেই মাধ্যম থেকে ছত্রাকের অংশ সরানোর পরও নানা অপ্রয়োজনীয় উপাদান রয়ে যেত। গবেষকেরা সক্রিয় পদার্থকে ধাপে ধাপে নিষ্কাশন ও ঘনীভূত করার চেষ্টা করেন। কাজটি সংবেদনশীল ছিল, কারণ ভুল পরিবেশে পদার্থটির কার্যকারিতা কমে যেতে পারত। প্রতিবার প্রস্তুত নমুনায় কতটা ব্যাকটেরিয়াবিরোধী শক্তি রয়েছে, সেটিও পরীক্ষা করতে হতো। পেনিসিলিন সংগ্রহের প্রতিটি ধাপ তাই আবার তার কার্যকারিতা মেপে দেখার ধাপ। শুধু কিছু তরল পাওয়া সাফল্য ছিল না; সেই তরলে কার্যকর পেনিসিলিন টিকে আছে কি না, সেটিই ছিল আসল পরীক্ষা।

অক্সফোর্ডের গবেষণাগারে এই কাজ চলছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরুর সময়ে। উপকরণ ও উৎপাদনক্ষমতা সীমিত থাকা সত্ত্বেও দলটি ছত্রাক চাষ এবং পদার্থ সংগ্রহের ব্যবস্থা গড়ে তোলে। বিশেষভাবে তৈরি অগভীর পাত্রে ছত্রাক বাড়িয়ে আরও বেশি চাষের তরল পাওয়ার চেষ্টা করা হয়। পরে গবেষণাগারটির অনেক কাজই পেনিসিলিন তৈরির চারপাশে সংগঠিত হয়। এটি তখনো শিল্পকারখানায় বিপুল উৎপাদন ছিল না। কয়েকটি পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় পদার্থ জোগাড় করতেও গবেষকদের অনেকগুলো পাত্র, বারবার নিষ্কাশন এবং সতর্ক হিসাবের ওপর নির্ভর করতে হতো।

১৯৪০ সালে আসে একটি নির্ণায়ক পরীক্ষা। গবেষকেরা ইঁদুরের দুটি দলকে বিপজ্জনক ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে আক্রান্ত করেন। একটি দল পেনিসিলিন পায়; অন্য দলটি তুলনার জন্য ওষুধ ছাড়া রাখা হয়। ওষুধ পাওয়া ইঁদুরগুলোর বেঁচে থাকার ফল অন্য দলের তুলনায় অনেক ভালো হয়। এটি ছিল পেট্রি ডিশের বাইরে জীবন্ত শরীরে পেনিসিলিনের কার্যকারিতার শক্ত প্রমাণ। পরীক্ষাটি মানুষের চিকিৎসা সফল হবে—এমন নিশ্চয়তা দেয়নি, কিন্তু এত দিন যে মৌলিক প্রশ্নের উত্তর অনিশ্চিত ছিল, তার পক্ষে স্পষ্ট ফল দেখিয়েছিল।

ফ্লোরি ও সহকর্মীরা ১৯৪০ সালে তাঁদের প্রাণী পরীক্ষার ফল প্রকাশ করেন। এরপর সামনে আসে মানুষের জন্য ওষুধ তৈরির বাস্তব হিসাব। একটি ইঁদুরের চিকিৎসায় যে পরিমাণ পেনিসিলিন লাগে, একজন পূর্ণবয়স্ক রোগীর সংক্রমণ সামলাতে তার চেয়ে অনেক বেশি লাগবে। একবার ওষুধ দিলেই চিকিৎসা শেষ হবে না; কার্যকর মাত্রা ধরে রাখতে পুনরায় দিতে হতে পারে। নমুনা যত বিশুদ্ধই হোক, মাঝপথে সরবরাহ শেষ হয়ে গেলে গুরুতর রোগীর চিকিৎসা বিপন্ন হতে পারে। ফলে পরীক্ষার সাফল্য দলের সামনে আনন্দের পাশাপাশি উৎপাদনের চাপও বাড়িয়ে দেয়।

১৯৪১ সালের ফেব্রুয়ারিতে অক্সফোর্ডের র‍্যাডক্লিফ হাসপাতালে অ্যালবার্ট আলেকজান্ডার নামের এক পুলিশ কর্মকর্তাকে পেনিসিলিন দেওয়া হয়। তাঁর শরীরে গুরুতর সংক্রমণ ছড়িয়েছিল এবং অবস্থার অবনতি হচ্ছিল। চিকিৎসা শুরু হওয়ার পর তাঁর অবস্থার উল্লেখযোগ্য উন্নতি দেখা যায়। এই পরিবর্তন দেখায়, গবেষণাগারে তৈরি পেনিসিলিন মানুষের সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কাজ করতে পারে। কিন্তু দলের কাছে পর্যাপ্ত ওষুধ ছিল না। তাঁরা যতটা সম্ভব পেনিসিলিন জোগাড়ের চেষ্টা করেও চিকিৎসা চালিয়ে যাওয়ার মতো সরবরাহ ধরে রাখতে পারেননি। পরে আলেকজান্ডার মারা যান।

আলেকজান্ডারের ঘটনা পেনিসিলিনের ইতিহাসে তাই একই সঙ্গে আশার এবং বেদনার। তাঁর প্রথম উন্নতি ওষুধটির চিকিৎসাগত ক্ষমতা সামনে আনে; তাঁর মৃত্যু দেখিয়ে দেয়, কার্যকর পদার্থ আবিষ্কার করলেও পর্যাপ্ত পরিমাণে তৈরি করতে না পারলে রোগীকে বাঁচানো যায় না। পরবর্তী সময়ে আরও রোগীর চিকিৎসায় দলটি কাজ চালায় এবং পেনিসিলিনের ব্যবহার সম্পর্কে অভিজ্ঞতা বাড়ায়। কিন্তু রোগীপ্রতি প্রয়োজনীয় পরিমাণ জোগাড়ের সমস্যা কাটাতে শুধু অক্সফোর্ডের গবেষণাগারের শ্রম যথেষ্ট ছিল না।

এই পুরো উদ্যোগকে শুধু ফ্লোরি ও চেইনের ব্যক্তিগত সাফল্য হিসেবে দেখলে গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো আড়াল হয়ে যায়। চেইনের প্রাণরসায়নসংক্রান্ত গবেষণা, ফ্লোরির নেতৃত্বে পরীক্ষার পরিকল্পনা, হিটলির চাষ ও নিষ্কাশনের ব্যবস্থা, এবং দলের অন্য সদস্যদের পরীক্ষামূলক কাজ মিলেই ফল আসে। চিকিৎসকদের সহযোগিতা ছাড়া রোগীদের পর্যবেক্ষণ ও চিকিৎসার ফল মূল্যায়নও সম্ভব হতো না। ফ্লেমিংয়ের মূল আবিষ্কার তাঁদের কাজের ভিত্তি দিয়েছিল; অক্সফোর্ডের দল সেই ভিত্তির ওপর চিকিৎসার প্রমাণ তৈরি করে।

এরপরও পেনিসিলিন সাধারণ মানুষের নাগালের ওষুধ হয়ে যায়নি। যুদ্ধকালীন ব্রিটেনে বড় পরিসরের উৎপাদনের সুযোগ সীমিত ছিল। আরও বেশি ছত্রাক চাষ, উৎপাদন বাড়ায় এমন পদ্ধতি খোঁজা, নিষ্কাশনের ক্ষতি কমানো এবং প্রতিটি প্রস্তুত নমুনার কার্যকারিতা বজায় রাখা—এসবের জন্য শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সহায়তা প্রয়োজন হয়ে পড়ে। ১৯৪১ সালে ফ্লোরি ও হিটলি যুক্তরাষ্ট্রে যান সেই সহায়তার পথ খুঁজতে। অক্সফোর্ড প্রমাণ করেছিল পেনিসিলিন ওষুধ হতে পারে; এখন চ্যালেঞ্জ ছিল অসংখ্য রোগীর জন্য যথেষ্ট ওষুধ তৈরি করা।

ফ্লোরি ও চেইনের গবেষণা ফ্লেমিংয়ের আবিষ্কারকে নতুন অর্থ দেয়। ১৯২৮ সালের ডিশে দেখা ব্যাকটেরিয়ামুক্ত অঞ্চল থেকে যাত্রা শুরু হলেও চিকিৎসাবিজ্ঞানের সিদ্ধান্ত নিতে লেগেছিল বিশুদ্ধকরণ, শক্তি যাচাই, প্রাণীর পরীক্ষা এবং মানুষের চিকিৎসায় সতর্ক পর্যবেক্ষণ। অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারের সাময়িক উন্নতি সম্ভাবনাটিকে স্পষ্ট করেছিল, আর ওষুধ ফুরিয়ে যাওয়া দেখিয়েছিল পরের বাধাটি কত নির্মম। পেনিসিলিনের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; এবার জীবন বাঁচানোর সংখ্যাটি নির্ভর করবে উৎপাদনের ওপর।