বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পেনিসিলিন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছে? নোবেল পুরস্কার ও প্রতিরোধের ইতিহাস

সিরিজ: পেনিসিলিন আবিষ্কার

পেনিসিলিন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছে? নোবেল পুরস্কার ও প্রতিরোধের ইতিহাস
জীবনরক্ষার আবিষ্কার, ভবিষ্যতের সতর্কতা

ওষুধটি যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, ব্যাকটেরিয়া কি সব সময় তার প্রতি একই রকম সংবেদনশীল থাকবে? দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদনের গল্প শেষে এই প্রশ্নটি সামনে এসেছিল। যুদ্ধের আগে অক্সফোর্ডের গবেষণাগারে একজন গুরুতর অসুস্থ রোগীর চিকিৎসা শেষ করার মতো পেনিসিলিন জোগাড় করাই কঠিন ছিল। কয়েক বছরের মধ্যে কারখানায় উৎপাদন বেড়ে যাওয়ায় চিকিৎসকেরা আরও বহু রোগীর সংক্রমণের বিরুদ্ধে এটি ব্যবহার করার সুযোগ পান। পেনিসিলিন চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছিল একই সঙ্গে দুটি কারণে: এটি নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে কাজ করত এবং পর্যাপ্ত পরিমাণে রোগীর কাছে পৌঁছাতে পেরেছিল।

আগে ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণে চিকিৎসকেরা ক্ষত পরিষ্কার করা, পুঁজ বের করা, প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার এবং রোগীর শরীরের নিজস্ব প্রতিরোধক্ষমতার ওপর অনেকটাই নির্ভর করতেন। এসব ব্যবস্থা জরুরি ছিল, কিন্তু সংক্রমণ শরীরের গভীরে বা রক্তে ছড়িয়ে পড়লে চিকিৎসার সুযোগ সীমিত হয়ে যেত। পেনিসিলিন সংবেদনশীল জীবাণুর বৃদ্ধি থামিয়ে শরীরকে সংক্রমণ সামলানোর সময় দেয়। ফলে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে কেবল ক্ষতের বাইরের অংশ নয়, ভেতরের সংক্রমণের বিরুদ্ধেও কার্যকর চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব হয়। তবে ব্যাকটেরিয়া কোনটি, সংক্রমণ কোথায় এবং রোগীর অবস্থা কতটা গুরুতর—এসবের ওপর ফল নির্ভর করত।

পেনিসিলিনের কাজ বোঝার জন্য ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীরের দিকে তাকাতে হয়। অনেক ব্যাকটেরিয়ার চারদিকে শক্ত প্রাচীর থাকে, যা তাদের আকার ধরে রাখতে ও ভেতরের চাপ সামলাতে সাহায্য করে। পেনিসিলিন সেই প্রাচীর তৈরির গুরুত্বপূর্ণ ধাপে বাধা দেয়। বিশেষ করে বৃদ্ধি ও বিভাজনের সময় সংবেদনশীল জীবাণু এতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। মানুষের কোষে একই ধরনের কোষপ্রাচীর নেই; এ কারণেই উপযুক্ত মাত্রায় পেনিসিলিন দিয়ে ব্যাকটেরিয়াকে আঘাত করার সুযোগ তৈরি হয়। ওষুধটির ক্ষমতা ছিল শরীরের প্রতিটি জীবকে নির্বিচারে ধ্বংস করা নয়, ব্যাকটেরিয়ার একটি নির্দিষ্ট দুর্বলতাকে লক্ষ্য করা।

এই ক্ষমতা ক্ষত সংক্রমণের বাইরেও চিকিৎসার সম্ভাবনা বাড়ায়। সংবেদনশীল জীবাণু দ্বারা সৃষ্ট নিউমোনিয়া, রক্তের সংক্রমণ এবং অন্য কিছু রোগে পেনিসিলিন গুরুত্বপূর্ণ ওষুধ হয়ে ওঠে। অস্ত্রোপচারের পরে সংক্রমণের চিকিৎসা এবং প্রসবের পর দেখা দেওয়া নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণ সামলাতেও অ্যান্টিবায়োটিকের যুগ নতুন সুযোগ আনে। তার মানে অস্ত্রোপচার বা প্রসব হঠাৎ ঝুঁকিমুক্ত হয়ে যায়নি। জীবাণুমুক্ত পরিবেশ, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক, ক্ষতের সঠিক পরিচর্যা এবং রোগীর পর্যবেক্ষণ আগের মতোই জরুরি ছিল। পেনিসিলিন এসব ব্যবস্থার পাশে একটি শক্তিশালী চিকিৎসা যোগ করে।

প্রভাবটি বোঝার আরেকটি উপায় হলো প্রথম দিকের পেনিসিলিন চিকিৎসার অভিজ্ঞতা দেখা। অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারের অবস্থার উন্নতি হয়েও ওষুধের অভাবে চিকিৎসা শেষ হয়নি। পরে উৎপাদন বাড়ায় এমন সীমাবদ্ধতা কমতে থাকে। পর্যাপ্ত ওষুধ থাকলে চিকিৎসক নির্ধারিত সময় ও মাত্রায় চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন—যা একটি সংক্রমণ দমনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আবিষ্কারের সঙ্গে উৎপাদনের সম্পর্ক এখানে সরাসরি জীবন ও মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছিল। গবেষণাগার, কারখানা ও হাসপাতালের কাজ একই ধারায় যুক্ত হওয়ায় পেনিসিলিনের প্রকৃত চিকিৎসাগত প্রভাব বিস্তৃত হয়।

পেনিসিলিন ঠিক কত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে, তার নির্ভুল বৈশ্বিক সংখ্যা দেওয়া কঠিন। দশকের পর দশক ধরে অসংখ্য দেশে এটি ব্যবহৃত হয়েছে; একই রোগী অস্ত্রোপচার, ক্ষত পরিচর্যা এবং অন্য চিকিৎসাও পেয়েছেন। তাই প্রতিটি সুস্থ হয়ে ওঠা মানুষকে শুধু একটি ওষুধের কারণে বেঁচেছেন বলে গণনা করা যায় না। বিভিন্ন প্রচলিত হিসাবে বড় বড় সংখ্যা বলা হলেও তাদের পদ্ধতি এক নয়। তবু ঐতিহাসিক পরিবর্তনটি স্পষ্ট: যেসব ব্যাকটেরিয়াজনিত সংক্রমণের চিকিৎসায় আগে কার্যকর বিকল্প খুব সীমিত ছিল, সেগুলোর অনেকটির বিরুদ্ধে চিকিৎসকের হাতে একটি শক্তিশালী অস্ত্র আসে। কোটি মানুষের জীবনরক্ষার যে কথা বলা হয়, তা এই বিস্তৃত প্রভাবের ইঙ্গিত; নির্ভুলভাবে গণনা করা একক সংখ্যা নয়।

১৯৪৫ সালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিং, হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও আর্নস্ট চেইন যৌথভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। পুরস্কারটি পেনিসিলিন আবিষ্কার এবং বিভিন্ন সংক্রামক রোগে তার চিকিৎসাগত প্রভাবকে স্বীকৃতি দেয়। তিনজনের ভূমিকা একই ছিল না। ফ্লেমিং ১৯২৮ সালে ছত্রাকের ব্যাকটেরিয়াবিরোধী প্রভাব শনাক্ত করেন। চেইন, ফ্লোরি এবং অক্সফোর্ডের সহকর্মীরা পদার্থটি নিয়ে গভীর গবেষণা করে জীবন্ত শরীর ও রোগীর চিকিৎসায় তার কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠা করেন। নরম্যান হিটলিসহ আরও অনেকের উৎপাদন ও পরীক্ষামূলক অবদানও এই ইতিহাসের অংশ। নোবেল পুরস্কারের তিনটি নামের পেছনে ছিল একটি বৃহত্তর যৌথ প্রচেষ্টা।

পেনিসিলিনের সাফল্য অন্য অণুজীব থেকে জীবাণুবিরোধী পদার্থ খোঁজার আগ্রহ বাড়ায়। নতুন অ্যান্টিবায়োটিকের অনুসন্ধান, পরীক্ষার পদ্ধতি এবং ওষুধ উৎপাদনের সক্ষমতা বিকশিত হতে থাকে। তবে পেনিসিলিন প্রথম সফল হলেই পরের প্রতিটি অ্যান্টিবায়োটিক একই জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করবে—এমন নয়। জীবাণু শনাক্ত করা, তার সংবেদনশীলতা পরীক্ষা করা এবং রোগ অনুযায়ী ওষুধ বেছে নেওয়ার গুরুত্ব ক্রমে আরও স্পষ্ট হয়। পেনিসিলিনের উত্তরাধিকার তাই একটি নির্দিষ্ট ওষুধের জনপ্রিয়তার চেয়েও বড়: এটি দেখিয়েছিল, সংক্রমণের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত গবেষণা থেকে ব্যবহারযোগ্য চিকিৎসা তৈরি করা সম্ভব।

সাফল্যের মধ্যেই ছিল উদ্বেগের কারণ। একই প্রজাতির সব ব্যাকটেরিয়া অভিন্ন নয়। কোনো জীবাণুর এমন বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে, যার ফলে একটি অ্যান্টিবায়োটিক তার ওপর কম কাজ করে বা একেবারেই করে না। ওষুধ ব্যবহারে সংবেদনশীল জীবাণু দমে গেলে প্রতিরোধী জীবাণু টিকে থেকে বংশবিস্তার করার সুযোগ পেতে পারে। কিছু ব্যাকটেরিয়া পেনিসিলিনের গঠন ভেঙে দিতে পারে এমন পদার্থ তৈরি করে; অন্যদের ক্ষেত্রে ওষুধের লক্ষ্যবস্তু বদলে যায় বা ওষুধের পৌঁছানো বাধাগ্রস্ত হয়। প্রতিরোধক্ষমতা মানুষের শরীরে নয়, জীবাণুর জনগোষ্ঠীতে দেখা দেয় এবং ছড়াতে পারে।

ফ্লেমিং নিজেও পেনিসিলিনের অপর্যাপ্ত বা ভুল ব্যবহারে প্রতিরোধী জীবাণু নির্বাচিত হওয়ার আশঙ্কা সম্পর্কে সতর্ক করেছিলেন। আজকের চিকিৎসায় প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত। অ্যান্টিবায়োটিক ভাইরাসজনিত সাধারণ সর্দি সারায় না; প্রয়োজন ছাড়া সেগুলো ব্যবহার করলে উপকারের বদলে ক্ষতি ও প্রতিরোধের চাপ বাড়তে পারে। আবার চিকিৎসকের নির্ধারিত মাত্রা বা সময় নিজের ইচ্ছায় বদলানোও ঠিক নয়। রোগ, জীবাণু এবং রোগীর পরিস্থিতি অনুসারে চিকিৎসার দৈর্ঘ্য ভিন্ন হতে পারে। তাই নিরাপদ নীতি হলো চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক অ্যান্টিবায়োটিক, সঠিক মাত্রায় ও নির্ধারিত সময়ে ব্যবহার করা—কোনো পুরোনো ব্যবস্থাপত্র দেখে নিজে সিদ্ধান্ত নেওয়া নয়।

প্রতিরোধ দেখা দিয়েছে বলে পেনিসিলিনের যুগ শেষ হয়ে গেছে—এমনও নয়। নির্দিষ্ট সংক্রমণে সঠিক পরীক্ষা ও চিকিৎসাগত সিদ্ধান্তের ভিত্তিতে পেনিসিলিনজাত ওষুধ এখনো মূল্যবান। কিন্তু কোনো অ্যান্টিবায়োটিককে চিরকাল সমান কার্যকর ধরে নেওয়া যায় না। সংক্রমণ প্রতিরোধ, জীবাণু শনাক্তের পরীক্ষা, যুক্তিসংগত ওষুধ ব্যবহার এবং নতুন চিকিৎসা নিয়ে গবেষণা একসঙ্গে চালাতে হয়। ফ্লেমিংয়ের পেট্রি ডিশ থেকে শুরু হওয়া এই সিরিজের শেষ শিক্ষা তাই পেনিসিলিনের আবিষ্কারেই সীমাবদ্ধ নয়: একটি জীবনরক্ষাকারী ওষুধ তৈরি করা বিজ্ঞান ও সহযোগিতার অর্জন; সেটির কার্যকারিতা রক্ষা করাও দীর্ঘদিনের সম্মিলিত দায়িত্ব।