টিকা কীভাবে শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায়?
টিকা যেভাবে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে প্রশিক্ষণ দেয়
মানবদেহ প্রতিদিন অসংখ্য জীবাণু, ক্ষুদ্র কণা এবং বাইরের রাসায়নিক পদার্থের সংস্পর্শে আসে। এসবের অধিকাংশ ক্ষতিকর নয়, কিন্তু কিছু ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়া বা তাদের উৎপাদিত বিষাক্ত পদার্থ গুরুতর রোগ সৃষ্টি করতে পারে। শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা এসব বিপদের বিরুদ্ধে লড়াই করে। তবে কোনো নতুন রোগজীবাণুর সঙ্গে প্রথমবার দেখা হলে সেটিকে সঠিকভাবে শনাক্ত করে কার্যকর প্রতিরোধ গড়ে তুলতে শরীরের কিছুটা সময় লাগে। এই বিলম্বের মধ্যেই জীবাণু দ্রুত বংশবিস্তার করে অসুস্থতা, অঙ্গের ক্ষতি কিংবা মৃত্যুর কারণ হতে পারে। টিকা শরীরকে আসল বিপদ আসার আগেই সেই জীবাণুর গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় চিনিয়ে দেয়।
টিকা সরাসরি রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করা কোনো বাহ্যিক সেনাবাহিনী নয়। এটি শরীরের নিজস্ব রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে এমনভাবে প্রশিক্ষণ দেয়, যাতে ভবিষ্যতে নির্দিষ্ট রোগজীবাণুর মুখোমুখি হলে দ্রুত ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া তৈরি করা যায়। অধিকাংশ টিকায় পুরো সক্রিয় রোগজীবাণুর পরিবর্তে দুর্বল করা জীবাণু, নিষ্ক্রিয় জীবাণু, জীবাণুর কোনো নির্দিষ্ট অংশ, নিষ্ক্রিয় করা বিষাক্ত পদার্থ অথবা সেই অংশ তৈরির সাময়িক নির্দেশনা ব্যবহার করা হয়। এগুলো রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে বিপদের অনুকরণ দেখায়, কিন্তু পূর্ণমাত্রার স্বাভাবিক সংক্রমণের ঝুঁকি ছাড়াই শেখার সুযোগ দেয়।
শরীরের প্রতিরক্ষাকে সাধারণভাবে দুটি পরস্পর-সহযোগী ভাগে বোঝা যায়। প্রথমটি জন্মগত রোগপ্রতিরোধ, যা দ্রুত কাজ শুরু করে এবং সাধারণ বিপদের লক্ষণ চিনতে পারে। ত্বক, শ্লেষ্মা, প্রদাহ, কিছু রাসায়নিক সংকেত এবং জীবাণু গ্রাসকারী বিভিন্ন কোষ এর অংশ। দ্বিতীয়টি অভিযোজিত রোগপ্রতিরোধ, যা নির্দিষ্ট জীবাণুর সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য শনাক্ত করে বিশেষায়িত প্রতিক্রিয়া তৈরি করে। বি কোষ, টি কোষ, অ্যান্টিবডি এবং রোগপ্রতিরোধ স্মৃতি এই ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। টিকা প্রথমে জন্মগত প্রতিরোধকে সতর্ক করে এবং তার সহায়তায় অভিযোজিত প্রতিরোধকে নির্দিষ্ট লক্ষ্য সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দেয়।
ভাইরাস বা ব্যাকটেরিয়ার পৃষ্ঠে কিংবা ভেতরে এমন কিছু অণু থাকে, যেগুলোকে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা বিদেশি হিসেবে চিনতে পারে। এগুলোকে অ্যান্টিজেন বলা হয়। একটি অ্যান্টিজেন পুরো জীবাণু নয়; এটি জীবাণুর কোনো প্রোটিন, শর্করাজাত অংশ বা অন্য বিশেষ আণবিক গঠন হতে পারে। টিকায় এমন অ্যান্টিজেন নির্বাচন করা হয়, যা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে আসল জীবাণু শনাক্ত করতে সাহায্য করবে। অনেকটা অপরাধীকে সরাসরি সামনে না এনে তার নির্ভরযোগ্য পরিচয়চিহ্ন দেখিয়ে নিরাপত্তাকর্মীদের আগে থেকে প্রস্তুত করার মতো।
টিকা শরীরে প্রবেশ করার পর জন্মগত প্রতিরোধব্যবস্থার কিছু বিশেষ কোষ অ্যান্টিজেন সংগ্রহ করে। এদের মধ্যে ডেনড্রাইটিক কোষ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। কোষটি অ্যান্টিজেনকে ক্ষুদ্র অংশে ভেঙে নিজের পৃষ্ঠে প্রদর্শন করে এবং কাছের লসিকাগ্রন্থির দিকে যায়। লসিকাগ্রন্থি হলো এমন একটি জৈবিক মিলনস্থল, যেখানে রোগপ্রতিরোধ কোষগুলো তথ্য বিনিময় ও সক্রিয় হতে পারে। অ্যান্টিজেন বহনকারী কোষ সেখানে টি কোষকে জানায় যে শরীরে একটি বিশেষ ধরনের বিদেশি গঠন দেখা গেছে।
শরীরে বিপুলসংখ্যক টি কোষ থাকে এবং তাদের প্রত্যেক দলের গ্রাহক গঠন ভিন্ন। কোনো নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের সঙ্গে মিল থাকা টি কোষ সেটিকে চিনতে পারলে সক্রিয় হয়। সক্রিয় কোষ দ্রুত বিভাজিত হয়ে একই ধরনের বহু কোষ তৈরি করতে পারে। সহায়ক টি কোষ রাসায়নিক সংকেতের মাধ্যমে বি কোষসহ অন্য প্রতিরোধ কোষকে নির্দেশনা দেয়। কিছু টিকা এমন প্রতিক্রিয়াও সৃষ্টি করে, যাতে হত্যাকারী টি কোষ ভবিষ্যতে ভাইরাসে আক্রান্ত নিজস্ব কোষ শনাক্ত করে ধ্বংস করতে পারে। ভাইরাস যেহেতু কোষের ভেতরে বংশবিস্তার করে, তাই শুধু বাইরে ভাসমান ভাইরাস আটকানো নয়, আক্রান্ত কোষ নিয়ন্ত্রণ করাও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
বি কোষের পৃষ্ঠেও নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন শনাক্তকারী গ্রাহক থাকে। উপযুক্ত অ্যান্টিজেনের সঙ্গে যুক্ত হওয়া এবং সহায়ক টি কোষের প্রয়োজনীয় সংকেত পাওয়ার পর বি কোষ সক্রিয় ও বিভাজিত হয়। এর কিছু কোষ অ্যান্টিবডি উৎপাদনকারী রসকোষে পরিণত হয়। অ্যান্টিবডি হলো বিশেষ ধরনের প্রোটিন, যার গঠন নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেনের সঙ্গে মানানসই। তালার সঙ্গে সঠিক চাবির মিলের মতো অ্যান্টিবডির একটি অংশ নির্দিষ্ট জীবাণুর নির্দিষ্ট অংশকে চিনে যুক্ত হতে পারে।
অ্যান্টিবডি বিভিন্নভাবে সুরক্ষা দেয়। ভাইরাসের এমন অংশে অ্যান্টিবডি যুক্ত হতে পারে, যা ব্যবহার করে ভাইরাস মানবকোষে প্রবেশ করে। সেই অংশ ঢেকে গেলে ভাইরাস আর সহজে কোষকে সংক্রমিত করতে পারে না। একে নিষ্ক্রিয়করণ বলা হয়। অ্যান্টিবডি কোনো জীবাণুর গায়ে যুক্ত হয়ে তাকে অন্য প্রতিরোধ কোষের কাছে সহজ লক্ষ্য হিসেবেও চিহ্নিত করতে পারে। কিছু অ্যান্টিবডি শরীরের পরিপূরক প্রতিরক্ষাব্যবস্থাকে সক্রিয় করতে সাহায্য করে, যা জীবাণুকে ক্ষতিগ্রস্ত বা অপসারণে ভূমিকা রাখে। তবে সব অ্যান্টিবডি সমান কার্যকর নয়; তাদের পরিমাণ, অ্যান্টিজেন ধরার শক্তি ও অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ।
প্রাথমিক প্রতিক্রিয়ায় তৈরি বি কোষের একটি অংশ লসিকাগ্রন্থির বিশেষ অঞ্চলে পরিশোধনের মতো একটি প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে যায়। সেখানে অ্যান্টিজেনকে বেশি দৃঢ়ভাবে ধরতে সক্ষম কোষগুলো নির্বাচিত হয় এবং তাদের তৈরি অ্যান্টিবডির মান ধীরে ধীরে উন্নত হয়। একে অ্যান্টিবডির আকর্ষণক্ষমতা পরিণত হওয়া বলা যায়। টিকার পর শরীরের সুরক্ষা তাৎক্ষণিকভাবে পূর্ণমাত্রায় তৈরি না হওয়ার এটি একটি কারণ। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে উপযুক্ত কোষ নির্বাচন, বিস্তার এবং উন্নত অ্যান্টিবডি তৈরির জন্য সাধারণত কিছু সময় দিতে হয়।
টিকার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ফল শুধু সাময়িক অ্যান্টিবডি উৎপাদন নয়, রোগপ্রতিরোধ স্মৃতি তৈরি করা। সক্রিয় বি ও টি কোষের কিছু অংশ দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিকোষে পরিণত হয়। কিছু দীর্ঘজীবী রসকোষ অস্থিমজ্জায় অবস্থান করে দীর্ঘ সময় অ্যান্টিবডি উৎপাদন করতে পারে। স্মৃতি বি কোষ শরীরে থেকে যায় এবং একই অ্যান্টিজেন আবার দেখা দিলে দ্রুত বিভাজিত হয়ে নতুন অ্যান্টিবডি উৎপাদক কোষ তৈরি করে। স্মৃতি টি কোষও পরিচিত জীবাণুর বিরুদ্ধে দ্রুত সহায়তা ও কোষীয় প্রতিরোধ গড়ে তুলতে পারে।
আসল রোগজীবাণু পরে শরীরে প্রবেশ করলে প্রশিক্ষিত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তাকে প্রথমবারের অপরিচিত শত্রু হিসেবে দেখে না। আগে থেকে থাকা অ্যান্টিবডি সংক্রমণের শুরুতেই জীবাণুকে আটকে দিতে পারে। অ্যান্টিবডির মাত্রা কমে গেলেও স্মৃতিকোষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া বাড়াতে পারে। ফলে জীবাণু ব্যাপকভাবে বংশবিস্তার করার আগেই নিয়ন্ত্রণে আসার সম্ভাবনা বাড়ে। কোনো ক্ষেত্রে সংক্রমণ পুরোপুরি ঠেকানো যায়, আবার কোনো ক্ষেত্রে সংক্রমণ হলেও গুরুতর রোগ, হাসপাতালে ভর্তি বা মৃত্যুর ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে।
সব টিকা একই উপায়ে অ্যান্টিজেন দেখায় না। জীবিত কিন্তু দুর্বল করা টিকায় রোগজীবাণুর এমন রূপ ব্যবহার করা হয়, যা সুস্থ মানুষের শরীরে স্বাভাবিক জীবাণুর মতো কিছুটা বংশবিস্তার করতে পারলেও সাধারণত রোগ সৃষ্টি করার ক্ষমতা হারিয়েছে বা ব্যাপকভাবে কমেছে। এই টিকা প্রকৃত সংক্রমণের কাছাকাছি শক্তিশালী প্রতিরোধ তৈরি করতে পারে। তবে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা গুরুতরভাবে দুর্বল কিছু মানুষের জন্য নির্দিষ্ট জীবিত দুর্বল টিকা উপযুক্ত নাও হতে পারে। তাই ব্যক্তির স্বাস্থ্যাবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসকের পরামর্শ গুরুত্বপূর্ণ।
নিষ্ক্রিয় টিকায় রোগজীবাণুকে এমনভাবে অকার্যকর করা হয় যে সেটি আর বংশবিস্তার করতে পারে না। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা তবু তার অ্যান্টিজেন চিনতে পারে। এই ধরনের টিকায় জীবন্ত সংক্রমণ সৃষ্টির ক্ষমতা থাকে না, তবে পর্যাপ্ত ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিরোধ তৈরির জন্য একাধিক মাত্রা বা পরবর্তী পুনরুজ্জীবনী মাত্রা লাগতে পারে। টিকার ধরন ও রোগভেদে এই প্রয়োজন আলাদা হয়।
উপাংশ টিকায় পুরো জীবাণুর পরিবর্তে শুধু নির্বাচিত প্রোটিন বা শর্করাজাত অংশ ব্যবহার করা হয়। এতে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট ও গুরুত্বপূর্ণ লক্ষ্য দেখানো যায়। কিছু ব্যাকটেরিয়ার বাইরের শর্করাজাত আবরণ একা ছোট শিশুদের শক্তিশালী স্মৃতি তৈরি করতে যথেষ্ট কার্যকর নয়। তখন সেই শর্করাকে একটি বাহক প্রোটিনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। এই সংযুক্ত টিকা টি কোষের সহায়তা নিয়ে উন্নত বি কোষীয় স্মৃতি গড়ে তুলতে পারে।
কিছু ব্যাকটেরিয়া নিজে সরাসরি যতটা ক্ষতি করে, তার চেয়ে বেশি ক্ষতি করে উৎপাদিত বিষাক্ত পদার্থের মাধ্যমে। এমন ক্ষেত্রে জীবাণুর পরিবর্তে তার বিষকে নিরাপদভাবে নিষ্ক্রিয় করে টিকায় ব্যবহার করা হয়। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা সেই বিষাক্ত পদার্থের গঠন চিনে অ্যান্টিবডি তৈরি করে। ভবিষ্যতে আসল ব্যাকটেরিয়া বিষ উৎপাদন করলে অ্যান্টিবডি সেটিকে নিষ্ক্রিয় করতে সাহায্য করে। ধনুষ্টংকার ও ডিপথেরিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহৃত টিকা এই নীতির পরিচিত উদাহরণ।
বাহকভিত্তিক টিকায় ক্ষতিহীন বা পরিবর্তিত একটি ভাইরাসকে বাহক হিসেবে ব্যবহার করে লক্ষ্য রোগজীবাণুর নির্দিষ্ট অ্যান্টিজেন তৈরির নির্দেশনা শরীরের কিছু কোষে পৌঁছে দেওয়া হয়। কোষ অল্প সময়ের জন্য সেই অ্যান্টিজেন তৈরি করে রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দেখায়। বাহকটি লক্ষ্য রোগটি সৃষ্টি করে না। কিছু মানুষের আগে থেকেই বাহক ভাইরাসের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ থাকলে টিকার প্রতিক্রিয়ায় প্রভাব পড়তে পারে, তাই বাহক নির্বাচন ও টিকার নকশা গুরুত্বপূর্ণ।
বার্তাবাহী রাইবোনিউক্লিক অম্লভিত্তিক টিকায় প্রস্তুত অ্যান্টিজেনের পরিবর্তে অ্যান্টিজেন তৈরির সাময়িক আণবিক নির্দেশনা দেওয়া হয়। নির্দেশনাটি সাধারণত ক্ষুদ্র চর্বিজাত আবরণের ভেতরে সুরক্ষিত থাকে, যাতে শরীরের কোষে পৌঁছাতে পারে। কোষ সেই নির্দেশনা পড়ে অল্প সময়ের জন্য নির্দিষ্ট প্রোটিন তৈরি করে। রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা প্রোটিনটিকে চিনে প্রতিক্রিয়া ও স্মৃতি গড়ে তোলে। নির্দেশনাটি কোষের কেন্দ্রে প্রবেশ করার প্রয়োজন হয় না এবং এটি মানুষের বংশগত উপাদান পরিবর্তন করে না। ব্যবহারের পর নির্দেশনাটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় ভেঙে যায়।
কিছু টিকায় সহায়ক উপাদান যোগ করা হয়, যা জন্মগত রোগপ্রতিরোধকে যথেষ্ট সতর্ক করে অ্যান্টিজেনের বিরুদ্ধে শক্তিশালী ও দীর্ঘস্থায়ী প্রতিক্রিয়া তৈরিতে সাহায্য করে। একে সহায়ক উদ্দীপক বলা যায়। এটি নিজে লক্ষ্য রোগের অ্যান্টিজেন নয়; বরং অ্যান্টিজেন উপস্থিত থাকার বিষয়টি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে ভালোভাবে জানানোর পরিবেশ তৈরি করে। এর সাহায্যে অল্প অ্যান্টিজেন দিয়ে কার্যকর প্রতিক্রিয়া পাওয়া বা দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করা সম্ভব হতে পারে।
টিকা নেওয়ার পর বাহুতে ব্যথা, সামান্য ফুলে যাওয়া, ক্লান্তি, মাথাব্যথা বা অল্প জ্বর হতে পারে। এগুলো প্রায়ই টিকার উপাদানের প্রতি জন্মগত প্রতিরোধের সাময়িক প্রদাহজনিত প্রতিক্রিয়ার ফল। তবে পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া অনুভব করলেই শুধু টিকা কাজ করছে এবং কিছু অনুভব না করলে কাজ করছে না—এ ধারণা সঠিক নয়। অনেক মানুষ কোনো লক্ষণ ছাড়াই ভালো রোগপ্রতিরোধ তৈরি করেন। আবার বেশি জ্বর বা বেশি ব্যথা মানেই বেশি সুরক্ষা—এমন সম্পর্কও নির্ভরযোগ্য নয়।
গুরুতর প্রতিক্রিয়া ঘটতে পারে, কিন্তু অনুমোদিত টিকার ক্ষেত্রে তা সাধারণত বিরল। টিকা ব্যবহারের আগে একাধিক পর্যায়ে নিরাপত্তা, সঠিক মাত্রা ও কার্যকারিতা পরীক্ষা করা হয়। ব্যবহার শুরু হওয়ার পরও পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার তথ্য সংগ্রহ ও বিশ্লেষণ করা হয়, যাতে বিরল সমস্যাও শনাক্ত করা যায়। কোনো ঘটনার সঙ্গে টিকা নেওয়ার সময়গত সম্পর্ক থাকলেই টিকা সেটির কারণ—এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। প্রত্যাশিত স্বাভাবিক ঘটনার হারের সঙ্গে তুলনা, চিকিৎসার তথ্য এবং বিভিন্ন অঞ্চলের ফল বিশ্লেষণ করে কারণ নির্ধারণ করতে হয়।
টিকা নেওয়ার পর গুরুতর অ্যালার্জিজনিত প্রতিক্রিয়া খুব বিরল হলেও দ্রুত চিকিৎসা দরকার হতে পারে। এ কারণেই কিছু টিকার পর নির্দিষ্ট সময় পর্যবেক্ষণে থাকতে বলা হয়। আগে কোনো টিকার মাত্রা বা উপাদানে গুরুতর অ্যালার্জি হয়ে থাকলে পরবর্তী মাত্রার আগে স্বাস্থ্যকর্মীকে জানাতে হয়। গর্ভাবস্থা, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল হওয়া, বিশেষ চিকিৎসা গ্রহণ বা গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে কোন টিকা কখন নেওয়া যাবে, তা টিকার ধরন অনুযায়ী ভিন্ন হতে পারে।
একটি মাত্রা সব সময় পর্যাপ্ত না হওয়ার কয়েকটি কারণ আছে। প্রথম মাত্রা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে অ্যান্টিজেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে প্রাথমিক কোষীয় প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। পরবর্তী মাত্রা স্মৃতি বি ও টি কোষকে আবার সক্রিয় করে, অ্যান্টিবডির পরিমাণ বাড়ায় এবং অ্যান্টিজেন ধরার মান উন্নত করতে পারে। ছোট শিশুদের অপরিণত রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা, টিকার প্রকৃতি এবং মাতৃ অ্যান্টিবডির উপস্থিতির কারণেও নির্ধারিত ব্যবধানে একাধিক মাত্রা দরকার হতে পারে। পূর্ণ প্রাথমিক ধারাবাহিকতা শেষ না করলে কাঙ্ক্ষিত সুরক্ষা নাও তৈরি হতে পারে।
পুনরুজ্জীবনী মাত্রা সব টিকার ক্ষেত্রে একই কারণে লাগে না। কিছু রোগের বিরুদ্ধে অ্যান্টিবডির মাত্রা সময়ের সঙ্গে এমন পর্যায়ে নেমে যায়, যেখানে দ্রুত সুরক্ষার জন্য তা যথেষ্ট নয়। কিছু জীবাণু পরিবর্তিত হয়ে আগের অ্যান্টিবডির কাছ থেকে আংশিকভাবে ফাঁকি দিতে পারে। আবার কিছু টিকা স্বভাবগতভাবেই সীমিত সময়ের সুরক্ষা দেয়। পুনরুজ্জীবনী মাত্রা স্মৃতিকোষকে আবার সক্রিয় করে অ্যান্টিবডি ও কোষীয় প্রতিক্রিয়া বাড়াতে পারে। কোন টিকার কত মাত্রা ও কত ব্যবধান প্রয়োজন, তা গবেষণা, রোগের ঝুঁকি এবং জনস্বাস্থ্য নির্দেশনার ভিত্তিতে নির্ধারিত হয়।
টিকা নিলেও কোনো কোনো ব্যক্তি আক্রান্ত হতে পারেন। কোনো টিকাই প্রত্যেক মানুষের মধ্যে শতভাগ সমান সুরক্ষা সৃষ্টি করে না। বয়স, বংশগত পার্থক্য, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার অবস্থা, চলমান অসুস্থতা, ওষুধ এবং টিকার মাত্রা সম্পূর্ণ হয়েছে কি না—এসব প্রতিক্রিয়াকে প্রভাবিত করে। রোগজীবাণুর পরিবর্তনও টিকার তৈরি অ্যান্টিবডির কার্যকারিতা কমাতে পারে। কিন্তু টিকার উদ্দেশ্য শুধু প্রতিটি সংক্রমণ সম্পূর্ণ বন্ধ করা নয়; অনেক টিকার গুরুত্বপূর্ণ সাফল্য হলো সংক্রমণ ঘটলেও গুরুতর অসুস্থতা ও জটিলতার ঝুঁকি কমানো।
কোনো ব্যক্তি টিকা নেওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই সংক্রমিত হলে টিকা তখনো পূর্ণ সুরক্ষা তৈরি করার সুযোগ পায়নি। অ্যান্টিবডি, কার্যকর টি কোষ এবং স্মৃতিকোষ তৈরি হতে সাধারণত কিছু সময় লাগে। আবার ব্যক্তি টিকা নেওয়ার আগেই সংক্রমিত হয়ে থাকতে পারেন, কিন্তু রোগের লক্ষণ পরে প্রকাশ পেতে পারে। তখন সময়ের দিক থেকে টিকার পর অসুস্থতা দেখা গেলেও টিকা সেই সংক্রমণের কারণ নয়। টিকার কার্যকারিতা বিচার করতে সঠিক সময়সীমা ও তুলনামূলক তথ্য বিবেচনা করতে হয়।
স্বাভাবিক সংক্রমণ থেকেও রোগপ্রতিরোধ স্মৃতি তৈরি হতে পারে, কিন্তু এর মূল্য অনিশ্চিত। রোগটি হালকা হবে নাকি নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কের প্রদাহ, পক্ষাঘাত, অঙ্গের ক্ষতি, দীর্ঘস্থায়ী জটিলতা বা মৃত্যু ঘটাবে, তা আগে থেকে নিশ্চিতভাবে বলা যায় না। টিকা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে নির্বাচিত অ্যান্টিজেন দেখিয়ে পূর্ণ রোগের বিপদ ছাড়াই শিক্ষা দেওয়ার চেষ্টা করে। তাই শুধু সংক্রমণ ঘটিয়ে প্রতিরোধ অর্জনের তুলনায় অনুমোদিত টিকাদান সাধারণত অনেক বেশি নিয়ন্ত্রিত ও নিরাপদ পথ।
একসঙ্গে বা নির্ধারিত সময়ে একাধিক টিকা নিলে শিশুর রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থা অতিরিক্ত চাপে পড়ে—এমন ধারণার বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই। প্রতিদিন খাবার, বাতাস, ত্বক ও শ্বাসনালির মাধ্যমে শরীর বিপুলসংখ্যক অ্যান্টিজেনের সংস্পর্শে আসে। আধুনিক টিকায় থাকা নির্বাচিত অ্যান্টিজেনের সংখ্যা সেই দৈনন্দিন চ্যালেঞ্জের তুলনায় সামান্য। বরং নির্ধারিত সময়সূচি অনুসরণ করলে শিশুকে ঝুঁকিপূর্ণ সময়েই সুরক্ষা দেওয়া যায়। অপ্রয়োজনীয় দেরি করলে সে সময়ে প্রতিরোধযোগ্য রোগে আক্রান্ত হওয়ার সুযোগ বাড়ে।
টিকা শুধু গ্রহণকারী ব্যক্তিকে নয়, কখনো আশপাশের মানুষকেও সুরক্ষা দিতে পারে। কোনো রোগের বিরুদ্ধে জনসংখ্যার বড় অংশের কার্যকর প্রতিরোধ থাকলে জীবাণুর এক ব্যক্তি থেকে অন্য ব্যক্তিতে যাওয়ার সুযোগ কমতে পারে। এতে এমন মানুষ পরোক্ষ সুবিধা পান, যারা বয়স, গুরুতর অ্যালার্জি বা বিশেষ চিকিৎসাগত কারণে নির্দিষ্ট টিকা নিতে পারেন না কিংবা টিকা নিয়েও যথেষ্ট প্রতিরোধ তৈরি করতে পারেননি। তবে এই সামষ্টিক সুরক্ষার মাত্রা রোগটি কত সহজে ছড়ায় এবং টিকাটি সংক্রমণ ও সংক্রমণ ছড়ানো কতটা কমায় তার ওপর নির্ভর করে।
সব টিকা সংক্রমণ ছড়ানো সমানভাবে বন্ধ করে না। রক্তে তৈরি অ্যান্টিবডি গুরুতর রোগ ঠেকাতে কার্যকর হলেও নাক বা গলার শ্লেষ্মাস্তরে জীবাণুর প্রথম প্রবেশ সম্পূর্ণ বন্ধ করতে সব সময় যথেষ্ট নাও হতে পারে। কিছু টিকা শ্লেষ্মাস্তরীয় প্রতিরোধ তুলনামূলক ভালোভাবে তৈরি করতে পারে। তাই কোনো টিকা গুরুতর রোগের বিরুদ্ধে খুব কার্যকর হলেও সাময়িক সংক্রমণ বা অন্যকে সংক্রমিত করার সম্ভাবনা পুরোপুরি দূর না-ও করতে পারে। টিকার সাফল্য মূল্যায়নের সময় সংক্রমণ, লক্ষণযুক্ত রোগ, গুরুতর রোগ ও মৃত্যুর বিরুদ্ধে সুরক্ষাকে আলাদাভাবে দেখতে হয়।
অ্যান্টিবডির পরিমাণ কমে যাওয়া মানেই রোগপ্রতিরোধ সম্পূর্ণ হারিয়ে যাওয়া নয়। রক্তে অ্যান্টিবডি সহজে মাপা যায় বলে আলোচনায় সেটিই বেশি গুরুত্ব পায়। কিন্তু স্মৃতি বি কোষ, স্মৃতি টি কোষ এবং দীর্ঘজীবী অ্যান্টিবডি উৎপাদক কোষও সুরক্ষায় ভূমিকা রাখে। নতুন সংক্রমণের সময় স্মৃতিকোষ দ্রুত প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে। অবশ্য খুব দ্রুত বংশবিস্তারকারী জীবাণুর ক্ষেত্রে আগে থেকে পর্যাপ্ত অ্যান্টিবডি থাকা সংক্রমণের শুরুতেই প্রতিরোধের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে।
প্রতিটি রোগের জন্য কার্যকর টিকা তৈরি করা সমান সহজ নয়। কোনো জীবাণু দ্রুত নিজের বাহ্যিক গঠন বদলায়, কোনোটি রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থার কাছ থেকে লুকিয়ে থাকে এবং কোনোটি শরীরের এমন কোষে দীর্ঘদিন অবস্থান করে যেখানে তাকে সম্পূর্ণ অপসারণ করা কঠিন। কিছু রোগে কোন ধরনের প্রতিরোধ নিশ্চিত সুরক্ষা দেয়, সেটিও পুরোপুরি জানা থাকে না। তাই একটি টিকা তৈরিতে উপযুক্ত অ্যান্টিজেন নির্বাচন, নিরাপদ বাহন নির্ধারণ, সঠিক মাত্রা খোঁজা, বিভিন্ন বয়সের মানুষের প্রতিক্রিয়া পরীক্ষা এবং দীর্ঘমেয়াদি পর্যবেক্ষণ দরকার হয়।
টিকা রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাকে কোনো সচেতন মস্তিষ্কের মতো পাঠ শেখায় না; এটি নির্বাচিত অ্যান্টিজেন দেখিয়ে জৈবিক নির্বাচন ও স্মৃতির প্রক্রিয়া সক্রিয় করে। মিল থাকা বি ও টি কোষ সক্রিয় হয়, কার্যকর কোষগুলোর সংখ্যা বাড়ে, উন্নত অ্যান্টিবডি তৈরি হয় এবং তাদের কিছু দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতিকোষ হিসেবে থেকে যায়। পরে আসল জীবাণু এলে এই প্রস্তুত ব্যবস্থা প্রথম সংস্পর্শের তুলনায় দ্রুত, শক্তিশালী ও লক্ষ্যভিত্তিক প্রতিক্রিয়া জানায়।
এই পূর্বপ্রস্তুতিই টিকার মূল শক্তি। টিকা শরীরের প্রতিরোধের বিকল্প নয়; বরং সেই প্রতিরোধকে নিরাপদ অনুশীলনের সুযোগ দেয়। একেক টিকা একেক পদ্ধতিতে পরিচয় দেখালেও লক্ষ্য একই—আসল সংক্রমণের আগে যথেষ্ট অ্যান্টিবডি, কার্যকর রোগপ্রতিরোধ কোষ এবং দীর্ঘস্থায়ী স্মৃতি তৈরি করা। ফলে ভবিষ্যতে জীবাণু শরীরে প্রবেশ করলে প্রতিরোধ ব্যবস্থা নতুন করে সবকিছু শেখার আগেই লড়াই শুরু করতে পারে। রোগের বিপজ্জনক পরিণতি ঘটার আগে শরীরকে প্রস্তুত করে রাখাই টিকাদানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈজ্ঞানিক সাফল্য।
ড্রোন কীভাবে আকাশে ভারসাম্য বজায় রেখে উড়ে? প্রপেলার, সেন্সর ও নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার বিজ্ঞান
মাইক্রোচিপ কীভাবে তৈরি হয়? বালু থেকে কোটি কোটি ট্রানজিস্টরের বিস্ময়কর যাত্রা
লেজার কীভাবে কাজ করে এবং সাধারণ আলো থেকে এটি এত আলাদা কেন? আলোর বিস্ময়কর বিজ্ঞানের সহজ ব্যাখ্যা
এমআরআই যন্ত্র শরীর না কেটেই ভেতরের ছবি তোলে কীভাবে? চুম্বক, বেতার তরঙ্গ ও হাইড্রোজেন পরমাণুর বিস্ময়কর বিজ্ঞান
কোয়ান্টাম ইন্টারনেট কী? ভবিষ্যতের যোগাযোগ কি হ্যাক করা প্রায় অসম্ভব হবে?
কিউআর কোডের ছোট ছোট কালো বর্গের মধ্যে তথ্য লুকিয়ে থাকে কীভাবে? জানুন এর বিস্ময়কর প্রযুক্তি