বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পৃথিবীর কোথায় কয়েক মাস সূর্য অস্ত যায় না? মধ্যরাতের সূর্যের বিজ্ঞান

পৃথিবীর কোথায় কয়েক মাস সূর্য অস্ত যায় না? মধ্যরাতের সূর্যের বিজ্ঞান
মধ্যরাতেও দিগন্তের ওপরে সূর্য

রাত বারোটায় ঘড়ি দেখেও যদি জানালার বাইরে সূর্য দেখা যায়, প্রথমে সময় ভুল মনে হতে পারে। কিন্তু পৃথিবীর উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছাকাছি কিছু অঞ্চলে বছরের নির্দিষ্ট সময়ে এটিই স্বাভাবিক দৃশ্য। সূর্য দিনের আকাশে ঘুরতে ঘুরতে নিচের দিকে নামে, দিগন্তের কাছাকাছি পৌঁছায়, তারপর আবার ওপরে উঠতে শুরু করে। মাঝখানে একবারও পুরোপুরি অস্ত যায় না। এই ঘটনাকে বলা হয় ‘মধ্যরাতের সূর্য’। কোথাও এটি মাত্র এক দিন দেখা যায়, কোথাও কয়েক সপ্তাহ, আবার মেরুর খুব কাছে কয়েক মাস ধরে দিন চলতে থাকে।

মধ্যরাতের সূর্য বোঝার আগে সাধারণ দিন-রাতের কারণটি মনে করা দরকার। পৃথিবী নিজের অক্ষের চারদিকে ঘোরে। ফলে কোনো স্থানের মুখ যখন সূর্যের দিকে থাকে, সেখানে দিন; বিপরীত দিকে গেলে রাত। বাংলাদেশে আমরা প্রতিদিন সূর্যোদয় ও সূর্যাস্ত দেখি বলে মনে হয়, পৃথিবীর সব স্থানেই প্রতিটি ঘূর্ণনে কিছু সময় আলো এবং কিছু সময় অন্ধকার থাকবে। মেরু অঞ্চলে এই পরিচিত নিয়মের দৃশ্যমান ফল বদলে যায়, কারণ পৃথিবীর ঘূর্ণনের অক্ষ তার সূর্যকে প্রদক্ষিণের তলের তুলনায় হেলে আছে।

পৃথিবীর অক্ষের হেলন প্রায় সাড়ে তেইশ ডিগ্রি। পৃথিবী যখন সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে, বছরের এক অংশে উত্তর মেরু সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে। অন্য অংশে দক্ষিণ মেরু সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকে। উত্তর মেরু সূর্যের দিকে হেলে থাকলে উত্তরের উচ্চ অক্ষাংশে সূর্য আকাশে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করে। যথেষ্ট উত্তরে গেলে পৃথিবী একবার সম্পূর্ণ ঘুরে আসার পরও সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। ছয় মাস পরে অবস্থাটি উল্টে যায়; দক্ষিণ মেরুর দিকে দীর্ঘ আলোকিত দিনের পালা আসে।

এটি বোঝার একটি সহজ উপায় হলো একটি হেলে রাখা গোলক কল্পনা করা। গোলকটিকে একদিকে থেকে আলো দিয়ে তার অক্ষ বরাবর ঘোরালে দেখা যাবে, সূর্যের দিকে ঝুঁকে থাকা মেরুর কাছের অংশ পুরো ঘূর্ণনজুড়েই আলোকিত থাকতে পারে। অন্য মেরুর কাছের অংশ একই সময়ে অন্ধকারে থাকে। বাস্তব পৃথিবীতেও তাই ঘটে। এখানে সূর্য থেমে যায় না, পৃথিবীর ঘূর্ণনও বন্ধ হয় না। বরং ঘূর্ণনের সময় পর্যবেক্ষকের অবস্থান এমন পথে চলে যে তিনি সূর্যালোকিত অঞ্চল ছেড়ে পুরোপুরি বাইরে যান না।

উত্তর গোলার্ধে মধ্যরাতের সূর্য দেখা যায় উত্তর মেরুবৃত্তের ভেতরের অঞ্চলগুলোতে। উত্তর মেরুবৃত্ত প্রায় সাড়ে ছেষট্টি ডিগ্রি উত্তর অক্ষাংশে অবস্থিত। জুন মাসের সূর্য অয়নান্তের কাছাকাছি এর সীমানায় প্রায় একটি পূর্ণ দিনের জন্য সূর্য অস্ত না যাওয়ার জ্যামিতিক অবস্থা তৈরি হয়। আরও উত্তরে গেলে এই সময়কাল বাড়তে থাকে। তাই ‘উত্তর মেরুবৃত্তের ওপরে গেলেই কয়েক মাস সূর্য অস্ত যায় না’—এমন ধারণা ঠিক নয়। কয়েক মাসের অবিরাম দিন দেখতে হলে মেরুর অনেক কাছাকাছি যেতে হয়।

উত্তর মেরুবৃত্ত শুধু একটি দেশের মধ্যে নেই। উত্তর নরওয়ে, সুইডেন, ফিনল্যান্ড, রাশিয়া, গ্রিনল্যান্ড, কানাডা এবং যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার কিছু অংশে এই অভিজ্ঞতা পাওয়া যায়। তবে একই দেশের সব শহরে তা দেখা যায় না। নরওয়ের রাজধানী অসলোয় গ্রীষ্মের দিন দীর্ঘ হলেও সূর্য অস্ত যায়; উত্তরের ট্রমসো শহরে বছরের একটি সময়ে যায় না। শহরের নামের চেয়ে তার অক্ষাংশ এখানে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। দুই স্থানের মধ্যে কয়েকশ কিলোমিটার দূরত্বই অবিরাম দিন দেখা যাবে কি না, তা বদলে দিতে পারে।

নরওয়ের ট্রমসো মধ্যরাতের সূর্য দেখার পরিচিত স্থান। সেখানে সাধারণত মে মাসের শেষ ভাগ থেকে জুলাই মাসের শেষ ভাগ পর্যন্ত সূর্য দিগন্তের নিচে নামে না। আরও উত্তরের নর্থ কেপে সময়কাল কিছুটা দীর্ঘ। নরওয়ের স্ভালবার্ড দ্বীপপুঞ্জ উত্তর মেরুর দিকে আরও কাছে হওয়ায় সেখানে টানা চার মাসেরও বেশি সময় সূর্য আকাশে থাকতে পারে। তারিখগুলো স্থানভেদে আলাদা, আর দিগন্তের দৃশ্য, পাহাড় ও বায়ুমণ্ডলের অবস্থার কারণে চোখে দেখা অভিজ্ঞতায়ও পার্থক্য হতে পারে।

উত্তর মেরুতেই অবিরাম দিনের সময়কাল সবচেয়ে দীর্ঘ—প্রায় অর্ধবছর। মার্চের বিষুবের কাছাকাছি সূর্য সেখানে দিগন্তে ওঠে। তারপর আকাশে খুব উঁচুতে না গিয়ে প্রতিদিন দিগন্তের চারদিকে ঘুরতে ঘুরতে অবস্থান বদলায়। জুনের অয়নান্তের দিকে সর্বোচ্চ উচ্চতায় পৌঁছে আবার ধীরে ধীরে নিচে নামে। সেপ্টেম্বরের বিষুবের কাছাকাছি অস্ত যায়। বাস্তবে বায়ুমণ্ডলে আলোর বাঁক ও সূর্যের দৃশ্যমান আকারের জন্য সূর্যোদয়-সূর্যাস্তের পর্যবেক্ষিত সময় এই সরল জ্যামিতিক হিসাব থেকে কিছুটা সরে যায়।

দক্ষিণ গোলার্ধেও একই ঘটনা ঘটে, তবে ঋতু উল্টো। উত্তর গোলার্ধে যখন জুনের কাছাকাছি সময়ে দীর্ঘ দিন, তখন অ্যান্টার্কটিকায় শীত ও দীর্ঘ অন্ধকার। ডিসেম্বরের অয়নান্তের দিকে দক্ষিণ মেরু সূর্যের দিকে ঝুঁকলে অ্যান্টার্কটিক বৃত্তের ভেতরে মধ্যরাতের সূর্য দেখা যায়। দক্ষিণ মেরুতেও তখন প্রায় অর্ধবছরের দিন চলে। দক্ষিণের এই দৃশ্যের দর্শক তুলনামূলক কম, কারণ উত্তর মেরুবৃত্তের কাছে শহর ও জনবসতি থাকলেও অ্যান্টার্কটিকার অধিকাংশ অঞ্চলে স্থায়ী সাধারণ জনবসতি নেই।

মধ্যরাতের সূর্য মানে অবশ্য রাত বারোটায় সূর্য মাথার ঠিক ওপরে থাকবে, এমন নয়। উত্তর মেরুবৃত্তের ভেতরের অনেক স্থানে সেটি দিগন্তের খুব কাছ দিয়ে যায়। আকাশের আলো তখন দুপুরের মতো তীব্র না হয়ে গোধূলির মতো নরম ও সোনালি দেখাতে পারে। গ্রীষ্মের মধ্যভাগে মধ্যরাতের কাছাকাছি সূর্য যখন সবচেয়ে নিচু অবস্থানে পৌঁছায়, তারপর অস্ত না গিয়েই আবার ওপরে উঠতে থাকে। এজন্য আলো থাকার পরও দিনের বিভিন্ন সময়ে ছায়ার দৈর্ঘ্য ও আলোর রং বদলায়।

‘রাত বারোটা’ কথাটির সঙ্গেও একটি সূক্ষ্ম পার্থক্য আছে। ঘড়ির মধ্যরাত এবং কোনো স্থানে সূর্যের দিনের সর্বনিম্ন অবস্থানে পৌঁছানোর মুহূর্ত সব সময় এক নয়। সময় অঞ্চল ও স্থানীয় দ্রাঘিমার কারণে ঘড়িতে রাত বারোটা দেখানোর কিছু আগে বা পরে সূর্য সবচেয়ে নিচে থাকতে পারে। তবু ‘মধ্যরাতের সূর্য’ নামটি যথার্থ, কারণ সাধারণভাবে রাত বলে পরিচিত সময়েও সূর্য দিগন্তের ওপরে থাকে। ঘটনাটি বোঝার জন্য ঘড়ির মিনিটের চেয়ে সূর্য আদৌ অস্ত যাচ্ছে কি না, সেটিই মূল প্রশ্ন।

মেরুবৃত্তের ঠিক বাইরে গেলেও গ্রীষ্মের রাতে আকাশ অনেকক্ষণ উজ্জ্বল থাকতে পারে। সূর্য হয়তো দিগন্তের নিচে নেমেছে, কিন্তু খুব বেশি নিচে যায়নি। তার আলো বায়ুমণ্ডলে ছড়িয়ে পড়ে দীর্ঘ গোধূলি তৈরি করে। ফলে কোনো কোনো জায়গায় গভীর অন্ধকার নামার আগেই আবার ভোরের আলো শুরু হয়। এই অভিজ্ঞতাকে সত্যিকারের মধ্যরাতের সূর্যের সঙ্গে গুলিয়ে ফেলা সহজ। পার্থক্যটি হলো, দীর্ঘ গোধূলির সময় সূর্য অস্ত যায়; মধ্যরাতের সূর্যের সময় সূর্য পুরো সময় দিগন্তের ওপরে থাকে।

আকাশ পরিষ্কার থাকাও দৃশ্য দেখার জন্য জরুরি। কোনো শহরে নির্দিষ্ট দিনগুলোতে সূর্য জ্যামিতিকভাবে অস্ত না গেলেও মেঘে ঢাকা পড়তে পারে। পাহাড়ের আড়ালেও কিছু সময় সূর্যকে দেখা যায় না, যদিও খোলা দিগন্তে থাকলে সেটি দিগন্তের ওপরে দেখা যেত। এ কারণে ‘আজ মধ্যরাতের সূর্য দেখিনি’ বললেই সেই স্থানে ঘটনাটি ঘটেনি, এমন নয়। সূর্যের অবস্থান ও পর্যবেক্ষকের সামনে থাকা দৃশ্যমান বাধা আলাদা বিষয়। উপকূলের খোলা দিগন্তে এই পার্থক্য অনেক সময় সহজে বোঝা যায়।

দীর্ঘ আলোকিত দিন স্থানীয় জীবনযাত্রাকেও প্রভাবিত করে। বাইরে আলো থাকলে ঘুমানোর সময় হয়েছে কি না, তা শরীরের অভ্যস্ত সংকেত থেকে বোঝা কঠিন হতে পারে। মানুষ সাধারণত নির্দিষ্ট ঘুমের সময় বজায় রাখা ও ঘর অন্ধকার করার ব্যবস্থা ব্যবহার করে। পর্যটকেরা রাতেও হাঁটতে বা নৌভ্রমণে যেতে পারেন, কিন্তু স্থানীয় বাসিন্দাদের কাজ ও বিশ্রামের জন্য ঘড়ির সময়ই প্রয়োজন হয়। সূর্য অস্ত না যাওয়া মানে মানুষকে টানা কয়েক মাস জেগে থাকতে হয়, এমন নয়।

প্রাণী ও উদ্ভিদের জীবনেও এই দীর্ঘ দিনের গুরুত্ব রয়েছে। অল্প সময়ের মেরু গ্রীষ্মে উদ্ভিদের বেড়ে ওঠার সুযোগ তৈরি হয়। কিছু পাখি প্রজননের জন্য উচ্চ অক্ষাংশে আসে, যেখানে গ্রীষ্মের দীর্ঘ আলোকিত সময়ে খাবার সংগ্রহের সুযোগ বেশি থাকে। তবে কেবল দিনের দৈর্ঘ্য দিয়েই মেরু অঞ্চলের জীবন বোঝা যায় না; তাপমাত্রা, বরফ, খাদ্যের প্রাপ্যতা এবং আবহাওয়াও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অবিরাম আলো থাকলেও মেরু অঞ্চল গ্রীষ্মে বিষুবরেখার মতো উষ্ণ হয়ে যায় না, কারণ সেখানে সূর্যের আলো অনেক সময় নিচু কোণে পড়ে।

মধ্যরাতের সূর্যের বিপরীত অভিজ্ঞতা হলো মেরুরাত্রি। উত্তর গোলার্ধের শীতে উত্তর মেরুর দিকে সূর্য দীর্ঘ সময় দিগন্তের ওপরে ওঠে না; তখন দক্ষিণ মেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মের অবিরাম দিন চলে। আবার দক্ষিণের শীতে সেখানে দীর্ঘ অন্ধকার নামে এবং উত্তরে মধ্যরাতের সূর্য দেখা যায়। একই পৃথিবীতে একই সময়ে এক মেরু আলো আর অন্য মেরু অন্ধকার পাওয়ার কারণও সেই অক্ষের হেলন। বছর ঘুরে অবস্থান বদলানোর ফলে দুই মেরু পালাক্রমে দীর্ঘ দিন ও দীর্ঘ রাতের অভিজ্ঞতা পায়।

পৃথিবীর কোথায় কয়েক মাস সূর্য অস্ত যায় না—এর নির্ভুল উত্তর তাই উত্তর ও দক্ষিণ মেরুর কাছের অঞ্চলগুলোতে, নিজ নিজ গ্রীষ্মকালে। মেরুবৃত্তের সীমানায় সময়কাল খুব ছোট; মেরুর দিকে যত এগোনো যায়, তা তত বাড়ে এবং মেরুতে প্রায় অর্ধবছরে পৌঁছায়। মধ্যরাতের সূর্য কোনো অলৌকিক ঘটনা নয়। এটি প্রতিদিন ঘুরতে থাকা, সূর্যকে প্রদক্ষিণ করতে থাকা এবং সামান্য হেলে থাকা পৃথিবীকে এক বিশেষ অবস্থান থেকে দেখার ফল। সেই পরিচিত গ্রহটিই মেরুর কাছে দাঁড়ালে দিন ও রাত সম্পর্কে আমাদের ধারণাকে বিস্ময়করভাবে বদলে দেয়।


আপনার পছন্দ হতে পারে