বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

রাশিয়ার ওয়মিয়াকনে মানুষ কীভাবে বাঁচে? পৃথিবীর শীতলতম জনবসতিগুলোর একটির জীবন

রাশিয়ার ওয়মিয়াকনে মানুষ কীভাবে বাঁচে? পৃথিবীর শীতলতম জনবসতিগুলোর একটির জীবন
তীব্র শীতের মধ্যেও সচল একটি জনপদ

শীতের সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার আগে পোশাক পরা, গাড়ি চালু করা বা জল সংগ্রহ করা অধিকাংশ মানুষের কাছে সাধারণ কাজ। রাশিয়ার ওয়মিয়াকনে একই কাজের প্রতিটিতে বিশেষ প্রস্তুতি লাগে। পূর্ব সাইবেরিয়ার এই জনপদে শীতের তাপমাত্রা দীর্ঘ সময় ধরে হিমাঙ্কের অনেক নিচে থাকে; তীব্র শৈত্যপ্রবাহে তা মাইনাস পঞ্চাশ ডিগ্রি সেলসিয়াসেরও নিচে নামতে পারে। তবু এখানে মানুষ বাড়িতে থাকে, সন্তানকে বড় করে, কাজ করে এবং ঋতু বদলের অপেক্ষায় জীবন চালিয়ে যায়। তাদের টিকে থাকার ব্যাখ্যা শুধু শীত সহ্য করার ক্ষমতায় নেই; আছে পরিকল্পিত বসতি, তাপের ব্যবস্থা এবং পরিবেশ অনুযায়ী গড়ে ওঠা অভ্যাসে।

ওয়মিয়াকন রাশিয়ার সাখা প্রজাতন্ত্রে, ইয়াকুতিয়া নামেও পরিচিত এক বিস্তীর্ণ অঞ্চলে অবস্থিত। এটি কোনো বড় শহর নয়, অল্প মানুষের একটি দূরবর্তী জনবসতি। উত্তর গোলার্ধের সর্বনিম্ন নথিবদ্ধ তাপমাত্রাগুলোর একটি এখানে মাপা হয়েছে: ১৯৩৩ সালের ৬ ফেব্রুয়ারি মাইনাস ৬৭ দশমিক ৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস। এই সংখ্যাটি একটি চরম দিনের রেকর্ড, প্রতিদিনের তাপমাত্রা নয়। একই সঙ্গে পৃথিবীর শীতলতম স্থান বললে অ্যান্টার্কটিকার সঙ্গে পার্থক্য বুঝতে হবে; ওয়মিয়াকনের বিশেষত্ব হলো এমন কঠিন শীতের মধ্যেও এখানে স্থায়ী জনবসতি রয়েছে।

এত শীতের পেছনে প্রথম কারণ এর অবস্থান। মহাসাগরের জল তাপ ধীরে গ্রহণ ও ধীরে ছাড়ে বলে উপকূলের অনেক অঞ্চলে শীতের তীব্রতা কিছুটা নিয়ন্ত্রিত থাকে। ওয়মিয়াকন বিশাল ইউরেশীয় স্থলভাগের গভীরে, সমুদ্রের সেই নিয়ন্ত্রণকারী প্রভাব থেকে দূরে। শীতকালে এখানকার স্থলভাগ দীর্ঘ সময় তাপ হারায়। দিনের আলোও অল্প সময় থাকে এবং সূর্য আকাশে খুব উঁচুতে ওঠে না। ফলে দিনের আলোতে মাটি ও বাতাস যতটা উষ্ণ হতে পারে, দীর্ঘ শীতের রাত ও আশপাশের পরিবেশে তার চেয়ে বেশি তাপ হারিয়ে যায়।

ওয়মিয়াকন উত্তর মেরুবৃত্তের ভেতরে নয়। তাই শীতে সেখানে কয়েক মাস সূর্য ওঠে না—এমন ধারণা ভুল। সূর্য ওঠে, কিন্তু দিন ছোট এবং আলো অপেক্ষাকৃত নিচু কোণে আসে। সেই আলো জমাট ভূমিকে গ্রীষ্মের মতো গরম করতে পারে না। অবস্থানগত এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ওয়মিয়াকনের চরম শীত ব্যাখ্যা করতে দীর্ঘ মেরুরাত্রি ধরে নেওয়ার দরকার নেই। অল্প শীতকালীন সূর্যালোক, মহাদেশীয় অবস্থান এবং স্থানীয় ভূপ্রকৃতি মিলিয়েই পরিবেশটি যথেষ্ট ঠান্ডা হয়ে ওঠে।

ভূপ্রকৃতির ভূমিকাও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। ওয়মিয়াকন পাহাড়ঘেরা উপত্যকা অঞ্চলে অবস্থিত। পরিষ্কার ও শান্ত রাতে মাটির কাছের বাতাস তাপ হারিয়ে ঠান্ডা হয়। ঠান্ডা বাতাস তুলনামূলক ভারী হওয়ায় তা নিচের দিকে নেমে উপত্যকার তলায় জমতে পারে। তখন ওপরের ঢালের তুলনায় নিচের বসতিস্থল আরও ঠান্ডা হয়ে যায়। সাধারণত ওপরে উঠলে তাপমাত্রা কমে—এই পরিচিত ধারণার উল্টো পরিস্থিতিও এমন রাতে দেখা যায়। আবহাওয়াবিদেরা একে তাপমাত্রার উল্টো বিন্যাস বলেন। ওয়মিয়াকনের উপত্যকা সেই ঠান্ডা বাতাস ধরে রাখার অনুকূল পরিবেশ তৈরি করে।

শীতে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চচাপের অবস্থাও তীব্র ঠান্ডাকে সাহায্য করতে পারে। আকাশ পরিষ্কার থাকলে মাটি রাতে সহজে তাপ বিকিরণ করে হারায়। বাতাসের মিশ্রণ কম হলে উপত্যকার তলায় জমা ঠান্ডা বাতাস দ্রুত সরে যায় না। তুষারঢাকা ভূমি দিনের সূর্যালোকের বড় অংশ ফিরিয়ে দেয়; ফলে ভূমি সহজে গরম হয় না। এসব ঘটনা একসঙ্গে কাজ করে। তবে ওয়মিয়াকনে সব দিন সমান ঠান্ডা নয় এবং বাতাস, মেঘ ও ঋতু পরিবর্তনের সঙ্গে তাপমাত্রা ওঠানামা করে।

এমন পরিবেশে বাড়ি কেবল থাকার জায়গা নয়; সেটি তাপ ধরে রাখার ব্যবস্থা। দেয়াল, ছাদ, দরজা ও জানালা দিয়ে যত কম তাপ বেরোবে, ঘর উষ্ণ রাখতে তত কম শক্তি লাগবে। ঘর গরম রাখার উপযোগী চুল্লি বা অন্য তাপব্যবস্থা শীতের দৈনন্দিন জীবনের অপরিহার্য অংশ। দরজা খোলা হলে খুব ঠান্ডা বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ে, তাই প্রবেশপথ ব্যবহারেও সতর্কতা থাকে। জ্বালানি ও গরম রাখার যন্ত্রের নির্ভরযোগ্যতা এখানে আরামের প্রশ্নের চেয়ে বেশি; দীর্ঘ শীতের মধ্যে তা নিরাপদে বসবাসের মৌলিক শর্ত।

মাটির নিচের অবস্থাও বাড়িঘর ও পরিষেবা নির্মাণকে কঠিন করে। এই অঞ্চলের অনেক স্থানে ভূমির নিচে দীর্ঘকাল ধরে জমে থাকা চিরহিমায়িত মাটি রয়েছে। গরম ভবন, পাইপ বা অন্য স্থাপনার তাপ সেই মাটির কোনো অংশ গলিয়ে দিলে ভিত্তির স্থায়িত্বে সমস্যা হতে পারে। আবার পাইপ যথেষ্ট সুরক্ষিত না থাকলে তার ভেতরের জল জমে যেতে পারে। তাই ভবন ও জল সরবরাহের ব্যবস্থা স্থানীয় ভূমি ও তাপমাত্রা বুঝে পরিকল্পনা করতে হয়। সব বাড়ির নির্মাণ বা পরিষেবা অবশ্য এক রকম নয়; দূরবর্তী জনপদে সুবিধার প্রাপ্যতাও বাড়িভেদে ভিন্ন হতে পারে।

জল সংগ্রহ ও ব্যবহার সাধারণ শীতপ্রধান শহরের তুলনায় বেশি পরিশ্রমসাপেক্ষ হতে পারে। বাড়ির বাইরে রাখা পাত্রে জল দ্রুত বরফ হয়ে যায়; সরবরাহের পাইপও জমাট বাঁধার ঝুঁকিতে থাকে। ফলে কোথাও জল ঘরের ভেতরে সংরক্ষণ, বরফ গলানো বা অন্য স্থানীয় ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করতে হয়। শীতকালে বাড়ির ভেতরের উষ্ণ স্থান শুধু ঘুমানোর জন্য নয়; জল তরল রাখা এবং দৈনন্দিন কাজ সচল রাখার জন্যও দরকার। একটি কল খুললেই নিরবচ্ছিন্ন জল পাওয়া যাবে—এমন ধারণা সব বাড়ির বাস্তব অবস্থাকে বোঝায় না।

যাতায়াত ওয়মিয়াকনের জীবনে আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ। প্রচণ্ড ঠান্ডায় গাড়ির ব্যাটারির কার্যক্ষমতা কমে, ইঞ্জিন চালু করা কঠিন হতে পারে এবং কিছু তরল ও যন্ত্রাংশ স্বাভাবিকের তুলনায় ভিন্ন আচরণ করে। শীতের জন্য উপযুক্ত প্রস্তুতি, রক্ষণাবেক্ষণ এবং যাত্রাপথের পরিকল্পনা তাই জরুরি। দূরের পথে যাওয়ার সময় গাড়ি বিকল হলে পরিস্থিতি দ্রুত বিপজ্জনক হতে পারে। শীতের যাত্রায় কোথায় থামা যাবে, সাহায্য কীভাবে পাওয়া যাবে এবং গাড়িতে যথেষ্ট জ্বালানি ও উষ্ণ পোশাক আছে কি না, তা আগেই ভাবতে হয়।

ওয়মিয়াকন সম্পর্কে প্রায়ই বলা হয়, সেখানকার বাসিন্দারা শীতে কখনো গাড়ির ইঞ্জিন বন্ধ করেন না। কথাটি অতিরঞ্জিত। প্রচণ্ড ঠান্ডায় কোনো কোনো যাত্রা বা পরিস্থিতিতে ইঞ্জিন চালু রাখা হতে পারে, যাতে পরে আবার চালু করতে সমস্যা না হয়। কিন্তু সব গাড়ি সব সময় চলতেই থাকে—এমন নিয়ম নেই। যানবাহন রাখার স্থান, ইঞ্জিন গরম রাখার ব্যবস্থা, যাত্রার দৈর্ঘ্য এবং সেদিনের তাপমাত্রা অনুযায়ী সিদ্ধান্ত বদলায়। বাস্তব জীবনকে বুঝতে এমন চমকপ্রদ বাক্যের চেয়ে প্রস্তুতি ও স্থানীয় অভ্যাসের পার্থক্য দেখা বেশি উপকারী।

বাইরে বেরোনোর পোশাকেও সেই প্রস্তুতি বোঝা যায়। তীব্র শীতে কেবল একটি মোটা জামা যথেষ্ট নয়; শরীরের তাপ ধরে রাখতে একাধিক স্তরের পোশাক, ভালোভাবে ঢাকা মাথা, হাত ও পা দরকার। মুখের অনাবৃত ত্বক প্রচণ্ড ঠান্ডা ও বাতাসে দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। জুতা এমন হতে হয় যাতে পা শুকনো ও উষ্ণ থাকে। বাইরে কতক্ষণ থাকা হবে, হাঁটা নাকি স্থির দাঁড়িয়ে কাজ করা হবে এবং বাতাসের গতি কত—এসবের ওপর পোশাকের প্রয়োজন বদলে যায়। স্থানীয় মানুষের কাছে এই সিদ্ধান্তগুলো শীতের অভিজ্ঞতা থেকে শেখা দৈনন্দিন দক্ষতা।

খাবারের ক্ষেত্রেও দূরত্ব ও আবহাওয়া গুরুত্বপূর্ণ। দীর্ঘ শীতে স্থানীয়ভাবে তাজা সবজি চাষের সুযোগ সীমিত, আর দূর থেকে পণ্য আনার পথ কঠিন হতে পারে। মাছ, মাংস এবং দীর্ঘদিন সংরক্ষণ করা যায় এমন খাদ্য স্থানীয় খাদ্যসংস্কৃতিতে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে। পশুপালন, শিকার বা মাছ ধরার সঙ্গে কিছু পরিবারের জীবিকা জড়িত থাকতে পারে। তবে ওয়মিয়াকনের মানুষ শুধু এক ধরনের খাবার খেয়ে বাঁচেন—এমন সরল ছবি ভুল। দোকানের পণ্য, সরবরাহব্যবস্থা, পারিবারিক পছন্দ ও স্থানীয় ঐতিহ্য মিলে খাদ্যতালিকা তৈরি হয়।

শীতের সময় স্কুল, কাজ এবং প্রতিবেশীর সঙ্গে যোগাযোগও বন্ধ হয়ে যায় না। কোন অবস্থায় শিশুদের বাইরে পাঠানো নিরাপদ, যাতায়াত সম্ভব কি না কিংবা কোনো কাজ পিছিয়ে দেওয়া দরকার কি না, তা আবহাওয়া ও স্থানীয় সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করে। ইন্টারনেটে প্রচলিত একটি নির্দিষ্ট তাপমাত্রায় ‘সব স্কুল অবশ্যই বন্ধ’ ধরনের বক্তব্য সব সময় সব বয়স বা সব এলাকার জন্য খাটে না। একটি জনপদ সচল থাকার অর্থ হলো আবহাওয়া বুঝে নিয়ম বদলানো, প্রয়োজনীয় পরিষেবা চালু রাখা এবং অযথা বাইরে থাকার সময় কমানো।

শুধু তাপমাত্রার সংখ্যাই শরীরের ওপর শীতের প্রভাব নির্ধারণ করে না। বাতাস থাকলে শরীরের চারপাশের উষ্ণ বায়ুর পাতলা স্তর দ্রুত সরে যায়, ফলে ঠান্ডা আরও তীব্র লাগে। ঘামে ভেজা পোশাক বা জুতা তাপ হারানোর ঝুঁকি বাড়ায়। আঙুল, কান ও মুখের মতো অনাবৃত অংশ বিশেষভাবে সংবেদনশীল। তাই কাজ শেষ করে দ্রুত উষ্ণ স্থানে ফেরা, পোশাক শুকনো রাখা এবং দীর্ঘ সময় স্থির দাঁড়িয়ে না থাকা গুরুত্বপূর্ণ। শীতের সঙ্গে পরিচিত হওয়া মানে তার ক্ষতি থেকে পুরোপুরি মুক্ত হওয়া নয়।

ওয়মিয়াকনের নাম শুনে সারাবছর একই রকম বরফাচ্ছন্ন পৃথিবী কল্পনা করলেও বাস্তবে সেখানে ঋতু বদলায়। গ্রীষ্মে তাপমাত্রা হিমাঙ্কের ওপরে ওঠে এবং ভূমির ওপরের স্তরের কিছু অংশ গলে। গাছপালা বেড়ে ওঠে, চলাচল ও কাজের ধরন বদলে যায়। শীত ও গ্রীষ্মের এই বড় বৈপরীত্য পূর্ব সাইবেরিয়ার মহাদেশীয় জলবায়ুর বৈশিষ্ট্য। বাসিন্দাদের জীবন তাই শুধু শীত কাটানোর সংগ্রাম নয়; উষ্ণতর সময়ে পরের শীতের জন্য জ্বালানি, বাড়ি, যানবাহন ও সরবরাহ প্রস্তুত করার চক্রও।

ওয়মিয়াকনের গল্পের কেন্দ্রে কোনো অলৌকিক শারীরিক ক্ষমতা নেই। বাসিন্দারা মানুষের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতা নিয়েই এখানে জীবন গড়েছেন। পাহাড়ঘেরা উপত্যকায় কেন ঠান্ডা জমে, কোন পথে নিরাপদে যাওয়া যায়, কীভাবে ঘরের তাপ বজায় রাখতে হয় এবং কোন কাজ কখন করা সম্ভব—এই স্থানীয় জ্ঞান তাঁদের জীবনযাত্রার অংশ। ১৯৩৩ সালের মাইনাস ৬৭ দশমিক ৭ ডিগ্রির রেকর্ড স্থানটিকে পরিচিত করেছে, কিন্তু সেই এক দিনের সংখ্যার চেয়ে বেশি তাৎপর্যপূর্ণ হলো বছরের পর বছর ধরে এমন শীতের সঙ্গে মানিয়ে একটি জনপদকে সচল রাখার বাস্তব ব্যবস্থা।


আপনার পছন্দ হতে পারে