ডায়োমিড দ্বীপপুঞ্জ: মাত্র চার কিলোমিটার দূরে ‘আগামীকাল’ দেখা যায় কীভাবে?
কয়েক কিলোমিটার দূরে দুই দ্বীপ, ক্যালেন্ডারে দুই দিন।
বেরিং প্রণালির বুকে দুটি পাথুরে দ্বীপ মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছে। কাছের অংশে তাদের ব্যবধান প্রায় চার কিলোমিটার। পশ্চিমের বড় ডায়োমিড রাশিয়ার, পূর্বের ছোট ডায়োমিড যুক্তরাষ্ট্রের আলাস্কার অংশ। ছোট দ্বীপ থেকে বড় দ্বীপের দিকে তাকালে মানুষ আসলে মাত্র কয়েক কিলোমিটার দূরের একটি ভূখণ্ড দেখেন। অথচ সেখানকার ক্যালেন্ডারে অনেক সময় তাঁর নিজের দ্বীপের চেয়ে পরের দিনের তারিখ লেখা থাকে।
এই কারণেই বড় ডায়োমিডকে কখনো ‘আগামীকালের দ্বীপ’ এবং ছোট ডায়োমিডকে ‘গতকালের দ্বীপ’ বলা হয়। নাম দুটি শুনে সময়ভ্রমণের গল্প মনে হতে পারে। বাস্তবে সূর্য, পৃথিবীর ঘূর্ণন এবং মানুষের তৈরি সময় গণনার নিয়ম মিলিয়েই এই অদ্ভুত পরিস্থিতির সৃষ্টি।
দ্বীপ দুটি কোথায় এবং এত কাছাকাছি কেন?
এশিয়ার উত্তর-পূর্ব প্রান্তে রাশিয়া এবং উত্তর আমেরিকার উত্তর-পশ্চিম প্রান্তে আলাস্কার মাঝখানে রয়েছে বেরিং প্রণালি। এটি প্রশান্ত মহাসাগরীয় জলভাগকে উত্তর মহাসাগরীয় জলভাগের সঙ্গে যুক্ত করেছে। প্রণালিটির মাঝামাঝি অংশে ডায়োমিড দ্বীপ দুটি অবস্থিত। বড় দ্বীপটির পশ্চিমে রাশিয়ার মূল ভূখণ্ড, ছোট দ্বীপটির পূর্বে আলাস্কার মূল ভূখণ্ড।
দ্বীপ দুটির আকারে পার্থক্য আছে, কিন্তু নাম দেখে দূরত্ব সম্পর্কে ভুল ধারণা হতে পারে। ‘বড়’ ও ‘ছোট’ তাদের আকারের পরিচয়; তারা দূরদেশে ছড়িয়ে থাকা দ্বীপ নয়। পরিষ্কার আবহাওয়ায় একটি থেকে অন্যটি দেখা সম্ভব। মাঝখানের সরু জলপথই একই সঙ্গে দুটি দেশের সীমান্তের অংশ।
ছোট ডায়োমিডে একটি আদিবাসী জনগোষ্ঠীর বসতি আছে। বড় ডায়োমিডে বর্তমানে সাধারণ স্থায়ী বেসামরিক বসতি নেই। ফলে ‘আজকের মানুষ আগামীকালের মানুষের দিকে তাকিয়ে আছে’—এমন জনপ্রিয় বর্ণনা আকর্ষণীয় হলেও আক্ষরিক অর্থে দ্বীপ দুটির জীবনযাত্রা একই রকম নয়।
হিমযুগে সমুদ্রপৃষ্ঠ নিচু থাকার সময় এশিয়া ও উত্তর আমেরিকার মধ্যবর্তী বিস্তৃত স্থলভাগকে বেরিঞ্জিয়া বলা হয়। আজকের দ্বীপগুলো সেই অঞ্চলের ভূগোল বোঝার ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ। তবে ‘আগামীকাল’ দেখার রহস্য তাদের ভূতাত্ত্বিক ইতিহাসে নয়; সেটি মানচিত্রে আঁকা একটি তারিখ পরিবর্তনের সীমায়।
আন্তর্জাতিক তারিখরেখা কীভাবে মাঝখানে এল?
পৃথিবী নিজের অক্ষে ঘোরে। তাই পৃথিবীর সব জায়গায় একই সময়ে সকাল বা সন্ধ্যা হয় না। মানুষ দৈনন্দিন কাজের সুবিধার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে আলাদা ঘড়ির সময় নির্ধারণ করেছে। কিন্তু পৃথিবী গোল হওয়ায় পূর্ব বা পশ্চিম দিকে সময় গুনতে গুনতে এক পর্যায়ে তারিখ কোথায় বদলাবে, সেটিও ঠিক করতে হয়।
এই কাজে ব্যবহৃত সীমাকে বলা হয় আন্তর্জাতিক তারিখরেখা। রেখাটি মোটামুটি প্রশান্ত মহাসাগরের ওপর দিয়ে চলে, তবে এটি নিখুঁত সোজা রেখা নয়। দেশ ও দ্বীপগুচ্ছকে সুবিধামতো একই তারিখে রাখতে বিভিন্ন স্থানে রেখাটি বাঁক নিয়েছে। বেরিং প্রণালির এই অংশে রেখাটি ডায়োমিড দ্বীপ দুটির মাঝের জলপথ দিয়ে যায়।
তারিখরেখা পশ্চিমমুখে পার হলে ক্যালেন্ডারে সাধারণভাবে এক দিন যোগ হয়; পূর্বমুখে পার হলে এক দিন বিয়োগ হয়। তাই ছোট ডায়োমিড থেকে পশ্চিমে বড় ডায়োমিডের দিকে তাকালে পরের তারিখের একটি দ্বীপ দেখা যেতে পারে। একই মুহূর্তে বড় দ্বীপ থেকে পূর্বে তাকালে আগের তারিখের ছোট দ্বীপ দেখা যায়।
এখানে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি: আন্তর্জাতিক তারিখরেখা সমুদ্রের ওপর দৃশ্যমান কোনো দাগ নয়। এটি সময় ও তারিখ গণনার জন্য নির্ধারিত সীমা। দ্বীপ দুটির মাঝের জলরাশি অন্য যেকোনো জলরাশির মতোই; ‘আগামীকাল’ কথাটি সেখানে ব্যবহৃত স্থানীয় তারিখের বর্ণনা।
দুই দ্বীপের ঘড়িতে ঠিক কত ঘণ্টার পার্থক্য?
বড় ডায়োমিড রাশিয়ার এমন একটি সময় অঞ্চলে পড়ে, যা সমন্বিত বৈশ্বিক সময়ের চেয়ে ১২ ঘণ্টা এগিয়ে। ছোট ডায়োমিড আলাস্কার সময় অনুসরণ করে। আলাস্কায় শীতকালীন মানসময়ে ঘড়ি সমন্বিত বৈশ্বিক সময়ের চেয়ে ৯ ঘণ্টা পিছিয়ে থাকে। সে হিসাবে দুই দ্বীপের স্থানীয় ঘড়ির পার্থক্য হয় ২১ ঘণ্টা।
যেমন, শীতকালীন সময়ে ছোট ডায়োমিডে যদি সোমবার দুপুর ১২টা হয়, একই মুহূর্তে বড় ডায়োমিডে মঙ্গলবার সকাল ৯টা। ছোট দ্বীপের মানুষ তাকিয়ে এমন একটি দ্বীপ দেখবেন, যেখানে ক্যালেন্ডার ইতিমধ্যে মঙ্গলবারে পৌঁছেছে। অথচ দুই জায়গাতেই মুহূর্তটি এক—কেউ ভবিষ্যতে পৌঁছাননি।
আলাস্কায় গ্রীষ্মকালীন ঘড়ি পরিবর্তনের সময় ব্যবধানটি সাধারণত ২০ ঘণ্টা হয়, কারণ তখন আলাস্কার ঘড়ি এক ঘণ্টা এগিয়ে দেওয়া হয়। রাশিয়ার ওই অঞ্চলে একইভাবে ঘড়ি পরিবর্তন করা হয় না। সে সময় ছোট ডায়োমিডে সোমবার দুপুর ১২টা হলে বড় ডায়োমিডে মঙ্গলবার সকাল ৮টা হবে।
তাই ‘দুই দ্বীপে ঠিক ২৪ ঘণ্টার পার্থক্য’ বলা নির্ভুল নয়। তাদের তারিখে সাধারণত এক দিনের পার্থক্য দেখা যায়, কিন্তু ঘড়ির হিসাবে ব্যবধান ঋতুভেদে প্রায় ২০ বা ২১ ঘণ্টা। ‘আগামীকাল’ নামটির সৌন্দর্য এই সূক্ষ্ম পার্থক্য বুঝে দেখলে আরও স্পষ্ট হয়।
চোখে কি সত্যিই আগামী দিনের দৃশ্য দেখা যায়?
ছোট ডায়োমিডে দাঁড়িয়ে বড় ডায়োমিডের পাহাড় দেখলে আপনি ভবিষ্যতের কোনো ঘটনা দেখছেন না। দুই দ্বীপে আলো একই সূর্য থেকে আসছে এবং দৃশ্যটি একই মুহূর্তে ঘটছে। শুধু এক পাশে সেই মুহূর্তকে সোমবার, অন্য পাশে মঙ্গলবার বলা হচ্ছে। সময়ের বাস্তব প্রবাহ বদলায় না; বদলায় ঘড়ি ও ক্যালেন্ডারের নামকরণ।
এখানে ভৌগোলিক অবস্থানও মানুষকে বিভ্রান্ত করতে পারে। আমরা সাধারণত ভাবি, পূর্ব দিকের জায়গা সময়ে এগিয়ে থাকবে। কিন্তু ডায়োমিড দ্বীপ দুটির মাঝখানে তারিখরেখা থাকায় পূর্বের ছোট দ্বীপটির তারিখ পশ্চিমের বড় দ্বীপটির চেয়ে পিছিয়ে। পৃথিবী ঘুরে সময় অঞ্চলের হিসাব কোথায় নতুন করে শুরু হবে, তার ফলেই এমনটি ঘটে।
শীতকালে দ্বীপ দুটির মাঝের জলরাশি বরফে ঢেকে যেতে পারে। তবে তাই বলে এক দ্বীপ থেকে অন্য দ্বীপে হেঁটে যাওয়া সাধারণ ভ্রমণের পথ নয়। সেখানে আন্তর্জাতিক সীমান্ত, কঠিন আবহাওয়া, সমুদ্রবরফের অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার বিধিনিষেধ রয়েছে। মানচিত্রে চার কিলোমিটার ছোট দূরত্ব হলেও বাস্তবে তা অতিক্রম করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
ডায়োমিড দ্বীপপুঞ্জের বিস্ময় তাই কোনো অলৌকিক ঘটনার মধ্যে নেই। এটি দেখায়, দূরত্ব এবং স্থানীয় তারিখ একই নিয়মে বাড়ে না। মাত্র কয়েক কিলোমিটার জলপথের দুই পারে দাঁড়িয়ে থাকা ভূমিকে মানুষ একই মুহূর্তে দুটি ভিন্ন দিনের নামে ডাকে—এটাই ‘আগামীকাল’ দেখার প্রকৃত ব্যাখ্যা।
পন্স দে লিওন ইনলেট বাতিঘর: ফ্লোরিডার আকাশছোঁয়া ঐতিহাসিক সমুদ্রপ্রহরীর গল্প
কেপ হ্যাটেরাস বাতিঘর: আমেরিকার বিখ্যাত ডোরাকাটা বাতিঘর কেন পুরোপুরি সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল?
স্যান্ডি হুক বাতিঘর: আমেরিকার প্রাচীনতম সচল বাতিঘরের দীর্ঘ ইতিহাস
ব্রান ক্যাসেল: ড্রাকুলার দুর্গের কিংবদন্তি বনাম রোমানিয়ার সত্যিকারের ইতিহাস
ওয়াওয়েল রয়্যাল ক্যাসেল: পোল্যান্ডের রাজা, ড্রাগনের কিংবদন্তি ও জাতীয় ইতিহাসের কেন্দ্র
মালবোর্ক ক্যাসেল: টিউটনিক নাইটদের নির্মিত বিশ্বের বিশাল ইটের দুর্গের ইতিহাস