দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন কীভাবে শুরু হয়েছিল?
সিরিজ: পেনিসিলিন আবিষ্কার
যুদ্ধের চাহিদায় বদলে গেল চিকিৎসা
পেনিসিলিনের কার্যকারিতা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে; এবার জীবন বাঁচানোর সংখ্যাটি নির্ভর করবে উৎপাদনের ওপর। আগের নিবন্ধের শেষে অক্সফোর্ডের গবেষকেরা ঠিক এই সমস্যার মুখে দাঁড়িয়েছিলেন। তাঁদের তৈরি অল্প ওষুধে গুরুতর সংক্রমণের রোগী অ্যালবার্ট আলেকজান্ডারের অবস্থার উন্নতি হয়েছিল, কিন্তু চিকিৎসা শেষ করার আগেই সরবরাহ ফুরিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছিল, আর যুদ্ধক্ষেত্রে আহত মানুষের ক্ষতে সংক্রমণ ছিল প্রতিদিনের বিপদ। একজন রোগীর জন্য কষ্টে জোগাড় করা ওষুধকে হাজার হাজার রোগীর কাছে পৌঁছানোই হয়ে ওঠে পরবর্তী চ্যালেঞ্জ।
পেনিসিলিন রক্তক্ষরণ বন্ধ করত না, ভাঙা হাড় জোড়া লাগাত না, অস্ত্রোপচারের বিকল্পও ছিল না। কিন্তু ক্ষতে সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়া ঢুকে সংক্রমণ ছড়ালে ওষুধটি চিকিৎসকদের নতুন সুযোগ দিতে পারত। গভীর ক্ষত, অপরিষ্কার পরিবেশ এবং চিকিৎসা পেতে বিলম্ব সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়াত। যুদ্ধক্ষেত্র থেকে হাসপাতালে পৌঁছানো একজন সৈনিকের বেঁচে থাকা তাই কেবল প্রাথমিক আঘাতের তীব্রতার ওপর নির্ভর করত না; পরবর্তী সংক্রমণও বড় ভূমিকা রাখত। পেনিসিলিন কার্যকর হলেও সীমিত সরবরাহের কারণে শুরুতে চিকিৎসকদের বেছে নিতে হতো, কার চিকিৎসায় সেটি ব্যবহার করা সম্ভব।
অক্সফোর্ডের পদ্ধতিতে ছত্রাক অগভীর পাত্রের তরলের ওপর বেড়ে পেনিসিলিন তৈরি করত। গবেষণাগারের পরীক্ষার জন্য এটি গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি হলেও বিপুল সরবরাহের উপায় ছিল না। অনেক পাত্র সামলাতে শ্রম লাগত, উৎপাদন কম হতো, আর তরল থেকে সক্রিয় পদার্থ বের করে বিশুদ্ধ করতে গিয়েও কিছু অংশ হারিয়ে যেত। একই শক্তির ওষুধ বারবার তৈরি করা এবং তা জীবাণুমুক্ত অবস্থায় রোগীর কাছে পাঠানো ছিল আরও দুটি আলাদা সমস্যা। ব্যাপক উৎপাদন মানে শুধু বেশি ছত্রাক জন্মানো নয়; প্রতিটি মাত্রায় নির্ভরযোগ্য ওষুধ পৌঁছে দেওয়া।
ব্রিটেনের শিল্প ও গবেষণার অনেক সম্পদ তখন যুদ্ধের অন্য জরুরি কাজে ব্যস্ত। অক্সফোর্ডে যে পরিমাণ পেনিসিলিনের সম্ভাবনা দেখা গিয়েছিল, তা উৎপাদন করতে বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানের যন্ত্রপাতি ও দক্ষতা দরকার ছিল। ১৯৪১ সালে হাওয়ার্ড ফ্লোরি ও নরম্যান হিটলি যুক্তরাষ্ট্রে যান। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল গবেষক, সরকারি সংস্থা এবং ওষুধ প্রস্তুতকারীদের সহযোগিতা পাওয়া। এরপর ব্রিটিশ গবেষণার ফল, মার্কিন কৃষি গবেষণাগারের ছত্রাক চাষের দক্ষতা এবং ওষুধশিল্পের উৎপাদনক্ষমতা একসঙ্গে কাজে লাগতে শুরু করে।
যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় অঙ্গরাজ্যের পিওরিয়া গবেষণাগার এই কাজে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সেখানে গবেষকেরা পরীক্ষা করেন, কোন পুষ্টিমাধ্যমে ছত্রাক আরও বেশি পেনিসিলিন তৈরি করে। ভুট্টা প্রক্রিয়াজাত করার সময় পাওয়া পুষ্টিসমৃদ্ধ উপজাত ছত্রাক চাষের তরলে যোগ করে উৎপাদন বাড়ানোর ফল পাওয়া যায়। তরলে অন্য উপাদানের ভারসাম্যও পরীক্ষা করা হয়। একই ছত্রাককে শুধু বড় পাত্রে রাখলে ফল একই অনুপাতে বাড়বে—এমন নিশ্চয়তা ছিল না। ছত্রাক কী খাচ্ছে এবং কী পরিবেশে বাড়ছে, তা উৎপাদিত পেনিসিলিনের পরিমাণ বদলে দিচ্ছিল।
গবেষকেরা আরও বেশি পেনিসিলিন তৈরি করতে পারে এমন ছত্রাকের জাত খুঁজতে থাকেন। পিওরিয়ার একটি বাজারে পাওয়া ছত্রাকধরা বাঙ্গি থেকে সংগ্রহ করা একটি জাত বিশেষ কার্যকর প্রমাণিত হয়। পরে সেই জাত থেকে আরও উন্নত উৎপাদক নির্বাচন করার কাজ চলে। ঘটনাটি ফ্লেমিংয়ের দূষিত পেট্রি ডিশের মতোই আকস্মিক উপাদান বহন করে, কিন্তু এর গুরুত্ব যাচাই ও বাড়ানোর পেছনে ছিল পরিকল্পিত গবেষণা। উপযুক্ত ছত্রাকের জাত এবং ভালো পুষ্টিমাধ্যম একত্র হওয়ায় আগের তুলনায় অনেক বেশি পেনিসিলিন পাওয়ার পথ খুলে যায়।
উৎপাদনের সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসে গভীর ট্যাংকে ছত্রাক চাষের পদ্ধতিতে। অগভীর অসংখ্য পাত্রের বদলে বড় বন্ধ ট্যাংকের তরলে ছত্রাক বাড়ানো হলে উৎপাদন অনেক বাড়ানো সম্ভব। তবে কাজটি দেখতে যত সহজ, বাস্তবে তত ছিল না। ছত্রাকের বৃদ্ধির জন্য তরলে বাতাস পৌঁছাতে হতো, উপযুক্ত পরিবেশ বজায় রাখতে হতো এবং অন্য জীবাণুর দূষণ ঠেকাতে হতো। বিশাল পরিমাণ চাষের তরল থেকে পেনিসিলিন দ্রুত সংগ্রহ ও বিশুদ্ধ করাও জরুরি ছিল। গভীর ট্যাংকের পদ্ধতি ছিল জীববিজ্ঞান, রসায়ন ও প্রকৌশলের সমন্বিত অর্জন।
সরকারি সমন্বয় ও একাধিক ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠানের অংশগ্রহণ এই পদ্ধতিকে কারখানায় নিয়ে যায়। প্রতিটি প্রতিষ্ঠান একই সমস্যার বিভিন্ন দিক নিয়ে কাজ করছিল: কেউ ছত্রাক চাষ বাড়াচ্ছিল, কেউ নিষ্কাশন উন্নত করছিল, কেউ ওষুধের শক্তি পরীক্ষা ও নির্দিষ্ট মাত্রায় সংরক্ষণের ব্যবস্থা গড়ছিল। ১৯৪৪ সালের মার্চে ব্রুকলিনে বড় আকারের গভীর ট্যাংকভিত্তিক একটি পেনিসিলিন উৎপাদনকেন্দ্র চালু হয়। এটি গবেষণাগারের পরীক্ষাকে শিল্প উৎপাদনে বদলে দেওয়ার দৃশ্যমান উদাহরণ। তবু একটি কারখানা একা কাজটি করেনি; যুদ্ধকালীন সরবরাহ তৈরি হয়েছিল অনেক গবেষণাগার, কারখানা ও চিকিৎসাদলের যৌথ প্রচেষ্টায়।
ওষুধ উৎপাদনের পাশাপাশি কোথায় এবং কখন তা দেওয়া সবচেয়ে কার্যকর, সেটিও বোঝা দরকার ছিল। ১৯৪৩ সালে উত্তর আফ্রিকায় সামরিক চিকিৎসায় পেনিসিলিনের ব্যবহার নিয়ে গবেষণা ও পর্যবেক্ষণ হয়। পুরোনো, দীর্ঘদিনের সংক্রমিত ক্ষত চিকিৎসার অভিজ্ঞতা দেখায় যে রোগী আহত হওয়ার অনেক পরে অপেক্ষা করার চেয়ে সংক্রমণ গুরুতর হওয়ার আগেই উপযুক্ত ক্ষেত্রে চিকিৎসা শুরু করা গুরুত্বপূর্ণ। চিকিৎসকদের ক্ষত পরিষ্কার করা, প্রয়োজনে অস্ত্রোপচার, সংক্রমণ শনাক্ত করা এবং পেনিসিলিনের ব্যবহার—সব মিলিয়ে সিদ্ধান্ত নিতে হতো। পেনিসিলিন যুদ্ধক্ষেত্রের চিকিৎসাব্যবস্থার শক্তিশালী অংশ হয়ে ওঠে; পুরো ব্যবস্থাটির বিকল্প হয়ে ওঠেনি।
১৯৪৪ সালের জুনে নরম্যান্ডিতে মিত্রবাহিনীর অভিযান শুরুর সময় পেনিসিলিনের উৎপাদন আগের তুলনায় বিপুল পরিমাণে বেড়েছিল। অভিযানের জন্য লক্ষাধিক নয়, মিলিয়ন সংখ্যায় ওষুধের মাত্রা প্রস্তুত করা সম্ভব হয়। কয়েক বছর আগে অক্সফোর্ডে একজন রোগীর পূর্ণ চিকিৎসার ওষুধ জোগাড় করাই যেখানে কঠিন ছিল, সেখানে এই পরিবর্তন ছিল অসাধারণ। তবু সব ধরনের সংক্রমণে পেনিসিলিন সমান কাজ করত না। কোন ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণ ঘটিয়েছে এবং ক্ষতের অবস্থা কী, তা চিকিৎসার ফলকে প্রভাবিত করত। যুদ্ধের সময়ও ওষুধটির ব্যবহার চিকিৎসাগত বিচার ও সরবরাহের বাস্তব সীমার মধ্যে পরিচালিত হয়েছে।
যুদ্ধের চাহিদা পেনিসিলিন উৎপাদনের গতি বাড়িয়েছিল, কিন্তু এই অগ্রগতির ভিত্তি ছিল আগের গবেষণা। ফ্লেমিং ব্যাকটেরিয়াবিরোধী প্রভাব শনাক্ত করেন; অক্সফোর্ডের দল প্রমাণ করে পদার্থটি জীবন্ত শরীর ও রোগীর চিকিৎসায় কাজ করতে পারে; পিওরিয়ার গবেষকেরা উন্নত ছত্রাক ও চাষের পরিবেশ খুঁজে পান; প্রকৌশলী ও শিল্পপ্রতিষ্ঠান বিপুল পরিমাণে উৎপাদনের ব্যবস্থা করেন। এই ধারাবাহিক কাজ ছাড়া পেনিসিলিন একটি বিরল পরীক্ষাগারজাত ওষুধ হয়েই থাকতে পারত।
যুদ্ধ শেষে পেনিসিলিনের উৎপাদনক্ষমতা সামরিক প্রয়োজনের বাইরেও চিকিৎসার পথ খুলে দেয়। চিকিৎসকেরা সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়াজনিত নানা সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর ওষুধ ব্যবহারের সুযোগ পান, আর গবেষকেরা অন্য অ্যান্টিবায়োটিক খুঁজতে আরও মনোযোগী হন। তবে নতুন যুগের সঙ্গে একটি নতুন প্রশ্নও সামনে আসতে থাকে: ওষুধটি যত বেশি মানুষের কাছে পৌঁছাবে, ব্যাকটেরিয়া কি সব সময় তার প্রতি একই রকম সংবেদনশীল থাকবে?
আবিষ্কারের পরও পেনিসিলিন কেন এক দশক চিকিৎসায় আসেনি?
আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ও পেনিসিলিন: ১৯২৮ সালের আকস্মিক আবিষ্কারের গল্প
Augmented Reality কী? বাস্তব পৃথিবীর ওপর ডিজিটাল জগত বসানোর প্রযুক্তি
টিকা কীভাবে শরীরকে রোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে শেখায়?