বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ও পেনিসিলিন: ১৯২৮ সালের আকস্মিক আবিষ্কারের গল্প

সিরিজ: পেনিসিলিন আবিষ্কার

আলেকজান্ডার ফ্লেমিং ও পেনিসিলিন: ১৯২৮ সালের আকস্মিক আবিষ্কারের গল্প
একটি ছত্রাক, চিকিৎসাবিজ্ঞানের নতুন পথ

১৯২৮ সালের লন্ডনে সেন্ট মেরি হাসপাতালে আলেকজান্ডার ফ্লেমিংয়ের গবেষণাগারে রাখা একটি পেট্রি ডিশে অনাকাঙ্ক্ষিত ছত্রাক জন্মেছিল। জীবাণু চাষের পরীক্ষায় এমন দূষণ সাধারণত বিরক্তির কারণ: কাঙ্ক্ষিত ব্যাকটেরিয়ার সঙ্গে অন্য জীব ঢুকে পড়লে পরীক্ষার ফল আর আগের মতো ব্যবহার করা যায় না। কিন্তু ফ্লেমিং ডিশটি ফেলে দেওয়ার আগে একটি অস্বাভাবিক দৃশ্য লক্ষ করলেন। ছত্রাকের আশপাশে ব্যাকটেরিয়ার ঘন স্তর ছিল না। যেখানে অসংখ্য ব্যাকটেরিয়া জন্মানোর কথা, সেখানে তৈরি হয়েছিল একটি পরিষ্কার অঞ্চল। সেই ছোট পর্যবেক্ষণই পরে পেনিসিলিন আবিষ্কারের সূচনা হয়ে ওঠে।

ফ্লেমিং ছিলেন ব্যাকটেরিয়া নিয়ে কাজ করা একজন চিকিৎসক ও গবেষক। ক্ষত সংক্রমণ এবং জীবাণু দমনের প্রচলিত উপায়গুলোর সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে তাঁর আগ্রহ ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় আহত সৈনিকদের চিকিৎসার অভিজ্ঞতা তাঁকে দেখিয়েছিল, সংক্রমণের বিরুদ্ধে কার্যকর উপায়ের প্রয়োজন কতটা গভীর। তাঁর গবেষণাগারে বিভিন্ন ব্যাকটেরিয়াকে পুষ্টিসমৃদ্ধ মাধ্যমের ওপর বাড়িয়ে তাদের আচরণ পরীক্ষা করা হতো। ১৯২৮ সালে তিনি যে ডিশগুলো পর্যবেক্ষণ করছিলেন, সেগুলোর একটিতে ছিল স্ট্যাফিলোকক্কাস নামের ব্যাকটেরিয়া। এই জীবাণুগোষ্ঠীর সদস্যরা মানুষের শরীরে নানা ধরনের সংক্রমণ ঘটাতে পারে।

পেট্রি ডিশের পুষ্টিমাধ্যমে ব্যাকটেরিয়া ছোট ছোট কলোনি তৈরি করে। সাধারণ অবস্থায় পর্যাপ্ত খাবার ও অনুকূল পরিবেশ পেলে কলোনিগুলো ছড়িয়ে পড়ে। ফ্লেমিংয়ের একটি ডিশে বাইরে থেকে এসে একটি ছত্রাকও বেড়ে উঠেছিল। দূষণটি কীভাবে ঘটেছিল, তার প্রতিটি ধাপ নিশ্চিতভাবে জানা যায় না; তবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল ছত্রাক ও ব্যাকটেরিয়ার মাঝের দৃশ্যমান সম্পর্ক। ছত্রাকের গা ঘেঁষে ব্যাকটেরিয়া বাড়তে পারছিল না, অথচ কিছুটা দূরে তারা স্বাভাবিকভাবেই বেড়ে উঠছিল। ফলে ঘটনাটিকে শুধু একটি নষ্ট ডিশ বলে এড়িয়ে যাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে।

এই ফাঁকা অংশকে বোঝার জন্য দেখতে হয় জীবাণুগুলো কোথায় অবস্থান করছিল। ছত্রাকের চারদিকে একটি বলয় তৈরি হয়েছিল, যেখানে ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হয়েছে। যদি ছত্রাক কেবল জায়গা দখল করত, তাহলে তার একেবারে নিচের অংশেই ব্যাকটেরিয়া অনুপস্থিত থাকার কথা। কিন্তু আশপাশের পুষ্টিমাধ্যমেও প্রভাব দেখা যাচ্ছিল। ফ্লেমিং ধারণা করলেন, ছত্রাক এমন কিছু ছাড়ছে যা মাধ্যমের মধ্যে ছড়িয়ে পাশের ব্যাকটেরিয়াকে দমন করছে। দৃশ্যমান ফল থেকে অদৃশ্য কোনো পদার্থের উপস্থিতি অনুমান করা ছিল তাঁর অনুসন্ধানের মূল ধাপ।

তিনি ছত্রাকটি আলাদা করে চাষ করেন এবং তার বৃদ্ধি ঘটে এমন তরলের ব্যাকটেরিয়াবিরোধী ক্ষমতা পরীক্ষা করেন। পরীক্ষায় দেখা যায়, ছত্রাকের উপস্থিতিতে তৈরি পদার্থ শুধু মূল ডিশের মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না; সেটি আলাদা অবস্থাতেও কিছু ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি আটকাতে পারছিল। ছত্রাকটি পেনিসিলিয়াম গণের হওয়ায় ফ্লেমিং ওই সক্রিয় পদার্থের নাম দেন পেনিসিলিন। নামকরণ সহজ হলেও পদার্থটিকে বিশুদ্ধভাবে সংগ্রহ করা, তার প্রকৃতি বোঝা এবং নির্ভরযোগ্য চিকিৎসায় ব্যবহার করা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার সমস্যা।

পেনিসিলিনের প্রভাব সব ব্যাকটেরিয়ার ওপর সমান ছিল না। ফ্লেমিং লক্ষ্য করেছিলেন, স্ট্যাফিলোকক্কাসসহ কয়েক ধরনের ব্যাকটেরিয়া এতে সংবেদনশীল। পরীক্ষাগারে একটি পদার্থের ব্যাকটেরিয়াবিরোধী প্রভাব দেখা গেলেই সেটি মানুষের সব সংক্রমণের ওষুধ হয়ে যায় না। কোন জীবাণুর বিরুদ্ধে কাজ করছে, কতটা ঘনত্বে কাজ করছে এবং শরীরের মধ্যে পৌঁছানোর পরও কার্যকর থাকবে কি না—এসব প্রশ্নের আলাদা উত্তর দরকার। ফ্লেমিংয়ের আবিষ্কার ছিল সম্ভাবনাময় একটি কার্যকর পদার্থের সন্ধান; প্রস্তুত ওষুধের আবিষ্কার নয়।

এখানেই ছত্রাকের পাশের ব্যাকটেরিয়ামুক্ত অঞ্চলটির বৈজ্ঞানিক গুরুত্ব স্পষ্ট হয়। ছত্রাকটি কোনো সচেতন উদ্দেশ্যে ব্যাকটেরিয়া ধ্বংস করছিল না। অণুজীবেরা একই পরিবেশে খাদ্য ও জায়গার জন্য প্রতিযোগিতা করে; তাদের তৈরি রাসায়নিক পদার্থ অন্য অণুজীবের বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত করতে পারে। ফ্লেমিংয়ের ডিশে সেই প্রভাব চোখে দেখা যাচ্ছিল। তবে পরিষ্কার বলয় দেখে একাই বলা যায় না যে পাশের প্রতিটি ব্যাকটেরিয়া একইভাবে মারা গেছে। ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থেমেছে, নাকি জীবাণুগুলো ধ্বংস হয়েছে—তা নির্ধারণে আরও পরীক্ষা প্রয়োজন। এই পার্থক্য গবেষণার ভাষায় গুরুত্বপূর্ণ।

আজ আমরা জানি, পেনিসিলিন সংবেদনশীল ব্যাকটেরিয়ার কোষপ্রাচীর তৈরির প্রক্রিয়ায় বাধা দেয়। ব্যাকটেরিয়ার শক্ত কোষপ্রাচীর তাকে নিজের ভেতরের চাপ সামলাতে সাহায্য করে। সেই প্রাচীর ঠিকমতো গড়ে উঠতে না পারলে, বিশেষত বৃদ্ধি ও বিভাজনের সময়, জীবাণুটি ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। কিন্তু ১৯২৮ সালের পেট্রি ডিশ দেখে ফ্লেমিং এই আণবিক প্রক্রিয়ার সম্পূর্ণ ব্যাখ্যা পাননি। তাঁর তাৎক্ষণিক অবদান ছিল ঘটনাটি শনাক্ত করা, পর্যবেক্ষণকে পরীক্ষায় যাচাই করা এবং ব্যাকটেরিয়াবিরোধী পদার্থটির কথা বৈজ্ঞানিকভাবে তুলে ধরা।

পেনিসিলিনকে ওষুধে পরিণত করার পথে বড় বাধা ছিল পর্যাপ্ত সক্রিয় পদার্থ পাওয়া। ছত্রাকের তৈরি তরল থেকে পেনিসিলিন আলাদা করা কঠিন ছিল; পদার্থটির কার্যকারিতা ধরে রেখে বিশুদ্ধ নমুনা সংগ্রহও সহজ হচ্ছিল না। অল্প পরিমাণে পরীক্ষাগারে যে ফল পাওয়া যায়, অসুস্থ মানুষের শরীরে চিকিৎসার জন্য তার চেয়ে অনেক বেশি পরিমাণে নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য ওষুধ প্রয়োজন। ফ্লেমিং ১৯২৯ সালে তাঁর পর্যবেক্ষণ প্রকাশ করলেও আবিষ্কারের পরপরই রোগীদের জন্য পেনিসিলিনের সরবরাহ শুরু হয়নি। গবেষণাগারের ডিশ থেকে হাসপাতালের শয্যা পর্যন্ত পথটি তখনো দীর্ঘ।

এই গল্পে ‘আকস্মিক’ শব্দটির অর্থ তাই বুঝে নেওয়া জরুরি। ছত্রাকের ডিশে এসে পড়া ছিল অনিচ্ছাকৃত ঘটনা। কিন্তু দূষিত ডিশে ব্যাকটেরিয়ামুক্ত বলয় দেখে প্রশ্ন তোলা, ছত্রাককে আলাদা করা এবং প্রভাবটি পরীক্ষা করা ছিল গবেষকের সচেতন কাজ। অনেক গবেষণাগারেই কোনো না কোনো নমুনা দূষিত হয়; প্রতিটি দূষণ চিকিৎসাবিজ্ঞানের আবিষ্কারে পরিণত হয় না। ফ্লেমিংয়ের প্রস্তুতি ও পর্যবেক্ষণক্ষমতা ঘটনাটিকে তথ্যের উৎসে বদলে দিয়েছিল।

আবিষ্কারের গুরুত্ব বুঝতে সেই সময়ের চিকিৎসার সীমাবদ্ধতাও মনে রাখতে হয়। সংক্রমিত ক্ষত, ফুসফুসের কিছু ব্যাকটেরিয়াজনিত রোগ কিংবা অস্ত্রোপচারের পর জটিলতা চিকিৎসকদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ ছিল। জীবাণু দমনের কোনো পদার্থ পরীক্ষাগারে পাওয়া মানেই অবশ্য রোগীর শরীরে তা কাজ করবে—এমন নিশ্চয়তা ছিল না। তবু ফ্লেমিংয়ের ফল একটি বাস্তব সম্ভাবনা দেখায়: প্রকৃতিতে উৎপন্ন কোনো পদার্থ দিয়ে নির্দিষ্ট ব্যাকটেরিয়ার বিরুদ্ধে চিকিৎসা তৈরি করা যেতে পারে। এই সম্ভাবনাই পরের গবেষকদের কাজের ভিত্তি তৈরি করে।

এক দশকেরও বেশি সময় পরে অক্সফোর্ডের গবেষক হাওয়ার্ড ফ্লোরি, আর্নস্ট চেইন এবং তাঁদের সহকর্মীরা পেনিসিলিনকে বিশুদ্ধ করা ও কার্যকর চিকিৎসায় ব্যবহারের দিকে বড় অগ্রগতি আনেন। নরম্যান হিটলিসহ দলের সদস্যদের পরীক্ষাগার ও উৎপাদনসংক্রান্ত কাজও এতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। পরবর্তী বছরগুলোতে আরও গবেষণা ও ব্যাপক উৎপাদনের মাধ্যমে পেনিসিলিন চিকিৎসায় ব্যবহারযোগ্য হয়ে ওঠে। ফ্লেমিং, ফ্লোরি ও চেইন ১৯৪৫ সালে চিকিৎসাবিজ্ঞানে নোবেল পুরস্কার পান। ১৯২৮ সালের আবিষ্কার এবং পরে ব্যবহারযোগ্য ওষুধ তৈরি—দুটি ঘটনাই পেনিসিলিনের ইতিহাসের অপরিহার্য অংশ।

সেন্ট মেরির সেই ডিশে ফ্লেমিং প্রথমে দেখেছিলেন একটি ছত্রাক আর তার চারপাশে ব্যাকটেরিয়ার অনুপস্থিতি। তিনি তখন হাতে পাননি কোটি রোগীর জন্য প্রস্তুত কোনো চিকিৎসা। পেয়েছিলেন একটি প্রশ্নের পরীক্ষাযোগ্য সূত্র: ছত্রাকের তৈরি কোন পদার্থ ব্যাকটেরিয়ার বৃদ্ধি থামাচ্ছে? সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গিয়েই পেনিসিলিনের পরিচয় সামনে আসে। আর পরের অধ্যায় শুরু হয় আরও কঠিন প্রশ্ন দিয়ে—ডিশে কাজ করা এই নাজুক পদার্থকে কীভাবে পর্যাপ্ত পরিমাণে সংগ্রহ করে মানুষের চিকিৎসায় ব্যবহার করা সম্ভব হবে?