রাসপুতিন হত্যা রহস্য: রুশ রাজপরিবারের ‘পবিত্র মানুষটিকে’ কারা ও কেন হত্যা করেছিল?
সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
রাজতন্ত্র বাঁচাতে হত্যা, অথচ কয়েক মাসেই ভেঙে পড়ল সিংহাসন।
গ্রিগরি রাসপুতিনকে হত্যার পেছনে ছিলেন রাশিয়ার রাজতন্ত্রের শত্রুরা নন, বরং সেই রাজতন্ত্রের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত কয়েকজন অভিজাত ও রক্ষণশীল ব্যক্তি। তাঁদের বিশ্বাস ছিল, এই বিতর্কিত ধর্মীয় ব্যক্তিত্বকে সরিয়ে দিলে রোমানভ রাজপরিবারের মর্যাদা ফিরবে এবং দেশ বিপর্যয় থেকে বাঁচবে। ১৯১৬ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে তাঁরা রাসপুতিনকে প্রাসাদে ডেকে হত্যা করেন। অপরাধীদের পরিচয়ের বড় অংশ জানা থাকলেও হত্যার ঘটনাক্রম ঘিরে রহস্য রয়ে গেছে, কারণ বহুল প্রচলিত বিবরণের প্রধান উৎস হত্যাকারীদের নিজেদের লেখা।
প্রথমেই রাসপুতিনের পরিচয় সম্পর্কে একটি ভুল ধারণা সরানো দরকার। তাঁকে প্রায়ই ‘উন্মাদ সন্ন্যাসী’ বলা হয়, কিন্তু তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে রুশ অর্থোডক্স চার্চের সন্ন্যাসী বা পুরোহিত ছিলেন না। সাইবেরিয়ার পোকরোভস্কোয়ে গ্রামের কৃষক পরিবারে জন্ম নেওয়া এই বিবাহিত মানুষ ধর্মীয় ভ্রমণ ও ব্যক্তিগত সাধনার মাধ্যমে পরিচিতি পান। অনুসারীরা তাঁকে আধ্যাত্মিক পরামর্শদাতা ও রোগ নিরাময়ের ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তি মনে করতেন। ‘পবিত্র মানুষ’ ছিল তাঁর ভক্তদের বিশ্বাসভিত্তিক পরিচয়, কোনো স্বীকৃত ধর্মীয় পদ নয়।
১৯০৫ সালে জার দ্বিতীয় নিকোলাস ও জারিনা আলেকজান্দ্রার সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। রাজপরিবারে তাঁর গুরুত্ব বাড়ার কেন্দ্রে ছিলেন উত্তরাধিকারী আলেক্সেই, যিনি হিমোফিলিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন। এই রোগে রক্তপাত সহজে বন্ধ হয় না। সন্তানের অসুস্থতায় বিপর্যস্ত আলেকজান্দ্রা মনে করতেন, রাসপুতিনের প্রার্থনা ও উপস্থিতি তাকে বাঁচাতে পারে। কিছু সংকটে তাঁর আশ্বাসের পর আলেক্সেইয়ের অবস্থার উন্নতি এই বিশ্বাসকে শক্ত করেছিল। তবে এসব ঘটনা রাসপুতিনের অলৌকিক চিকিৎসাশক্তির বৈজ্ঞানিক প্রমাণ নয়; তাঁর কার্যকারণ ব্যাখ্যা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
আলেক্সেইয়ের রোগ জনসমক্ষে পুরোপুরি প্রকাশ করা হয়নি। ফলে সাধারণ মানুষ বুঝতে পারত না, কেন এক গ্রাম্য ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব রাজপরিবারের এত আস্থা পাচ্ছেন। এই গোপনীয়তা সন্দেহ বাড়ায়। রাসপুতিনের মদ্যপান, যৌন আচরণ ও প্রভাব খাটানোর অভিযোগের সঙ্গে রাজনৈতিক অপপ্রচার মিশে যায়। আলেকজান্দ্রার সঙ্গে তাঁর যৌন সম্পর্কের গুজবও ছড়ায়, যার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। তাঁর চরিত্র নিয়ে সমালোচনা, বাস্তব অসদাচরণের অভিযোগ এবং রাজপরিবারকে হেয় করার কল্পকাহিনি আলাদা করে বিচার করা জরুরি।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ পরিস্থিতিকে আরও বিষাক্ত করে। ১৯১৫ সালে নিকোলাস সামরিক বাহিনীর সর্বাধিনায়কত্ব গ্রহণ করে সদর দপ্তরে বেশি সময় কাটাতে শুরু করেন। রাজধানীর রাজনীতিতে আলেকজান্দ্রার ভূমিকা বাড়ে; বিভিন্ন নিয়োগ ও সিদ্ধান্ত সম্পর্কে তিনি রাসপুতিনের মতামতকে গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু রাসপুতিন একাই পুরো রাশিয়া শাসন করতেন—এই জনপ্রিয় দাবি অতিরঞ্জিত। সিদ্ধান্তের আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা জারের কাছেই ছিল। তাঁর প্রভাবের সীমা নিয়ে বিতর্ক থাকলেও অস্বচ্ছ ব্যক্তিগত প্রভাবের ধারণাই প্রশাসনের ওপর জনবিশ্বাস দুর্বল করার জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠেছিল।
যুদ্ধক্ষেত্রের ক্ষয়ক্ষতি, রসদসংকট এবং ঘনঘন মন্ত্রী পরিবর্তনের মধ্যে রাসপুতিনকে ব্যর্থ শাসনের প্রতীক বানানো হয়। জারিনার জার্মান বংশপরিচয় সন্দেহ আরও বাড়ায়। রাসপুতিনের যুদ্ধবিরোধী অবস্থান থেকে কেউ কেউ দাবি করেন, তিনি জার্মানির সঙ্গে আলাদা শান্তির পথ তৈরি করছেন। কিন্তু সন্দেহ ও প্রমাণিত গুপ্তচরবৃত্তি এক নয়। অভিজাতদের একাংশ মনে করছিল, নিকোলাস ভুল মানুষের ওপর নির্ভর করছেন এবং পরিবারের অন্য সদস্য, সংসদ ও অভিজ্ঞ উপদেষ্টাদের থেকে দূরে সরে যাচ্ছেন।
ষড়যন্ত্রের কেন্দ্রে ছিলেন প্রিন্স ফেলিক্স ইউসুপভ, বিপুল সম্পদের উত্তরাধিকারী এবং জারের ভাগনি ইরিনার স্বামী। তাঁর সঙ্গে যুক্ত হন জারের চাচাতো ভাই গ্র্যান্ড ডিউক দিমিত্রি পাভলোভিচ ও রাষ্ট্রদুমার রক্ষণশীল সদস্য ভ্লাদিমির পুরিশকেভিচ। সেনা কর্মকর্তা সের্গেই সুখোতিন এবং চিকিৎসক স্তানিস্লাভ লাজোভের্তও সহযোগীদের মধ্যে ছিলেন। কে কোন কাজ করেছিলেন, তার কিছু বিবরণ অস্পষ্ট। তবে ইউসুপভ, দিমিত্রি ও পুরিশকেভিচের কেন্দ্রীয় সম্পৃক্ততা নিয়ে ঐতিহাসিক ভিত্তি দৃঢ়। তাঁরা রাজপরিবারের বাইরের বিপ্লবী সংগঠন ছিলেন না।
পুরিশকেভিচ প্রকাশ্যেই রাসপুতিনের প্রভাবের বিরুদ্ধে বক্তব্য দিয়েছিলেন। ইউসুপভও হত্যাকে রাজতন্ত্র রক্ষার পদক্ষেপ হিসেবে উপস্থাপন করেন। তাঁদের ধারণা ছিল, রাসপুতিন চলে গেলে জার আবার অভিজাত ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের পরামর্শ শুনবেন। কিন্তু এই যুক্তিতে রাষ্ট্রের জটিল সংকটকে একজন মানুষের উপস্থিতির ওপর চাপানো হচ্ছিল। রাসপুতিনকে সরালেই যুদ্ধের ব্যর্থতা, খাদ্যসংকট বা শাসকের রাজনৈতিক বিচ্ছিন্নতা দূর হতো না। তবু তাঁকে সহজে চিহ্নিত করা যায় এমন একটি শত্রু হিসেবে বেছে নেওয়া হয়।
গ্রেগরীয় পঞ্জিকা অনুযায়ী ১৯১৬ সালের ২৯ ডিসেম্বর রাত থেকে ৩০ ডিসেম্বরের ভোরের মধ্যে হত্যাকাণ্ড ঘটে। রাশিয়ায় তখন ব্যবহৃত জুলিয়ান পঞ্জিকায় তারিখ ছিল ১৬–১৭ ডিসেম্বর। শহরটির নামও তখন সেন্ট পিটার্সবার্গের পরিবর্তে পেত্রোগ্রাদ। রাসপুতিনকে মোইকা প্রাসাদে আমন্ত্রণ জানান ইউসুপভ। তাঁর বর্ণনা অনুযায়ী, ইরিনার সঙ্গে পরিচয় করানোর কথা বলা হয়েছিল, যদিও ইরিনা তখন সেখানে ছিলেন না। আমন্ত্রণের এই আড়াল রাসপুতিনকে পরিচিত অভিজাতের ব্যক্তিগত পরিসরে নিয়ে আসে।
এরপরের বিখ্যাত গল্পটি মূলত ইউসুপভের লেখা থেকে এসেছে। তিনি দাবি করেন, রাসপুতিনকে বিষমেশানো খাবার ও পানীয় দেওয়া হলেও কোনো ফল হয়নি। পরে গুলি করে মৃত ভেবে ফেলে রাখার পর তিনি নাকি আবার উঠে আক্রমণ করেন এবং পালানোর চেষ্টা করেন। আরও গুলি করার পর দেহ সরানো হয়। এই নাটকীয় বিবরণকে ঘটনাস্থলের নিরপেক্ষ প্রতিবেদন হিসেবে পড়া যায় না। ইউসুপভ ছিলেন অপরাধের অংশগ্রহণকারী; নিজের কাজকে দেশরক্ষা এবং রাসপুতিনকে অস্বাভাবিক অশুভ শক্তি হিসেবে দেখানোর স্বার্থ তাঁর ছিল।
বিষের গল্পের পক্ষে নির্ভরযোগ্য প্রমাণ দুর্বল। পরবর্তী বর্ণনায় বিষ আদৌ ব্যবহার করা হয়েছিল কি না, তা নিয়েও অসংগতি দেখা যায়। তাই রাসপুতিনের শরীর বিষ সহ্য করতে পারত—এমন সিদ্ধান্ত ভিত্তিহীন। উপলব্ধ ফরেনসিক উপাদান বরং গুলিতে মৃত্যুর ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। তাঁর শরীরে একাধিক গুলির আঘাত ছিল; মাথায় অত্যন্ত কাছ থেকে গুলি করার চিহ্নও শনাক্ত করা হয়েছে। তবে পুরোনো নথি ও ছবির সীমাবদ্ধতা মেনে চলতে হয়। সেগুলো মৃত্যুর ধরন বুঝতে সাহায্য করলেও প্রতিটি গুলি কে চালিয়েছিলেন তা নিশ্চিত করে না।
দেহ নদীতে ফেলার অংশটির সঙ্গে আরেক জনপ্রিয় দাবি যুক্ত হয়েছে: রাসপুতিন নাকি তখনও জীবিত ছিলেন এবং শেষ পর্যন্ত ডুবে মারা যান। কিন্তু উপলব্ধ ময়নাতদন্তসংক্রান্ত বিবরণ এই ধারণাকে সমর্থন করে না। তাঁকে নদীতে ফেলার আগেই মৃত্যু হয়েছিল—এটাই প্রমাণের সঙ্গে বেশি সামঞ্জস্যপূর্ণ ব্যাখ্যা। ছোট নেভকা নদীতে দেহ ফেলা হয় এবং পরে উদ্ধার করা হয়। ফলে ‘বিষ, গুলি, প্রহার—কিছুতেই মরেননি’ ধরনের গল্প ইতিহাসের চেয়ে হত্যাকাণ্ডকে ঘিরে তৈরি কিংবদন্তির অংশ।
ব্রিটিশ গোয়েন্দাদের ভূমিকা নিয়েও তত্ত্ব রয়েছে। ব্রিটেন চাইত রাশিয়া জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধে থাকুক; রাসপুতিন আলাদা শান্তিতে প্রভাব ফেলতে পারেন—এমন আশঙ্কা কারও ছিল। ব্রিটিশ কর্মকর্তা অসওয়াল্ড রেনারের সঙ্গে ইউসুপভের পরিচয়ও আলোচনায় আসে। কিন্তু পরিচয়, সম্ভাব্য স্বার্থ এবং অপরাধে প্রত্যক্ষ অংশগ্রহণ একই জিনিস নয়। ব্রিটিশ নির্দেশে হত্যা হয়েছে বা কোনো ব্রিটিশ কর্মকর্তা চূড়ান্ত গুলি চালিয়েছেন—এমন সিদ্ধান্ত চূড়ান্তভাবে প্রমাণিত নয়। অস্ত্রের সম্ভাব্য ধরন থেকেও একা হত্যাকারীর পরিচয় নির্ধারণ করা যায় না।
রাসপুতিনের নিখোঁজ হওয়া ও গুলির শব্দ নিয়ে অনুসন্ধান দ্রুত প্রাসাদের দিকে যায়। কিন্তু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সম্পৃক্ততার কারণে পূর্ণাঙ্গ প্রকাশ্য বিচার হয়নি। নিকোলাস ইউসুপভকে রাজধানী থেকে দূরে তাঁর সম্পত্তিতে পাঠান এবং দিমিত্রিকে পারস্যের যুদ্ধাঞ্চলে পাঠানো হয়। আলেকজান্দ্রা গভীরভাবে শোকাহত হন। রাজপরিবারের অন্য সদস্যদের অনেকে হত্যাকারীদের প্রতি সহানুভূতি দেখান। ঘটনাটি তাই শুধু একজন বিতর্কিত ব্যক্তির মৃত্যু নয়; রাজবংশের নিজের ভেতরেও আনুগত্য ও কর্তৃত্ব কতটা ভেঙে পড়েছিল, তার প্রকাশ।
হত্যাকারীরা আশা করেছিলেন, রাসপুতিনের মৃত্যু রাজতন্ত্রকে বাঁচাবে। বাস্তবে কয়েক মাসের মধ্যেই ১৯১৭ সালের ফেব্রুয়ারি বিপ্লব, গ্রেগরীয় হিসাবে মার্চে, নিকোলাসের সিংহাসন ত্যাগের পথ তৈরি করে। রাসপুতিনের হত্যা সেই পতনের একমাত্র কারণ ছিল না; যুদ্ধ, অর্থনৈতিক সংকট ও রাজনৈতিক ব্যর্থতা অনেক গভীর ছিল। তাঁর মৃত্যুর আসল রহস্য অলৌকিকভাবে বারবার বেঁচে ওঠায় নয়, অপরাধীদের তৈরি গল্প ও অসম্পূর্ণ প্রমাণের ফাঁকে। রাজতন্ত্র রক্ষার নামে সংঘটিত হত্যাটি শেষ পর্যন্ত দেখিয়েছিল, সেই রাজতন্ত্রের অভ্যন্তরীণ বিশ্বাস কতটা ক্ষয়প্রাপ্ত হয়ে গেছে।
নেপোলিয়নকে হত্যার ষড়যন্ত্র: ‘ইনফার্নাল মেশিন’ বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা
ফরাসি বিপ্লবের আড়ালের ষড়যন্ত্র: রাজতন্ত্র, বিপ্লবী ও বিদেশি শক্তির গোপন খেলা
আমেরিকান বিপ্লবের গুপ্তচর জগৎ: ওয়াশিংটনের গোপন কালপার স্পাই রিং
মীর কাসিমের পতন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল ও বাংলার ক্ষমতার লড়াই
পলাশীর যুদ্ধ কি আসলে যুদ্ধ ছিল, নাকি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তর?
মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা