নেপোলিয়নের পতনের পেছনে কি শুধু যুদ্ধ ছিল? ইউরোপীয় শক্তির গোপন কূটনীতি
সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয়ের আড়ালে ছিল কূটনীতির দীর্ঘ লড়াই।
নেপোলিয়নের পতনের কথা উঠলেই চোখের সামনে ভেসে ওঠে রাশিয়ার তুষার, লাইপৎসিগের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ কিংবা ওয়াটারলুর শেষ পরাজয়। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরে আরেকটি লড়াই চলছিল—দরবারে, ব্যক্তিগত বৈঠকে, গোপন চিঠিতে এবং চুক্তির ধারায়। সেখানে সেনাবাহিনীর বদলে ব্যবহৃত হচ্ছিল অর্থ, প্রতিশ্রুতি, সীমান্তের প্রস্তাব ও পক্ষবদলের সুযোগ। নেপোলিয়নকে পরাজিত করতে সামরিক শক্তি অপরিহার্য ছিল, কিন্তু সেই শক্তিকে একত্র রাখা ছিল কূটনীতির কাজ। তাঁর পতন বুঝতে তাই কামানের পাশাপাশি আলোচনার টেবিলও দেখতে হয়।
এটি অবশ্য কোনো সর্বশক্তিমান গোপন চক্রের পরিকল্পনা ছিল না। ব্রিটেন, রাশিয়া, অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়ার স্বার্থ ভিন্ন ছিল; পরস্পরের প্রতিও তাদের সন্দেহ ছিল। আগের বহু জোট ভেঙে গিয়েছিল পরাজয়, আলাদা শান্তিচুক্তি এবং স্বার্থের দ্বন্দ্বে। নেপোলিয়ন সেই বিভাজন কাজে লাগাতে পারতেন। ১৮১২ সালের পর পরিস্থিতি বদলায়, কারণ তাঁর সামরিক দুর্বলতা প্রতিপক্ষকে নতুন সুযোগ দেয়। কিন্তু সুযোগকে স্থায়ী জোটে রূপান্তর করা স্বয়ংক্রিয় ছিল না; তার জন্য দীর্ঘ দরকষাকষি দরকার হয়েছিল।
ব্রিটেনের বিরুদ্ধে মহাদেশীয় অবরোধ নেপোলিয়নের মিত্রদের মধ্যেও অসন্তোষ সৃষ্টি করেছিল। বাণিজ্যিক ক্ষতি, নিয়ন্ত্রণের চাপ এবং রাশিয়ার সঙ্গে পোল্যান্ড নিয়ে উদ্বেগ দুই সম্রাটের সম্পর্ক দুর্বল করে। ১৮০৭ সালের তিলসিতের সমঝোতা স্থায়ী আস্থায় পরিণত হয়নি। ১৮১২ সালে রাশিয়া আক্রমণ করে নেপোলিয়ন সামরিকভাবে বিরোধ মেটাতে চেয়েছিলেন। বিপর্যয়কর পশ্চাদপসরণে তাঁর সেনাবাহিনী ক্ষয়প্রাপ্ত হলে ইউরোপের অন্য শক্তিগুলো বুঝতে পারে, এত দিন যে শাসককে অজেয় মনে হয়েছে, তাঁকে এবার প্রতিরোধ করা সম্ভব।
প্রথম বড় পরিবর্তনগুলোর একটি আসে প্রুশিয়ার দিক থেকে। ফরাসি অভিযানে বাধ্যতামূলক সহযোগী হিসেবে থাকা প্রুশীয় বাহিনীর কমান্ডার ইয়র্ক ১৮১২ সালের ৩০ ডিসেম্বর রুশ পক্ষের সঙ্গে টাউরোগেন সমঝোতা করেন। তাঁর বাহিনীকে নিরপেক্ষ করার এই পদক্ষেপ সরাসরি রাজকীয় অনুমোদন ছাড়াই নেওয়া হয়েছিল। এটি সঙ্গে সঙ্গে প্রুশিয়ার আনুষ্ঠানিক যুদ্ধঘোষণা ছিল না, কিন্তু নেপোলিয়নের মিত্রব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ফাটল তৈরি করে। পরবর্তী মাসগুলোতে প্রুশিয়া রাশিয়ার সঙ্গে যুক্ত হয়ে ফরাসি আধিপত্যের বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামে।
অস্ট্রিয়ার অবস্থান ছিল আরও জটিল। নেপোলিয়ন অস্ট্রিয়ার সম্রাটের কন্যা মারি লুইজকে বিয়ে করেছিলেন; ফলে পারিবারিক সম্পর্ক রাজনৈতিক নিরাপত্তার আশ্বাস বলে মনে হতে পারত। কিন্তু পররাষ্ট্রমন্ত্রী মেটারনিখ রাষ্ট্রের স্বার্থকে সেই সম্পর্কের ওপর স্থান দেন। অস্ট্রিয়া ফরাসি আধিপত্য কমাতে চাইছিল, আবার রাশিয়া ও প্রুশিয়ার অতিরিক্ত শক্তিবৃদ্ধিও ঠেকাতে চেয়েছিল। মেটারনিখের লক্ষ্য শুধু নেপোলিয়নের পরাজয় ছিল না; ছিল এমন ভারসাম্য, যেখানে অস্ট্রিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে থাকবে।
১৮১৩ সালের যুদ্ধবিরতির সময় অস্ট্রিয়া মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নেয়। একই সঙ্গে রাশিয়া ও প্রুশিয়ার সঙ্গে আলোচনা করে, কোন শর্তে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে যোগ দেবে তা নির্ধারণ করতে থাকে। রাইখেনবাখের সমঝোতায় এই দ্বিমুখী অবস্থান স্পষ্ট হয়: নেপোলিয়ন নির্দিষ্ট শর্ত না মানলে অস্ট্রিয়া মিত্রদের সঙ্গে যুদ্ধে যাবে। বাইরে শান্তির উদ্যোগ, ভেতরে সম্ভাব্য যুদ্ধের প্রস্তুতি—এটি ছিল চাপ সৃষ্টির কূটনীতি। নেপোলিয়ন একে অস্ট্রিয়ার প্রতারণা মনে করলেও মেটারনিখ নিজের রাষ্ট্রের দরকষাকষির শক্তি বাড়াচ্ছিলেন।
প্রাগের শান্তি-উদ্যোগ সফল হয়নি। ফ্রান্সের নিয়ন্ত্রণাধীন জার্মান অঞ্চল, পোল্যান্ড, প্রুশিয়ার পুনর্গঠন এবং অন্যান্য ভূখণ্ডের প্রশ্নে বড় ব্যবধান থেকে যায়। নেপোলিয়ন কিছু ছাড় দেওয়ার সম্ভাবনা বিবেচনা করলেও দ্রুত তাঁর সাম্রাজ্যিক অবস্থান ত্যাগ করতে প্রস্তুত ছিলেন না। আলোচনার সময়সীমা শেষ হলে আগস্টে অস্ট্রিয়া যুদ্ধে যোগ দেয়। এখানে ব্যর্থতা শুধু ব্যক্তিগত অহংকারে সীমাবদ্ধ ছিল না; উভয় পক্ষই ভবিষ্যৎ সামরিক ফল সম্পর্কে নিজস্ব হিসাব করছিল। তবে নেপোলিয়নের বিলম্ব তাঁর অবস্থানকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে।
ব্রিটেন এই জোটের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্ত করে। তার নৌক্ষমতা ও বাণিজ্যিক সম্পদের পাশাপাশি মিত্রদের দেওয়া আর্থিক সহায়তা স্থলযুদ্ধ চালিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ক্যাসলরি বুঝতেন, শুধু অর্থ দিলেই জোট টিকবে না; অংশীদারদের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার আশ্বাসও দরকার। ব্রিটিশ কূটনীতি যুদ্ধের ব্যয় বহন এবং আলাদা শান্তির প্রলোভন কমানো—দুই কাজই করছিল। ফলে নেপোলিয়নের পক্ষে একজন প্রতিপক্ষকে পরাজিত করে অন্যদের বিচ্ছিন্ন করা আগের তুলনায় কঠিন হয়ে ওঠে।
ছোট ও মাঝারি রাষ্ট্রগুলোর পক্ষবদলও সাম্রাজ্যকে দুর্বল করে। বাভারিয়া ১৮১৩ সালের অক্টোবরে অস্ট্রিয়ার সঙ্গে রিড চুক্তি করে ফরাসি মিত্রশিবির ছাড়ে। নিজের রাজ্য ও মর্যাদা রক্ষার প্রতিশ্রুতি এই সিদ্ধান্তে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। নেপোলিয়নের প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থার সুবিধাভোগীরাও তখন বিকল্প রক্ষাকবচ খুঁজছিল। ফলে লাইপৎসিগের পরাজয় শুধু একটি বড় যুদ্ধের হার ছিল না; তার সঙ্গে যুক্ত ছিল মিত্রদের আস্থা হারানো এবং জার্মানিতে ফরাসি রাজনৈতিক কাঠামোর ভাঙন।
তবু ১৮১৩ সালের শেষদিকে নেপোলিয়নকে সরানোই সব মিত্রের একমাত্র স্থির লক্ষ্য ছিল না। নভেম্বরের ফ্রাঙ্কফুর্ট প্রস্তাবে ফ্রান্সকে তথাকথিত প্রাকৃতিক সীমান্তের মধ্যে রেখে শান্তির সম্ভাবনা ওঠে। এই ধারণায় নেপোলিয়নের সিংহাসন বজায় থাকার সুযোগ ছিল। কিন্তু এটি চূড়ান্ত, সর্বসম্মত ও স্বাক্ষরিত শান্তিচুক্তি ছিল না। শর্তের ব্যাখ্যা, ব্রিটেনের উদ্বেগ এবং যুদ্ধের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিষয়টিকে অনিশ্চিত করে। তাই নেপোলিয়ন একটি সহজ, নিশ্চিত মুক্তির পথ সরাসরি ফিরিয়ে দিয়েছিলেন—এমন বর্ণনা অতিরিক্ত সরল।
মিত্ররা জনমতকেও লক্ষ্য করে। তারা নিজেদের বক্তব্যে ফ্রান্স ও নেপোলিয়নের আধিপত্যকে আলাদা করার চেষ্টা করে: যুদ্ধ ফরাসি জাতিকে ধ্বংস করার জন্য নয়, ইউরোপকে নিরাপদ করার জন্য। এই ভাষার উদ্দেশ্য ছিল ফরাসিদের মনে শান্তির আকাঙ্ক্ষা বাড়ানো এবং সম্রাটের সঙ্গে দেশের স্বার্থের দূরত্ব তৈরি করা। কূটনীতি এখানে শুধু শাসকদের বোঝাচ্ছিল না; প্রতিপক্ষ দেশের মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্যও প্রভাবিত করতে চাইছিল। সামরিক অগ্রযাত্রার সঙ্গে এই প্রচার আরও কার্যকর হয়।
১৮১৪ সালের মার্চের শোমোঁ চুক্তি জোটের ঐক্যকে শক্ত ভিত্তি দেয়। চার প্রধান শক্তি যুদ্ধ চালানো, আলাদা শান্তি না করা এবং দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তাব্যবস্থা গড়ার অঙ্গীকার করে। ব্রিটেন বড় আর্থিক সহায়তার প্রতিশ্রুতি দেয়। নেপোলিয়নের জন্য এর তাৎপর্য ছিল গভীর: মিত্রদের পৃথক করে সমঝোতা করার সুযোগ সংকুচিত হয়। তাদের মধ্যে মতভেদ তখনও ছিল, কিন্তু চুক্তি সেই মতভেদকে জোট ভাঙার কারণ হয়ে উঠতে বাধা দেওয়ার ব্যবস্থা তৈরি করেছিল।
ফ্রান্সের ভেতরে তালেইরাঁ নতুন রাজনৈতিক বিকল্প তৈরিতে ভূমিকা রাখেন। প্যারিসে মিত্রদের প্রবেশের পর তিনি জার প্রথম আলেকজান্ডারের সঙ্গে যোগাযোগ করেন এবং বুরবোঁ পুনঃপ্রতিষ্ঠার পক্ষে কাজ করেন। সেনেটের মাধ্যমে নেপোলিয়নের অপসারণে তাঁর প্রভাব ছিল। তবে তালেইরাঁ একাই পতন ঘটাননি। রাজধানীর পরাজয়, যুদ্ধক্লান্তি, প্রশাসনিক আনুগত্যের ক্ষয় এবং সেনানায়কদের আপত্তি ছাড়া তাঁর উদ্যোগ এত কার্যকর হতো না। গোপন যোগাযোগ তখন সফল হয়, যখন প্রকাশ্য ক্ষমতার ভিত্তি ইতিমধ্যে দুর্বল হয়ে পড়েছে।
নেপোলিয়ন প্রথমে নিজের পুত্রের অধিকার রেখে সিংহাসন ত্যাগের সম্ভাবনা খুঁজেছিলেন। কিন্তু মিত্রদের অবস্থান এবং সামরিক সমর্থনের সংকট সেই পথ বন্ধ করে। এপ্রিলের নিঃশর্ত পদত্যাগের পর ফন্টেনব্লোর চুক্তিতে তাঁর এলবায় অবস্থানসহ ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয়। ফলে তাঁর প্রথম পতন ছিল সামরিক পরাজয়কে রাজনৈতিক নিষ্পত্তিতে রূপ দেওয়ার ফল। যুদ্ধ তাঁকে দুর্বল করেছিল; আলোচনা ঠিক করেছিল সেই দুর্বলতার পরিণতি কী হবে এবং ফ্রান্সে কে শাসন করবে।
নেপোলিয়ন সরে যাওয়ার পরও বিজয়ীরা ঐক্যবদ্ধ ছিলেন না। ভিয়েনার আলোচনায় পোল্যান্ড ও স্যাক্সনি নিয়ে রাশিয়া-প্রুশিয়ার দাবি অন্যদের উদ্বিগ্ন করে। ১৮১৫ সালের ৩ জানুয়ারি ব্রিটেন, অস্ট্রিয়া ও পুনঃপ্রতিষ্ঠিত ফ্রান্স গোপন প্রতিরক্ষা চুক্তি করে। এই চুক্তি নেপোলিয়নের প্রথম পতনের কারণ নয়; এটি পতনের পর মিত্রদের পারস্পরিক অবিশ্বাসের প্রমাণ। একই শক্তিগুলো পরিস্থিতি বদলালে একে অন্যের বিরুদ্ধে নিরাপত্তার ব্যবস্থা নিতে প্রস্তুত ছিল।
কিন্তু মার্চে নেপোলিয়ন ফিরে এলে তাদের বিরোধ আবার পেছনে যায়। নতুন চুক্তির মাধ্যমে প্রধান শক্তিগুলো তাঁর বিরুদ্ধে যুদ্ধের অঙ্গীকার পুনর্নবীকরণ করে। ওয়াটারলুর পরাজয় তাঁর শেষ সুযোগ শেষ করলেও তার পেছনে ছিল এই রাজনৈতিক সংকল্প—একটি সাময়িক সাফল্যে তাঁকে আবার ইউরোপীয় ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্য শাসক করা হবে না। তাই তাঁর পতনকে শুধু যুদ্ধ কিংবা শুধু ষড়যন্ত্র দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না। সামরিক ক্ষয়, কূটনৈতিক বিচ্ছিন্নতা ও অভ্যন্তরীণ সমর্থনহীনতা একত্র হয়েই তাঁর সাম্রাজ্যের অবসান ঘটায়।
পলাশীর যুদ্ধ কি আসলে যুদ্ধ ছিল, নাকি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তর?
মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা
সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: পলাশীর যুদ্ধের আগে গোপনে কী ঘটেছিল?
শিবাজী ও আফজল খানের সাক্ষাৎ: শান্তি আলোচনা নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার ফাঁদ?
দারা শিকোহর পতন: আওরঙ্গজেব কীভাবে ভাইকে পরাজিত করে মুঘল সিংহাসন দখল করেছিলেন?
মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনের ষড়যন্ত্র: শাহজাহানের চার পুত্রের রক্তাক্ত ক্ষমতার লড়াই