বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লিংকন হত্যা: পুরো মার্কিন সরকারকে অচল করার ষড়যন্ত্র ছিল কি?

সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য

লিংকন হত্যা: পুরো মার্কিন সরকারকে অচল করার ষড়যন্ত্র ছিল কি?
তিন নেতাকে হত্যার ছক, লক্ষ্য ছিল রাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিপর্যয়।

আব্রাহাম লিংকনকে হত্যার পরিকল্পনা শুধু একজন রাষ্ট্রপতির জীবন শেষ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। জন উইলকস বুথ ও তাঁর সহযোগীরা একই রাতে উপরাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রু জনসন এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সিওয়ার্ডকেও হত্যা করতে চেয়েছিলেন। উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধশেষের গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বে বিপর্যয় সৃষ্টি করা। তবে সরকারকে বিশৃঙ্খল করার উদ্দেশ্য এবং রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান অচল করে দেওয়ার সক্ষমতা এক বিষয় নয়। বুথের পরিকল্পনায় প্রথমটির স্পষ্ট প্রমাণ আছে; দ্বিতীয়টির জন্য প্রয়োজনীয় বিস্তৃত ব্যবস্থা দেখা যায় না।

১৮৬৫ সালের এপ্রিল ছিল আমেরিকার গৃহযুদ্ধের নির্ধারক সময়। ৩ এপ্রিল কনফেডারেট রাজধানী রিচমন্ড ইউনিয়নের হাতে যায় এবং ৯ এপ্রিল রবার্ট ই. লি অ্যাপোম্যাটক্সে আত্মসমর্পণ করেন। কিন্তু এর অর্থ তখনই সব কনফেডারেট বাহিনীর আত্মসমর্পণ নয়। দক্ষিণের অন্যত্র সশস্ত্র প্রতিরোধ অব্যাহত ছিল। এই পরিস্থিতিতে উগ্র কনফেডারেট সমর্থক বুথ আশা করেছিলেন, উত্তরের রাজনৈতিক নেতৃত্বে আকস্মিক আঘাত যুদ্ধের ফল বদলানোর সুযোগ তৈরি করতে পারে। তাঁর হিসাব বাস্তব সামরিক পরিস্থিতির তুলনায় অনেক বেশি আশানির্ভর ছিল।

বুথের আগের ছক ছিল লিংকনকে অপহরণ করে বন্দী কনফেডারেট সৈন্যদের মুক্তির জন্য চাপ দেওয়া। সেই উদ্দেশ্যে তিনি সহযোগী, যোগাযোগের স্থান ও পালানোর পথের ব্যবস্থা করেছিলেন। মার্চের একটি অপহরণচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এপ্রিলের পরাজয়গুলো এবং কৃষ্ণাঙ্গদের সীমিত ভোটাধিকারের প্রতি লিংকনের সমর্থন তাঁর ক্ষোভ বাড়ায়। এরপর পরিকল্পনা হত্যার দিকে মোড় নেয়। অপহরণে রাষ্ট্রপতি ছিলেন দরকষাকষির হাতিয়ার; হত্যায় তাঁর অনুপস্থিতিকেই রাজনৈতিক অস্ত্র বানানোর চেষ্টা হয়। এই পরিবর্তনের সঙ্গে সবার অংশগ্রহণও এক ছিল না।

লিংকনকে বেছে নেওয়ার কারণ সহজে বোঝা যায়। তিনি ছিলেন রাষ্ট্রপ্রধান, সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ক এবং ইউনিয়নের বিজয়ের প্রধান রাজনৈতিক মুখ। দাসমুক্তির ঘোষণার কারণেও বুথ তাঁকে ঘৃণা করতেন। কিন্তু শুধু লিংকনকে হত্যা করলে সাংবিধানিকভাবে জনসন রাষ্ট্রপতি হতেন। সুতরাং জনসনকে লক্ষ্য করার অর্থ ছিল তাৎক্ষণিক উত্তরাধিকারকে আঘাত করা। যুদ্ধশেষের আলোচনা, আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত এবং দক্ষিণের পুনর্গঠনের সময় এই দ্বৈত শূন্যতা বড় রাজনৈতিক সংকট তৈরি করতে পারত।

সিওয়ার্ডকে হত্যার উদ্দেশ্য বুঝতে তাঁর পদ ও প্রভাব বিবেচনা করতে হয়। তিনি ছিলেন অভিজ্ঞ পররাষ্ট্রমন্ত্রী এবং লিংকন প্রশাসনের গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা। গৃহযুদ্ধের সময় বিদেশি শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক সামলানো ও কনফেডারেসির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ঠেকানোর প্রচেষ্টায় তাঁর ভূমিকা ছিল। তাঁর মৃত্যু প্রশাসনের অভিজ্ঞ নেতৃত্বকে আরও দুর্বল করত। তবে সিওয়ার্ড উপরাষ্ট্রপতির পর রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যক্তি ছিলেন না। তিন লক্ষ্যবস্তুকে উত্তরাধিকারের প্রথম তিন ধাপ বলে উপস্থাপন করলে ষড়যন্ত্রের প্রকৃতি ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হয়।

১৮৬৫ সালে কার্যকর ছিল ১৭৯২ সালের রাষ্ট্রপতি উত্তরাধিকার আইন। রাষ্ট্রপতি ও উপরাষ্ট্রপতি উভয়ের পদ শূন্য হলে সেনেটের অস্থায়ী সভাপতি রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করতেন; তাঁর পরে ছিল প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকারের স্থান। তখন সেনেটের অস্থায়ী সভাপতি ছিলেন লাফায়েত সাবিন ফস্টার। ফলে জনসন নিহত হলেও আইনগত বিকল্প সম্পূর্ণ শেষ হতো না। একাধিক মৃত্যু দায়িত্ব হস্তান্তরে জটিলতা তৈরি করতে পারত, কিন্তু রাষ্ট্রের নেতৃত্ব নেওয়ার কোনো বিধানই ছিল না—এমন ধারণা সঠিক নয়।

বুথ ফস্টার, কংগ্রেসের নেতৃত্ব এবং সব গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রীকে হত্যার জন্য পূর্ণাঙ্গ সমন্বিত ব্যবস্থা করেছিলেন—এমন প্রতিষ্ঠিত প্রমাণ নেই। সেনাবাহিনীর সদর দপ্তর, সরকারি অর্থব্যবস্থা বা যোগাযোগব্যবস্থা দখলের পরিকল্পনাও জানা যায় না। কোনো বিকল্প সরকার বসানোর প্রস্তুত রূপরেখা ছিল না। তাই ঘটনাটিকে সামরিক অভ্যুত্থানের মতো ভাবা বিভ্রান্তিকর। এটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের একযোগে হত্যা করে ব্যাপক অস্থিরতা সৃষ্টির চেষ্টা, যার পরবর্তী রাজনৈতিক ফল সম্পর্কে ষড়যন্ত্রকারীদের ধারণা ছিল অনিশ্চিত।

১৪ এপ্রিল রাতে হামলার দায়িত্ব ভাগ করা হয়। বুথ ফোর্ডস থিয়েটারে লিংকনকে আক্রমণ করবেন। লুইস পাওয়েল যাবেন সিওয়ার্ডের বাড়িতে। জর্জ অ্যাটজেরডটের লক্ষ্য ছিলেন কার্কউড হোটেলে অবস্থানরত জনসন। ডেভিড হেরোল্ড সহযোগিতা ও পালানোর কাজে যুক্ত ছিলেন। একই সন্ধ্যায় বিভিন্ন স্থানে আঘাত হানার উদ্দেশ্য ছিল একটি হামলার খবর ছড়িয়ে অন্য লক্ষ্যবস্তুর নিরাপত্তা শক্ত হওয়ার আগেই কাজ শেষ করা। তবে তাদের সমন্বয় ছিল সীমিত, আর প্রত্যেক সদস্য হত্যায় সমানভাবে প্রস্তুত ছিলেন না।

রাত প্রায় সোয়া দশটায় বুথ লিংকনকে গুলি করেন। গুরুতর আহত রাষ্ট্রপতিকে থিয়েটারের বিপরীত পাশের পিটারসেন হাউসে নিয়ে যাওয়া হয়। অন্যদিকে পাওয়েল সিওয়ার্ডের বাড়িতে ঢুকে তাঁকে ছুরিকাঘাত করেন। সাম্প্রতিক গাড়ি দুর্ঘটনার কারণে সিওয়ার্ড শয্যাশায়ী ছিলেন। তাঁকে রক্ষার চেষ্টায় পরিবারের সদস্য ও সেবারত ব্যক্তিরাও আহত হন। কিন্তু সিওয়ার্ড বেঁচে যান। রাষ্ট্রপতির ওপর গুলি এবং পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বাড়িতে হামলা প্রমাণ করে, পরিকল্পনাটি একাধিক কেন্দ্রের নেতৃত্বকে বাস্তবেই আঘাত করেছিল।

জনসনের ওপর হামলা ঘটেনি। অ্যাটজেরডট শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করার চেষ্টা থেকে সরে যান। তাঁর সিদ্ধান্ত পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর একটি ব্যর্থ করে। কারণ লিংকনের মৃত্যুর পর সরাসরি সাংবিধানিক উত্তরাধিকারী অক্ষত ছিলেন। পাওয়েলও ঘটনাস্থল ছেড়ে নিরাপদে সরে থাকার ব্যবস্থা ধরে রাখতে পারেননি; পরে তিনি গ্রেপ্তার হন। ঘটনাগুলো দেখায়, দলের ব্যক্তিগত সাহস, মানসিক প্রস্তুতি ও যোগাযোগের দুর্বলতা তাদের রাজনৈতিক উচ্চাকাঙ্ক্ষার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তবু রাজধানীতে তাৎক্ষণিক সংকট ছিল বাস্তব। আলাদা স্থানে দুই শীর্ষ নেতার ওপর হামলার খবর পাওয়ার পর আরও আক্রমণ আসছে কি না, তা বোঝা কঠিন হয়ে ওঠে। যুদ্ধমন্ত্রী এডউইন স্ট্যানটন সংবাদ সংগ্রহ, অনুসন্ধান এবং নিরাপত্তামূলক নির্দেশ সমন্বয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। সামরিক কর্মকর্তা, পুলিশ ও টেলিগ্রাফ যোগাযোগ সক্রিয় থাকে। সরকারের প্রধান ব্যক্তি মৃত্যুশয্যায় থাকলেও প্রশাসনের অন্যান্য অংশ কাজ চালিয়ে যায়। স্ট্যানটনের সক্রিয়তা তাঁকে রাষ্ট্রপতি বানায়নি; তিনি নিজের দপ্তর ও জরুরি পরিস্থিতির মধ্যে কাজ করছিলেন।

১৫ এপ্রিল সকাল সাতটা বাইশ মিনিটে লিংকন মারা যান। সেদিনই প্রধান বিচারপতি স্যালমন পি. চেজ কার্কউড হোটেলে জনসনকে রাষ্ট্রপতির শপথ পড়ান। মন্ত্রিসভার সদস্য ও অন্যান্য রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব সেখানে উপস্থিত ছিলেন। দ্রুত দায়িত্ব গ্রহণ সরকারের ধারাবাহিকতা প্রকাশ করে। বুথ যে নেতৃত্বশূন্যতা সৃষ্টি করতে চেয়েছিলেন, তা দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। শোক, অনিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার আতঙ্ক চলতে থাকলেও রাষ্ট্রপতির পদ সাংবিধানিকভাবে পূরণ হয় এবং নির্বাহী সরকারের কাজ অব্যাহত থাকে।

পররাষ্ট্র দপ্তরের কার্যক্রমও পুরোপুরি বন্ধ হয়নি। সিওয়ার্ড আহত থাকায় উইলিয়াম হান্টার অস্থায়ীভাবে দায়িত্ব পালন করেন। বিদেশে মার্কিন প্রতিনিধিদের কাছে রাষ্ট্রপতির মৃত্যু, জনসনের দায়িত্ব গ্রহণ এবং সিওয়ার্ডের অবস্থার খবর পাঠানো হয়। এই যোগাযোগের গুরুত্ব ছিল দ্বিমুখী: বিদেশি সরকারকে পরিস্থিতি জানানো এবং যুক্তরাষ্ট্রের সরকার কার্যকর রয়েছে তা স্পষ্ট করা। একটি দপ্তরের প্রধান অক্ষম হলেও অধস্তন কর্মকর্তা ও বিদ্যমান প্রশাসনিক কাঠামো দায়িত্ব ধরে রাখতে পারে—ঘটনাটি তার নির্দিষ্ট উদাহরণ।

তিনটি হত্যাই সফল হলে কী ঘটত, তার নিশ্চিত উত্তর দেওয়া যায় না। নেতৃত্ব হস্তান্তরে বিলম্ব, গুজব, নিরাপত্তা অভিযান এবং যুদ্ধসংক্রান্ত সিদ্ধান্তে বিভ্রান্তি বাড়তে পারত। কিন্তু ইউনিয়নের বাহিনী, নৌবাহিনী, অঙ্গরাজ্য সরকার, কংগ্রেস ও আদালত একসঙ্গে বিলুপ্ত হতো না। কনফেডারেসির হারানো জনবল, রসদ ও ভূখণ্ডও ফিরে আসত না। সুতরাং সম্ভাব্য গুরুতর রাজনৈতিক সংকটকে নিশ্চিত সামরিক ফল বদলের সঙ্গে এক করে দেখা যায় না। বুথের প্রত্যাশা ছিল, নেতৃত্বে আঘাত প্রতিষ্ঠিত সামরিক বাস্তবতাকেও উল্টে দেবে।

বুথের সহযোগীদের কনফেডারেট যোগাযোগ থাকলেও শীর্ষ কনফেডারেট সরকার এই তিন হত্যার সরাসরি নির্দেশ দিয়েছিল—এমন সিদ্ধান্ত নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত নয়। একইভাবে হামলার পর সরকারি কঠোরতা বা কোনো মন্ত্রীর দ্রুত সক্রিয়তাকে গোপন সম্পৃক্ততার প্রমাণ বলা যায় না। বিচারে অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা, পূর্ববর্তী অপহরণ পরিকল্পনা এবং পালাতে সাহায্য করার অভিযোগ আলাদাভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল। একটি বাস্তব ষড়যন্ত্র প্রমাণিত হওয়ার অর্থ তার সঙ্গে যুক্ত প্রতিটি বৃহত্তর অভিযোগ সত্য হয়ে যাওয়া নয়।

লিংকনের মৃত্যু অবশ্য দীর্ঘমেয়াদে গভীর রাজনৈতিক পরিবর্তন আনে। জনসনের অধীনে দক্ষিণের পুনর্গঠন, মুক্ত কৃষ্ণাঙ্গদের অধিকার ও কংগ্রেসের সঙ্গে ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তীব্র হয়। কিন্তু এসব পরিণতি বুথের নিয়ন্ত্রণে ছিল না, এবং লিংকন বেঁচে থাকলে সব সমস্যার সমাধান হতো—এমন নিশ্চয়তাও নেই। মূল প্রশ্নের উত্তর তাই স্পষ্ট: বুথের উদ্দেশ্য ছিল মার্কিন নেতৃত্বকে বিপর্যস্ত করে সরকারকে বিশৃঙ্খল করা; পুরো রাষ্ট্রকে স্থায়ীভাবে অচল করার সক্ষম পরিকল্পনা তাঁর ছিল না। হত্যাকাণ্ড জাতিকে বদলে দিয়েছিল, কিন্তু সরকারের ধারাবাহিকতা ভাঙতে পারেনি।


আপনার পছন্দ হতে পারে