বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার হত্যা: বারবার ব্যর্থতার পর যেভাবে সফল হয় ষড়যন্ত্র

সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য

জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডার হত্যা: বারবার ব্যর্থতার পর যেভাবে সফল হয় ষড়যন্ত্র
বারবার বেঁচে যাওয়া জারের জীবনের শেষ হলো দ্বিতীয় বিস্ফোরণে।

১৮৮১ সালের ১৩ মার্চ রাশিয়ার জার দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের গাড়ির কাছে একটি বোমা বিস্ফোরিত হয়। গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রক্ষী ও পথচারীরা হতাহত হন, কিন্তু জার তখনও বেঁচে ছিলেন। তিনি গাড়ি থেকে নামার পর আরেক হামলাকারীর বিস্ফোরণে মারাত্মক আহত হন। কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। যে শাসক আগেও গুলি, রেলপথের বিস্ফোরণ এবং নিজের প্রাসাদে হামলা থেকে বেঁচেছিলেন, শেষ পর্যন্ত তাঁকে হত্যা করে একটি সংগঠিত বিপ্লবী চক্র। তবে এই হত্যার ইতিহাস শুধু চূড়ান্ত হামলার বিবরণ নয়; এর পেছনে ছিল সংস্কার, দমন এবং রাজনৈতিক হতাশার দীর্ঘ সংঘাত।

ঘটনার তারিখ নিয়ে একটি বিষয় শুরুতেই পরিষ্কার করা জরুরি। তখন রাশিয়ায় জুলিয়ান পঞ্জিকা ব্যবহৃত হতো, যা গ্রেগরীয় পঞ্জিকার চেয়ে বারো দিন পিছিয়ে ছিল। ফলে রুশ সমকালীন নথিতে হত্যার তারিখ ১ মার্চ ১৮৮১, আর বর্তমানে প্রচলিত গ্রেগরীয় হিসাবে ১৩ মার্চ। আগের হত্যাচেষ্টাগুলোর ক্ষেত্রেও এই পার্থক্য দেখা যায়। একইভাবে মোট চেষ্টার সংখ্যাও বিবরণভেদে বদলে যায়, কারণ কেউ শুধু সংঘটিত হামলা গণনা করেন, আবার কেউ ব্যর্থ প্রস্তুতি ও পরিত্যক্ত পরিকল্পনাও যুক্ত করেন।

১৮৫৫ সালে সিংহাসনে বসা আলেকজান্ডার ছিলেন রাশিয়ার গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারক। ১৮৬১ সালে তিনি ভূমিদাসপ্রথা বিলোপ করেন; বিচারব্যবস্থা, সামরিক সংগঠন ও স্থানীয় প্রশাসনেও পরিবর্তন আসে। কিন্তু ভূমিদাসমুক্তি কৃষকদের সব দুর্দশা দূর করেনি। জমির পরিমাণ, অর্থপরিশোধের বোঝা এবং গ্রামীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে অসন্তোষ বজায় ছিল। একই সঙ্গে জারের সর্বময় রাজনৈতিক ক্ষমতা অক্ষুণ্ণ থাকে। সংস্কার প্রত্যাশা বাড়িয়েছিল, কিন্তু রাজনৈতিক অংশগ্রহণের সীমাবদ্ধতা সেই প্রত্যাশার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করে। শাসকের উদার ভাবমূর্তি ও দমনমূলক রাষ্ট্র পাশাপাশি টিকে ছিল।

প্রথম আলোচিত হত্যাচেষ্টাটি ঘটে ১৮৬৬ সালের এপ্রিলে। সেন্ট পিটার্সবার্গের সামার গার্ডেনের কাছে দিমিত্রি কারাকোজভ জারের দিকে গুলি করেন, কিন্তু লক্ষ্যভ্রষ্ট হন। তাঁকে ধরে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ঘটনাটি রাজদরবারে গভীর আতঙ্ক সৃষ্টি করে এবং সরকারের কঠোরতা বাড়ায়। কারাকোজভের হামলা পরবর্তী নারোদনায়া ভলিয়ার অভিযান ছিল না; সংগঠনটি তখন গড়েই ওঠেনি। একই শাসককে লক্ষ্য করা সব হামলাকে একটি অবিচ্ছিন্ন কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্র বলে ভাবলে পৃথক ব্যক্তি ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের পার্থক্য হারিয়ে যায়।

১৮৬৭ সালের জুনে প্যারিস সফরকালে আবার আক্রমণের মুখে পড়েন আলেকজান্ডার। পোলিশ নির্বাসিত আন্তোনি বেরেজোভস্কি তাঁকে গুলি করার চেষ্টা করেন। তখন জার ফরাসি সম্রাট তৃতীয় নেপোলিয়নের সঙ্গে গাড়িতে ছিলেন। হামলায় আলেকজান্ডার আহত হননি। এই ঘটনার পটভূমিতে ছিল পোল্যান্ডে রুশ শাসন এবং ১৮৬৩ সালের বিদ্রোহ দমনের স্মৃতি। ফলে এটি রাশিয়ার অভ্যন্তরীণ বিপ্লবী আন্দোলনের পাশাপাশি সাম্রাজ্যের অধীন জাতিগুলোর ক্ষোভেরও প্রকাশ। জারের বিরুদ্ধে বিরোধিতা একটিমাত্র মতাদর্শ থেকে আসছিল না।

১৮৭০-এর দশকে বহু তরুণ বিপ্লবী কৃষকদের মধ্যে গিয়ে সমাজ পরিবর্তনের প্রচার শুরু করেন। কিন্তু প্রত্যাশিত গণআন্দোলন গড়ে ওঠেনি; গ্রেপ্তার, বিচার ও নির্বাসন আন্দোলনকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। একাংশ তখন সিদ্ধান্ত নেয়, সরাসরি রাষ্ট্রের শীর্ষে আঘাত করা দরকার। ১৮৭৯ সালের এপ্রিলে আলেকজান্ডার সলোভিয়ভ সেন্ট পিটার্সবার্গে জারকে লক্ষ্য করে একাধিক গুলি করেন। জার সরে গিয়ে প্রাণে বাঁচেন। সলোভিয়ভের মৃত্যুদণ্ড হয়, কিন্তু তাঁর ব্যর্থতা রাজনৈতিক হত্যার ধারণাকে থামাতে পারেনি।

১৮৭৯ সালে ‘জেমলিয়া ই ভলিয়া’ বা ‘ভূমি ও স্বাধীনতা’ আন্দোলনের বিভাজন থেকে জন্ম নেয় ‘নারোদনায়া ভলিয়া’—‘জনগণের ইচ্ছা’। সংগঠনটির নেতৃত্ব মনে করত, স্বৈরতান্ত্রিক রাষ্ট্রের কেন্দ্রে আঘাত করলে রাজনৈতিক পরিবর্তনের দরজা খুলবে। তাদের দাবিতে প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা ও নাগরিক স্বাধীনতার বিষয়ও ছিল। কিন্তু নির্বাচিত কৌশল ছিল রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড। গোপন নির্বাহী নেতৃত্ব, ছদ্মপরিচয় এবং নিবেদিত সদস্যদের মাধ্যমে তারা কাজ করত। জনগণের নামে কথা বললেও তাদের হাতে ব্যাপক গণসমর্থনের নিশ্চয়তা ছিল না।

সেই বছরের নভেম্বরে রাজকীয় ট্রেনকে লক্ষ্য করে হামলার উদ্যোগ নেওয়া হয়। মস্কোর কাছে বিস্ফোরণে অন্য একটি রাজকীয় সফরসংশ্লিষ্ট ট্রেন ক্ষতিগ্রস্ত হলেও জার অক্ষত থাকেন। ট্রেনের চলাচল সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং পরিস্থিতির পরিবর্তন পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে। এই ঘটনা দেখায়, হামলাকারীরা আর শুধু ব্যক্তিগতভাবে অস্ত্র নিয়ে সুযোগের অপেক্ষায় ছিল না; তারা দীর্ঘ প্রস্তুতিনির্ভর অভিযান চালাচ্ছিল। কিন্তু এত প্রস্তুতির পরও জারের অবস্থান সম্পর্কে ভুল তথ্য পুরো পরিকল্পনাকে নিষ্ফল করে দিতে পারত।

১৮৮০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বিপদ পৌঁছে যায় শীতকালীন প্রাসাদের ভেতরে। স্তেপান খালতুরিন সেখানে কাঠমিস্ত্রির কাজ নিয়ে প্রবেশ করেছিলেন। তাঁর সঙ্গে যুক্ত বিস্ফোরণে প্রাসাদের রক্ষীরা নিহত ও আহত হন, কিন্তু খাবারের সময়সূচিতে বিলম্বের কারণে জার লক্ষ্যস্থলে ছিলেন না। ঘটনাটি ছিল রাজকীয় নিরাপত্তার জন্য মারাত্মক অপমান। সবচেয়ে সুরক্ষিত বলে বিবেচিত বাসস্থানেও শত্রু পৌঁছাতে পেরেছিল। হামলা ব্যর্থ হলেও নিহত সাধারণ সৈন্যদের জন্য তার পরিণতি চূড়ান্ত ছিল। রাজনৈতিক লক্ষ্যবস্তু বেঁচে যাওয়া অন্যদের ক্ষয়ক্ষতি কমায়নি।

ক্রমাগত হামলার প্রতিক্রিয়ায় মিখাইল লরিস-মেলিকভকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা ও প্রশাসনিক দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি দমন চালানোর পাশাপাশি সীমিত সংস্কারের মাধ্যমে শিক্ষিত সমাজের সমর্থন পাওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর প্রস্তাবে স্থানীয় প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিদের পরামর্শমূলক কাজে যুক্ত করার সুযোগ ছিল। একে প্রায়ই ‘লরিস-মেলিকভ সংবিধান’ বলা হয়, কিন্তু এটি পূর্ণ সংসদীয় গণতন্ত্র বা জারের ক্ষমতার অবসানের পরিকল্পনা ছিল না। আলেকজান্ডার প্রস্তাবটি এগিয়ে নেওয়ার সম্মতি দিয়েছিলেন। ফলে হত্যার সময় রাষ্ট্রের সামনে শুধু দমন নয়, সীমিত পরিবর্তনের সম্ভাবনাও ছিল।

চূড়ান্ত হত্যাচেষ্টার প্রস্তুতিতে আন্দ্রেই ঝেলিয়াবভ গুরুত্বপূর্ণ নেতৃত্ব দেন। কিন্তু হামলার অল্প আগে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়। এরপর সমন্বয়ের দায়িত্ব নেন সোফিয়া পেরোভস্কায়া, যিনি অভিজাত পরিবার ছেড়ে বিপ্লবী আন্দোলনে যোগ দিয়েছিলেন। তাঁর ভূমিকা ছিল সক্রিয় সংগঠকের; তাঁকে শুধু কোনো পুরুষ বিপ্লবীর সহযোগী হিসেবে দেখলে ইতিহাস অসম্পূর্ণ হয়। সংগঠনের প্রস্তুতি একজন নেতার গ্রেপ্তারে থামেনি। দীর্ঘদিনের নজরদারি ও পূর্বপ্রস্তুতির ওপর নির্ভর করে বাকি সদস্যরা পরিকল্পনা চালিয়ে যায়।

১৩ মার্চ জার সামরিক পরিদর্শন শেষে ফেরার পথে একাতেরিনা খালের ধারে পৌঁছান। নিকোলাই রিসাকভের ছোড়া প্রথম বোমায় তাঁর গাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কিন্তু তিনি মারাত্মক আঘাত পাননি। রিসাকভ ঘটনাস্থলেই ধরা পড়েন। জার গাড়ি থেকে নেমে পরিস্থিতি দেখতে এগিয়ে গেলে দ্বিতীয় হামলাকারী ইগনাতি গ্রিনেভিৎস্কি বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। প্রথম হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার পরের মুহূর্তেই জার প্রাণঘাতী আঘাত পান। গ্রিনেভিৎস্কিও মারাত্মক আহত হন এবং পরে মারা যান।

গুরুতর রক্তক্ষরণে আক্রান্ত আলেকজান্ডারকে শীতকালীন প্রাসাদে ফিরিয়ে নেওয়া হয়। সেদিন বিকেলেই তাঁর মৃত্যু ঘটে। ঘটনাস্থলে রক্ষী ও সাধারণ মানুষও হতাহত হন। বিভিন্ন স্মৃতিচারণে জারের শেষ কথাবার্তা ও আচরণ নিয়ে পার্থক্য আছে; তাই প্রতিটি নাটকীয় সংলাপকে নিশ্চিত সত্য বলা যায় না। তবে ঘটনাক্রম স্পষ্ট: প্রথম বিস্ফোরণ তাঁকে হত্যা করেনি, দ্বিতীয়টি করেছে। নিরাপত্তারক্ষীদের উপস্থিতি এবং আগের হামলা থেকে বেঁচে যাওয়ার অভিজ্ঞতা সেই শেষ বিপদ ঠেকাতে পারেনি।

হত্যার পর রিসাকভের দেওয়া তথ্যসহ বিভিন্ন সূত্র ধরে পুলিশ সংগঠনের সদস্যদের গ্রেপ্তার করে। পেরোভস্কায়া, ঝেলিয়াবভ, নিকোলাই কিবালচিচ, তিমোফেই মিখাইলভ ও রিসাকভকে বিচার শেষে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয়। ১৮৮১ সালের ১৫ এপ্রিল, রুশ পুরোনো পঞ্জিকায় ৩ এপ্রিল, তাঁদের ফাঁসি হয়। গ্রেপ্তার ও দমন সংগঠনের কেন্দ্রীয় কাঠামোকে গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। জারকে হত্যা করতে পারলেও হত্যাকারীরা নিজেদের প্রত্যাশিত রাজনৈতিক পরিবর্তন ঘটানোর মতো শক্তি ধরে রাখতে পারেনি।

দ্বিতীয় আলেকজান্ডারের পর তাঁর ছেলে তৃতীয় আলেকজান্ডার সিংহাসনে বসেন এবং স্বৈরতান্ত্রিক কর্তৃত্ব আরও দৃঢ় করার পথে যান। লরিস-মেলিকভের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যাত হয়; রাজনৈতিক নজরদারি ও দমন বাড়ে। ফলে হত্যার তাৎক্ষণিক ফল বিপ্লবীদের আশার বিপরীত হয়। ঘটনাটি পরবর্তী রুশ বিপ্লবী রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ স্মৃতি হয়ে থাকলেও ১৯১৭ সালের বিপ্লবকে এর সরাসরি ও অনিবার্য ফল বলা যায় না। এই ষড়যন্ত্র একজন শাসকের জীবন শেষ করেছিল, কিন্তু তাঁর শাসনব্যবস্থা শেষ করেনি—বরং প্রথম প্রতিক্রিয়ায় সেটিকে আরও কঠোর করে তুলেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে