বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ম্যাগেলান ও এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা: ১৫১৯–১৫২২ সালের ঐতিহাসিক অভিযান

সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান

ম্যাগেলান ও এলকানোর বিশ্বপরিক্রমা: ১৫১৯–১৫২২ সালের ঐতিহাসিক অভিযান
ম্যাগেলানের শুরু করা অভিযান এলকানোর নেতৃত্বে ভিক্টোরিয়ার প্রত্যাবর্তনে পূর্ণতা পায়।

পানামার পাহাড় থেকে বালবোয়া যে সমুদ্র দেখেছিলেন, সেটি পেরিয়ে এশিয়ায় পৌঁছানোর পথ তখনও ইউরোপীয়দের অজানা। আমেরিকার ভেতর দিয়ে জাহাজ চলার কোনো প্রণালি আছে কি না, থাকলে তার অবস্থান কোথায়—এসব প্রশ্নের উত্তর খুঁজছিল স্পেন। সেই অনুসন্ধানের নেতৃত্ব নেন ফার্দিনান্দ ম্যাগেলান। তাঁর উদ্দেশ্য শুরুতে পৃথিবী ঘুরে ফিরে আসার কৃতিত্ব অর্জন ছিল না; প্রধান লক্ষ্য ছিল পশ্চিমমুখী পথে মসলার দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো। কিন্তু অভিযানের পরিণতিতে সম্পন্ন হয় ইতিহাসের প্রথম নথিভুক্ত সমুদ্রপথে বিশ্বপরিক্রমা।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার: ম্যাগেলান নিজে সম্পূর্ণ পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেননি। তিনি অভিযান শুরু করেন এবং প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রমে নেতৃত্ব দেন, কিন্তু ফিলিপাইনে নিহত হন। বেঁচে থাকা অভিযাত্রীদের একটি অংশ হুয়ান সেবাস্তিয়ান এলকানোর নেতৃত্বে পশ্চিমদিকে এগিয়ে স্পেনে ফেরে। তাই ঘটনাটিকে ম্যাগেলান–এলকানো অভিযান বলা অধিক যথার্থ। এটি ছিল বহু দেশের নাবিক, পথপ্রদর্শক ও স্থানীয় মানুষের সহযোগিতা এবং সংঘর্ষে গড়ে ওঠা ইতিহাস।

জন্মসূত্রে পর্তুগিজ ম্যাগেলান আগে ভারত মহাসাগরীয় অভিযানে কাজ করেছিলেন। ফলে পূর্বের বাণিজ্য ও পর্তুগিজ সম্প্রসারণ সম্পর্কে তাঁর অভিজ্ঞতা ছিল। পর্তুগালের রাজদরবারে নিজের পরিকল্পনার সমর্থন না পেয়ে তিনি স্পেনের রাজা প্রথম কার্লোসের কাছে যান। তাঁর যুক্তি ছিল, পশ্চিমদিকে গিয়ে মলুক্কাস বা মসলার দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো সম্ভব এবং দ্বীপগুলো স্পেনের দাবিক্ষেত্রে পড়তে পারে। টরডেসিলাসের বিভাজন পৃথিবীর অপর পাশে কোথায় পড়বে, সেই অনিশ্চয়তাও পরিকল্পনাকে রাজনৈতিক গুরুত্ব দেয়।

১৫১৯ সালের আগস্টে সেভিয়া থেকে বহর যাত্রা শুরু করে; ২০ সেপ্টেম্বর সানলুকার দে বারামেদা থেকে সমুদ্রে বেরিয়ে পড়ে। পাঁচটি জাহাজের নাম ছিল ত্রিনিদাদ, সান আন্তোনিও, কনসেপসিওন, ভিক্টোরিয়া ও সান্তিয়াগো। বহরে প্রায় আড়াইশ লোক ছিলেন, যদিও গণনার পদ্ধতি অনুযায়ী সংখ্যা ভিন্ন পাওয়া যায়। খাদ্য, পানি, অস্ত্র ও বিনিময়যোগ্য পণ্যের সঙ্গে বহন করা হয়েছিল দীর্ঘ অজানা যাত্রার প্রত্যাশা এবং নেতৃত্ব নিয়ে অবিশ্বাসও।

আটলান্টিক পেরিয়ে বহর ব্রাজিলের উপকূলে পৌঁছায়, তারপর দক্ষিণমুখে এগোয়। নদীর মোহনা কিংবা উপসাগরকে সম্ভাব্য প্রণালি মনে করে পরীক্ষা করতে হতো। রিও দে লা প্লাতার বিশাল মোহনাও প্রত্যাশিত পথ দেয়নি। যত দক্ষিণে যাওয়া হচ্ছিল, তত ঠান্ডা ও আবহাওয়ার সমস্যা বাড়ছিল। পশ্চিমের সমুদ্রে যাওয়ার পথ খোঁজা ছিল ধীর উপকূল অনুসন্ধান, কোনো পরিচিত মানচিত্র অনুসরণ করে এগিয়ে যাওয়া নয়।

১৫২০ সালে প্যাটাগোনিয়ার পুয়ের্তো সান হুলিয়ানে শীত কাটানোর সময় নেতৃত্বের সংকট বিস্ফোরিত হয়। কয়েকজন অধিনায়ক ম্যাগেলানের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ করেন। তিনি কঠোরভাবে তা দমন করেন; মৃত্যুদণ্ড ও নির্বাসনের শাস্তি দেওয়া হয়। অভিযানের ঐক্য ফিরলেও পারস্পরিক আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। একই সময়ে অনুসন্ধানে বেরিয়ে সান্তিয়াগো জাহাজ ধ্বংস হয়। ফলে গুরুত্বপূর্ণ প্রণালি খুঁজে পাওয়ার আগেই বহরের শক্তি কমে যায়।

অবশেষে ১৫২০ সালের অক্টোবরে দক্ষিণ আমেরিকার দক্ষিণাঞ্চলে একটি প্রবেশপথ পাওয়া যায়। সংকীর্ণ জলপথ, অসংখ্য বাঁক এবং পাহাড়ঘেরা শাখাপথের মধ্যে দিয়ে বহর এগোয়। এটিই পরে ম্যাগেলান প্রণালি নামে পরিচিত হয়। অনুসন্ধানের সময় সান আন্তোনিও বহর ছেড়ে স্পেনে ফিরে যায়, সঙ্গে নিয়ে যায় উল্লেখযোগ্য রসদ। অবশিষ্ট তিনটি জাহাজ নভেম্বরের শেষে প্রণালি পেরিয়ে খোলা মহাসাগরে প্রবেশ করে।

প্রণালির দুর্যোগপূর্ণ পরিবেশের পর তুলনামূলক শান্ত জল দেখে ম্যাগেলান সমুদ্রটির সঙ্গে ‘প্রশান্ত’ নামটি যুক্ত করেন। কিন্তু শান্ত জল নিরাপদ বা সংক্ষিপ্ত যাত্রার নিশ্চয়তা ছিল না। মহাসাগরটি তাঁদের অনুমানের চেয়ে অনেক বিস্তৃত। মাসের পর মাস উল্লেখযোগ্য রসদ সংগ্রহের সুযোগ ছাড়া চলতে হয়। পৃথিবীর ভৌগোলিক আকার সম্পর্কে ভুল প্রত্যাশা এবার সরাসরি খাদ্য ও পানির সংকটে পরিণত হয়।

অভিযাত্রী আন্তোনিও পিগাফেত্তার বিবরণে এই দুর্ভোগের ভয়াবহ ছবি পাওয়া যায়। খাবার পচে যায়, পরিষ্কার পানির অভাব হয় এবং নাবিকেরা চরম অপুষ্টিতে ভোগেন। স্কার্ভিতে মাড়ি ফুলে যাওয়া ও দুর্বলতার কারণে অনেকের পক্ষে খাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। প্রশান্ত মহাসাগর অতিক্রম ছিল অভিযানের সবচেয়ে কঠিন পরীক্ষাগুলোর একটি। ১৫২১ সালের মার্চে গুয়ামে পৌঁছে বহর রসদ সংগ্রহের সুযোগ পায়, যদিও স্থানীয় মানুষের সঙ্গে সহিংস সংঘর্ষও ঘটে।

এরপর বহর বর্তমান ফিলিপাইনের দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছায়। ম্যাগেলান স্থানীয় শাসকদের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন, খ্রিস্টধর্ম প্রচার এবং স্প্যানিশ আনুগত্য আদায়ের চেষ্টা করেন। সেবুর শাসক হুমাবনের সঙ্গে মিত্রতা তাঁকে আঞ্চলিক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে ফেলে। ২৭ এপ্রিল ১৫২১ সালে মাকতানে লাপুলাপুর নেতৃত্বাধীন প্রতিরোধের বিরুদ্ধে আক্রমণ চালাতে গিয়ে ম্যাগেলান নিহত হন। স্থানীয় রাজনীতিতে সামরিক হস্তক্ষেপ তাঁর সমুদ্রযাত্রার সমাপ্তি ঘটায়।

ম্যাগেলানের মৃত্যুর পর নেতৃত্ব বদলাতে থাকে এবং আরও প্রাণহানি ঘটে। তিনটি জাহাজ চালানোর মতো লোক না থাকায় কনসেপসিওন পুড়িয়ে ফেলা হয়। অবশিষ্ট ত্রিনিদাদ ও ভিক্টোরিয়া নানা দ্বীপ ঘুরে ১৫২১ সালের নভেম্বরে মলুক্কাসের তিদোরে পৌঁছায়। সেখানে স্থানীয় শাসকের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে লবঙ্গ সংগ্রহ করা হয়। অভিযানের মূল বাণিজ্যিক লক্ষ্য অর্জিত হলেও স্পেনে ফেরার পথ এখনো বিপজ্জনকভাবে দীর্ঘ।

ত্রিনিদাদ মেরামতের প্রয়োজন হওয়ায় দুই জাহাজ আলাদা সিদ্ধান্ত নেয়। পরে ত্রিনিদাদ পূর্বদিকে প্রশান্ত মহাসাগর পেরিয়ে ফেরার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়; তার লোকদের অনেকে পর্তুগিজদের হাতে বন্দি হন। অন্যদিকে এলকানোর নেতৃত্বে ভিক্টোরিয়া পশ্চিমমুখী পথে ভারত মহাসাগর অতিক্রমের সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্তই অভিযানের একটি অংশকে পূর্ণ বিশ্বপরিক্রমায় নিয়ে যায়। পর্তুগিজ নিয়ন্ত্রিত বন্দর এড়াতে হওয়ায় রসদ সংগ্রহের সুযোগও সীমিত ছিল।

১৫২২ সালে ভিক্টোরিয়া ভারত মহাসাগর পেরিয়ে উত্তমাশা অন্তরীপ ঘুরে আটলান্টিকে প্রবেশ করে। অনাহার, অসুস্থতা ও জাহাজের দুরবস্থা অব্যাহত থাকে। কেপ ভার্দেতে খাদ্য সংগ্রহ করতে গিয়ে কিছু নাবিক আটক হন; বাকিদের নিয়ে এলকানো পালিয়ে যান। অবশেষে ৬ সেপ্টেম্বর ১৫২২ সালে ভিক্টোরিয়া সানলুকারে পৌঁছায়, সঙ্গে মূল অভিযানের মাত্র আঠারোজন জীবিত প্রত্যাবর্তনকারী। দুই দিন পরে জাহাজটি সেভিয়ায় পৌঁছায়। অন্য কিছু অভিযাত্রী পরবর্তী সময়ে পৃথকভাবে দেশে ফেরেন।

এই যাত্রা পৃথিবী গোল—এ ধারণা প্রথম সৃষ্টি করেনি; শিক্ষিত সমাজে তা বহু আগে থেকেই পরিচিত ছিল। এর অর্জন ছিল পরস্পর-সংযুক্ত মহাসাগর ধরে জাহাজে পৃথিবী প্রদক্ষিণ বাস্তবে সম্পন্ন করা এবং প্রশান্ত মহাসাগরের বিপুল বিস্তার উপলব্ধি করা। পশ্চিমদিকে ঘুরে আসায় অভিযাত্রীদের দিনগণনা স্থানীয় হিসাবের চেয়ে এক দিন পিছিয়ে পড়েছিল। ঘটনাটি পৃথিবীকে ঘিরে চলাচলের সঙ্গে সময়গণনার সম্পর্কও স্পষ্ট করে।

তবু এই পথ সঙ্গে সঙ্গে সুবিধাজনক নিয়মিত বাণিজ্যপথ হয়ে ওঠেনি। দূরত্ব, প্রাণহানি ও রাজনৈতিক ঝুঁকি ছিল বিপুল। ভিক্টোরিয়ার লবঙ্গ অর্থনৈতিক মূল্য বহন করলেও মানুষের ক্ষতি তার চেয়ে অনেক বড়। ম্যাগেলানের নেতৃত্বে শুরু এবং এলকানোর প্রত্যাবর্তনে সম্পন্ন অভিযান পৃথিবীর সমুদ্রগুলোর সম্পর্ককে নতুনভাবে দৃশ্যমান করেছিল। একই সঙ্গে স্পেন ও পর্তুগালের প্রতিযোগিতা এখন এক মহাসাগরের সীমা ছাড়িয়ে পুরো পৃথিবীকে ঘিরে বিস্তৃত হলো।