আব্রাহাম লিংকন হত্যার ষড়যন্ত্র: জন উইলকস বুথের পরিকল্পনা কতটা বিস্তৃত ছিল?
সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
লক্ষ্য ছিলেন তিন নেতা, একটি হত্যায় বদলে যায় আমেরিকার ইতিহাস।
১৮৬৫ সালের ১৪ এপ্রিল রাতে ওয়াশিংটনের ফোর্ডস থিয়েটারে আব্রাহাম লিংকনকে গুলি করেন অভিনেতা জন উইলকস বুথ। পরদিন সকালে রাষ্ট্রপতির মৃত্যু হয়। কিন্তু ঘটনাটিকে একজন উগ্র মানুষের একক হামলা হিসেবে দেখলে ষড়যন্ত্রের বড় অংশ আড়ালে থেকে যায়। একই রাতে উপরাষ্ট্রপতি অ্যান্ড্রু জনসন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী উইলিয়াম সিওয়ার্ডকেও হত্যার পরিকল্পনা ছিল। উদ্দেশ্য ছিল গৃহযুদ্ধে পরাজয়ের মুখে থাকা কনফেডারেসির পক্ষে পরিস্থিতি বদলাতে কেন্দ্রীয় সরকারের নেতৃত্বে আকস্মিক বিপর্যয় সৃষ্টি করা। পরিকল্পনাটি বিস্তৃত ছিল, কিন্তু তার সব অংশ সমানভাবে প্রস্তুত বা সফল হয়নি।
বুথ ছিলেন পরিচিত নাট্যপরিবারের সন্তান এবং জনপ্রিয় অভিনেতা। মেরিল্যান্ডে জন্ম নেওয়া এই ব্যক্তি দক্ষিণের বিচ্ছিন্নতাবাদী কনফেডারেসির প্রবল সমর্থক ছিলেন। তিনি দাসপ্রথা ও শ্বেতাঙ্গ আধিপত্যের পক্ষে অবস্থান নেন এবং লিংকনকে দক্ষিণের পরাজয়ের প্রধান প্রতীক মনে করতেন। তাঁর রাজনৈতিক ক্ষোভকে শুধু ব্যক্তিগত বিদ্বেষ হিসেবে ব্যাখ্যা করলে উদ্দেশ্যের গভীরতা বোঝা যায় না। মুক্ত হওয়া কৃষ্ণাঙ্গ মানুষের ভবিষ্যৎ অধিকারও তাঁর বিরোধিতার কেন্দ্রে ছিল। মঞ্চে পরিচিতি তাঁকে অর্থ, চলাচলের সুযোগ ও মানুষের আস্থা অর্জনে সাহায্য করেছিল।
তবে বুথের প্রথম পরিকল্পনা হত্যা ছিল না। ১৮৬৪ সালের দিকে তিনি লিংকনকে অপহরণ করে কনফেডারেট নিয়ন্ত্রিত অঞ্চলে নিয়ে যাওয়ার ছক তৈরি করেন। রাষ্ট্রপতিকে বন্দী রেখে ইউনিয়নের হাতে আটক কনফেডারেট সৈন্যদের মুক্তির জন্য চাপ দেওয়া হবে—এমন চিন্তা ছিল। বন্দিবিনিময়ের জটিলতা এবং দক্ষিণের জনবলসংকট এই পরিকল্পনার পটভূমি। অপহরণের উদ্দেশ্য ছিল লিংকনকে দরকষাকষির হাতিয়ার বানানো। পরবর্তী হত্যাচেষ্টা সেই মূল পরিকল্পনার ধারাবাহিকতা হলেও লক্ষ্য ও অংশগ্রহণকারীদের ভূমিকা বদলে গিয়েছিল।
এই প্রস্তুতিতে জন সুরাট ছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সহযোগী। তিনি কনফেডারেট বার্তাবাহক হিসেবে বিভিন্ন যোগাযোগ ও যাতায়াতের পথ চিনতেন। তাঁর মাধ্যমে বুথের সঙ্গে আরও কয়েকজনের পরিচয় হয়। জর্জ অ্যাটজেরডটের নৌপথ সম্পর্কে অভিজ্ঞতা, ডেভিড হেরোল্ডের স্থানীয় পথঘাটের জ্ঞান এবং সাবেক কনফেডারেট সৈন্য লুইস পাওয়েলের শারীরিক সক্ষমতা কাজে লাগানোর কথা ছিল। বুথের পরিচিত স্যামুয়েল আর্নল্ড ও মাইকেল ও’লাফলিনও অপহরণচক্রে যুক্ত হন। তাঁরা কোনো বিশাল নিয়মতান্ত্রিক গোয়েন্দা বাহিনী ছিলেন না; ব্যক্তিগত যোগাযোগই দলটির প্রধান ভিত্তি।
জন সুরাটের মা মেরি সুরাটের ওয়াশিংটনের বোর্ডিং হাউস ছিল ষড়যন্ত্রকারীদের মিলিত হওয়ার স্থান। মেরিল্যান্ডে তাঁর মালিকানাধীন পান্থশালাটিও যোগাযোগ ও সরঞ্জাম রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়। ১৮৬৫ সালের ১৭ মার্চ লিংকনকে পথে আটক করার একটি চেষ্টা ব্যর্থ হয়, কারণ তিনি প্রত্যাশিত পথে যাননি। এই ব্যর্থতার পর দলের সক্রিয়তা বদলে যায়। কয়েকজন আগের পরিকল্পনা থেকে দূরে সরে যান। অতএব অপহরণের আলোচনায় অংশ নেওয়া এবং এপ্রিলের হত্যার সিদ্ধান্ত জানা—দুটি আলাদা ঐতিহাসিক প্রশ্ন।
এপ্রিলের শুরুতে ঘটনাপ্রবাহ দ্রুত বদলায়। ৯ এপ্রিল রবার্ট ই. লি অ্যাপোম্যাটক্সে তাঁর বাহিনী নিয়ে আত্মসমর্পণ করেন। সব কনফেডারেট বাহিনী তখনও অস্ত্র নামায়নি, কিন্তু দক্ষিণের পরাজয় স্পষ্ট হয়ে উঠেছিল। ১১ এপ্রিল লিংকন সীমিত পরিসরে কৃষ্ণাঙ্গ পুরুষদের ভোটাধিকারের পক্ষে বক্তব্য দেন। বুথ সেখানে উপস্থিত ছিলেন বলে প্রত্যক্ষদর্শীর বিবরণ রয়েছে। সেই বক্তব্য তাঁর ক্ষোভ বাড়ায়। ঠিক কোন মুহূর্তে অপহরণ থেকে হত্যায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত বদলেছিল তা পুরোপুরি নিশ্চিত নয়, তবে এই শেষ দিনগুলোতে পরিবর্তনটি সম্পন্ন হয়।
১৪ এপ্রিল বুথ জানতে পারেন, লিংকন রাতে ফোর্ডস থিয়েটারে যাবেন। দ্রুত পরিকল্পনা নির্দিষ্ট করা হয়: বুথ রাষ্ট্রপতিকে, পাওয়েল সিওয়ার্ডকে এবং অ্যাটজেরডট জনসনকে আক্রমণ করবেন। হেরোল্ডের ভূমিকা ছিল সহযোগিতা ও পালানোর ব্যবস্থায় সহায়তা করা। তিনজনকে সরিয়ে সরকারের শীর্ষ নেতৃত্বে আতঙ্ক ও বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করাই ছিল লক্ষ্য। তবে সিওয়ার্ড উপরাষ্ট্রপতির পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে রাষ্ট্রপতি হওয়ার ব্যক্তি ছিলেন না। এটি উত্তরাধিকারব্যবস্থার প্রতিটি ধাপ নিখুঁতভাবে ধ্বংস করার পূর্ণাঙ্গ সাংবিধানিক পরিকল্পনা ছিল না।
রাত প্রায় সোয়া দশটায় বুথ থিয়েটারের রাষ্ট্রপতির বক্সে ঢুকে লিংকনকে গুলি করেন। বাধা দিতে গেলে মেজর হেনরি র্যাথবোনও আহত হন। বুথ মঞ্চের দিকে নেমে থিয়েটার ছেড়ে পালিয়ে যান। গুরুতর আহত লিংকনকে রাস্তার বিপরীত পাশের পিটারসেন হাউসে নেওয়া হয়। ১৫ এপ্রিল সকাল সাতটা বাইশ মিনিটে তিনি মারা যান। বুথের নাট্যমঞ্চ সম্পর্কে পরিচিতি তাঁর চলাচলে সুবিধা দিয়েছিল; নিরাপত্তার ঘাটতি সেই সুযোগকে আরও বড় করে। রাষ্ট্রপতির উপস্থিতি জনসমক্ষে জানা থাকাও পরিকল্পনায় সাহায্য করেছিল।
অন্যদিকে পাওয়েল সিওয়ার্ডের বাড়িতে পৌঁছান। সিওয়ার্ড তখন ঘোড়ার গাড়ির দুর্ঘটনায় আহত হয়ে শয্যাশায়ী ছিলেন। ওষুধ পৌঁছে দেওয়ার অজুহাতে প্রবেশের চেষ্টা করে পাওয়েল বাড়ির লোকজনের বাধা অতিক্রম করেন এবং সিওয়ার্ডকে ছুরিকাঘাত করেন। তাঁকে রক্ষা করতে গিয়ে আরও কয়েকজন আহত হন। গুরুতর আঘাত পেলেও সিওয়ার্ড বেঁচে যান। লিংকনের ওপর হামলার বাইরে এটি ছিল একই ষড়যন্ত্রের বাস্তবে কার্যকর হওয়া দ্বিতীয় আক্রমণ। ফলে একাধিক লক্ষ্যবস্তুর পরিকল্পনা নিছক পরবর্তী গুজব ছিল না।
জনসনের ক্ষেত্রে পরিকল্পনা কার্যকর হয়নি। তাঁকে হত্যার দায়িত্ব পাওয়া অ্যাটজেরডট শেষ পর্যন্ত আক্রমণ করেননি। তাঁর এই পিছু হটা সমন্বিত হত্যাচেষ্টার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ভেঙে দেয়। হেরোল্ডও সিওয়ার্ডের বাড়ির ঘটনাস্থল ছেড়ে পরে বুথের সঙ্গে মিলিত হন। পাওয়েল একা পড়ে যান এবং কয়েক দিন পর মেরি সুরাটের বাড়িতে এসে ধরা পড়েন। এখানে দলটির সীমাবদ্ধতা স্পষ্ট: অভিন্ন রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকলেও সদস্যদের দৃঢ়তা, প্রস্তুতি ও আচরণ এক ছিল না। পরিকল্পনা কার্যকর করার সময় সেই দুর্বলতাগুলো প্রকাশ পায়।
বুথ ও হেরোল্ড মেরিল্যান্ড হয়ে ভার্জিনিয়ার দিকে পালান। পথে চিকিৎসক স্যামুয়েল মাড বুথের আহত পায়ের চিকিৎসা করেন। কিন্তু চিকিৎসা দেওয়া, আগে থেকে পরিচিত থাকা এবং হত্যার উদ্দেশ্য সম্পর্কে অবহিত থাকা—এসবের প্রমাণ আলাদাভাবে বিচার করতে হয়। অনুসন্ধানকারীরা যাতায়াতের পথ, পরিচিতজন এবং ব্যবহৃত আশ্রয় অনুসরণ করেন। ২৬ এপ্রিল ভার্জিনিয়ার গ্যারেট খামারের একটি গোলাঘরে দুজনকে ঘিরে ফেলা হয়। হেরোল্ড আত্মসমর্পণ করেন; বুথ গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান। প্রধান পরিকল্পনাকারীর মৃত্যু অনেক প্রশ্ন সরাসরি জিজ্ঞাসা করার সুযোগ শেষ করে দেয়।
মে ও জুনে সামরিক কমিশনের সামনে আটজনের বিচার হয়। ৭ জুলাই মেরি সুরাট, লুইস পাওয়েল, ডেভিড হেরোল্ড ও জর্জ অ্যাটজেরডটকে ফাঁসি দেওয়া হয়। আর্নল্ড, ও’লাফলিন ও মাড যাবজ্জীবন কারাদণ্ড পান; থিয়েটারকর্মী এডম্যান স্প্যাংলার পান ছয় বছরের কারাদণ্ড। বিচারপ্রক্রিয়ায় হত্যার পরিকল্পনা, পূর্ববর্তী অপহরণচক্র এবং পালাতে সাহায্য করার অভিযোগ এক বৃহত্তর ষড়যন্ত্রের মধ্যে বিবেচিত হয়েছিল। কিন্তু আদালতে একই মামলার আসামি হওয়া মানেই প্রত্যেকের জ্ঞান ও ভূমিকা সমান ছিল না।
মেরি সুরাটকে ঘিরে বিতর্ক বিশেষভাবে স্থায়ী হয়েছে। তাঁর বাড়িতে বৈঠক হওয়া এবং পান্থশালার ভাড়াটে জন লয়েডের সাক্ষ্য অভিযোগের কেন্দ্রে ছিল। লয়েড দাবি করেন, হত্যার দিন তিনি অস্ত্র প্রস্তুত রাখতে বলেছিলেন। কিন্তু হত্যার নির্দিষ্ট পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি কতটা জানতেন এবং মৃত্যুদণ্ড যথাযথ ছিল কি না, তা নিয়ে ইতিহাসবিদদের মতভেদ রয়েছে। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় সরকারের হাতে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত প্রথম নারী হন। স্প্যাংলারের ক্ষেত্রে বুথের উদ্দেশ্য জানা ছিল কি না, সেটিও গুরুতর সংশয়ের বিষয়।
জন সুরাটের ঘটনা আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য দেখায়। তিনি অপহরণচক্রের কেন্দ্রীয় সদস্য হলেও হত্যার সময় ওয়াশিংটনে ছিলেন না। বিদেশে পালানোর পর ধরা পড়েন এবং ১৮৬৭ সালে বেসামরিক আদালতে তাঁর বিচার হয়। বিচারকমণ্ডলী একমত হতে না পারায় রায় হয়নি; তাঁকে হত্যার দায়ে দোষী সাব্যস্ত করা যায়নি। পরে তিনি অপহরণ পরিকল্পনায় অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। তাঁর কনফেডারেট যোগাযোগ বৃহত্তর অনুসন্ধানের কারণ হলেও তা নিজে থেকেই রাষ্ট্রপতি হত্যায় কেন্দ্রীয় নির্দেশের প্রমাণ হয়ে ওঠে না।
কনফেডারেট প্রেসিডেন্ট জেফারসন ডেভিস বা শীর্ষ নেতৃত্ব সরাসরি হত্যার নির্দেশ দিয়েছিলেন—এই অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু তা নিশ্চিতভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়নি। বুথের যোগাযোগ ছিল বলে সব সিদ্ধান্ত বাইরের কোনো নিয়ন্ত্রকের হাতে ছিল, এমন অনুমানও গ্রহণযোগ্য নয়। আবার অ্যান্ড্রু জনসন বা যুদ্ধমন্ত্রী স্ট্যানটনকে গোপন মূল পরিকল্পনাকারী বলার নির্ভরযোগ্য প্রমাণ নেই। প্রমাণিত চিত্র হলো: অপহরণের জন্য গড়া একটি বাস্তব নেটওয়ার্কের অংশকে বুথ বহু নেতার বিরুদ্ধে হত্যাচেষ্টায় ব্যবহার করেছিলেন। লিংকনকে হত্যা করা সম্ভব হলেও সরকার অচল করা বা কনফেডারেসিকে উদ্ধার করার লক্ষ্য পূরণ হয়নি।
নেপোলিয়নকে হত্যার ষড়যন্ত্র: ‘ইনফার্নাল মেশিন’ বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা
ফরাসি বিপ্লবের আড়ালের ষড়যন্ত্র: রাজতন্ত্র, বিপ্লবী ও বিদেশি শক্তির গোপন খেলা
আমেরিকান বিপ্লবের গুপ্তচর জগৎ: ওয়াশিংটনের গোপন কালপার স্পাই রিং
মীর কাসিমের পতন: ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির রাজনৈতিক কৌশল ও বাংলার ক্ষমতার লড়াই
পলাশীর যুদ্ধ কি আসলে যুদ্ধ ছিল, নাকি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তর?
মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা