বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা

সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য

মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা
গোপন চুক্তিতে বদলে গিয়েছিল বাংলার ভবিষ্যৎ

১৭৫৭ সালের জুন মাসে পলাশীর আমবাগানে যে যুদ্ধ হয়েছিল, তার আগে মুর্শিদাবাদের অন্দরমহল, ধনী ব্যাংকারদের বৈঠকখানা এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দপ্তরে আরেকটি অদৃশ্য যুদ্ধ চলছিল। সেই যুদ্ধে কামানের বদলে ব্যবহৃত হয়েছিল গোপন চিঠি, শপথ, অর্থের প্রতিশ্রুতি, দ্বৈত চুক্তিপত্র এবং ক্ষমতা দখলের পরিকল্পনা। মীর জাফর নবাব হওয়ার নিশ্চয়তা চাইছিলেন, জগৎশেঠ পরিবার চাইছিল নিরাপদ ও তাদের ওপর নির্ভরশীল শাসক, আর ইংরেজ কোম্পানি চাইছিল ক্ষতিপূরণ, বাণিজ্যিক সুবিধা এবং বাংলার রাজনীতির ওপর স্থায়ী প্রভাব। এই তিন পক্ষের স্বার্থ এক বিন্দুতে মিলিত হওয়ার পরই সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র একটি কার্যকর অভ্যুত্থান পরিকল্পনায় রূপ নেয়।

পলাশীর আগে বাংলা ছিল মুঘল সাম্রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত হলেও কার্যত স্বায়ত্তশাসিত ও অত্যন্ত সমৃদ্ধ একটি সুবা। বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজস্ব, কৃষি, বস্ত্র, রেশম, লবণ, আফিম এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্য নবাবি সরকারকে বিপুল অর্থনৈতিক শক্তি দিয়েছিল। মুর্শিদাবাদের কোষাগার ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোর গুরুত্ব এত বেশি ছিল যে কোনো নবাব শুধু সেনাবাহিনী দিয়ে রাজ্য শাসন করতে পারতেন না। তাঁকে রাজস্ব কর্মকর্তা, জমিদার, ব্যাংকার, সেনাপতি, বণিক এবং দরবারের প্রভাবশালী পরিবারগুলোর সহযোগিতাও ধরে রাখতে হতো। সিরাজউদ্দৌলা এই জটিল ক্ষমতার ভারসাম্যের মাঝখানেই সিংহাসনে বসেছিলেন।

১৭৫৬ সালের এপ্রিল মাসে আলীবর্দী খানের মৃত্যুর পর তাঁর মনোনীত উত্তরাধিকারী সিরাজউদ্দৌলা বাংলার নবাব হন। উত্তরাধিকার আগে থেকে নির্ধারিত থাকলেও দরবারের সবাই তা মেনে নেয়নি। আলীবর্দীর জ্যেষ্ঠ কন্যা ঘসেটি বেগমের বিপুল সম্পদ ও রাজনৈতিক যোগাযোগ ছিল। পূর্ণিয়ার শাসক শওকত জংও ক্ষমতার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে উঠেছিলেন। রাজবল্লভের পরিবার, পুরোনো আমলা এবং সেনাবাহিনীর কিছু উচ্চপদস্থ ব্যক্তিও নতুন নবাবের নীতিতে নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন। সিরাজ ক্ষমতা সুসংহত করতে দ্রুত পদক্ষেপ নিলে বিরোধী গোষ্ঠীগুলো আরও আতঙ্কিত হয়।

মীর জাফর আলী খান ছিলেন নবাবি সেনাবাহিনীর অভিজ্ঞ সেনাপতি এবং আলীবর্দী খানের পরিবারের সঙ্গে বৈবাহিক সম্পর্কে যুক্ত। আলীবর্দীর আমলে তিনি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক মর্যাদা ভোগ করেছিলেন। সিরাজ ক্ষমতায় এসে তাঁর ওপর পুরোপুরি আস্থা রাখতে পারেননি এবং সেনাবাহিনীতে তাঁর অবস্থান দুর্বল হয়ে পড়ে। মোহনলাল ও মীর মদনের মতো বিশ্বস্ত কর্মকর্তাদের উত্থানও মীর জাফরের প্রভাব কমিয়ে দেয়। হারানো মর্যাদা, ব্যক্তিগত অপমান, ভবিষ্যৎ নিরাপত্তার আশঙ্কা এবং নবাব হওয়ার উচ্চাকাঙ্ক্ষা তাঁকে সিরাজবিরোধী গোষ্ঠীর কেন্দ্রীয় ব্যক্তিতে পরিণত করে।

তবে মীর জাফর শুধু ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশে হঠাৎ বিশ্বাসঘাতকতার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন—এমন সরল ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়। তিনি নিজে শক্তিশালী হলেও এককভাবে সিরাজকে অপসারণ করার মতো নিশ্চিত অবস্থায় ছিলেন না। তাঁর প্রয়োজন ছিল সেনাবাহিনীর আরও কয়েকজন অধিনায়কের নীরব সমর্থন, দরবারের প্রভাবশালী অংশের সম্মতি, বিপুল অর্থের নিশ্চয়তা এবং এমন একটি বাহ্যিক সামরিক শক্তি, যা প্রয়োজনে নবাবের বিশ্বস্ত বাহিনীর মোকাবিলা করতে পারবে। এই চারটি প্রয়োজন পূরণ করেছিল রায় দুর্লভের মতো দরবারি কর্মকর্তা, জগৎশেঠের আর্থিক গোষ্ঠী এবং ইংরেজ ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি।

জগৎশেঠ কোনো ব্যক্তির জন্মনাম ছিল না; এটি ছিল বাংলার সবচেয়ে প্রভাবশালী ব্যাংকার পরিবারের একটি উপাধি। অষ্টাদশ শতকের মধ্যভাগে মহাতাব রায় ও স্বরূপচাঁদ এই পরিবারের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি ছিলেন। তাদের আর্থিক প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নবাবি রাজস্ব স্থানান্তর, বড় অঙ্কের ঋণ, মুদ্রা বিনিময় এবং দূরবর্তী শহরে অর্থ পাঠানো হতো। মুর্শিদাবাদ থেকে দিল্লি পর্যন্ত তাদের আর্থিক যোগাযোগ বিস্তৃত ছিল। নবাবি সরকার যুদ্ধ, প্রশাসন বা জরুরি ব্যয়ের জন্য তাদের ঋণ ও আর্থিক ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করত।

বর্তমান যুগের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, সরকারি কোষাগার ও বৃহৎ বাণিজ্যিক ব্যাংকের কিছু ভূমিকা সে সময় জগৎশেঠ পরিবারের প্রতিষ্ঠানে একত্রে দেখা যেত। তারা শুধু ধনী মহাজন ছিলেন না; কার হাতে রাজস্ব যাবে, কে দ্রুত ঋণ পাবে এবং কোন রাজনৈতিক পক্ষ অর্থনৈতিক সমর্থন অর্জন করবে—এসব প্রশ্নে তাদের সিদ্ধান্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। ফলে বাংলার সিংহাসনে কে বসবেন, তা তাদের কাছে নিছক দরবারি বিষয় ছিল না। শাসক পরিবর্তন তাদের সম্পদ, ঋণ, প্রভাব ও নিরাপত্তার সঙ্গে সরাসরি যুক্ত ছিল।

সিরাজউদ্দৌলার সঙ্গে জগৎশেঠ পরিবারের সম্পর্ক ঠিক কীভাবে চূড়ান্তভাবে ভেঙে পড়েছিল, তা নিয়ে বিভিন্ন ঐতিহাসিক বর্ণনা রয়েছে। কোনো বিবরণে ব্যক্তিগত অপমানের কথা বলা হয়েছে, কোনো বিবরণে সম্পদ বাজেয়াপ্ত হওয়ার ভয়, আবার কোথাও নবাবের অস্থির নীতি ও অনিশ্চিত রাজনৈতিক আচরণকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এসব কাহিনির কিছু অংশ পরবর্তী সময়ে নাটকীয়ভাবে বাড়িয়ে বলা হতে পারে। তবে এটি স্পষ্ট যে পরিবারটি সিরাজের শাসনে নিজেদের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ও সম্পদের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল।

জগৎশেঠরা এমন একজন নবাব চাইছিলেন, যিনি তাদের আর্থিক সহায়তার প্রয়োজন অনুভব করবেন এবং তাদের বিরুদ্ধে আকস্মিক ব্যবস্থা নেওয়ার সাহস কম দেখাবেন। মীর জাফর এই উদ্দেশ্যের জন্য উপযুক্ত ছিলেন। তাঁর নবাবি দাবি প্রতিষ্ঠার জন্য অর্থ ও রাজনৈতিক সমর্থন দরকার ছিল, আর জগৎশেঠ পরিবারের দরকার ছিল এমন একজন শাসক, যাঁর ক্ষমতার ভিত্তি তাদের সহায়তার সঙ্গে যুক্ত থাকবে। এই পারস্পরিক নির্ভরতা ষড়যন্ত্রের অভ্যন্তরীণ ভিত্তি গড়ে দেয়।

কিন্তু শুধু দরবারি ও ব্যাংকারদের সমর্থনে সিরাজকে অপসারণ করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। নবাবের হাতে বিশাল সেনাবাহিনী, কামান, রাজকোষ এবং মোহনলাল ও মীর মদনের মতো বিশ্বস্ত কর্মকর্তা ছিলেন। ব্যর্থ অভ্যুত্থান ঘটলে ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পদ ও জীবন দুটিই হারানোর আশঙ্কা ছিল। তাই তাদের এমন একটি বিদেশি সামরিক সহযোগী দরকার ছিল, যে যুদ্ধক্ষেত্রে সিরাজের বাহিনীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিতে পারবে। কলকাতা পুনর্দখলের পর শক্তিশালী হয়ে ওঠা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি সেই সহযোগীতে পরিণত হয়।

ইংরেজদের সঙ্গে সিরাজের সংঘাতের পেছনে বেশ কয়েকটি বাস্তব কারণ ছিল। কোম্পানি মুঘল আমলের বাণিজ্যিক ছাড় ব্যবহার করে বাংলায় শুল্কমুক্ত বাণিজ্য করত। কিন্তু কোম্পানির কর্মচারীরা নিজেদের ব্যক্তিগত ব্যবসায়ও এই সুবিধা ব্যবহার করায় নবাবের রাজস্ব ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছিল। কোম্পানি কলকাতায় নবাবের অনুমতি ছাড়া দুর্গ মেরামত ও সামরিক প্রস্তুতি বাড়াচ্ছিল। একই সঙ্গে নবাবের বিরোধী বা সন্দেহভাজন ব্যক্তিদের আশ্রয় দেওয়ার অভিযোগও ছিল। সিরাজের দৃষ্টিতে এসব কাজ একটি বিদেশি বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সীমা অতিক্রম করে তাঁর সার্বভৌম ক্ষমতার প্রতি চ্যালেঞ্জ ছিল।

১৭৫৬ সালের জুনে সিরাজউদ্দৌলার বাহিনী কলকাতা দখল করে। ইংরেজ কর্মকর্তাদের অনেকে পালিয়ে যান এবং কোম্পানির বাণিজ্যিক মর্যাদা বড় আঘাত পায়। পরবর্তী সময়ে মাদ্রাজ থেকে রবার্ট ক্লাইভ ও চার্লস ওয়াটসনের নেতৃত্বে সামরিক শক্তি বাংলায় আসে। ১৭৫৭ সালের জানুয়ারিতে ইংরেজরা কলকাতা পুনর্দখল করে এবং হুগলিতে আক্রমণ চালিয়ে নিজেদের ক্ষমতা প্রদর্শন করে। ফেব্রুয়ারিতে আলীনগরের চুক্তির মাধ্যমে সাময়িক শান্তি প্রতিষ্ঠিত হলেও উভয় পক্ষ পরস্পরের বিরুদ্ধে প্রস্তুতি নিতে থাকে।

ইংরেজ কোম্পানি প্রথমে কলকাতা পুনরুদ্ধার ও বাণিজ্যিক সুবিধা নিশ্চিত করতে চেয়েছিল। কিন্তু অল্প সময়ের মধ্যেই তাদের লক্ষ্য বদলে যায়। সিরাজকে ক্ষমতায় রেখে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা যাবে না—এমন ধারণা কোম্পানির কর্মকর্তাদের মধ্যে শক্তিশালী হতে থাকে। তারা বুঝতে পারে, নবাবকে শুধু সামরিকভাবে ভয় দেখানোর চেয়ে তাঁকে সরিয়ে একজন নির্ভরশীল শাসক বসাতে পারলে দীর্ঘমেয়াদি সুবিধা পাওয়া যাবে। অর্থাৎ কোম্পানি একজন বণিক থেকে বাংলার রাজনীতিতে শাসক নির্বাচনের ভূমিকায় প্রবেশ করতে শুরু করে।

১৭৫৭ সালের মার্চে ইংরেজরা বাংলায় ফরাসিদের প্রধান ঘাঁটি চন্দননগর আক্রমণ ও দখল করে। এতে সিরাজের সম্ভাব্য ফরাসি সামরিক সহায়তা দুর্বল হয়ে যায়। একই সঙ্গে ইংরেজদের আত্মবিশ্বাস বাড়ে। বাংলায় তাদের প্রধান ইউরোপীয় প্রতিদ্বন্দ্বী কার্যত নিষ্ক্রিয় হওয়ার পর কোম্পানি নবাব পরিবর্তনের পরিকল্পনায় বেশি মনোযোগ দিতে পারে। চন্দননগরের পতন তাই শুধু ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রতিদ্বন্দ্বিতার ঘটনা ছিল না; এটি সিরাজবিরোধী ষড়যন্ত্র সফল করার গুরুত্বপূর্ণ পূর্বশর্তও হয়ে ওঠে।

মুর্শিদাবাদে কোম্পানির প্রতিনিধি উইলিয়াম ওয়াটস গোপন যোগাযোগের প্রধান সংগঠকদের একজন ছিলেন। তিনি দরবারের অসন্তুষ্ট ব্যক্তিদের মনোভাব সম্পর্কে তথ্য সংগ্রহ করতেন এবং ইংরেজ নেতৃত্বকে নিয়মিত সংবাদ পাঠাতেন। মীর জাফর, জগৎশেঠ পরিবার ও অন্যান্য ষড়যন্ত্রকারীর সঙ্গে সরাসরি বা মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে আলোচনা চলত। রবার্ট ক্লাইভ কলকাতা থেকে পরিকল্পনার সামরিক ও রাজনৈতিক দিক পরিচালনা করতেন। গোপন বার্তা বহনের জন্য বিশ্বস্ত দূত, ব্যবসায়িক যোগাযোগ এবং সাংকেতিক ভাষা ব্যবহার করা হতো।

ষড়যন্ত্রের সঙ্গে রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান এবং দরবারের আরও কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি যুক্ত হন। তাদের ভূমিকা সবার ক্ষেত্রে সমান ছিল না। কেউ মীর জাফরের নবাবি সমর্থন করেছিলেন, কেউ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বাহিনী নিষ্ক্রিয় রাখার আশ্বাস দিয়েছিলেন, আবার কেউ গোপন আলোচনা ও অর্থের ব্যবস্থায় সহায়তা করেছিলেন। পরিকল্পনার মূল শক্তি ছিল প্রকাশ্য বিদ্রোহ নয়; বরং সিরাজের বিশাল বাহিনীকে ভেতর থেকে অকার্যকর করে দেওয়া।

১৭৫৭ সালের মে মাস নাগাদ ইংরেজ কোম্পানির নেতৃত্ব সিরাজকে অপসারণের নীতি গ্রহণ করে। মীর জাফরকে ভবিষ্যৎ নবাব হিসেবে সামনে আনা হলেও তাঁর প্রতিশ্রুতি কতটা বিশ্বাসযোগ্য, তা নিয়ে ইংরেজদের সংশয় ছিল। মীর জাফরও ইংরেজদের পুরোপুরি বিশ্বাস করতেন না। তিনি জানতেন, পরিকল্পনা ফাঁস হলে তাঁকে রাষ্ট্রদ্রোহী হিসেবে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। ফলে উভয় পক্ষই লিখিত চুক্তি, শপথ এবং মধ্যস্থতাকারীর মাধ্যমে নিশ্চয়তা চাইছিল।

গোপন চুক্তির মূল কথা ছিল পরিষ্কার। ইংরেজরা সিরাজউদ্দৌলাকে অপসারণ করে মীর জাফরকে বাংলার নবাব করতে সামরিক সহায়তা দেবে। বিনিময়ে মীর জাফর কোম্পানির বাণিজ্যিক অধিকার নিশ্চিত করবেন, কলকাতায় ইংরেজদের দুর্গ নির্মাণ ও প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করার সুযোগ দেবেন এবং সিরাজের কলকাতা অভিযানে কোম্পানি ও বিভিন্ন গোষ্ঠীর যে ক্ষতি হয়েছে বলে দাবি করা হচ্ছিল, তার বিপুল ক্ষতিপূরণ দেবেন। কোম্পানির সেনা ও নৌবাহিনী এবং অভিযানে যুক্ত উচ্চপদস্থ কর্মকর্তাদের জন্যও বড় অঙ্কের পুরস্কার নির্ধারণ করা হয়।

বিভিন্ন ঐতিহাসিক বিবরণে প্রতিশ্রুত অর্থের অঙ্কে কিছু পার্থক্য দেখা যায়। তবে সামগ্রিক পরিমাণ যে অত্যন্ত বিশাল ছিল, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই। কোম্পানি, কলকাতার ইউরোপীয় বাসিন্দা, ভারতীয় ব্যবসায়ী, আর্মেনীয় বণিক, সেনাবাহিনী, নৌবাহিনী এবং ইংরেজ কর্মকর্তাদের জন্য পৃথক ক্ষতিপূরণ ও পুরস্কারের কথা ছিল। এই প্রতিশ্রুতিগুলো এমনভাবে নির্ধারিত হয়েছিল যেন নবাব হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই মীর জাফর বাংলার কোষাগারের একটি বড় অংশ ইংরেজদের হাতে তুলে দিতে বাধ্য হন।

চুক্তিতে জমি ও বাণিজ্যিক সুবিধাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। কলকাতার আশপাশে কোম্পানির কর্তৃত্ব বিস্তার, দুর্গ রক্ষার স্বাধীনতা এবং শত্রু ইউরোপীয় শক্তিকে বাংলায় ঘাঁটি স্থাপন করতে না দেওয়ার নিশ্চয়তা ইংরেজরা চাইছিল। এগুলো শুধু ক্ষতিপূরণের শর্ত ছিল না; ভবিষ্যতে কোম্পানির নিজস্ব সামরিক অঞ্চল ও রাজনৈতিক প্রভাব গড়ে তোলার ভিত্তি ছিল। বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের নিরাপত্তার নামে তারা কার্যত নবাবি সরকারের ভেতরে একটি স্বাধীন শক্তিকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার সুযোগ পাচ্ছিল।

চুক্তির একটি তাৎপর্যপূর্ণ শর্ত ছিল ইংরেজদের শত্রুকে মীর জাফরের শত্রু হিসেবে বিবেচনা করা। এই ধরনের প্রতিশ্রুতি বাংলার বৈদেশিক ও সামরিক নীতিকে কোম্পানির স্বার্থের সঙ্গে বেঁধে দিত। নবাব নামমাত্র স্বাধীন থাকলেও কোনো ইউরোপীয় শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক রাখবেন বা কাকে শত্রু বিবেচনা করবেন, সে সিদ্ধান্তে কোম্পানির প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হতো। বিশেষ করে ফরাসিদের বিরুদ্ধে এটি ছিল ইংরেজদের জন্য বড় সাফল্য।

ষড়যন্ত্রের পরিকল্পনা গোপন রাখতে উমিচাঁদ গুরুত্বপূর্ণ মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হন। তিনি কলকাতার ধনী ব্যবসায়ী এবং ইংরেজ, আর্মেনীয় ও বাংলার দরবারি মহলের সঙ্গে সংযুক্ত ছিলেন। তাঁর বাণিজ্যিক পরিচয় ও যোগাযোগের কারণে মুর্শিদাবাদ ও কলকাতার মধ্যে বার্তা আদান-প্রদানে তিনি সহায়তা করতে পারতেন। ষড়যন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তাঁর জানা ছিল বলে ইংরেজদের পক্ষে তাঁকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করা সম্ভব ছিল না।

একপর্যায়ে উমিচাঁদ নিজের জন্য বিপুল অর্থ দাবি করেন এবং দাবি পূরণ না হলে পরিকল্পনা ফাঁস করার হুমকি দেন বলে ইংরেজ নথিতে উল্লেখ রয়েছে। তাঁর উদ্দেশ্য নিয়ে বিতর্ক আছে এবং ইংরেজ বিবরণ তাঁকে লোভী ও প্রতারক হিসেবে তুলে ধরতে সচেষ্ট ছিল। তবু এটি স্পষ্ট যে তাঁর দাবি ষড়যন্ত্রের নেতাদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। সিরাজ পরিকল্পনাটি জেনে গেলে মীর জাফরসহ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা দ্রুত গ্রেপ্তার হতে পারতেন এবং ইংরেজদের সামরিক অভিযানও বিপর্যস্ত হতে পারত।

উমিচাঁদকে শান্ত রাখতে রবার্ট ক্লাইভের নেতৃত্বে দুই ধরনের চুক্তিপত্র তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। সাদা কাগজে লেখা আসল চুক্তিতে উমিচাঁদের জন্য বিশেষ অর্থ বরাদ্দ ছিল না। লাল কাগজে তৈরি ভুয়া চুক্তিতে তাঁর দাবিকৃত অর্থ দেওয়ার প্রতিশ্রুতি রাখা হয়। তাঁকে লাল চুক্তি দেখিয়ে বিশ্বাস করানো হয় যে ইংরেজরা তাঁর শর্ত মেনে নিয়েছে। কিন্তু ষড়যন্ত্র সফল হওয়ার পর সাদা চুক্তিটিই কার্যকর করা হবে—এটাই ছিল পরিকল্পনা।

নৌবাহিনীর প্রধান চার্লস ওয়াটসন ভুয়া চুক্তিতে স্বাক্ষর করতে অস্বীকার করেছিলেন বলে প্রচলিত বিবরণে জানা যায়। তা সত্ত্বেও লাল চুক্তিতে তাঁর স্বাক্ষর বসানো হয়েছিল বলে অভিযোগ রয়েছে। অর্থাৎ সিরাজের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রবদলের পরিকল্পনা পরিচালনা করতে গিয়ে ইংরেজরা শুধু নবাবকে নয়, নিজেদের মধ্যস্থতাকারীকেও লিখিত প্রতারণার শিকার করেছিল। পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশ রাজনীতিতেও ক্লাইভের এই কাজের নৈতিকতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।

দুটি চুক্তিপত্রের ঘটনা ষড়যন্ত্রের প্রকৃত চরিত্র প্রকাশ করে। এখানে কোনো পক্ষই শুধু নীতি বা ন্যায়ের ভিত্তিতে কাজ করছিল না। মীর জাফর সিংহাসন চাইছিলেন, জগৎশেঠরা নিরাপদ রাজনৈতিক পরিবেশ চাইছিলেন, কোম্পানি অর্থ ও ক্ষমতা চাইছিল, আর উমিচাঁদ নিজের ভূমিকার বিনিময়ে সম্পদ নিশ্চিত করতে চেয়েছিলেন। পারস্পরিক অবিশ্বাসে ভরা এই জোটকে ধরে রেখেছিল ব্যক্তিগত লাভ এবং সিরাজকে সরানোর অভিন্ন লক্ষ্য।

১৭৫৭ সালের জুনের শুরুতে মীর জাফর ও ইংরেজদের মধ্যে গোপন সমঝোতা লিখিত রূপ পায়। মীর জাফর ধর্মীয় শপথের মাধ্যমে নিজের অঙ্গীকার দৃঢ় করেছিলেন বলে বর্ণনা পাওয়া যায়। কিন্তু প্রকাশ্যে তাঁকে নবাবের বিশ্বস্ত সেনাপতি হিসেবেই আচরণ করতে হচ্ছিল। ষড়যন্ত্রের সাফল্য নির্ভর করছিল সিরাজ যেন শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তাঁকে সম্পূর্ণ শত্রু হিসেবে চিহ্নিত করতে না পারেন।

সিরাজউদ্দৌলা অবশ্য ষড়যন্ত্রের কিছু সংবাদ পেয়েছিলেন। মীর জাফরের আনুগত্য নিয়ে সন্দেহ হলে তাঁকে কোরআন স্পর্শ করে বিশ্বস্ততার শপথ করতে বলা হয়েছিল বলে প্রচলিত ইতিহাসে উল্লেখ আছে। মীর জাফর সেই শপথ করেও গোপন যোগাযোগ বজায় রাখেন। সিরাজ চাইলে তাঁকে অবিলম্বে গ্রেপ্তার করতে পারতেন, কিন্তু এমন পদক্ষেপে সেনাবাহিনীর একটি বড় অংশ বিদ্রোহ করতে পারে বলে আশঙ্কা ছিল। দরবারের কতজন ষড়যন্ত্রে যুক্ত, তা নিশ্চিতভাবে বোঝাও কঠিন ছিল।

নবাবের দ্বিধা ষড়যন্ত্রকারীদের সবচেয়ে বড় সুযোগ দেয়। তিনি কখনো মীর জাফরকে হুমকি দিয়েছেন, কখনো সমঝোতা করেছেন, আবার কখনো তাঁকে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক দায়িত্বেই রেখেছেন। সিরাজের বিশ্বস্ত কর্মকর্তারা কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিলেও তিনি সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপ নিতে পারেননি। বিপরীতে ষড়যন্ত্রকারীরা তাঁর প্রতিটি পদক্ষেপ ইংরেজদের জানাচ্ছিল। ফলে নবাব নিজের রাজধানীতেই তথ্যের যুদ্ধে পিছিয়ে পড়েন।

ইংরেজদের কাছেও পরিস্থিতি পুরোপুরি নিশ্চিত ছিল না। মীর জাফর শেষ মুহূর্তে ভয় পেয়ে সরে দাঁড়াতে পারেন, নবাব তাঁকে বন্দী করতে পারেন কিংবা যুদ্ধক্ষেত্রে সিরাজের বিশ্বস্ত বাহিনী ইংরেজদের পরাজিত করতে পারে—এমন আশঙ্কা ছিল। রবার্ট ক্লাইভ মীর জাফরের কাছ থেকে বারবার নিশ্চয়তা চাইছিলেন। কখনো বার্তা পৌঁছাতে বিলম্ব হওয়ায় ইংরেজ শিবিরে উৎকণ্ঠা তৈরি হয়। তাই পলাশীর বিজয়কে আগে থেকেই নিশ্চিত ও ঝুঁকিহীন পরিকল্পনা বলা যাবে না।

কাটোয়া দখলের পর ক্লাইভ তাঁর কর্মকর্তাদের নিয়ে যুদ্ধপরিষদ আহ্বান করেন। নবাবের বিশাল বাহিনীর বিরুদ্ধে সঙ্গে সঙ্গে অগ্রসর হওয়া উচিত কি না, তা নিয়ে মতভেদ দেখা দেয়। ক্লাইভ নিজেও প্রথমে অপেক্ষার পক্ষে ছিলেন বলে জানা যায়। পরে সিদ্ধান্ত বদলে তিনি ভাগীরথী অতিক্রম করে পলাশীর দিকে এগিয়ে যান। এই সাহসের পেছনে তাঁর সামরিক আত্মবিশ্বাসের পাশাপাশি মীর জাফর ও অন্য সেনাপতিদের নিষ্ক্রিয় থাকার গোপন নিশ্চয়তা ছিল।

১৭৫৭ সালের ২২ জুন রাতে ইংরেজ বাহিনী পলাশীর আমবাগানে অবস্থান নেয়। পরদিন নবাবের সেনাবাহিনী তাদের মুখোমুখি হয়। সংখ্যার বিচারে সিরাজের বাহিনী ছিল বহুগুণ বড়। কিন্তু এই বাহিনীর একটি বড় অংশের নেতৃত্বে ছিলেন মীর জাফর, রায় দুর্লভ ও ইয়ার লতিফ খান। তারা বাহিনী নিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে উপস্থিত থাকলেও নির্ণায়ক আক্রমণ থেকে বিরত থাকে। পরিকল্পনা ছিল পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করা এবং ইংরেজদের বিজয় নিশ্চিত হলে তাদের পক্ষে অবস্থান নেওয়া।

মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতা তাই ইংরেজদের পোশাক পরে সিরাজের ওপর গুলি চালানোর মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর সবচেয়ে কার্যকর অস্ত্র ছিল নিষ্ক্রিয়তা। হাজার হাজার সৈন্য তাঁর অধীনে দাঁড়িয়ে থেকেও যুদ্ধ করেনি। এতে নবাবের বাহিনীর সংখ্যাগত শ্রেষ্ঠত্ব অর্থহীন হয়ে পড়ে। ইংরেজরা জানত, তাদের সামনে দৃশ্যমান বিশাল সেনাবাহিনীর পুরোটা তাদের বিরুদ্ধে আক্রমণ করবে না। গোপন চুক্তি যুদ্ধক্ষেত্রের শক্তির হিসাব এভাবেই বদলে দিয়েছিল।

অন্যদিকে মীর মদন, মোহনলাল এবং ফরাসি গোলন্দাজ সাঁ ফ্রেজের বাহিনী সক্রিয়ভাবে ইংরেজদের বিরুদ্ধে লড়ে। নবাবের কামান থেকে গোলাবর্ষণ হয় এবং একপর্যায়ে ইংরেজ বাহিনী প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে থাকে। মীর মদন গোলার আঘাতে মারাত্মক আহত হয়ে মৃত্যুবরণ করলে নবাবের বিশ্বস্ত সামরিক নেতৃত্ব বড় ধাক্কা খায়। মোহনলাল লড়াই চালিয়ে যেতে চাইলেও তাঁকে পিছু হটার নির্দেশ দেওয়া হয়।

মীর জাফর ও তাঁর সহযোগীরা নবাবকে যুদ্ধ বন্ধ বা সাময়িক পিছু হটার পরামর্শ দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ আছে। সিরাজ যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের সেনাপতিদের প্রকৃত আনুগত্য বুঝতে না পেরে বিভ্রান্ত হয়ে পড়েন। যখন সক্রিয় বাহিনী পিছু হটতে শুরু করে, তখন ইংরেজরা সুযোগ নিয়ে সামনে এগিয়ে আসে। নবাবের বিশাল শিবিরে বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়ে এবং সৈন্যরা পালাতে থাকে। কয়েক ঘণ্টার সংঘর্ষের পর এমন এক বাহিনী পরাজিত হয়, যা সংখ্যায় ইংরেজদের তুলনায় বহু গুণ বড় ছিল।

পলাশীর ফল নির্ধারণে বর্ষায় বারুদ ভিজে যাওয়া, ইংরেজদের সুরক্ষিত অবস্থান, তুলনামূলক গতিশীল কামান এবং নবাবের দুর্বল যুদ্ধনেতৃত্ব ভূমিকা রেখেছিল। কিন্তু এসব সামরিক বিষয়ের ওপর দাঁড়িয়ে ছিল আরও গভীর রাজনৈতিক সত্য—নবাবের প্রধান সেনাপতিদের একাংশ জয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধই করেনি। গোপন চুক্তি না থাকলে ইংরেজদের ছোট বাহিনীকে সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হতো।

যুদ্ধের পর সিরাজ মুর্শিদাবাদে ফিরে পরিস্থিতি সামলানোর চেষ্টা করেন। দ্রুত বুঝতে পারেন রাজধানীর প্রভাবশালী অংশ তাঁর পাশে নেই। তিনি পালিয়ে যাওয়ার পর ধরা পড়েন এবং মীর জাফরের পুত্র মীরনের নির্দেশে তাঁকে হত্যা করা হয় বলে প্রচলিত বিবরণে জানা যায়। এরপর মীর জাফরকে বাংলার নবাব ঘোষণা করা হয়। বাহ্যিকভাবে এটি ছিল দরবারের ভেতরে শাসক পরিবর্তন; বাস্তবে প্রথমবারের মতো একটি বিদেশি বাণিজ্যিক কোম্পানির সামরিক শক্তি বাংলার সিংহাসন নির্ধারণ করেছিল।

মীর জাফর নবাব হওয়ার পর গোপন চুক্তির আর্থিক মূল্য পরিশোধের পালা শুরু হয়। মুর্শিদাবাদের কোষাগার খুলে কোম্পানি ও তার কর্মকর্তাদের বিপুল অর্থ দেওয়া হয়। নগদ অর্থ, স্বর্ণ, রৌপ্য ও মূল্যবান সামগ্রী নৌকায় করে কলকাতায় পাঠানো হয়েছিল। প্রতিশ্রুত অর্থের সম্পূর্ণ পরিমাণ তাৎক্ষণিকভাবে দেওয়া সম্ভব না হওয়ায় কিস্তি, সম্পদ হস্তান্তর এবং নতুন আর্থিক ব্যবস্থার আশ্রয় নিতে হয়। জগৎশেঠ পরিবারের সহায়তাও এই অর্থ স্থানান্তরে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

রবার্ট ক্লাইভসহ কোম্পানির উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা ব্যক্তিগতভাবে বিপুল পুরস্কার পান। কোম্পানির সামরিক অভিযান আর শুধু প্রতিষ্ঠানের বাণিজ্যিক স্বার্থ রক্ষার বিষয় থাকেনি; ব্যক্তিগত সম্পদ অর্জনের পথেও পরিণত হয়েছিল। বাংলায় অর্জিত অর্থ নিয়ে ইংল্যান্ডে ফিরে যাওয়া কোম্পানি কর্মকর্তাদের একটি নতুন ধনী গোষ্ঠী তৈরি হয়। তাদের বিলাসিতা ও রাজনৈতিক প্রভাব পরে ব্রিটেনেও বিতর্ক সৃষ্টি করে।

জগৎশেঠ পরিবার হয়তো মনে করেছিল, মীর জাফর ক্ষমতায় এলে পুরোনো রাজনৈতিক ভারসাম্য ফিরে আসবে এবং ইংরেজরা সামরিক সহায়তার বিনিময়ে অর্থ নিয়ে বাণিজ্যে ফিরে যাবে। কিন্তু তাদের এই হিসাব দীর্ঘমেয়াদে ভুল প্রমাণিত হয়। কোম্পানি পলাশীর মাধ্যমে বুঝে যায় যে বাংলার অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব ব্যবহার করে নবাব বসানো ও সরানো সম্ভব। যে বিদেশি শক্তিকে দরবারের একটি পক্ষ সাময়িক সহযোগী হিসেবে ব্যবহার করতে চেয়েছিল, সেই শক্তিই অল্প সময়ে সবার ঊর্ধ্বে উঠে যায়।

মীর জাফরও দ্রুত উপলব্ধি করেন যে নবাবের মসনদ পেলেও স্বাধীনভাবে শাসন করা সম্ভব হচ্ছে না। কোম্পানির আর্থিক দাবি, সামরিক ব্যয় এবং কর্মকর্তাদের ব্যক্তিগত প্রত্যাশা পূরণ করতে গিয়ে তাঁর প্রশাসন দুর্বল হয়ে পড়ে। রাজকোষের ওপর চাপ বাড়ে এবং সেনাবাহিনী ও প্রশাসনের ব্যয় মেটানো কঠিন হয়। ইংরেজদের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হলে ১৭৬০ সালে তাঁকে সরিয়ে জামাতা মীর কাসিমকে নবাব করা হয়। পরে মীর কাসিম কোম্পানির নিয়ন্ত্রণ থেকে মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করলে আবার সংঘাত শুরু হয়।

পলাশীর পরপরই ইংরেজরা পুরো বাংলা শাসন করতে শুরু করেনি। নবাবি প্রশাসন, রাজস্ব কর্মকর্তা ও স্থানীয় ক্ষমতার কাঠামো তখনো বহাল ছিল। কিন্তু রাজনৈতিক ক্ষমতার কেন্দ্র বদলে গিয়েছিল। কোম্পানি বুঝে গিয়েছিল, সরাসরি প্রশাসনিক দায়িত্ব না নিয়েও সামরিক শক্তি ও অর্থনৈতিক চাপের মাধ্যমে নবাবকে নিয়ন্ত্রণ করা যায়। এই পরোক্ষ কর্তৃত্বই পরবর্তী আট বছরে আরও দৃঢ় হয় এবং ১৭৬৫ সালে দেওয়ানি লাভের মাধ্যমে কোম্পানি বাংলা, বিহার ও ওড়িশার রাজস্ব আদায়ের অধিকার অর্জন করে।

মীর জাফরের নাম তাই বাংলায় বিশ্বাসঘাতকতার সমার্থক হয়ে উঠেছে। কারণ তিনি নবাবের সেনাপতি হয়েও বিদেশি শক্তির সঙ্গে গোপন চুক্তি করে সিংহাসন লাভ করেছিলেন এবং যুদ্ধক্ষেত্রে নিজের বাহিনীকে নিষ্ক্রিয় রেখেছিলেন। তবে সমস্ত দায় শুধু তাঁর ওপর চাপালে ষড়যন্ত্রের বিস্তৃত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়। রায় দুর্লভ, ইয়ার লতিফ খান, জগৎশেঠ পরিবার, বিভিন্ন মধ্যস্থতাকারী এবং কোম্পানির কর্মকর্তাদের সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া পরিকল্পনাটি সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম ছিল।

জগৎশেঠদের ভূমিকা নিয়েও ভারসাম্যপূর্ণ বিচার প্রয়োজন। তারা নিজেরা যুদ্ধক্ষেত্রে অস্ত্র ধরেনি, কিন্তু অর্থ, রাজনৈতিক যোগাযোগ ও আস্থার নিশ্চয়তা দিয়ে শাসক পরিবর্তনের পরিকল্পনাকে সম্ভব করেছিল। তাদের উদ্দেশ্য সরাসরি ব্রিটিশ উপনিবেশ প্রতিষ্ঠা করা ছিল—এমন প্রমাণ নেই। তারা সম্ভবত নিজেদের সম্পদ ও প্রভাব রক্ষার জন্য একজন অনুকূল নবাব চেয়েছিল। কিন্তু স্বল্পমেয়াদি নিরাপত্তার এই হিসাব এমন একটি শক্তিকে বাংলার রাজনীতিতে প্রবেশের সুযোগ দেয়, যা পরে দেশীয় ব্যাংকার ও নবাব উভয়ের স্বাধীনতা ধ্বংস করে।

ইংরেজদের ভূমিকাকে শুধু মীর জাফরের প্রস্তাব গ্রহণ হিসেবে দেখাও ভুল। কোম্পানির কর্মকর্তারা সক্রিয়ভাবে যোগাযোগ পরিচালনা, প্রার্থী নির্বাচন, চুক্তির শর্ত নির্ধারণ, অর্থের পরিমাণ স্থির এবং সামরিক অভিযান পরিকল্পনা করেছিলেন। উমিচাঁদকে প্রতারিত করতে দুটি চুক্তি তৈরি তাদের সুপরিকল্পিত কূটকৌশলের প্রমাণ। তারা বাংলার বিভক্ত রাজনীতিকে শুধু ব্যবহার করেনি; নিজেদের স্বার্থ অনুযায়ী সেই বিভাজনকে পরিচালনাও করেছিল।

সিরাজউদ্দৌলার প্রশাসনিক ভুল, অস্থির সিদ্ধান্ত ও ক্ষমতাবান গোষ্ঠীর সঙ্গে সংঘাত ষড়যন্ত্রের পরিবেশ সৃষ্টি করেছিল। কিন্তু একটি শাসকের দুর্বলতা তাঁর সেনাপতি ও কর্মকর্তাদের বিদেশি কোম্পানির সঙ্গে গোপন চুক্তিকে বৈধ করে না। সিরাজের বিরুদ্ধে অসন্তোষ থাকলে দরবারের ভেতরে পরিবর্তনের পথ খোঁজা যেত। ইংরেজ সামরিক শক্তিকে আমন্ত্রণ জানানোর ফলে সংঘাত আর শুধু বাংলার অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; এটি বিদেশি আধিপত্যের দরজা খুলে দেয়।

এই গোপন চুক্তির সবচেয়ে গভীর তাৎপর্য ছিল রাজনীতি ও বাণিজ্যের সম্পর্ক বদলে দেওয়া। আগে কোম্পানি নবাবের অনুমতি নিয়ে বাংলায় ব্যবসা করত। পলাশীর পর নবাবকেই ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য কোম্পানির অনুমোদন ও সামরিক সহায়তার ওপর নির্ভর করতে হয়। অর্থাৎ বণিক ও শাসকের সম্পর্ক উল্টে যায়। যে প্রতিষ্ঠান রাজস্ব ছাড় ও বাণিজ্যিক নিরাপত্তা চাইত, সেটিই ধীরে ধীরে রাজস্ব, ভূখণ্ড ও শাসক নির্ধারণের ক্ষমতা অর্জন করে।

মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন সমঝোতা তাই শুধু একটি ব্যক্তিকে সিংহাসনে বসানোর চুক্তি ছিল না। এটি বাংলার সার্বভৌম রাজনৈতিক কাঠামোকে ভেতর থেকে দুর্বল করার দলিল। ষড়যন্ত্রকারীরা প্রত্যেকে তাৎক্ষণিক লাভের হিসাব করেছিল, কিন্তু কেউই সম্ভবত এর দীর্ঘমেয়াদি পরিণতির সম্পূর্ণ গভীরতা উপলব্ধি করেনি। মীর জাফর মসনদ পেলেও স্বাধীনতা হারান, জগৎশেঠরা সাময়িক প্রভাব ধরে রাখলেও শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা হারায়, আর বাংলা তার রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা ক্রমে একটি বিদেশি কোম্পানির হাতে তুলে দিতে বাধ্য হয়।

পলাশীর আমবাগানে কামানের গোলা ছোড়ার আগেই সাদা চুক্তিপত্রে যুদ্ধের ফল অনেকটা নির্ধারিত হয়ে গিয়েছিল। লাল চুক্তি আবার দেখিয়েছিল, এই জোটের মধ্যে নৈতিকতা বা পারস্পরিক বিশ্বাসের স্থান কত সামান্য ছিল। শপথ ভঙ্গ, দ্বৈত দলিল, অর্থের প্রতিশ্রুতি এবং যুদ্ধক্ষেত্রে পরিকল্পিত নিষ্ক্রিয়তা মিলেই বাংলার ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়েছিল। এই কারণেই ১৭৫৭ সালের গোপন চুক্তি শুধু অতীতের বিশ্বাসঘাতকতার কাহিনি নয়; এটি ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও স্বল্পমেয়াদি লাভের জন্য বিদেশি শক্তিকে রাষ্ট্রের ভেতরে প্রবেশের সুযোগ দেওয়ার ভয়াবহ পরিণতির এক স্থায়ী ঐতিহাসিক সতর্কবার্তা।


আপনার পছন্দ হতে পারে