বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা

সিরিজ: আলোকায়নের যুগ

জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
জনগণই সার্বভৌম—রুশোর সামাজিক চুক্তিতে স্বাধীনতা ও সাম্যের অনুসন্ধান।

ক্ষমতাকে নিয়ন্ত্রণ করা এবং ধর্মীয় নিপীড়ন বন্ধ করার পরও একটি প্রশ্ন থেকে যায়: যে সমাজে কেউ বিপুল সম্পদের মালিক, আর কেউ বেঁচে থাকার জন্য অন্যের অনুগ্রহের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে স্বাধীনতা কতটা বাস্তব? মন্টেস্কু রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানে ভারসাম্য খুঁজেছিলেন, ভলতেয়ার আক্রমণ করেছিলেন অসহিষ্ণুতা ও অবিচারকে। জঁ-জাক রুশো অনুসন্ধানকে নিয়ে গেলেন সমাজের ভিত্তির কাছে। মানুষ কীভাবে একত্রে রাজনৈতিক সমাজ গঠন করবে, অথচ অন্যের ব্যক্তিগত ইচ্ছার দাস হয়ে পড়বে না? তাঁর সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব এই সমস্যার উত্তর খোঁজার প্রচেষ্টা।

১৭১২ সালে জেনেভায় জন্ম নেওয়া রুশোর রাজনৈতিক কল্পনায় তাঁর জন্মস্থানের প্রজাতান্ত্রিক পরিচয়ের প্রভাব ছিল। তবে জেনেভা আধুনিক অর্থে সবার সমান অংশগ্রহণের গণতন্ত্র ছিল না; নাগরিক মর্যাদা ও রাজনৈতিক অধিকার সীমিত ছিল। জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে রুশো ফ্রান্স ও সুইজারল্যান্ডের নানা অঞ্চলে বসবাস করেন এবং প্যারিসের বুদ্ধিবৃত্তিক জগতের সঙ্গে যুক্ত হন। দিদরোর সঙ্গে পরিচয় ও বিশ্বকোষ প্রকল্পে অংশগ্রহণ তাঁকে আলোকায়নের আলোচনার কেন্দ্রে আনে। কিন্তু সভ্যতার অগ্রগতি নিয়ে সমকালীন আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে তাঁর বিরোধও ক্রমে স্পষ্ট হয়।

১৭৫০ সালে প্রকাশিত শিল্পকলা ও বিজ্ঞানবিষয়ক আলোচনায় রুশো প্রশ্ন করেন, জ্ঞানের অগ্রগতি কি মানুষের নৈতিক উন্নতি নিশ্চিত করেছে? তাঁর অভিযোগ ছিল, বাহ্যিক পরিশীলন অনেক সময় অহংকার, প্রতিযোগিতা ও নির্ভরতাকে আড়াল করে। তিনি সব জ্ঞান বাতিল কিংবা মানুষকে আক্ষরিকভাবে বনবাসে ফেরানোর কর্মসূচি দেননি। তাঁর লক্ষ্য ছিল অগ্রগতির মূল্য বিচার করা। মানুষ কী জানে, তার পাশাপাশি মানুষ কেমন সম্পর্কের মধ্যে বাস করে—এই দ্বিতীয় প্রশ্নটিকে তিনি রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রে আনেন।

১৭৫৫ সালের বৈষম্যের উৎপত্তিবিষয়ক গ্রন্থে রুশো প্রাকৃতিক পার্থক্য এবং সামাজিক বৈষম্য আলাদা করেন। বয়স, স্বাস্থ্য বা শারীরিক শক্তির পার্থক্য এক বিষয়; ধনসম্পদ, সম্মান ও আদেশ দেওয়ার ক্ষমতার অসম বণ্টন অন্য বিষয়। দ্বিতীয়টি মানুষের তৈরি প্রতিষ্ঠান ও রীতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তাঁর বর্ণনা সরল প্রত্নতাত্ত্বিক ইতিহাস নয়, সমাজের উৎপত্তি নিয়ে দার্শনিক পুনর্গঠন। বিদ্যমান বৈষম্য প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় বিধান—এই দাবি অস্বীকার করাই ছিল তাঁর গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।

ব্যক্তিগত সম্পত্তির প্রসারে রুশো এই রূপান্তরের বড় সূত্র খুঁজে পান। জমি নিজের বলে দাবি করা, শ্রমবিভাগ এবং সম্পদ সঞ্চয়ের সঙ্গে মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতা বাড়ে। অন্যের চোখে নিজের মর্যাদা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাও তীব্র হয়। ধনীরা নিজেদের সুবিধা রক্ষার ব্যবস্থাকে সবার নিরাপত্তার চুক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে। তবে বৈষম্যবিষয়ক গ্রন্থে বর্ণিত এই প্রতারণামূলক চুক্তি এবং পরবর্তী বৈধ সামাজিক চুক্তি এক নয়। একটি ব্যাখ্যা করে আধিপত্যের জন্ম; অন্যটি অনুসন্ধান করে ন্যায্য রাজনৈতিক ব্যবস্থার শর্ত।

১৭৬২ সালে প্রকাশিত দ্য সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট সেই দ্বিতীয় অনুসন্ধানের প্রধান রচনা। এর শুরুতে মানুষের জন্মগত স্বাধীনতা ও সর্বত্র শৃঙ্খলে আবদ্ধ থাকার বৈপরীত্য উঠে আসে। রুশোর প্রশ্ন ছিল, সামাজিক বাধ্যবাধকতা কখন বৈধ হয়? শক্তি প্রয়োগ করে কাউকে আনুগত্যে বাধ্য করা সম্ভব, কিন্তু শক্তিই নৈতিক অধিকার সৃষ্টি করে না। একইভাবে মানুষ নিজের সমগ্র স্বাধীনতা অন্যের হাতে দিয়ে দিলে বৈধ রাজনৈতিক সম্পর্কের ভিত্তিই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তাই আনুগত্যের এমন রূপ দরকার, যা নাগরিকের স্বাধীনতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।

রুশোর সমাধানে প্রত্যেকে নিজের ব্যক্তি ও ক্ষমতাকে সমগ্র রাজনৈতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে যুক্ত করেন, এবং সবাই একই শর্তে তা করেন। ফলে কেউ বিশেষ কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত অধীনতা স্বীকার করছেন না। এই সম্মিলনে একটি রাজনৈতিক সমষ্টি গঠিত হয়, যার সদস্যেরা যৌথভাবে সার্বভৌম এবং ব্যক্তিগতভাবে আইনের অধীন নাগরিক। সরকার জনগণের মালিক নয়; রাজনৈতিক কর্তৃত্বের চূড়ান্ত উৎস জনগণ নিজেরাই। জন্মগত রাজাধিকার বা বিজয়ের দাবির পরিবর্তে সমান সদস্যদের সম্মিলিত সম্পর্ক এখানে বৈধতার ভিত্তি।

এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে সাধারণ ইচ্ছা। এটি সবার ব্যক্তিগত চাওয়ার যোগফল নয়। প্রত্যেকে নিজের সুবিধা চাইলে সেই চাওয়াগুলোর সমষ্টি জনস্বার্থের বিরুদ্ধেও যেতে পারে। সাধারণ ইচ্ছা হলো নাগরিকেরা রাজনৈতিক সমষ্টির সদস্য হিসেবে যে অভিন্ন স্বার্থ বিবেচনা করেন। উদাহরণস্বরূপ, নিজের কর কমানোর আকাঙ্ক্ষা ব্যক্তিগত স্বার্থ; সবার ওপর ন্যায্য নিয়মে কর প্রযোজ্য হওয়া জনস্বার্থের প্রশ্ন। রুশো তাই নাগরিক সিদ্ধান্তে ব্যক্তিগত সুবিধা এবং সাধারণ কল্যাণের পার্থক্যকে বিশেষ গুরুত্ব দেন।

সাধারণ ইচ্ছাকে সংখ্যাগরিষ্ঠের যেকোনো সিদ্ধান্তের সমার্থক ভাবাও ভুল। রুশো ভোটকে গুরুত্বপূর্ণ মনে করলেও স্বীকার করেন, মানুষ প্রতারিত হতে পারে এবং দলীয় স্বার্থ সিদ্ধান্তকে বিকৃত করতে পারে। স্বাধীন বিচার, যথেষ্ট তথ্য এবং শক্তিশালী গোষ্ঠীর আধিপত্য থেকে মুক্ত পরিবেশ তাঁর যুক্তির জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তবু সমস্যা থেকে যায়: কোনো সিদ্ধান্ত সত্যিই সাধারণ স্বার্থের প্রকাশ কি না, তা নির্ধারণ করবে কে? জনগণের নামে ক্ষমতা ব্যবহারকারী গোষ্ঠী নিজের ইচ্ছাকে সাধারণ ইচ্ছা বলে ঘোষণা করতে পারে—এটি তাঁর তত্ত্বের গুরুত্বপূর্ণ বিতর্কিত দিক।

রুশোর কাছে সার্বভৌমত্ব হস্তান্তরযোগ্য কিংবা বিভাজ্য নয়, কারণ জনগণের সম্মিলিত আইনপ্রণেতা ইচ্ছা অন্য কেউ স্থায়ীভাবে নিজের করে নিতে পারে না। তিনি সার্বভৌম জনগণ ও সরকারকে পৃথক করেন। জনগণ আইন নির্ধারণ করে; সরকার তা কার্যকর করার দায়িত্ব পালন করে। এই অর্থে সরকারি পদ ক্ষমতার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। প্রতিনিধিদের হাতে আইনপ্রণয়নের চূড়ান্ত কর্তৃত্ব ছেড়ে দেওয়া সম্পর্কেও তিনি গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাঁর আদর্শে নাগরিকের সক্রিয় অংশগ্রহণ অপরিহার্য, যা বৃহৎ আধুনিক প্রতিনিধিত্বমূলক রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি মেলে না।

স্বাধীনতার ধারণাও এখানে বদলে যায়। প্রাকৃতিক স্বাধীনতা নিজের শক্তি ও সামর্থ্য পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে; নাগরিক স্বাধীনতা সাধারণ আইনের মধ্যে প্রতিষ্ঠিত হয়। নৈতিক স্বাধীনতা বলতে রুশো নিজের আকাঙ্ক্ষার অন্ধ অনুসরণের বদলে নিজের জন্য স্বীকৃত বিধান মানার ক্ষমতাকে বোঝান। সমস্যা হলো, কোনো সদস্য সাধারণ ইচ্ছা মানতে অস্বীকার করলে সম্প্রদায় তাকে বাধ্য করতে পারে। এই যুক্তিকে রুশো স্বাধীনতার শর্ত রক্ষার উপায় ভাবলেও, ভিন্নমত দমনের অনুমতি হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা রাজনৈতিক চিন্তায় দীর্ঘ বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।

সাম্যের ক্ষেত্রেও রুশোর লক্ষ্য সবাইকে হুবহু সমপরিমাণ সম্পদের মালিক করা ছিল না। তাঁর উদ্বেগ ছিল সম্পদের এমন বৈষম্য, যাতে একজন অন্যজনকে কিনে নেওয়ার মতো ক্ষমতাবান হয় এবং অন্যজন নিজেকে বিক্রি করতে বাধ্য হয়। অর্থনৈতিক নির্ভরতা রাজনৈতিক স্বাধীনতাকে দুর্বল করে—এই সংযোগ তাঁর মৌলিক অবদান। সম্পত্তি রাজনৈতিক সমাজে স্বীকৃতি পেতে পারে, কিন্তু তা সামষ্টিক বিধানের বাইরে সীমাহীন দাবি নয়। স্বাধীন নাগরিক সমাজের জন্য তিনি সংযম, নাগরিক শিক্ষা এবং জনকল্যাণের প্রতি দায়বোধকেও জরুরি মনে করেন।

তাঁর স্বাধীনতার পরিসরে সীমাবদ্ধতাও ছিল। ১৭৬২ সালের এমিল গ্রন্থে নারীর শিক্ষাকে প্রধানত পুরুষকেন্দ্রিক পারিবারিক ভূমিকার সঙ্গে যুক্ত করা হয়। আবার সামাজিক চুক্তির ‘নাগরিক ধর্ম’ আলোচনায় তিনি অসহিষ্ণুতার বিরোধিতা করলেও নাগরিক সংহতির জন্য কিছু বিশ্বাসের শর্ত রাখেন। ফলে বিবেকের স্বাধীনতা ও রাজনৈতিক ঐক্যের মধ্যে টানাপোড়েন দেখা দেয়। সোশ্যাল কনট্র্যাক্ট ও এমিল কর্তৃপক্ষের বিরোধিতার মুখে পড়ে, এবং রুশোকে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে স্থানান্তরিত হতে হয়। তাঁর প্রশ্নগুলো প্রতিষ্ঠিত ক্ষমতার কাছে নিছক তাত্ত্বিক ছিল না।

১৭৭৮ সালে রুশোর মৃত্যুর পর ফরাসি বিপ্লবে জনগণের সার্বভৌমত্ব ও সাধারণ ইচ্ছার ভাষা নতুন গুরুত্ব পায়। বিভিন্ন বিপ্লবী গোষ্ঠী তাঁকে নিজেদের মতো করে পড়েছিল; বিপ্লবের সব সিদ্ধান্তের সরাসরি রচয়িতা হিসেবে তাঁকে দেখা যথার্থ নয়। তাঁর স্থায়ী প্রভাব ছিল এই দাবিতে যে স্বাধীনতা রক্ষার জন্য শাসকের সীমা নির্ধারণের পাশাপাশি নাগরিকের সমান মর্যাদা ও বাস্তব অংশগ্রহণও দরকার। এখন আলোকায়নের সামনে আরেক কাজ স্পষ্ট হলো: এই রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রশ্নগুলোকে কীভাবে সংগঠিত জ্ঞান, শিক্ষা এবং বিস্তৃত জনআলোচনার অংশ করে তোলা যায়?