বালবোয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর: ১৫১৩ সালের পানামা অভিযানের ইতিহাস
সিরিজ: আবিষ্কারের যুগ: সমুদ্র অভিযান ও নতুন বিশ্বের সন্ধান
পানামার ওপারের সমুদ্র ইউরোপীয়দের সামনে আমেরিকা ও এশিয়ার মধ্যবর্তী জলভাগের বাস্তবতা তুলে ধরে।
গোয়া, মালাক্কা ও হরমুজকে কেন্দ্র করে পর্তুগিজরা যখন পূর্বের বাণিজ্যপথে অবস্থান শক্ত করছিল, স্প্যানিশ অভিযাত্রীরা তখন আমেরিকার পশ্চিমে যাওয়ার সুযোগ খুঁজছিলেন। মাঝখানে দাঁড়িয়ে ছিল বিস্তৃত এক ভূখণ্ড, যার সম্পূর্ণ আকৃতি তাঁদের অজানা। সেই বাধার মধ্যেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সূত্র মিলল: ক্যারিবীয় উপকূলের ওপারে পাহাড় ও অরণ্য পেরোলে নাকি আরেকটি বড় সমুদ্র রয়েছে। ১৫১৩ সালে ভাস্কো নুনিয়েজ দে বালবোয়ার পানামা অভিযান এই সংবাদকে ইউরোপীয়দের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতায় রূপ দেয়।
তবে বালবোয়া সমুদ্রটির প্রথম আবিষ্কারক ছিলেন না। প্রশান্ত মহাসাগরের দ্বীপ ও উপকূলে বহু আগে থেকেই মানুষের বসবাস এবং নৌযাতায়াত ছিল। পানামার স্থানীয় জনগোষ্ঠীও তাদের দক্ষিণের জলভাগ সম্পর্কে জানত। বালবোয়ার বিশেষত্ব হলো, আমেরিকার দিক থেকে স্থলপথে অতিক্রম করে প্রশান্ত মহাসাগর দেখার প্রথম নথিভুক্ত ইউরোপীয় অভিযানটির নেতৃত্ব তিনি দেন। ঘটনাটি ইউরোপীয় ভূগোলের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ, সমুদ্রটির মানবিক ইতিহাসের সূচনা হিসেবে নয়।
বালবোয়া ছিলেন স্পেনের একজন অভিযাত্রী, যাঁর ক্যারিবীয় জীবনের প্রথম দিকে অর্থনৈতিক সাফল্য আসেনি। হিস্পানিওলায় বসতি ও কৃষিকাজের চেষ্টা তাঁকে ঋণের মধ্যে ফেলেছিল। প্রচলিত বিবরণ অনুযায়ী, ১৫১০ সালে তিনি গোপনে একটি জাহাজে উঠে মূল ভূখণ্ডমুখী অভিযানে যোগ দেন। সেখানে তাঁর পূর্ব অভিজ্ঞতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা কাজে আসে। দ্রুতই তিনি উপনিবেশিক নেতৃত্বের সংঘর্ষে নিজের অবস্থান তৈরি করেন।
এই ক্ষমতার ভিত্তি ছিল সান্তা মারিয়া লা আন্তিগুয়া দেল দারিয়েন, বর্তমান পানামা-কলম্বিয়া সীমান্তের কাছাকাছি অঞ্চলের একটি প্রাথমিক স্প্যানিশ বসতি। বালবোয়া এর প্রতিষ্ঠা ও নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। কিন্তু তাঁর কর্তৃত্ব নির্বিবাদ ছিল না; প্রতিদ্বন্দ্বী স্প্যানিশ কর্মকর্তাদের সরিয়ে ক্ষমতায় ওঠার কারণে রাজদরবারে জবাবদিহির আশঙ্কা ছিল। ফলে নতুন ভূখণ্ড, সোনা কিংবা গুরুত্বপূর্ণ পথের সন্ধান তাঁর জন্য ব্যক্তিগত রাজনৈতিক সুরক্ষার উপায়ও হয়ে ওঠে।
দারিয়েনে স্প্যানিশদের টিকে থাকা স্থানীয় সমাজের সঙ্গে সম্পর্কের ওপর নির্ভর করত। খাদ্য, পথঘাটের খবর এবং শ্রমের জন্য আদিবাসীদের সহযোগিতা দরকার ছিল। বালবোয়া কিছু নেতার সঙ্গে মিত্রতা করেন, আবার অন্যদের বিরুদ্ধে অভিযান চালান। সহযোগিতা ও সহিংসতা একই সম্প্রসারণের অংশ ছিল। স্থানীয় জনগোষ্ঠীগুলোর নিজেদের মধ্যে বিরোধও ছিল; স্প্যানিশদের কেউ সম্ভাব্য মিত্র, কেউ বিপজ্জনক প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে দেখতেন।
এই যোগাযোগ থেকেই দক্ষিণের সমুদ্র সম্পর্কে সংবাদ আসে। প্রচলিত বিবরণে কোমোগ্রে নামের এক নেতার পুত্র পানকিয়াকোর ভূমিকার কথা বলা হয়। তিনি সমুদ্রের ওপারের ধনী অঞ্চল সম্পর্কেও তথ্য দিয়েছিলেন বলে উল্লেখ রয়েছে। তবে এই ধরনের কথোপকথনের বিবরণ পরে স্প্যানিশ লেখকদের মাধ্যমে সংরক্ষিত হয়েছে। তাই প্রতিটি নাটকীয় সংলাপকে হুবহু সত্য ধরে নেওয়া অনুচিত। নিশ্চিত বিষয় হলো, স্থানীয় মানুষের জ্ঞান ছাড়া বালবোয়ার অভিযান পরিকল্পনা করা কঠিন হতো।
১৫১৩ সালের সেপ্টেম্বরে বালবোয়া প্রায় দুইশ স্প্যানিশ এবং বহু আদিবাসী সহযোগী ও বাহক নিয়ে যাত্রা শুরু করেন। সংখ্যার বিবরণে কিছু পার্থক্য রয়েছে। প্রথমে উপকূলীয় নৌযাত্রা, তারপর পানামার স্থলভাগ অতিক্রম করতে হয়। বর্তমান মানচিত্রে দুই সমুদ্র কাছাকাছি মনে হলেও বাস্তব যাত্রা সহজ ছিল না। ঘন অরণ্য, নদী, আর্দ্রতা, পাহাড়ি ঢাল এবং অপরিচিত পথ অভিযাত্রীদের অগ্রগতি ধীর করে।
দলটিকে খাদ্য ও বিশ্রামের ব্যবস্থা করতে হতো স্থানীয় বসতিগুলোর সাহায্যে কিংবা বলপ্রয়োগের মাধ্যমে। অসুস্থতা ও ক্লান্তিতে কেউ কেউ পিছিয়ে পড়ে। পথে প্রতিরোধের মুখেও পড়তে হয় এবং সংঘর্ষ ঘটে। ইউরোপীয় বর্ণনায় এসব ঘটনাকে প্রায়ই বীরত্বপূর্ণ বাধা অতিক্রম হিসেবে দেখানো হয়েছে। কিন্তু স্থানীয় মানুষের দৃষ্টিতে এগুলো ছিল অস্ত্রধারী বহিরাগতদের প্রবেশ এবং নিজেদের নিরাপত্তা ও কর্তৃত্ব রক্ষার লড়াই।
২৫ সেপ্টেম্বর ১৫১৩ সালে পাহাড়ি উঁচু স্থান থেকে বালবোয়া দূরের বিশাল জলরাশি দেখতে পান। প্রচলিত কাহিনিতে বলা হয়, পথপ্রদর্শকদের কাছ থেকে সামনে সমুদ্র দেখা যাবে শুনে তিনি আগে এগিয়ে যান। তাঁর সহযাত্রীরাও পরে দৃশ্যটি দেখেন। ঘটনাটির তাৎপর্য শুধু দিগন্তের সৌন্দর্যে ছিল না। ক্যারিবীয় সাগরের বিপরীত পাশে আরেকটি বিস্তৃত সমুদ্র থাকার খবর এখন স্প্যানিশদের কাছে প্রত্যক্ষ পর্যবেক্ষণে সমর্থিত হলো।
পাহাড় থেকে সমুদ্র দেখা আর তীরে পৌঁছানো এক ঘটনা নয়। দলটি আরও কয়েক দিন এগিয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর সান মিগেল উপসাগরের তীরে পৌঁছায়। বালবোয়া জলে নেমে স্প্যানিশ রাজমুকুটের নামে সমুদ্র ও সংলগ্ন ভূখণ্ড দাবি করেন। এই অনুষ্ঠান ছিল ইউরোপীয় সাম্রাজ্যিক অধিকারের প্রতীকী ঘোষণা। সমুদ্রের উপকূলবাসী কিংবা সেখানে চলাচলকারী জনগোষ্ঠী সেই দাবি অনুমোদন করেনি; বাস্তব নিয়ন্ত্রণও সঙ্গে সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত হয়নি।
বালবোয়া জলভাগটির নাম দেন ‘মার দেল সুর’ বা ‘দক্ষিণ সাগর’। নামটি অস্বাভাবিক মনে হতে পারে, কারণ আধুনিক মানচিত্রে প্রশান্ত মহাসাগরকে আমেরিকার পশ্চিমে দেখি। কিন্তু পানামার স্থলভাগ বাঁকানো এবং তাঁর অতিক্রম করা অঞ্চল থেকে জলভাগটি দক্ষিণদিকে পড়েছিল। ‘প্রশান্ত মহাসাগর’ নামটি বালবোয়ার দেওয়া নয়; পরবর্তী সময়ে মাগেলানের অভিযানের সঙ্গে সেই নাম যুক্ত হয়।
এই অভিযানের ফলে ইউরোপীয়রা বুঝতে পারল, অন্তত পানামা অঞ্চলে একটি তুলনামূলক সরু স্থলভাগ দুটি বৃহৎ জলভাগকে পৃথক করছে। কিন্তু এটিকে সঙ্গে সঙ্গে সমগ্র আমেরিকার নির্ভুল পরিচয় পাওয়া বলা যাবে না। উত্তর ও দক্ষিণ আমেরিকার বিস্তার, প্রশান্ত মহাসাগরের প্রস্থ এবং এশিয়ার প্রকৃত দূরত্ব তখনও অজানা ছিল। বালবোয়া একটি গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক সম্পর্ক নিশ্চিত করেছিলেন; পৃথিবীর সম্পূর্ণ মানচিত্র সমাধান করেননি।
এর ব্যবহারিক ফল ছিল নতুন পথের অনুসন্ধান। পানামা পায়ে অতিক্রম করা সম্ভব হলেও ইউরোপ থেকে আসা বড় জাহাজকে স্থলভাগের ওপর দিয়ে চালানো যায় না। পণ্য নামিয়ে স্থলপথে বহন করে অন্য পারে আবার জাহাজে তোলার সম্ভাবনা ছিল, কিন্তু তার জন্য ঘাঁটি ও পরিবহনব্যবস্থা দরকার। অন্যদিকে সমুদ্রযাত্রীরা এমন প্রণালি খুঁজতে থাকেন, যার মধ্য দিয়ে আটলান্টিক থেকে সরাসরি পশ্চিমের সমুদ্রে যাওয়া যাবে।
দক্ষিণ সাগরের সংবাদ স্প্যানিশদের সম্পদসংক্রান্ত প্রত্যাশাও বাড়ায়। উপকূলীয় মুক্তা এবং আরও দক্ষিণের ধনী রাজ্য সম্পর্কে খবর ভবিষ্যৎ অভিযানে উৎসাহ জোগায়। তবে বালবোয়া নিজে ইনকা সাম্রাজ্য জয় করেননি। তাঁর অভিযানের তাৎপর্য ছিল পরবর্তী উদ্যোগের ভৌগোলিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্র তৈরি করা। পানামা ধীরে ধীরে প্রশান্ত মহাসাগরমুখী অভিযানের কেন্দ্র হয়ে ওঠে, যেখান থেকে দক্ষিণ আমেরিকার পশ্চিম উপকূলের দিকে অগ্রসর হওয়া সম্ভব হয়।
সাফল্য বালবোয়াকে স্থায়ী নিরাপত্তা দেয়নি। নতুন গভর্নর পেদ্রারিয়াস দাভিলার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্ষমতার দ্বন্দ্বে জড়িয়ে পড়ে। প্রশান্ত মহাসাগরে অভিযান চালানোর জন্য জাহাজ তৈরির উদ্যোগও এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্যে পড়ে। শেষ পর্যন্ত রাষ্ট্রদ্রোহসহ অভিযোগে বিচার করে ১৫১৯ সালে আক্লায় বালবোয়ার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তাঁর পরিণতি দেখায়, সামুদ্রিক সম্প্রসারণে রাজকীয় পুরস্কারের পাশাপাশি উপনিবেশিক কর্মকর্তাদের সংঘর্ষও কতটা নির্ধারক ছিল।
বালবোয়ার মৃত্যুর বছরেই মাগেলানের বহর স্পেন থেকে পশ্চিমমুখী যাত্রা শুরু করবে। লক্ষ্য হবে আমেরিকার পাশ দিয়ে সমুদ্রপথ খুঁজে মসলার দ্বীপপুঞ্জে পৌঁছানো। পানামার পাহাড় থেকে দেখা জলরাশি তখনও বিশাল অজানা দূরত্বের প্রতিশ্রুতি ও বিপদ বহন করছিল। বালবোয়া দেখিয়েছিলেন, আমেরিকার ওপারে আরেক সমুদ্র রয়েছে; পরবর্তী অভিযানকে জানতে হবে, সেই সমুদ্র পেরিয়ে এশিয়া কত দূরে এবং সেখানে পৌঁছানোর পথ কোথায়।
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি
আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান
হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ