ফরাসি বিপ্লবের আড়ালের ষড়যন্ত্র: রাজতন্ত্র, বিপ্লবী ও বিদেশি শক্তির গোপন খেলা
সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য
গোপন চিঠি, বিদেশি চাপ ও সন্দেহের আগুনে বদলে যাওয়া ফ্রান্স।
প্যারিসের রাস্তায় তখন স্বাধীনতার স্লোগান, অথচ প্রাসাদের ভেতরে লেখা হচ্ছে গোপন চিঠি। সীমান্তের ওপারে নির্বাসিত অভিজাতেরা বিদেশি রাজাদের দরবারে সাহায্য চাইছেন। বিপ্লবী সভাকক্ষে একই আন্দোলনের নেতারা পরস্পরকে বিশ্বাসঘাতক বলছেন। ফরাসি বিপ্লবের এই অন্ধকার দিকটি নিছক রোমাঞ্চকর গল্প নয়। এখানে সত্যিকারের গোপন যোগাযোগ, রাজনৈতিক দরকষাকষি ও ক্ষমতার লড়াই ছিল। আবার অনেক অভিযোগের পেছনে ছিল গুজব, আতঙ্ক এবং প্রতিপক্ষকে সরানোর চেষ্টা। বাস্তব ষড়যন্ত্র ও ষড়যন্ত্রের ভয়—দুটিই বিপ্লবের গতিপথ বদলেছিল।
তবে বিপ্লবকে কোনো সর্বশক্তিমান গোপন দলের পরিকল্পনা হিসেবে দেখলে তার মূল কারণগুলো হারিয়ে যায়। রাজকোষের সংকট, করব্যবস্থার বৈষম্য, খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি এবং রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের দাবি ছিল বাস্তব সমস্যা। ১৭৮৯ সালে পুরোনো শাসনব্যবস্থার কর্তৃত্ব ভাঙতে শুরু করলে বিভিন্ন পক্ষ নিজেদের স্বার্থ রক্ষায় সক্রিয় হয়। কেউ রাজতন্ত্র সংস্কার করতে চেয়েছিল, কেউ পুরোনো ক্ষমতা ফিরিয়ে আনতে চেয়েছিল, আবার কেউ আরও গভীর পরিবর্তনের পক্ষে ছিল। এই ভিন্ন উদ্দেশ্য থেকেই প্রকাশ্য সংঘর্ষের পাশাপাশি গোপন রাজনীতি জন্ম নেয়।
বিপ্লবের শুরু থেকেই রাজদরবারের উদ্দেশ্য নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ১৭৮৯ সালের গ্রীষ্মে প্যারিস ও ভার্সাইয়ের আশপাশে সৈন্যসমাবেশ এবং জনপ্রিয় মন্ত্রী নেকেরকে অপসারণ জনতার উদ্বেগ বাড়ায়। অনেকের মনে হয়, জাতীয় পরিষদকে দমন করার প্রস্তুতি চলছে। একই সময়ে গ্রামাঞ্চলে ছড়ায় অভিজাতদের ভাড়াটে দস্যু দিয়ে ফসল ধ্বংস করানোর গুজব। ‘মহা আতঙ্ক’ নামে পরিচিত এই পরিস্থিতিতে কৃষকেরা অস্ত্র ধরে এবং জমিদারি নথি আক্রমণ করে। একটি দেশব্যাপী অভিজাত ষড়যন্ত্র প্রমাণিত না হলেও তার আশঙ্কা বাস্তব বিদ্রোহ সৃষ্টি করেছিল।
রাজতন্ত্র ও বিপ্লবের মধ্যবর্তী অস্পষ্ট অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র ছিলেন মিরাবো। জনসমক্ষে তিনি ছিলেন প্রভাবশালী বিপ্লবী বক্তা; আড়ালে রাজদরবারের অর্থপ্রাপ্ত পরামর্শদাতা। তাঁর লক্ষ্য ছিল সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্যে রাজতন্ত্রকে টিকিয়ে রাখা এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা। ফলে তাঁকে শুধু পুরোনো স্বৈরশাসন ফিরিয়ে আনার সরল পরিকল্পনাকারী বলা অসম্পূর্ণ। কিন্তু গোপন অর্থ ও পরামর্শের সম্পর্ক তাঁর জনসম্মুখের অবস্থানের সঙ্গে গুরুতর দ্বন্দ্ব তৈরি করেছিল। সমঝোতার চেষ্টা কখন বিশ্বাসভঙ্গ হয়ে ওঠে—মিরাবোর ঘটনা সেই প্রশ্ন তুলেছিল।
রাজপরিবারের সবচেয়ে নাটকীয় গোপন পদক্ষেপ ছিল ১৭৯১ সালের ২০–২১ জুনের পলায়নচেষ্টা। ষোড়শ লুই ও তাঁর পরিবার ছদ্মপরিচয়ে প্যারিস ছাড়েন। পরিকল্পনায় সুইডিশ অভিজাত আক্সেল দ্য ফেরসেন সহায়তা করেন। উদ্দেশ্য ছিল পূর্বাঞ্চলে বিশ্বস্ত সামরিক শক্তির কাছে পৌঁছে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পাওয়া। তাঁরা ভারেনে শনাক্ত ও আটক হন। ঘটনাটিকে কেবল বিদেশে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা বলা যথাযথ নয়; এর কেন্দ্রে ছিল বিপ্লবী প্যারিসের নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে শক্তিশালী অবস্থান পুনরুদ্ধারের আকাঙ্ক্ষা।
ভারেনের ব্যর্থতা রাজা ও জাতির সম্পর্কের গভীর ক্ষতি করে। প্রকাশ্যে নতুন ব্যবস্থার সঙ্গে সহযোগিতা করা রাজা গোপনে তা থেকে বেরিয়ে যেতে চেয়েছেন—এই উপলব্ধি মানুষের আস্থা নষ্ট করে। সাংবিধানিক রাজতন্ত্রের সমর্থকেরা তাঁকে ক্ষমতায় রাখার পথ খুঁজলেও অন্যরা রাজতন্ত্রের অবসান দাবি করে। রাজপরিবারের পলায়নচেষ্টা সন্দেহকে দৃশ্যমান রাজনৈতিক প্রমাণে রূপ দেয়। এরপর রাজদরবারের প্রতিটি সিদ্ধান্ত আরও কঠোরভাবে বিচার করা হয়; আপসের সুযোগ সংকুচিত হতে থাকে।
মারি আঁতোয়ানেতের গোপন চিঠিপত্র এই ইতিহাসের আরেক গুরুত্বপূর্ণ স্তর। অস্ট্রিয়ার রাজবংশে জন্ম নেওয়া রানি ফেরসেন ও অন্যান্য যোগাযোগের মাধ্যমে বাইরের সাহায্যের সম্ভাবনা খুঁজছিলেন। তাঁর সংরক্ষিত চিঠিতে সংকেত, অদৃশ্য কালি এবং পরে আড়াল করা অংশ রয়েছে। এসব যোগাযোগে ব্যক্তিগত আবেগের পাশাপাশি রাজপরিবারের নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ উঠে আসে। কিন্তু সব চিঠিকে একই উদ্দেশ্যের সামরিক ষড়যন্ত্র বলা যায় না। প্রতিটি চিঠির সময়, প্রাপক ও বক্তব্য বিবেচনা করেই তার অর্থ বুঝতে হয়।
ফ্রান্স ছেড়ে যাওয়া অভিজাত ও রাজপরিবারের আত্মীয়েরা বিদেশে প্রতিবিপ্লবী তৎপরতা চালান। বিশেষ করে সীমান্তের বাইরে তাঁরা অর্থ, সৈন্য ও কূটনৈতিক সমর্থন সংগ্রহের চেষ্টা করেন। তবে নির্বাসিতদের আকাঙ্ক্ষা এবং ইউরোপীয় রাজাদের হিসাব এক ছিল না। অস্ট্রিয়া ও প্রুশিয়া বিপ্লবের বিস্তার নিয়ে উদ্বিগ্ন হলেও নিজেদের ভূখণ্ডগত ও কৌশলগত স্বার্থও দেখছিল। রাজতন্ত্র রক্ষার ঘোষণার আড়ালেও আন্তর্জাতিক ক্ষমতার প্রতিযোগিতা চলছিল। বিদেশি শক্তিগুলো কোনো একক, নিখুঁত পরিকল্পনায় পরিচালিত হচ্ছিল না।
১৭৯১ সালের আগস্টে পিলনিৎস ঘোষণায় অস্ট্রিয়ার সম্রাট দ্বিতীয় লিওপোল্ড ও প্রুশিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফ্রেডেরিক উইলিয়াম ফরাসি রাজপরিবারের অবস্থাকে ইউরোপীয় উদ্বেগের বিষয় করেন। পদক্ষেপের ভাষা ছিল শর্তসাপেক্ষ; এটি সরাসরি অবিলম্বে আক্রমণের নির্দেশ ছিল না। তবু ফ্রান্সে বহু মানুষ একে বিদেশি হস্তক্ষেপের হুমকি হিসেবে দেখেন। কূটনৈতিক অস্পষ্টতা এখানে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে। যা বিদেশি দরবারে চাপ সৃষ্টির উপায়, বিপ্লবী জনতার কাছে তা জাতীয় স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রের ইঙ্গিত।
১৭৯২ সালের ২০ এপ্রিল ফ্রান্স অস্ট্রিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। যুদ্ধের সমর্থকদের উদ্দেশ্যও ভিন্ন ছিল। ব্রিসো ও তাঁর সহযোগীরা মনে করতেন, যুদ্ধ বিপ্লবকে শক্তিশালী করবে এবং অভ্যন্তরীণ বিশ্বাসঘাতকদের উন্মোচিত করবে। রাজদরবারের কিছু হিসাব আবার সামরিক পরাজয়ের মাধ্যমে কর্তৃত্ব পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনার সঙ্গে যুক্ত ছিল। রোবেসপিয়ের যুদ্ধের বিরোধিতা করেন, কারণ তিনি সেনানায়কদের ক্ষমতা বৃদ্ধি ও বিপ্লবের বিপদ নিয়ে সতর্ক ছিলেন। একই যুদ্ধ তাই পরস্পরবিরোধী রাজনৈতিক আশার মিলনস্থল হয়ে ওঠে।
সেই বছরের ২৫ জুলাই ব্রান্সউইক ঘোষণাপত্র পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করে। রাজপরিবারের ক্ষতি হলে প্যারিসের বিরুদ্ধে কঠোর প্রতিশোধের হুমকি দেওয়া হয়। রাজাকে রক্ষা করার উদ্দেশ্যের এই ঘোষণা উল্টো তাঁকে বিদেশি আক্রমণকারীদের সঙ্গে যুক্ত বলে মনে করার প্রবণতা বাড়ায়। ১০ আগস্ট তুইলেরি প্রাসাদে আক্রমণ হয় এবং রাজার ক্ষমতা স্থগিত হয়। বাইরের শক্তির হুমকি রাজতন্ত্রকে নিরাপদ করার বদলে তার পতনকে ত্বরান্বিত করেছিল। সেপ্টেম্বরে রাজতন্ত্র বিলুপ্ত হওয়ার মাধ্যমে প্রজাতান্ত্রিক অধ্যায় শুরু হয়।
১৭৯২ সালের নভেম্বরে তুইলেরির গোপন লোহার নথিভাণ্ডার প্রকাশ্যে আসে। ‘লোহার আলমারি’ নামে পরিচিত এই ভাণ্ডারের কাগজপত্র রাজদরবারের গোপন সম্পর্ক, অর্থব্যয় ও মিরাবোর সঙ্গে যোগাযোগের বিষয় সামনে আনে। রাজার বিচারের রাজনৈতিক পরিবেশে এগুলোর গুরুত্ব ছিল বিপুল। তবে ভাণ্ডারের প্রতিটি নথি একই ধরনের অপরাধের প্রমাণ ছিল না; কিছু ছিল শাসনসংক্রান্ত যোগাযোগ। আবার নথি সংগ্রহ ও প্রকাশের প্রক্রিয়া নিয়েও বিতর্ক ওঠে। ইতিহাসে প্রমাণের অস্তিত্ব এবং তার রাজনৈতিক ব্যবহার আলাদা করে দেখা জরুরি।
বিপ্লবীরা ক্ষমতায় এসেও ঐক্যবদ্ধ থাকেননি। জিরন্দিন ও মোঁতানিয়ারদের দ্বন্দ্বে যুদ্ধ, অর্থনীতি, প্যারিসের জনতার প্রভাব এবং রাষ্ট্র পরিচালনার প্রশ্ন জড়িয়ে ছিল। ১৭৯৩ সালে বিদেশি আক্রমণ, ভঁদে বিদ্রোহ ও খাদ্যসংকটের মধ্যে রাজনৈতিক মতভেদকে দেশদ্রোহ হিসেবে ব্যাখ্যা করা সহজ হয়ে ওঠে। প্রতিপক্ষের ভুল নীতি আর ইচ্ছাকৃত বিশ্বাসঘাতকতার সীমারেখা মুছে যেতে থাকে। দেশ বিপন্ন হলে অভিযোগ দ্রুত বিশ্বাসযোগ্য হয়ে ওঠে; কিন্তু বিশ্বাসযোগ্যতা নিজে প্রমাণের বিকল্প নয়।
এই পরিবেশে ফরাসি ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিলুপ্তিকরণ নিয়ে আর্থিক কেলেঙ্কারি নতুন সন্দেহ সৃষ্টি করে। ঘুষ, ব্যক্তিগত লাভ এবং সিদ্ধান্তের নথি বদলানোর অভিযোগে ফাব্র দেগ্লঁতিনসহ কয়েকজন প্রতিনিধি জড়িয়ে পড়েন। এর সঙ্গে বড় ‘বিদেশি ষড়যন্ত্রের’ দাবি মিশে যায়। বাস্তব দুর্নীতির ঘটনাকে ব্যবহার করে বিরোধীদের বিদেশি শক্তির সহযোগী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অর্থনৈতিক অপরাধের প্রমাণ থেকে সর্বব্যাপী বিদেশি চক্রান্তের সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ছিল রাজনৈতিকভাবে সুবিধাজনক, কিন্তু ঐতিহাসিকভাবে সমস্যাজনক।
সন্ত্রাসপর্বে সন্দেহভাজনদের বিরুদ্ধে আইন, নজরদারি ও বিপ্লবী বিচারব্যবস্থা দমনকে বিস্তৃত করে। ১৭৯৪ সালের মার্চে এবেরপন্থী এবং এপ্রিলে দান্তোঁ ও তাঁর সহযোগীরা মৃত্যুদণ্ড পান। তাঁদের অবস্থান ভিন্ন হলেও উভয় পক্ষকে ষড়যন্ত্রের অভিযোগে আঘাত করা হয়। এই দমন শুধু রোবেসপিয়েরের ব্যক্তিগত সিদ্ধান্তের ফল ছিল না; বিভিন্ন কমিটি ও নেতৃত্ব এতে অংশ নেয়। জুলাইয়ে তাঁর নিজের বিরুদ্ধে বিরোধী জোট গড়ে ওঠে। অস্পষ্ট নতুন অভিযোগে আতঙ্কিত প্রতিনিধিরা আত্মরক্ষার জন্য একত্রিত হন।
ফরাসি বিপ্লবের গোপন খেলা তাই একটি কেন্দ্রীয় ষড়যন্ত্রের গল্প নয়। এখানে ছিল রাজতন্ত্র রক্ষার উদ্যোগ, বিপ্লবী আদর্শ, ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা, আর্থিক দুর্নীতি এবং বিদেশি স্বার্থের সংঘাত। সত্যিকারের গোপন তৎপরতা সন্দেহকে শক্তি দিয়েছিল; সেই সন্দেহ আবার অপ্রমাণিত অভিযোগকে প্রাণঘাতী করে তুলেছিল। এই ইতিহাসের গভীর শিক্ষা হলো, বাস্তব শত্রুর অস্তিত্ব সব অভিযোগকে সত্য করে না। স্বাধীনতার সংগ্রাম যখন প্রমাণের চেয়ে আশঙ্কাকে বেশি গুরুত্ব দেয়, তখন তার নিজের মানুষও গোপন শত্রুর তালিকায় স্থান পেতে পারে।
পলাশীর যুদ্ধ কি আসলে যুদ্ধ ছিল, নাকি সাজানো ক্ষমতা হস্তান্তর?
মীর জাফর, জগৎশেঠ ও ইংরেজদের গোপন চুক্তি: বাংলার ইতিহাস বদলে দেওয়া বিশ্বাসঘাতকতা
সিরাজউদ্দৌলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র: পলাশীর যুদ্ধের আগে গোপনে কী ঘটেছিল?
শিবাজী ও আফজল খানের সাক্ষাৎ: শান্তি আলোচনা নাকি পূর্বপরিকল্পিত হত্যার ফাঁদ?
দারা শিকোহর পতন: আওরঙ্গজেব কীভাবে ভাইকে পরাজিত করে মুঘল সিংহাসন দখল করেছিলেন?
মুঘল সাম্রাজ্যের সিংহাসনের ষড়যন্ত্র: শাহজাহানের চার পুত্রের রক্তাক্ত ক্ষমতার লড়াই