বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

নেপোলিয়নকে হত্যার ষড়যন্ত্র: ‘ইনফার্নাল মেশিন’ বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা

সিরিজ: ইতিহাসের আড়ালে ষড়যন্ত্রের রহস্য

নেপোলিয়নকে হত্যার ষড়যন্ত্র: ‘ইনফার্নাল মেশিন’ বিস্ফোরণে উড়িয়ে দেওয়ার পরিকল্পনা
লক্ষ্য ছিলেন নেপোলিয়ন, প্রাণ হারালেন নিরীহ পথচারীরা।

১৮০০ সালের ২৪ ডিসেম্বর। বড়দিনের আগের রাতে প্যারিসের একটি সরু রাস্তায় দাঁড়িয়ে ছিল ঘোড়ায় টানা সাধারণ মালবাহী গাড়ি। দেখতে শহরের দৈনন্দিন জীবনের অংশ, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে রাখা হয়েছিল বিস্ফোরক। অল্প সময়ের মধ্যেই সেই পথ দিয়ে যাওয়ার কথা নেপোলিয়ন বোনাপার্টের। ষড়যন্ত্রকারীদের উদ্দেশ্য ছিল তাঁর যাত্রীগাড়ির কাছে বিস্ফোরণ ঘটিয়ে তাঁকে হত্যা করা। একটি গাড়ি, গোপন প্রস্তুতি এবং সময়মতো সংকেত—এই কয়েকটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করছিল ফ্রান্সের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তির জীবন।

প্রথমেই একটি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধন দরকার: তখন নেপোলিয়ন সম্রাট ছিলেন না। ১৭৯৯ সালের ব্রুমেয়ারের অভ্যুত্থানের পর তিনি ফ্রান্সের প্রথম কনসাল হিসেবে ক্ষমতায় ছিলেন। সম্রাট হন ১৮০৪ সালে। তবে ১৮০০ সালেই রাষ্ট্র পরিচালনায় তাঁর কর্তৃত্ব দ্রুত বাড়ছিল। বিপ্লবের দীর্ঘ অস্থিরতার পর অনেক মানুষ তাঁর মধ্যে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনার সম্ভাবনা দেখছিলেন। অন্যদিকে রাজতন্ত্রপন্থী ও কট্টর প্রজাতন্ত্রীদের একাংশ তাঁকে নিজেদের রাজনৈতিক ভবিষ্যতের প্রধান বাধা মনে করছিল।

রাজতন্ত্রপন্থীদের কাছে বোনাপার্ট ছিলেন বুরবোঁ রাজবংশের প্রত্যাবর্তনের পথে শক্তিশালী প্রতিবন্ধক। ফ্রান্সের পশ্চিমাঞ্চলে বিপ্লবী সরকারের বিরুদ্ধে দীর্ঘ সশস্ত্র প্রতিরোধ থেকে উঠে আসা শুয়াঁ যোদ্ধাদের মধ্যে এই বিরোধিতা প্রবল ছিল। তাঁদের আন্দোলনে রাজতন্ত্র, ধর্মীয় আনুগত্য এবং স্থানীয় ক্ষোভ একসঙ্গে কাজ করেছিল। কিন্তু সামরিক প্রতিরোধ দুর্বল হয়ে পড়লে কিছু উগ্র কর্মী রাজধানীতে গোপন হত্যাচেষ্টার দিকে ঝোঁকে। নেপোলিয়নকে সরিয়ে দিলেই রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিজেদের অনুকূলে যাবে—এই আশা ছিল পরিকল্পনার চালিকাশক্তি।

হামলার কেন্দ্রীয় ব্যক্তিদের মধ্যে ছিলেন পিয়ের রবিনো দ্য সাঁ-রেজাঁ, জোসেফ পিকো দ্য লিমোয়েলাঁ এবং ফ্রাঁসোয়া-জোসেফ কার্বোঁ। তাঁরা রাজতন্ত্রপন্থী শুয়াঁ পরিবেশের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। বৃহত্তর যোগাযোগে জর্জ কাদুদালের অনুসারীদের সম্পর্কও উঠে আসে। তবে প্রত্যক্ষ হামলাকারীদের ভূমিকা এবং প্রতিটি উচ্চপর্যায়ের নেতার পূর্বজ্ঞান এক করে দেখা উচিত নয়। এই ঘটনায় রাজতন্ত্রপন্থী নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা প্রতিষ্ঠিত হলেও গোটা ইউরোপের রাজদরবার একসঙ্গে পরিকল্পনাটি পরিচালনা করেছে—এমন দাবি প্রমাণের সীমা অতিক্রম করে।

ষড়যন্ত্রকারীরা জানতেন, নেপোলিয়নের নিরাপত্তাবেষ্টনী পেরিয়ে সরাসরি আক্রমণ করা কঠিন। তাই তাঁরা তাঁর চলাচলের পথকে আঘাতের স্থান হিসেবে বেছে নেন। সেদিন সন্ধ্যায় তাঁর অপেরায় যাওয়ার কথা ছিল, যেখানে হাইডনের ‘দ্য ক্রিয়েশন’ সংগীতকর্ম পরিবেশিত হচ্ছিল। তুইলেরি থেকে সেখানে যাওয়ার পথে রু সাঁ-নিকেজ পড়ত। সরু রাস্তার মধ্যে একটি গাড়ি রেখে দিলে লক্ষ্যবস্তুর কাছাকাছি অবস্থান নেওয়া সম্ভব—এই হিসাবেই প্রস্তুতি চলে। জনসমাগমকে তাঁরা নিরাপত্তার কারণ হিসেবে বিবেচনা করেননি।

‘ইনফার্নাল মেশিন’ নামটি শুনলে জটিল কোনো যান্ত্রিক আবিষ্কারের কথা মনে হতে পারে। বাস্তবে এটি ছিল সাধারণ গাড়ির মধ্যে আড়াল করা শক্তিশালী বিস্ফোরক ব্যবস্থা। নামটির অর্থ মোটামুটি ‘নারকীয় যন্ত্র’। এর ভয়াবহতা আধুনিক প্রযুক্তিতে নয়, মানুষের চলাচলের জায়গায় গোপনে বিস্ফোরণ ঘটানোর উদ্দেশ্যে। সাধারণ মালবাহী গাড়ির নিরীহ চেহারাই ছিল হত্যার অস্ত্রের আচ্ছাদন। পরিকল্পনাটি লক্ষ্যবস্তুর পাশাপাশি আশপাশের বাসিন্দা ও পথচারীদেরও অনিবার্য বিপদের মধ্যে ফেলেছিল।

রাত প্রায় আটটার দিকে নেপোলিয়ন তুইলেরি ছাড়েন। তাঁর যাত্রীগাড়ি সরু রাস্তা দিয়ে এগোতে থাকে। হামলাকারীদের একজনের কাজ ছিল তাঁর আগমন লক্ষ্য করে অন্যজনকে সংকেত দেওয়া। কিন্তু প্রচলিত ঐতিহাসিক বিবরণ অনুযায়ী সংকেতের সময় নিয়ে ভুল হয় এবং বিস্ফোরণ দেরিতে ঘটে। গাড়ির চালক রাস্তার প্রতিবন্ধকতা পেরিয়ে এগিয়ে যেতে সক্ষম হন। নেপোলিয়নের গাড়ি বিপজ্জনক স্থান অতিক্রম করার পরই বিস্ফোরণ ঘটে। সামান্য সময়ের ব্যবধান পরিকল্পনার ফল বদলে দেয়।

তাঁর বেঁচে যাওয়া নিয়ে পরবর্তী বিবরণে চালকের দক্ষতা, গাড়ির গতি এবং হামলাকারীদের বিভ্রান্তিকে গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। কিছু গল্প ঘটনাটিকে আরও নাটকীয় করে তোলে। কিন্তু নিশ্চিত অংশ হলো, বিস্ফোরণের সময় নেপোলিয়ন প্রাণঘাতী অবস্থান থেকে সরে গিয়েছিলেন। স্মৃতিকথার প্রতিটি সংলাপ বা মুহূর্তের বর্ণনা নির্ভুল ধরে নেওয়ার প্রয়োজন নেই। ইতিহাসের নাটকীয়তা অনেক সময় প্রকৃত ঘটনার মধ্যেই যথেষ্ট থাকে; তাকে আরও রহস্যময় করতে অতিরিক্ত কিংবদন্তি যোগ করতে হয় না।

রাস্তার মানুষের জন্য অবশ্য সেই সৌভাগ্য ছিল না। বিস্ফোরণে জানালা ভাঙে, আশপাশের বাড়ি ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং বহু মানুষ হতাহত হন। মৃতের সংখ্যা নিয়ে বিবরণে পার্থক্য রয়েছে; বিভিন্ন হিসাবে প্রায় তেরো থেকে বাইশজনের কথা পাওয়া যায়। আহতের সংখ্যাও এক নয়। তাই একটি নির্দিষ্ট হিসাবকে চূড়ান্ত বলা সতর্কতার দাবি রাখে। কিন্তু সংখ্যার মতভেদ মূল সত্য বদলায় না: একজন রাজনৈতিক নেতাকে হত্যার প্রচেষ্টায় নিরীহ নাগরিকেরাই সবচেয়ে ভারী মূল্য দিয়েছিলেন।

ঘটনার সবচেয়ে মর্মান্তিক বিবরণগুলোর একটি হলো গাড়ির ঘোড়া ধরে দাঁড়ানো এক কিশোরীর মৃত্যু। তাঁকে সামান্য পারিশ্রমিকের বিনিময়ে সেখানে দাঁড় করানো হয়েছিল বলে তদন্তসংক্রান্ত বিবরণে উঠে আসে। বিপদের প্রকৃতি বোঝার সুযোগ তাঁর ছিল না। এই ঘটনা হামলাকারীদের নিষ্ঠুরতার মানবিক মাত্রা প্রকাশ করে। তাঁরা শুধু অচেনা পথচারীদের ঝুঁকিতে ফেলেননি; নিজেদের কাজে সাহায্য নেওয়া একজন অসহায় মানুষকেও মৃত্যুর মুখে রেখে গিয়েছিলেন। রাজনৈতিক উদ্দেশ্য এখানে মানবজীবনের প্রতি দায় সম্পূর্ণ মুছে দিয়েছিল।

নেপোলিয়ন বেঁচে গিয়ে অপেরায় উপস্থিত হন। তাঁর সচিব বুরিয়েনের স্মৃতিকথায় সেখানে তাঁকে শান্ত ও সংযত দেখা যাওয়ার কথা রয়েছে। জনসমক্ষে উপস্থিত থাকার রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল: এতে বোঝানো সম্ভব হয় যে হামলা তাঁকে ভীত বা অক্ষম করেনি। তবে বাইরে দৃঢ়তা দেখালেও পরবর্তী প্রতিক্রিয়া ছিল তীব্র। প্রথম সন্দেহ পড়ে জ্যাকোবিনদের ওপর। পূর্ববর্তী কট্টর প্রজাতন্ত্রী ষড়যন্ত্রের স্মৃতি এবং তাঁদের প্রতি নেপোলিয়নের বিরাগ এই সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করেছিল।

পুলিশমন্ত্রী জোসেফ ফুশে প্রথম থেকেই এই ব্যাখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেন। তাঁর গোয়েন্দা যোগাযোগ এবং হামলার ধরন রাজতন্ত্রপন্থীদের দিকে অনুসন্ধানের কারণ দেয়। তবে তাঁকে নিখুঁত ন্যায়পরায়ণ নায়ক হিসেবে দেখাও ভুল হবে। রাজনৈতিক চাপে তাঁর ভূমিকা জটিল ছিল, এবং ভুল পক্ষের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা ঠেকাতে তিনি সফল হননি। নেপোলিয়নের দৃঢ় বিশ্বাস আর পুলিশের অনুসন্ধান একই দিকে এগোচ্ছিল না। ফলে অপরাধ তদন্তের পাশাপাশি রাষ্ট্রের ভেতরেও ব্যাখ্যা ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব তৈরি হয়।

বিস্ফোরণের ধ্বংসাবশেষ অনুসন্ধানে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। গাড়ির অংশ, ব্যবহৃত ঘোড়ার পরিচয় এবং কেনাবেচার সূত্র ধরে পুলিশ সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে পৌঁছানোর চেষ্টা করে। পরিচিত রাজতন্ত্রপন্থীদের নজরদারি ও যোগাযোগ অনুসরণও কাজে লাগে। এখানে রহস্য উন্মোচনের চাবিকাঠি কোনো অলৌকিক স্বীকারোক্তি ছিল না; ছিল ছোট সূত্র মিলিয়ে দেখা। যে সাধারণ গাড়ি হামলাকে আড়াল করেছিল, তার কেনাকাটার ইতিহাসই শেষ পর্যন্ত হামলাকারীদের শনাক্ত করতে সাহায্য করে।

১৮০১ সালের জানুয়ারিতে কার্বোঁ এবং পরে সাঁ-রেজাঁ আটক হন। তদন্তে হামলাটির রাজতন্ত্রপন্থী চরিত্র স্পষ্ট হয়। মার্চের শেষ থেকে এপ্রিলের শুরু পর্যন্ত বিচার চলে এবং দুজন মৃত্যুদণ্ড পান; এপ্রিলেই তাঁদের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। লিমোয়েলাঁ পালিয়ে যেতে সক্ষম হন। ফলে প্রত্যক্ষ ষড়যন্ত্রকারীদের সবাই একই পরিণতির মুখোমুখি হননি। নেটওয়ার্কের অনুসন্ধানও দ্রুত শেষ হয়নি। কিন্তু জ্যাকোবিনদের অপরাধী ধরে নেওয়া প্রাথমিক রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত যে ভুল ছিল, তা আর আড়াল করা যায়নি।

এর মধ্যেই বহু জ্যাকোবিনের বিরুদ্ধে নির্বাসন, আটক ও নজরদারির ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল। ১৮০১ সালের জানুয়ারিতে বিচার ছাড়াই নির্বাসনের পথ অনুমোদিত হয়। প্রকৃত হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ পেলেও আগের দমন পুরোপুরি প্রত্যাহার করা হয়নি। অপরাধের জন্য দায়ী ব্যক্তি খোঁজা এবং সরকারের অপছন্দের বিরোধীদের সরানো এক প্রক্রিয়ায় মিশে গিয়েছিল। হামলা রাষ্ট্রকে নিরাপত্তার যুক্তি দিয়েছিল; সেই যুক্তির আওতায় অপরাধের সঙ্গে সম্পর্কহীন রাজনৈতিক পরিচয়ও শাস্তির কারণ হয়ে ওঠে।

‘ইনফার্নাল মেশিন’ নেপোলিয়নকে হত্যা করতে পারেনি, কিন্তু তাঁর শাসনের কঠোরতা বাড়ানোর সুযোগ তৈরি করেছিল। ঘটনাটি সরাসরি তাঁকে সম্রাট বানায়নি; পরবর্তী উত্থানের পেছনে আরও বহু কারণ ছিল। তবু নিরাপত্তা, পুলিশি ক্ষমতা ও বিরোধী দমনের ইতিহাসে এর গুরুত্ব গভীর। যে ষড়যন্ত্র তাঁর কর্তৃত্ব ধ্বংস করতে চেয়েছিল, তার প্রতিক্রিয়া উল্টো সেই কর্তৃত্বকে শক্তিশালী করে। আর ইতিহাসের কেন্দ্রে বেঁচে থাকা নেতার নাম উজ্জ্বল হলেও, সেই রাতের প্রকৃত ট্র্যাজেডি রয়ে যায় নিহত সাধারণ মানুষের জীবনে।


আপনার পছন্দ হতে পারে