নিউরাল নেটওয়ার্ক কীভাবে শেখে? মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে মিল ও পার্থক্য
মস্তিষ্ক থেকে অনুপ্রেরণা, গণনার মাধ্যমে শেখা—কৃত্রিম স্নায়ুজালের মূল ধারণা।
মস্তিষ্ক থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে তৈরি একটি গণনাব্যবস্থা
একটি শিশু কয়েকবার বিড়াল দেখার পর নতুন বিড়াল চিনতে পারে। কম্পিউটারকে একই কাজ শেখাতে শুধু “বিড়ালের দুটি কান আছে” ধরনের নিয়ম লিখলে সমস্যা হয়। কুকুরেরও দুটি কান আছে, আবার ছবিতে বিড়ালের একটি কান ঢাকা থাকতে পারে। এই বৈচিত্র্যের মধ্যে উদাহরণ থেকে বৈশিষ্ট্য ও সম্পর্ক শেখার একটি পদ্ধতি হলো নিউরাল নেটওয়ার্ক বা কৃত্রিম স্নায়ুজাল।
এর অনুপ্রেরণা এসেছে মস্তিষ্কের অসংখ্য স্নায়ুকোষের সংযোগ থেকে। তবে এটি মানুষের মস্তিষ্কের পূর্ণ প্রতিলিপি নয়। মূলত অনেক ছোট গণনাকারী একককে যুক্ত করে এমন ব্যবস্থা তৈরি করা হয়, যার অভ্যন্তরীণ মান প্রশিক্ষণের মাধ্যমে বদলানো যায়।
অনুকরণের মূল ধারণা
জৈব স্নায়ুকোষ অন্য কোষ থেকে সংকেত পায় এবং নিজের কার্যক্রমের মাধ্যমে পরবর্তী কোষকে প্রভাবিত করে। কৃত্রিম স্নায়ুকোষও একাধিক সংখ্যাগত মান গ্রহণ করে, হিসাব করে এবং ফল পরবর্তী এককে পাঠায়।
এই মিলটি কাঠামোগত ও ধারণাগত। মস্তিষ্কে বৈদ্যুতিক সংকেত, রাসায়নিক পদার্থ, সময়নির্ভর প্রতিক্রিয়া ও অসংখ্য ধরনের কোষ কাজ করে। সাধারণ কৃত্রিম স্নায়ুজালে সেগুলোর পরিবর্তে সরল গাণিতিক কার্যক্রম ব্যবহৃত হয়।
কৃত্রিম স্নায়ুকোষ, সংযোগের ওজন ও স্তরের কাজ
একটি কৃত্রিম স্নায়ুকোষের কাছে আসা প্রতিটি তথ্যের সঙ্গে একটি সংযোগের ওজন থাকে। এই ওজন নির্ধারণ করে তথ্যটি পরবর্তী হিসাবে কতটা প্রভাব ফেলবে। বড় ধনাত্মক ওজন কোনো সংকেতের প্রভাব বাড়াতে পারে, আর ঋণাত্মক ওজন বিপরীত প্রভাব তৈরি করতে পারে।
কোষটি সাধারণত তথ্যগুলোকে নিজ নিজ ওজন দিয়ে গুণ করে যোগ করে। এর সঙ্গে একটি সমন্বয়যোগ্য অতিরিক্ত মানও যোগ হয়। তারপর সক্রিয়করণ ফাংশন সেই ফলকে রূপান্তর করে পরবর্তী স্তরে পাঠায়।
সক্রিয়করণ কেন দরকার?
সক্রিয়করণ শুধু সংকেত চালু বা বন্ধ করার সুইচ নয়। অনেক ক্ষেত্রে এটি ধারাবাহিক সংখ্যাগত রূপান্তর করে। অরৈখিক সক্রিয়করণ না থাকলে সাধারণ সরল স্তর অনেকগুলো বসিয়েও জটিল সম্পর্ক শেখার ক্ষমতা সীমিত হয়ে যায়।
একটি সাধারণ স্নায়ুজালে থাকে:
- প্রবেশস্তর: ছবি, শব্দ বা অন্য তথ্যের সংখ্যাগত রূপ গ্রহণ করে।
- অভ্যন্তরীণ স্তর: আগের স্তরের ফল থেকে নতুন বৈশিষ্ট্য তৈরি করে।
- ফলস্তর: শ্রেণি, সম্ভাবনা বা পূর্বানুমান প্রকাশ করে।
ছবি চেনার ব্যবস্থায় কোনো স্তর রেখা ও কিনারার মতো বৈশিষ্ট্যের প্রতি সাড়া দিতে পারে। পরবর্তী স্তর আরও জটিল আকৃতি ধরতে পারে। তবে প্রতিটি কোষের কাজ সব সময় মানুষের ভাষায় স্পষ্ট করে ব্যাখ্যা করা যায় না।
উদাহরণ থেকে শেখা: হাতে লেখা সংখ্যা চেনার গল্প
ধরা যাক, একটি স্নায়ুজালকে হাতে লেখা বাংলা সংখ্যা চিনতে শেখানো হবে। প্রতিটি ছবি ছোট ছোট বিন্দুর উজ্জ্বলতার সংখ্যায় রূপান্তর করা হলো। সঙ্গে দেওয়া হলো সঠিক উত্তর—ছবিটি ‘৩’, ‘৫’ নাকি অন্য সংখ্যা।
শুরুতে সংযোগের ওজন সাধারণত ছোট এলোমেলো মানে নির্ধারিত হয়। তাই প্রথম দিকের পূর্বানুমান অনেকটাই ভুল হবে। একটি ‘৩’-এর ছবিকে ব্যবস্থা হয়তো ‘৮’ হওয়ার বেশি সম্ভাবনা দিল।
ভুলের পরিমাণ হিসাব করা
সঠিক উত্তর ও পূর্বানুমানের ব্যবধান একটি ত্রুটি-মাপার ফাংশনে হিসাব করা হয়। শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে এটি শুধু উত্তর ভুল কি না দেখে না; ভুল উত্তরে কতটা আত্মবিশ্বাস ছিল, সেটিও বিবেচনা করতে পারে।
পরবর্তী লক্ষ্য হলো সংযোগের মান এমনভাবে পরিবর্তন করা, যাতে বহু উদাহরণে সামগ্রিক ত্রুটি কমে। একটি ছবি ঠিক চিনলেই শেখা সম্পূর্ণ হয় না। বিভিন্ন মানুষের হাতের লেখা, পুরুত্ব, বাঁক ও অবস্থান দেখতে হয়।
প্রশিক্ষণ সাধারণত ছোট দলে উদাহরণ নিয়ে এগোয়। পুরো প্রশিক্ষণতথ্য একবার ব্যবহার করার পর আবার নতুন পর্যায় শুরু হতে পারে। বারবার এই প্রক্রিয়ায় জালটি উপযোগী সংখ্যাগত সম্পর্ক গড়ে তোলে।
নতুন ছবি দেখানোর সময় সেই শেখা মান ব্যবহার করে ফল তৈরি হয়। উত্তর দেওয়া এবং নতুন করে প্রশিক্ষণ নেওয়া তাই পৃথক কাজ।
ভুল থেকে সংযোগ বদলায় কীভাবে?
স্নায়ুজালের শেখার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন হলো: ফল ভুল হলে কোন সংযোগ কতটা বদলাব? হাজার বা কোটি সমন্বয়যোগ্য মান থাকলে প্রত্যেকটি আলাদাভাবে পরীক্ষা করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল।
অনেক স্নায়ুজালে পশ্চাৎপ্রবাহ পদ্ধতি এই হিসাব সহজ করে। প্রথমে তথ্য সামনের দিকে যায় এবং ফল তৈরি হয়। তারপর ত্রুটির পরিবর্তন প্রতিটি সমন্বয়যোগ্য মানের পরিবর্তনের সঙ্গে কীভাবে সম্পর্কিত, তা বিপরীত ক্রমে হিসাব করা হয়।
ত্রুটির সংবেদনশীলতা ও সংশোধন
পশ্চাৎপ্রবাহ মূলত অন্তরকলনের ধারাবাহিক নিয়ম ব্যবহার করে সংবেদনশীলতা নির্ণয় করে। এর ফলে বোঝা যায়, কোনো ওজন সামান্য বাড়ালে বা কমালে ত্রুটি কোন দিকে বদলানোর সম্ভাবনা আছে।
তারপর সংশোধনকারী অ্যালগরিদম সেই তথ্য ব্যবহার করে ওজন হালনাগাদ করে। পশ্চাৎপ্রবাহ নিজে এবং ওজন পরিবর্তনের পদ্ধতি এক জিনিস নয়; প্রথমটি হিসাব দেয়, দ্বিতীয়টি সেই হিসাব দিয়ে পরিবর্তন করে।
শেখার হার নির্ধারণ করে পরিবর্তনের ধাপ কত বড় হবে। খুব বড় ধাপে ত্রুটি বাড়তে বা শেখা অস্থিতিশীল হতে পারে। খুব ছোট ধাপে অগ্রগতি ধীর হয়।
প্রতিটি সংশোধনে ফল ভালো হবেই—এমন নিশ্চয়তা নেই। ছোট দলের উদাহরণে ওঠানামা থাকে। লক্ষ্য হলো অনেক ধাপের পর নতুন তথ্যেও কার্যকর পূর্বানুমান করা।
মুখস্থ করা আর কার্যকরভাবে শেখার পার্থক্য
একটি স্নায়ুজাল প্রশিক্ষণের ছবিগুলো খুব ভালো চিনেও নতুন ছবি চিনতে ব্যর্থ হতে পারে। তখন বলা যায়, ব্যবস্থাটি উদাহরণের সাধারণ বৈশিষ্ট্যের চেয়ে নির্দিষ্ট তথ্যের খুঁটিনাটি বেশি ধরে ফেলেছে। একে অতিরিক্ত মানানসই হয়ে যাওয়া বলা হয়।
এটি পরীক্ষার প্রশ্ন মুখস্থ করে একই প্রশ্নে ভালো ফল করা, কিন্তু নতুন সমস্যায় আটকে যাওয়ার মতো। তবে তুলনাটি বোঝার সুবিধার জন্য; যন্ত্রের শেখা মানুষের মানসিক অভিজ্ঞতার সমান নয়।
আলাদা তথ্য দিয়ে যাচাই
প্রশিক্ষণের বাইরে কিছু তথ্য রেখে শেখার অগ্রগতি যাচাই করা হয়। চূড়ান্ত মূল্যায়নের তথ্যও আলাদা রাখা দরকার। একই তথ্য বারবার দেখে সিদ্ধান্ত নিলে নতুন পরিস্থিতিতে সক্ষমতা সম্পর্কে অতিরিক্ত আশাবাদ তৈরি হতে পারে।
তথ্যের বৈচিত্র্যও জরুরি। শুধু পরিষ্কার সাদা পটভূমিতে বিড়ালের ছবি দিলে ব্যবস্থা পটভূমির সূত্র ব্যবহার করতে পারে। পরে অন্ধকার বা ভিন্ন পরিবেশে ভুল হতে পারে।
এই সমস্যা দেখায়, সঠিক উত্তর দেওয়া মানেই মানুষের মতো অর্থ বোঝা নিশ্চিত নয়। ব্যবস্থাটি অনেক সময় এমন সম্পর্ক কাজে লাগায়, যা প্রশিক্ষণতথ্যে কার্যকর হলেও বাস্তব জীবনে নির্ভরযোগ্য নয়।
আরও তথ্য, উপযুক্ত কাঠামো, নিয়ন্ত্রিত প্রশিক্ষণ ও সতর্ক যাচাই এসব ঝুঁকি কমাতে পারে; পুরোপুরি দূর করার নিশ্চয়তা দেয় না।
মানুষের মস্তিষ্কের সঙ্গে মিল কোথায়, সীমা কোথায়?
মস্তিষ্ক ও কৃত্রিম স্নায়ুজাল—দুই ক্ষেত্রেই সংযোগ এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে পরিবর্তনের ধারণা গুরুত্বপূর্ণ। জৈব স্নায়ুব্যবস্থায় সংযোগের কার্যকারিতা বদলাতে পারে। কৃত্রিম ব্যবস্থায় প্রশিক্ষণ সংযোগের ওজন ও অন্যান্য মান বদলায়।
কিন্তু মানুষের শেখা শরীর, পরিবেশ, স্মৃতি, মনোযোগ ও সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে যুক্ত। মস্তিষ্কও শুধু একদিকে চলা স্তরের সারি নয়; এতে ব্যাপক পুনঃসংযোগ ও সময়নির্ভর কার্যক্রম রয়েছে।
মস্তিষ্ক কি পশ্চাৎপ্রবাহ ব্যবহার করে?
সাধারণ কম্পিউটারভিত্তিক পশ্চাৎপ্রবাহ হুবহু মস্তিষ্কে চলে—এটি প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। স্নায়ুবিজ্ঞানে গবেষণা চলছে, জৈব ব্যবস্থা কীভাবে ভুলসংক্রান্ত তথ্য ব্যবহার করে এবং কৃত্রিম পদ্ধতির সঙ্গে তার কতটা মিল রয়েছে।
সব স্নায়ুজাল সঠিক উত্তর লেখা উদাহরণ দিয়েও শেখে না। কিছু পদ্ধতি তথ্যের অংশ অনুমান করে, আবার কিছু পরিবেশে কাজের ফল বা পুরস্কারের সংকেত ব্যবহার করে।
কৃত্রিম স্নায়ুজালের সাফল্য তাই মস্তিষ্কের নিখুঁত অনুকরণে নয়। বহু উদাহরণ থেকে সমন্বয়যোগ্য গণনাব্যবস্থা তৈরি করে কার্যকর সম্পর্ক শেখাই তার শক্তি। এই পার্থক্য বুঝলে প্রযুক্তিটি কী পারে এবং কোথায় সতর্কভাবে যাচাই করা দরকার—দুটিই পরিষ্কার হয়।
কোয়ান্টাম এনট্যাঙ্গলমেন্ট কী? আইনস্টাইনের ‘ভৌতিক’ আপত্তি ও বিজ্ঞানের উত্তর
ডেটা সেন্টারের ভেতরে কী থাকে? ইন্টারনেটের অদৃশ্য অবকাঠামোর পরিচয়
পেনিসিলিন কীভাবে চিকিৎসাবিজ্ঞান বদলেছে? নোবেল পুরস্কার ও প্রতিরোধের ইতিহাস
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে পেনিসিলিনের ব্যাপক উৎপাদন কীভাবে শুরু হয়েছিল?
ফ্লোরি ও চেইন কীভাবে পেনিসিলিনকে জীবনরক্ষাকারী ওষুধে রূপ দিলেন?
আবিষ্কারের পরও পেনিসিলিন কেন এক দশক চিকিৎসায় আসেনি?