অ্যাপোলো ১১-এর প্রত্যাবর্তন: চাঁদ থেকে পৃথিবীতে ফেরার ইতিহাস
সিরিজ: চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৯
২৪ জুলাই ১৯৬৯: নিরাপদ প্রত্যাবর্তনে পূর্ণ হয় চন্দ্রজয়ের অভিযান।
চন্দ্রপৃষ্ঠের কাজ শেষ করে নীল আর্মস্ট্রং ও বাজ অলড্রিন ঈগলের ক্যাবিনে ফিরে এসেছিলেন। তাঁদের সঙ্গে ছিল পাথর, মাটি, সৌরবায়ু সংগ্রহের ফয়েল এবং তোলা ছবির ফিল্ম। কিন্তু এসব পৃথিবীতে পৌঁছানো পর্যন্ত অভিযানের বৈজ্ঞানিক উদ্দেশ্য পূর্ণ হবে না। সামনে প্রথম বাধা ছিল চাঁদ থেকে উড্ডয়ন, তারপর কক্ষপথে মাইকেল কলিন্সের সঙ্গে পুনর্মিলন। চাঁদে নামা যতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেখান থেকে জীবিত ফিরে আসাও ততটাই অপরিহার্য ছিল। কেনেডির ঘোষিত লক্ষ্যেও নিরাপদ প্রত্যাবর্তন স্পষ্টভাবে অন্তর্ভুক্ত ছিল।
প্রস্তুতির সময় ঈগলের দুই অংশের ভূমিকা বদলে যায়। নিচের অবতরণ ধাপ, তার পা ও অবতরণ ইঞ্জিন চাঁদেই থেকে যাবে। ওপরের ছোট অংশে থাকবেন দুই নভোচারী; সেটির নিজস্ব ইঞ্জিন তাঁদের কক্ষপথে তুলবে। নিচের অংশটি কার্যত উৎক্ষেপণমঞ্চ হিসেবে ব্যবহৃত হবে। এতে পৃথিবীতে ফেরার জন্য অপ্রয়োজনীয় ভার বহন করতে হয়নি। তবে ঊর্ধ্বাংশের ইঞ্জিন ঠিকমতো কাজ করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। চন্দ্রপৃষ্ঠে আটকে পড়লে তাঁদের উদ্ধারের জন্য প্রস্তুত কোনো দ্বিতীয় যান ছিল না।
২১ জুলাই বিশ্বসময় প্রায় ১৭টা ৫৪ মিনিটে ঈগলের ঊর্ধ্বাংশ চাঁদ থেকে উড্ডয়ন করে। প্রায় সাড়ে একুশ ঘণ্টার চন্দ্রপৃষ্ঠ অবস্থান শেষ হয়। ইঞ্জিনে এমন জ্বালানি ও অক্সিডাইজার ব্যবহৃত হতো, যা পরস্পরের সংস্পর্শে নিজে থেকেই জ্বলে ওঠে; আলাদা স্ফুলিঙ্গের ব্যবস্থা দরকার ছিল না। কিন্তু শুধু ওপরের দিকে ওঠা যথেষ্ট নয়। কলাম্বিয়ার সঙ্গে মিলিত হওয়ার উপযোগী কক্ষপথে পৌঁছাতে ঈগলকে ধীরে ধীরে সামনের দিকে গতি অর্জন করতে হয়। নির্দেশনা ব্যবস্থা, ইঞ্জিন এবং নভোচারীদের পর্যবেক্ষণ একসঙ্গে কাজ করছিল।
কলিন্স এই সময় কলাম্বিয়ায় থেকে পুনর্মিলনের প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। তাঁর কাজ নিছক অপেক্ষা করা ছিল না; নিজের যানের অবস্থান, যোগাযোগ ও সম্ভাব্য বিকল্প ব্যবস্থা পর্যবেক্ষণ করতে হচ্ছিল। ঈগল নির্ধারিত কক্ষপথে পৌঁছানোর পর কয়েক দফা চালনায় দুই যান কাছাকাছি আসে। মহাশূন্যে মিলিত হতে সরাসরি অন্য যানটির দিকে ছুটলেই হয় না। উচ্চতা ও গতির পরিবর্তন কক্ষপথকে বদলে দেয়। তাই পুনর্মিলন ছিল হিসাব করা সময়ে সঠিক কক্ষপথ অর্জনের প্রক্রিয়া, যার অনুশীলন জেমিনি কর্মসূচি থেকে চলে আসছিল।
উড্ডয়নের প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা পরে ঈগল ও কলাম্বিয়ার ডকিং সম্পন্ন হয়। সংযোগের নিরাপত্তা এবং দুই যানের মধ্যবর্তী পথের চাপ যাচাই করে হ্যাচ খোলা হয়। আর্মস্ট্রং ও অলড্রিন ফিরে আসেন কলিন্সের কাছে। নমুনার বাক্স, ফিল্ম ও দরকারি সরঞ্জামও কলাম্বিয়ায় সরানো হয়। চন্দ্রধুলা যতটা সম্ভব পরিষ্কার করার চেষ্টা করা হয়েছিল। তারপর ঈগলের ঊর্ধ্বাংশ আলাদা করে দেওয়া হয়। পৃথিবীতে ফেরার জন্য তিন নভোচারী আবার একই ক্যাপসুলে একত্র হন, আর ঈগলের ভূমিকা শেষ হয়।
এবার চাঁদের কক্ষপথ ছাড়তে হবে। ২২ জুলাই বিশ্বসময় অনুযায়ী ভোরে সার্ভিস মডিউলের প্রধান ইঞ্জিন প্রায় আড়াই মিনিট চালানো হয়। এই চালনা, ট্রান্স-আর্থ ইনজেকশন, কলাম্বিয়াকে পৃথিবীমুখী গতিপথে পাঠায়। ঘটনাটি ঘটে চাঁদের আড়ালে, যখন সরাসরি রেডিও যোগাযোগ বন্ধ ছিল। ইঞ্জিন ঠিকমতো কাজ না করলে ফিরতি পথ তৈরি হতো না। চাঁদের আড়াল থেকে বেরিয়ে যোগাযোগ ফিরে এলে হিউস্টন নিশ্চিত হয়, নভোচারীরা পৃথিবীর দিকে রওনা হয়েছেন। অভিযানের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বাধা তখন অতিক্রান্ত।
ফেরার পথে অবিরাম প্রধান ইঞ্জিন চালানোর প্রয়োজন হয়নি। নির্ধারিত গতিপথে চলতে চলতে পৃথিবীর মাধ্যাকর্ষণের প্রভাবে মহাকাশযানের গতি বাড়ছিল। প্রয়োজনীয় ছোট সংশোধন করে বায়ুমণ্ডলে প্রবেশের পথ ঠিক রাখা হয়। যানের বিভিন্ন অংশ যেন অসমভাবে গরম বা ঠান্ডা না হয়, সেজন্য সেটিকে ধীরে ঘোরানো হচ্ছিল। নভোচারীরা বিশ্রাম নেন, যন্ত্র পরীক্ষা করেন এবং টেলিভিশনে অভিজ্ঞতা জানান। কলিন্স বিশেষভাবে স্মরণ করেন সেই অসংখ্য কর্মীর অবদান, যাঁদের নির্মিত ব্যবস্থা তাঁদের নিরাপদে বহন করছিল।
পৃথিবীর কাছে পৌঁছানোর পর সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ ছিল বিপুল গতি কমানো। চাঁদ থেকে ফেরার সময় মহাকাশযান প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ১১ কিলোমিটার গতিতে বায়ুমণ্ডলে ঢুকছিল। এই গতিতে প্যারাস্যুট খোলা সম্ভব নয়। প্রথমে বায়ুমণ্ডলের প্রতিরোধ ব্যবহার করে গতি কমাতে হবে। প্রবেশের কোণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ: বেশি খাড়া হলে তাপ ও ত্বরণ সহ্যের সীমা ছাড়াতে পারে; বেশি অগভীর হলে কাঙ্ক্ষিত পথে নামা ব্যাহত হতে পারে। নিরাপদ পুনঃপ্রবেশ নির্ভর করছিল সঠিক গতিপথ ও তাপঢালের কার্যকারিতার ওপর।
২৪ জুলাই বায়ুমণ্ডলে ঢোকার আগে কমান্ড মডিউল সার্ভিস মডিউল থেকে বিচ্ছিন্ন হয়। প্রধান ইঞ্জিন ও বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থা বহনকারী অংশটি আর সঙ্গে থাকবে না। তিন নভোচারী ও চন্দ্রনমুনা ফিরবে শুধু কলাম্বিয়ার শঙ্কু আকৃতির ক্যাপসুলে। নিচের প্রশস্ত তাপঢালটি সামনের দিকে রেখে সেটি বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে। যানের সামনে বায়ু প্রবলভাবে সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয়। তাপঢালের উপাদান ক্ষয় হয়ে তাপের একটি অংশ সরিয়ে নেয়। বাইরের পরিবেশ অত্যন্ত উত্তপ্ত হলেও ক্যাবিনের বাসযোগ্য অবস্থা বজায় থাকে।
পুনঃপ্রবেশের সময় উত্তপ্ত আয়নিত গ্যাসের কারণে কিছু সময় রেডিও যোগাযোগ ব্যাহত হয়। নিয়ন্ত্রকদের অপেক্ষা করতে হয়েছিল যোগাযোগ ফিরে আসার জন্য। গতি যথেষ্ট কমলে প্রথমে ছোট স্থিতিশীলকারী প্যারাস্যুট এবং পরে তিনটি প্রধান প্যারাস্যুট খোলে। এভাবেই মহাকাশের প্রচণ্ড গতি থেকে সমুদ্রে নামার উপযোগী অবস্থায় আসে কলাম্বিয়া। মূল অবতরণ এলাকায় খারাপ আবহাওয়ার কারণে লক্ষ্যস্থান আগে বদলানো হয়েছিল। উদ্ধারকারী জাহাজও নতুন স্থানের দিকে এগিয়ে যায়। প্রত্যাবর্তন তাই মহাকাশযানের পাশাপাশি আবহাওয়া ও নৌ-উদ্ধার ব্যবস্থার সমন্বয় দাবি করেছিল।
২৪ জুলাই ১৯৬৯ বিশ্বসময় প্রায় ১৬টা ৫০ মিনিটে কলাম্বিয়া প্রশান্ত মহাসাগরে নামে। উৎক্ষেপণ থেকে অভিযানটির মোট সময় ছিল প্রায় আট দিন তিন ঘণ্টা। প্রথমে ক্যাপসুলটি উল্টো অবস্থায় ভাসছিল; নির্ধারিত ভাসমান ব্যাগ ফুলে সেটিকে সোজা করে। কাছেই অবস্থান করছিল উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার, আর প্রধান উদ্ধারজাহাজ ছিল ইউএসএস হর্নেট। সমুদ্রে নিরাপদে নামা বড় সাফল্য হলেও ঢেউয়ের মধ্যে ক্যাপসুল স্থিতিশীল করা এবং নভোচারীদের বের করে আনার কাজ তখনও বাকি ছিল।
নৌবাহিনীর সাঁতারুরা ক্যাপসুলের চারপাশে ভাসমান কলার লাগান এবং উদ্ধারভেলা প্রস্তুত করেন। নভোচারীরা বিশেষ জৈবিক পৃথকীকরণ পোশাক পরে বাইরে আসেন। সম্ভাব্য দূষণ নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা নেওয়ার পর তাঁদের একে একে হেলিকপ্টারে তোলা হয় এবং হর্নেটে নিয়ে যাওয়া হয়। পৃথিবীতে ফিরে সঙ্গে সঙ্গে সবার সঙ্গে মেলামেশার অনুমতি ছিল না। অজানা চন্দ্রজীবাণু পৃথিবীতে নিয়ে আসার সম্ভাবনা যাচাইয়ের জন্য কোয়ারেন্টিন পরিকল্পনা করা হয়েছিল। এটি জীবাণু পাওয়ার প্রমাণ নয়, তখনকার অনিশ্চয়তার ভিত্তিতে নেওয়া সতর্কতা ছিল।
হর্নেটে তাঁরা প্রবেশ করেন মোবাইল কোয়ারেন্টিন ফ্যাসিলিটিতে। প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন তাঁদের স্বাগত জানান, কিন্তু পৃথকীকরণ বজায় রেখেই। পরে নভোচারীদের হিউস্টনের লুনার রিসিভিং ল্যাবরেটরিতে নেওয়া হয়; নমুনাও নিয়ন্ত্রিত ব্যবস্থায় গবেষণার জন্য পাঠানো হয়। কোয়ারেন্টিনের সময় গণনা করা হয়েছিল চাঁদ ছাড়ার দিন থেকে, শুধু সমুদ্রে নামার দিন থেকে নয়। চিকিৎসা পর্যবেক্ষণ ও পরীক্ষায় বিপজ্জনক চন্দ্রজীবাণুর প্রমাণ পাওয়া যায়নি। প্রত্যাবর্তনের পরও তাই অভিযানসম্পর্কিত পরীক্ষা ও মূল্যায়ন চলেছিল।
অ্যাপোলো ১১ স্নায়ুযুদ্ধের মহাকাশ প্রতিযোগিতায় যুক্তরাষ্ট্রকে একটি নির্ধারক সাফল্য দেয়। কিন্তু এর গুরুত্ব শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নকে পেছনে ফেলার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না। প্রথমবার মানুষ অন্য একটি জগতে নেমে কাজ করে নিরাপদে ফিরে এসেছিল। এই অভিজ্ঞতা পরবর্তী চন্দ্রাভিযানে দীর্ঘতর অবস্থান ও বিস্তৃত গবেষণার পথ তৈরি করে। নমুনার পরীক্ষায় চাঁদের আগ্নেয় ও আঘাতজনিত ইতিহাস বোঝা যায়, আর অভিযানের প্রকৌশল ব্যবস্থাপনা দেখায়—স্পষ্ট লক্ষ্য, ধারাবাহিক পরীক্ষা ও বিপুল সহযোগিতা দিয়ে কত জটিল কাজ সম্পন্ন করা সম্ভব।
তবু চন্দ্রজয় স্থায়ীভাবে সীমাহীন মহাকাশ বাজেট নিশ্চিত করেনি। পরবর্তী রাজনৈতিক অগ্রাধিকার ও অর্থনৈতিক সিদ্ধান্তে কর্মসূচি সংকুচিত হয়; ১৯৭২ সালে অ্যাপোলো ১৭ শেষ মানুষবাহী অ্যাপোলো চন্দ্রাবতরণ সম্পন্ন করে। এই সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ১৯৬৯ সালের অর্জন অম্লান। সাফল্যের পূর্ণ অর্থ তৈরি হয়েছিল প্রথম পদচিহ্ন, সংগ্রহ করা বৈজ্ঞানিক প্রমাণ এবং তিনজনের নিরাপদ প্রত্যাবর্তন একত্র হওয়ায়। ২৪ জুলাই সমুদ্র থেকে উদ্ধার হওয়া ছোট ক্যাপসুলটি তাই একটি অভিযানের সমাপ্তির পাশাপাশি মানুষের পৃথিবীর বাইরে অনুসন্ধানক্ষমতার নতুন অধ্যায়ের সাক্ষ্য হয়ে দাঁড়ায়।
চাঁদে পায়ের ছাপ কতদিন টিকে থাকে? ধুলোমাটিতে মানুষের পদচিহ্নের বিজ্ঞান
ব্ল্যাক হোল কি পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে
সূর্যের চেয়েও বড় নক্ষত্র কতটা বিশাল হতে পারে?
ফার্মি প্যারাডক্স: মহাবিশ্বে এত গ্রহ থাকলেও এলিয়েনরা কোথায়?
মহাকাশে এত উপগ্রহ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ায়?
নক্ষত্রগুলো রাতে মিটমিট করে কিন্তু গ্রহগুলো করে না কেন?