কিম জং-উনের পারমাণবিক পরীক্ষা: উত্তর কোরিয়ার উসকানি ও বিচ্ছিন্নতার ইতিহাস
পারমাণবিক শক্তির প্রদর্শন উত্তর কোরিয়াকে নিরাপত্তার দাবি ও আন্তর্জাতিক নিষেধাজ্ঞার দ্বন্দ্বে ফেলেছিল।
২০১৭ সালের ৩ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়ার উত্তর-পূর্বাঞ্চলের পাহাড়ি এলাকায় প্রবল ভূকম্পন শনাক্ত হয়। এটি সাধারণ ভূমিকম্পের মতো ঘটনা ছিল না। আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণব্যবস্থায় ধরা পড়া সংকেত একটি বড় কৃত্রিম বিস্ফোরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল। কিছুক্ষণের মধ্যে পিয়ংইয়ং ঘোষণা করে, তারা আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রে বহনযোগ্য হাইড্রোজেন বোমা পরীক্ষা করেছে। বিশ্বজুড়ে উদ্বেগ ছড়িয়ে পড়ে। কিম জং-উনের নেতৃত্বে উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক কর্মসূচি তখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছিল, যেখানে একটি আঞ্চলিক সংকট যুক্তরাষ্ট্রসহ বৃহত্তর বিশ্বের নিরাপত্তার প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়।
এই কর্মসূচি অবশ্য কিম জং-উন শুরু করেননি। উত্তর কোরিয়া প্রথম পারমাণবিক পরীক্ষা চালায় ২০০৬ সালে, দ্বিতীয়টি ২০০৯ সালে। দুটিই তাঁর বাবা কিম জং-ইলের শাসনামলে হয়। ২০১১ সালের ডিসেম্বরে বাবার মৃত্যুর পরে ক্ষমতায় এসে কিম জং-উন বিদ্যমান কর্মসূচিকে আরও দ্রুত এগিয়ে নেন। তাঁর আমলে ২০১০-এর দশকে চারটি পারমাণবিক পরীক্ষা হয়: ২০১৩ সালে একটি, ২০১৬ সালে দুটি এবং ২০১৭ সালে একটি। ফলে সেই দশকের শেষে দেশটির মোট পরীক্ষার সংখ্যা দাঁড়ায় ছয়।
উত্তর কোরিয়ার নেতৃত্ব পারমাণবিক অস্ত্রকে রাষ্ট্র ও শাসনব্যবস্থার নিরাপত্তার নিশ্চয়তা হিসেবে তুলে ধরে। কোরীয় যুদ্ধের অবসান একটি অস্ত্রবিরতির মাধ্যমে হওয়ায় উপদ্বীপে স্থায়ী শান্তিচুক্তির অনুপস্থিতি, দক্ষিণ কোরিয়ায় মার্কিন সেনা এবং যৌথ সামরিক মহড়াকে পিয়ংইয়ং হুমকি হিসেবে ব্যবহার করে। বিশ্লেষকদের মতে, অস্ত্র কর্মসূচি একই সঙ্গে প্রতিপক্ষকে আক্রমণ থেকে বিরত রাখা, আলোচনায় সুবিধা অর্জন এবং দেশের ভেতরে নেতৃত্বের শক্তি প্রদর্শনের উপায় ছিল। তবে এই নিরাপত্তার যুক্তি প্রতিবেশীদের উদ্বেগ দূর করেনি।
কিম জং-উনের আমলে প্রথম পরীক্ষা হয় ২০১৩ সালের ১২ ফেব্রুয়ারি। পুঙ্গিয়ে-রির ভূগর্ভস্থ পরীক্ষাস্থলের কাছে আন্তর্জাতিক পর্যবেক্ষণকেন্দ্রগুলো অস্বাভাবিক ভূকম্পন শনাক্ত করে। উত্তর কোরিয়া দাবি করে, তারা ছোট ও হালকা একটি পারমাণবিক যন্ত্র পরীক্ষা করেছে। এই দাবির গুরুত্ব ছিল অস্ত্রকে ক্ষেপণাস্ত্রে বহনের উপযোগী করার প্রশ্নে। কিন্তু সফল বিস্ফোরণ এবং নির্ভরযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্রবাহিত অস্ত্র এক বিষয় নয়। একটি বিস্ফোরণের তথ্য দিয়ে অস্ত্রের আকার, নিরাপত্তা ও বাস্তব ব্যবহারের সব সক্ষমতা নিশ্চিত করা যায় না।
২০১৬ সালের ৬ জানুয়ারির পরীক্ষায় পিয়ংইয়ং প্রথম হাইড্রোজেন বোমার সফল বিস্ফোরণের ঘোষণা দেয়। হাইড্রোজেন বোমায় পরমাণুর সংযোজনের প্রক্রিয়া যুক্ত থাকে এবং উপযুক্ত নকশায় তা সাধারণ বিভাজনভিত্তিক অস্ত্রের তুলনায় অনেক বেশি শক্তি উৎপন্ন করতে পারে। কিন্তু ওই পরীক্ষার বিস্ফোরণমাত্রা দেখে বহু বিশেষজ্ঞ পূর্ণাঙ্গ তাপপারমাণবিক অস্ত্রের দাবিতে সন্দেহ প্রকাশ করেন। দেশটির ঘোষণা ও স্বাধীনভাবে যাচাই করা তথ্যের মধ্যে এই ব্যবধান গুরুত্বপূর্ণ। বাইরের গবেষকেরা পরীক্ষাস্থলে সরাসরি প্রবেশ করতে না পারায় অনিশ্চয়তা থেকেই যায়।
একই বছরের ৯ সেপ্টেম্বর উত্তর কোরিয়া আবার পরীক্ষা চালায়। এবার তাদের ঘোষণায় পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্রের কার্যকারিতা ও মানসম্মত উৎপাদনের ওপর জোর দেওয়া হয়। অর্থাৎ বার্তাটি শুধু একটি পরীক্ষামূলক যন্ত্র বিস্ফোরণের ছিল না; ব্যবহারযোগ্য অস্ত্রভান্ডার তৈরির দিকে অগ্রগতির দাবি ছিল। একই বছরে দুটি পরীক্ষা আন্তর্জাতিক মহলে আশঙ্কা বাড়ায় যে কূটনৈতিক চাপ কর্মসূচির গতি থামাতে পারছে না। দক্ষিণ কোরিয়া ও জাপানের কাছে এটি ছিল সরাসরি নিরাপত্তার উদ্বেগ।
২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরের পরীক্ষা আগেরগুলোর তুলনায় অনেক বড় ছিল। আন্তর্জাতিক পারমাণবিক পরীক্ষা পর্যবেক্ষণব্যবস্থার একশর বেশি কেন্দ্র বিশ্লেষণে তথ্য সরবরাহ করে। বিস্ফোরণের শক্তি নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার হিসাবে পার্থক্য থাকলেও আগের পরীক্ষাগুলোর তুলনায় বড় বৃদ্ধি স্পষ্ট ছিল। এটি শক্তিশালী তাপপারমাণবিক যন্ত্রের সম্ভাবনাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে। তবু ভূকম্পন থেকে বিস্ফোরণের মাত্রা অনুমান করা এবং অস্ত্রের সম্পূর্ণ অভ্যন্তরীণ নকশা নিশ্চিত করা আলাদা কাজ।
এখানে পারমাণবিক পরীক্ষা ও ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষার পার্থক্য বোঝা জরুরি। প্রথমটি বিস্ফোরক যন্ত্রের কার্যকারিতা সম্পর্কে তথ্য দেয়; দ্বিতীয়টি অস্ত্র বহনের ব্যবস্থার পাল্লা ও উড্ডয়নক্ষমতা যাচাই করে। ২০১৭ সালে উত্তর কোরিয়ার আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষাগুলো এই দুই কর্মসূচিকে একই নিরাপত্তা আলোচনায় নিয়ে আসে। তবে পরীক্ষায় দীর্ঘ পাল্লার সম্ভাবনা দেখানো মানেই সব পরিস্থিতিতে নির্ভরযোগ্য আঘাতের সক্ষমতা প্রমাণিত হওয়া নয়। লক্ষ্যভেদের নির্ভুলতা এবং বায়ুমণ্ডলে পুনঃপ্রবেশের সময় অস্ত্রের সুরক্ষাও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন ছিল।
যুক্তরাষ্ট্র ও উত্তর কোরিয়ার তীব্র হুমকি-পাল্টা হুমকি পরিস্থিতিকে আরও বিপজ্জনক করে তোলে। সামরিক শক্তিপ্রদর্শন প্রতিপক্ষের কাছে আত্মরক্ষার প্রস্তুতি নাকি আক্রমণের সংকেত—এই পার্থক্য ভুল বোঝার ঝুঁকি তৈরি হয়। বিশেষত কোরীয় উপদ্বীপে বিপুল জনসংখ্যা ও সামরিক উপস্থিতির কারণে সংঘাতের মূল্য অত্যন্ত বেশি হতে পারত। পারমাণবিক অস্ত্র শুধু ব্যবহারের সম্ভাবনার জন্য নয়, ভুল হিসাব ও সংকটের অনিয়ন্ত্রিত বিস্তারের কারণেও উদ্বেগ সৃষ্টি করে।
জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ধারাবাহিকভাবে নিষেধাজ্ঞা বাড়ায়। ২০১৬ সালের সিদ্ধান্তগুলো বাণিজ্য, আর্থিক লেনদেন এবং সামরিক কর্মসূচির সঙ্গে যুক্ত প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ বিস্তৃত করে। ২০১৭ সালের সেপ্টেম্বরে গৃহীত ২৩৭৫ নম্বর প্রস্তাবে বস্ত্র রপ্তানি নিষিদ্ধ করা হয় এবং জ্বালানি সরবরাহসহ বিভিন্ন খাতে নতুন সীমাবদ্ধতা আসে। ডিসেম্বরে ২৩৯৭ নম্বর প্রস্তাব পরিশোধিত জ্বালানির সীমা আরও কঠোর করে এবং বিদেশে কর্মরত উত্তর কোরীয় শ্রমিকদের প্রত্যাবর্তনের ব্যবস্থা যুক্ত করে। উদ্দেশ্য ছিল অস্ত্র কর্মসূচির জন্য বৈদেশিক আয় ও সম্পদ পাওয়ার সুযোগ সংকুচিত করা।
এই বিচ্ছিন্নতা সম্পূর্ণ যোগাযোগহীনতা ছিল না। চীন উত্তর কোরিয়ার গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক অংশীদার হিসেবে থেকে যায়। সে পারমাণবিক পরীক্ষার বিরোধিতা ও নিষেধাজ্ঞা সমর্থন করলেও সীমান্তের অস্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। নিষেধাজ্ঞা ফাঁকি দেওয়ার অভিযোগ ও বাস্তবায়নের সীমাবদ্ধতাও চাপের কার্যকারিতা কমায়। অন্যদিকে সাধারণ মানুষের জীবনে অর্থনৈতিক বিধিনিষেধের প্রভাব এবং মানবিক সহায়তা পৌঁছানোর বাধা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়। উত্তর কোরিয়ার দুরবস্থাকে শুধু নিষেধাজ্ঞা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায় না; অভ্যন্তরীণ নীতি ও সামরিক অগ্রাধিকারও বিবেচ্য।
২০১৮ সালে উত্তেজনার মধ্যে কূটনৈতিক পরিবর্তন আসে। দক্ষিণ কোরিয়ার সঙ্গে যোগাযোগ বাড়ে, কিম পারমাণবিক ও আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্র পরীক্ষা স্থগিতের ঘোষণা দেন এবং পরীক্ষাস্থলের কিছু সুড়ঙ্গপ্রবেশপথ ধ্বংস করা হয়। জুনে সিঙ্গাপুরে ডোনাল্ড ট্রাম্প ও কিম জং-উন বৈঠক করেন। তাঁদের যৌথ ঘোষণায় নতুন সম্পর্ক, শান্তি এবং কোরীয় উপদ্বীপের পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুতি থাকে। কিন্তু অস্ত্রের পূর্ণ তালিকা, যাচাইব্যবস্থা এবং নির্দিষ্ট সময়সূচি অনুপস্থিত ছিল।
২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারিতে হ্যানয়ের দ্বিতীয় শীর্ষ বৈঠক কোনো চুক্তি ছাড়াই শেষ হয়। উত্তর কোরিয়ার পারমাণবিক স্থাপনায় ছাড়ের বিনিময়ে কতটা নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার হবে এবং কোন পদক্ষেপ আগে নেওয়া হবে—এসব প্রশ্নে সমঝোতা হয়নি। পরীক্ষা স্থগিত থাকা অস্ত্রভান্ডার ধ্বংস বা কর্মসূচি বন্ধ হওয়ার সমান ছিল না। দশকের শেষে তাই সামরিক উন্নয়ন, অর্থনৈতিক চাপ ও অসম্পূর্ণ আলোচনার দ্বন্দ্ব অমীমাংসিত থেকে যায়। এই ইতিহাস দেখায়, পারমাণবিক শক্তি প্রদর্শন আলোচনার দরজা খুলতে পারে, কিন্তু স্থায়ী নিরাপত্তার জন্য যাচাইযোগ্য পদক্ষেপ ও রাজনৈতিক আস্থা অপরিহার্য।
সুন্দরবন কীভাবে বাংলাদেশ ও ভারতের উপকূলকে রক্ষা করে?
মাউন্ট ফুজি: জাপানের শঙ্কু আকৃতির আগ্নেয়গিরি এত বিখ্যাত কেন?
ক্যাস্পিয়ান সাগর: নাম সাগর হলেও কেন এটি পৃথিবীর বৃহত্তম হ্রদ?
নীল নদ: হাজার বছর ধরে উত্তর-পূর্ব আফ্রিকার জীবন ও সভ্যতা গড়ে তোলার গল্প
গ্রিনল্যান্ড: পৃথিবীর বৃহত্তম দ্বীপের অধিকাংশ বরফে ঢাকা কেন?
১১ সেপ্টেম্বরের হামলা: ২০০১ সালে যুক্তরাষ্ট্রে কী ঘটেছিল এবং বিশ্ব কীভাবে বদলে গেল?