মহাকাশ প্রতিযোগিতা ও অ্যাপোলো: যুক্তরাষ্ট্রের চাঁদ জয়ের প্রস্তুতি
সিরিজ: চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণ: ১৯৬৯
স্নায়ুযুদ্ধের প্রতিযোগিতা থেকে মানুষের চন্দ্রযাত্রার প্রস্তুতি।
১৯৬৯ সালে চাঁদে মানুষের প্রথম পদার্পণের গল্প শুরু হয়েছিল পৃথিবীর দুই প্রতিদ্বন্দ্বী পরাশক্তির ক্ষমতা প্রদর্শনের লড়াই থেকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়ন বুঝেছিল, যে দেশ শক্তিশালী রকেট তৈরি করতে পারবে, সে পারমাণবিক অস্ত্র বহন এবং মহাকাশ অনুসন্ধান—উভয় ক্ষেত্রেই সুবিধা পাবে। ফলে মহাকাশ হয়ে উঠেছিল স্নায়ুযুদ্ধের নতুন মঞ্চ। চাঁদে যাওয়ার প্রস্তুতি ছিল বিজ্ঞান, সামরিক প্রযুক্তি, রাজনৈতিক মর্যাদা ও বিপুল সাংগঠনিক সক্ষমতার মিলিত ফল। এই প্রতিযোগিতার প্রথম বড় ধাক্কাটি দিয়েছিল সোভিয়েত ইউনিয়ন।
১৯৫৭ সালের ৪ অক্টোবর সোভিয়েতরা পৃথিবীর কক্ষপথে পাঠায় স্পুটনিক-১, মানুষের তৈরি প্রথম কৃত্রিম উপগ্রহ। প্রায় ৮৪ কিলোগ্রাম ওজনের ধাতব গোলকটির রেডিও সংকেত যুক্তরাষ্ট্রে প্রযুক্তিগত পিছিয়ে পড়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে। উপগ্রহ বহনকারী রকেট এত দূরে পৌঁছাতে পারলে একই প্রযুক্তি আন্তমহাদেশীয় ক্ষেপণাস্ত্রেও কাজে লাগতে পারে। নভেম্বরে স্পুটনিক-২-এ লাইকা নামের কুকুরকে পাঠিয়ে সোভিয়েতরা আরও এগিয়ে যায়। অন্যদিকে ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের ভ্যানগার্ড উপগ্রহ উৎক্ষেপণের প্রচেষ্টা লঞ্চপ্যাডেই ব্যর্থ হওয়ায় পরিস্থিতি আরও বিব্রতকর হয়ে ওঠে।
যুক্তরাষ্ট্র ১৯৫৮ সালের ৩১ জানুয়ারি এক্সপ্লোরার-১ উৎক্ষেপণ করে প্রথম উপগ্রহ পাঠাতে সক্ষম হয়। একই বছর প্রতিষ্ঠিত হয় ন্যাশনাল অ্যারোনটিক্স অ্যান্ড স্পেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বা নাসা, যা ১ অক্টোবর কার্যক্রম শুরু করে। এর মাধ্যমে বেসামরিক মহাকাশ গবেষণার জন্য একটি কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে ওঠে। তবে নাসা শূন্য থেকে যাত্রা শুরু করেনি। পূর্ববর্তী বিমান গবেষণা সংস্থা নাকা, সামরিক রকেট কর্মসূচি, বিশ্ববিদ্যালয় এবং শিল্পপ্রতিষ্ঠানের অভিজ্ঞতা একত্র করা হয়েছিল। বিচ্ছিন্ন উদ্যোগগুলোকে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় কর্মসূচিতে রূপ দেওয়াই ছিল গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন।
তারপরও মানুষের মহাকাশযাত্রায় সোভিয়েতরাই প্রথম সাফল্য পায়। ১৯৬১ সালের ১২ এপ্রিল ইউরি গ্যাগারিন ভোস্টক-১-এ পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। ঘটনাটি দেখিয়েছিল, মানুষ মহাকাশে পৌঁছে জীবিত ফিরে আসতে পারে। যুক্তরাষ্ট্রের অ্যালান শেপার্ড ৫ মে মহাকাশে গেলেও তাঁর যাত্রা ছিল উপকক্ষপথীয়; তিনি পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেননি। সোভিয়েত অগ্রগতির সামনে প্রেসিডেন্ট জন এফ. কেনেডি এমন একটি লক্ষ্য খুঁজছিলেন, যেখানে প্রতিযোগিতা তখনও উন্মুক্ত এবং যথেষ্ট বিনিয়োগ করলে যুক্তরাষ্ট্র এগিয়ে যেতে পারে।
১৯৬১ সালের ২৫ মে কংগ্রেসে কেনেডি ঘোষণা করেন, দশক শেষ হওয়ার আগেই যুক্তরাষ্ট্র একজন মানুষকে চাঁদে নামিয়ে নিরাপদে পৃথিবীতে ফিরিয়ে আনবে। লক্ষ্যটি শুধু চাঁদে পৌঁছানো ছিল না; নিরাপদ প্রত্যাবর্তনও ছিল সমান অপরিহার্য। তখন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো নভোচারী পৃথিবীর কক্ষপথেও যাননি। ফলে ঘোষণাটি বিদ্যমান সক্ষমতার বিবরণ নয়, ভবিষ্যৎ প্রযুক্তি তৈরির রাজনৈতিক অঙ্গীকার ছিল। অ্যাপোলো পরিকল্পনা কেনেডির ঘোষণার আগেই শুরু হলেও তাঁর সিদ্ধান্ত সেটিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করে।
এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে অর্থ, জনবল ও শিল্পক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হয়। অ্যাপোলো কর্মসূচির ঐতিহাসিক ব্যয় ছিল তৎকালীন হিসাবে প্রায় ২৫ বিলিয়ন ডলার। সর্বোচ্চ পর্যায়ে এর সঙ্গে প্রায় চার লাখ মানুষ যুক্ত ছিলেন। নাসা নিজে সবকিছু তৈরি করেনি; হাজারো ঠিকাদার ও সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠান রকেট, ইঞ্জিন, মহাকাশযান, কম্পিউটার এবং যোগাযোগব্যবস্থার অংশ নির্মাণ করেছিল। প্রতিটি যন্ত্রাংশ আলাদাভাবে ভালো হলেই চলত না; সম্পূর্ণ ব্যবস্থা হিসেবে সেগুলোকে নির্ভরযোগ্যভাবে কাজ করতে হতো।
চন্দ্রাভিযানের আগে মারকিউরি কর্মসূচি মানুষের মহাকাশযাত্রার প্রাথমিক প্রশ্নগুলোর উত্তর দেয়। একজন নভোচারী ওজনহীন অবস্থায় কাজ করতে পারবেন কি না, তাঁর শারীরিক অবস্থা কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে এবং মহাকাশযান পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে নিরাপদে ফিরতে পারবে কি না—এসব পরীক্ষা করা হয়। ১৯৬২ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি জন গ্লেন প্রথম মার্কিন নভোচারী হিসেবে পৃথিবী প্রদক্ষিণ করেন। কিন্তু একজন মানুষকে ছোট ক্যাপসুলে কক্ষপথে পাঠানো এবং কয়েক দিন দূরের চাঁদে নামিয়ে ফিরিয়ে আনার মধ্যে বিরাট প্রযুক্তিগত ব্যবধান ছিল।
সেই ব্যবধান কমায় জেমিনি কর্মসূচি। ১৯৬৫–১৯৬৬ সালে দুই নভোচারীবাহী অভিযানে দীর্ঘ সময় মহাকাশে থাকা, কক্ষপথ পরিবর্তন, মহাকাশযানের বাইরে কাজ এবং দুটি যানের মিলিত হওয়ার কৌশল পরীক্ষা করা হয়। জেমিনি-৬এ ও জেমিনি-৭ মহাকাশে কাছাকাছি অবস্থান ধরে রাখে; জেমিনি-৮ প্রথমবার অন্য একটি যানের সঙ্গে ডকিং সম্পন্ন করে। আবার মহাশূন্যে কাজের সময় নভোচারীদের ক্লান্তি দেখিয়ে দেয়, পৃথিবীর প্রশিক্ষণ যথেষ্ট নয়। হাতল, শরীর আটকে রাখার ব্যবস্থা ও কাজের পদ্ধতিও নতুনভাবে সাজাতে হবে।
চাঁদে যাওয়ার পরিকল্পনার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তগুলোর একটি ছিল লুনার অরবিট রঁদেভু, অর্থাৎ চাঁদের কক্ষপথে মহাকাশযানের পুনর্মিলন। একটি বিশাল যান সরাসরি চাঁদে নামিয়ে আবার পৃথিবীতে ফেরানোর পরিবর্তে মূল যানটি চাঁদের কক্ষপথে থাকবে। ছোট লুনার মডিউল দুই নভোচারীকে পৃষ্ঠে নামাবে; পরে তার ঊর্ধ্বাংশ ফিরে এসে মূল যানের সঙ্গে যুক্ত হবে। প্রকৌশলী জন হুবোল্ট এই পদ্ধতির পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন। এতে চাঁদের পৃষ্ঠে বহন করতে হওয়া ভর ও জ্বালানির চাহিদা অনেক কমে যায়।
এই পরিকল্পনা অনুযায়ী অ্যাপোলো মহাকাশযানের তিনটি প্রধান অংশ তৈরি হয়। কমান্ড মডিউল ছিল তিন নভোচারীর বসবাস এবং পৃথিবীতে ফেরার ক্যাপসুল। সার্ভিস মডিউলে থাকত প্রধান ইঞ্জিন, জ্বালানি ও বিভিন্ন সহায়ক ব্যবস্থা। লুনার মডিউল শুধু মহাশূন্য ও চাঁদের জন্য নির্মিত হওয়ায় পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে উড়তে পারত না। তার অবতরণ অংশ চাঁদে থেকে যাবে, আর ছোট ঊর্ধ্বাংশ নভোচারীদের কক্ষপথে ফিরিয়ে নেবে। ওজন কমানো ছিল এই অদ্ভুত আকৃতির যানের নকশার কেন্দ্রীয় বিবেচনা।
সম্পূর্ণ ব্যবস্থা উৎক্ষেপণের জন্য তৈরি হয় স্যাটার্ন ফাইভ, প্রায় ১১১ মিটার উঁচু তিন ধাপের রকেট। ভার্নার ফন ব্রাউনের নেতৃত্বাধীন মার্শাল স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের দল এর উন্নয়নে কেন্দ্রীয় ভূমিকা রাখে। প্রথম ধাপের পাঁচটি এফ-১ ইঞ্জিন কেরোসিন ও তরল অক্সিজেন ব্যবহার করত; ওপরের ধাপগুলো ব্যবহার করত তরল হাইড্রোজেন ও অক্সিজেন। রকেটকে প্রথমে পৃথিবীর কক্ষপথে পৌঁছাতে হতো, তারপর ওপরের ধাপের ইঞ্জিন আবার চালিয়ে মহাকাশযানকে চাঁদের পথে পাঠাতে হতো।
প্রস্তুতির সবচেয়ে ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটে ১৯৬৭ সালের ২৭ জানুয়ারি। উৎক্ষেপণস্থলে অ্যাপোলো-১-এর পরীক্ষার সময় ক্যাবিনে আগুন লেগে গাস গ্রিসম, এড হোয়াইট ও রজার চ্যাফি নিহত হন। উচ্চচাপের বিশুদ্ধ অক্সিজেন, দাহ্য উপকরণ এবং দ্রুত খুলতে না পারা হ্যাচ পরিস্থিতিকে প্রাণঘাতী করে তোলে। দুর্ঘটনার পর তারের সুরক্ষা, উপকরণ, হ্যাচ ও পরীক্ষার পদ্ধতি বদলানো হয়। অ্যাপোলো কর্মসূচির সময়সূচি পিছিয়ে যায়, কিন্তু নিরাপত্তার মৌলিক দুর্বলতা সংশোধন ছাড়া চন্দ্রাভিযান চালিয়ে যাওয়া সম্ভব ছিল না।
এরপর পরীক্ষাগুলো ধাপে ধাপে এগোয়। ১৯৬৭ সালের নভেম্বরে মানুষবিহীন অ্যাপোলো-৪ প্রথম স্যাটার্ন ফাইভের উড্ডয়ন পরীক্ষা করে। ১৯৬৮ সালের অ্যাপোলো-৬-এ ইঞ্জিন ও কম্পনের সমস্যা দেখা দিলে সেগুলো সমাধান করতে হয়। অক্টোবরে অ্যাপোলো-৭ পৃথিবীর কক্ষপথে মানুষসহ কমান্ড ও সার্ভিস মডিউল যাচাই করে। ডিসেম্বরে অ্যাপোলো-৮ প্রথম মানুষবাহী অভিযান হিসেবে চাঁদের কক্ষপথে পৌঁছায়। ফ্র্যাঙ্ক বোরম্যান, জিম লাভেল ও উইলিয়াম অ্যান্ডার্সের এই যাত্রা প্রমাণ করে, চাঁদ পর্যন্ত গিয়ে ফেরার নেভিগেশন ও যোগাযোগব্যবস্থা কার্যকর।
১৯৬৯ সালের মার্চে অ্যাপোলো-৯ পৃথিবীর কক্ষপথে মানুষসহ লুনার মডিউল পরীক্ষা করে। মে মাসে অ্যাপোলো-১০ চাঁদের কাছে পূর্ণাঙ্গ মহড়া চালায়; লুনার মডিউল চন্দ্রপৃষ্ঠের প্রায় ১৫ কিলোমিটার ওপরে পর্যন্ত নামে। পাশাপাশি নভোচারীরা ভূতত্ত্ব, নমুনা সংগ্রহ, অবতরণ এবং জরুরি পরিস্থিতির প্রশিক্ষণ নেন। লুনার অরবিটার ও সার্ভেয়ারের মতো মানুষবিহীন অভিযান সম্ভাব্য অবতরণস্থল সম্পর্কে তথ্য দেয়। হিউস্টনের নিয়ন্ত্রকেরাও অনুশীলন করেন, কারণ কোনো সংকট দেখা দিলে সিদ্ধান্ত নিতে কখনো মাত্র কয়েক সেকেন্ড পাওয়া যাবে।
সোভিয়েত ইউনিয়নও চন্দ্রাভিযানের চেষ্টা করছিল, কিন্তু তাদের বিশাল এন-১ রকেটের প্রথম দুটি উৎক্ষেপণ ১৯৬৯ সালের ফেব্রুয়ারি ও জুলাইয়ে ব্যর্থ হয়। প্রধান নকশাবিদ সের্গেই কোরোলিয়ভের মৃত্যু, প্রকল্পগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং রকেটের জটিলতা অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের সুবিধা তৈরি হয় ধারাবাহিক পরীক্ষা, কেন্দ্রীয় লক্ষ্য এবং পর্যাপ্ত সম্পদ একত্র হওয়ায়। ১৯৬৯ সালের জুলাইয়ে চাঁদে নামার প্রস্তুতি তাই কোনো একক আবিষ্কারের সাফল্য ছিল না। পরীক্ষিত ব্যবস্থাগুলোর ওপর নির্ভর করে এবার নীল আর্মস্ট্রং, বাজ অলড্রিন ও মাইকেল কলিন্সকে নিয়ে অ্যাপোলো-১১-এর বাস্তব যাত্রা শুরু হওয়ার পালা।
চাঁদে পায়ের ছাপ কতদিন টিকে থাকে? ধুলোমাটিতে মানুষের পদচিহ্নের বিজ্ঞান
ব্ল্যাক হোল কি পুরো মহাবিশ্ব গিলে ফেলতে পারে? বিজ্ঞান কী বলে
সূর্যের চেয়েও বড় নক্ষত্র কতটা বিশাল হতে পারে?
ফার্মি প্যারাডক্স: মহাবিশ্বে এত গ্রহ থাকলেও এলিয়েনরা কোথায়?
মহাকাশে এত উপগ্রহ কীভাবে একে অপরের সঙ্গে সংঘর্ষ এড়ায়?
নক্ষত্রগুলো রাতে মিটমিট করে কিন্তু গ্রহগুলো করে না কেন?