বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক জীব প্যান্ডো: দেখতে বিশাল বন, কিন্তু আসলে কি একটি গাছ?

পৃথিবীর সবচেয়ে বড় একক জীব প্যান্ডো: দেখতে বিশাল বন, কিন্তু আসলে কি একটি গাছ?
হাজারো কাণ্ড, অথচ এক জীব—প্যান্ডোর বিস্ময়

যুক্তরাষ্ট্রের উটাহ অঙ্গরাজ্যের ফিশলেক জাতীয় অরণ্যের একটি পাহাড়ি ঢালে দাঁড়ালে প্রথম দেখায় অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ার কথা নয়। চারদিকে সারি সারি অ্যাসপেন গাছ। সাদা থেকে হালকা ধূসর রঙের মসৃণ কাণ্ড, বাতাসে কাঁপতে থাকা ছোট গোলাকার পাতা এবং শরৎকালে অসংখ্য পাতার উজ্জ্বল সোনালি রং—সব মিলিয়ে এটি দেখতে একটি সুন্দর অ্যাসপেন বন। সেখানে হাজার হাজার আলাদা কাণ্ড রয়েছে। কোনোটি মোটা, কোনোটি সরু, কোনোটি বৃদ্ধ, আবার কোনোটি সদ্য মাটি ফুঁড়ে বেরিয়ে এসেছে। স্বাভাবিকভাবেই মনে হবে, প্রতিটি কাণ্ড একটি আলাদা গাছ এবং সবগুলো মিলে একটি বন তৈরি করেছে। কিন্তু প্যান্ডোর ক্ষেত্রে চোখে দেখা এই ব্যাখ্যাটি অসম্পূর্ণ।

প্যান্ডোর বিস্ময় বুঝতে হলে মাটির ওপরে নয়, মাটির নিচে তাকাতে হয়। যে অসংখ্য কাণ্ডকে আলাদা গাছ বলে মনে হয়, সেগুলোর বিশাল অংশ আসলে একই শিকড়ব্যবস্থা থেকে জন্ম নেওয়া এবং একই জিনগত পরিচয় বহনকারী কাণ্ড। অর্থাৎ দৃশ্যমান প্রতিটি কাণ্ডকে সম্পূর্ণ স্বাধীন জীব হিসেবে বিবেচনা না করে একটি বৃহৎ জীবের পৃথক প্রকাশ হিসেবে দেখা যায়। এই কারণেই প্যান্ডোকে পৃথিবীর সবচেয়ে বিখ্যাত বিশাল একক জীবগুলোর একটি বলা হয়। এর নামটিও অত্যন্ত অর্থবহ। লাতিন ভাষা থেকে নেওয়া ‘প্যান্ডো’ শব্দটির অর্থ দাঁড়ায় ‘আমি ছড়িয়ে পড়ি’—যা এই জীবটির প্রকৃতির সঙ্গে অসাধারণভাবে মিলে যায়।

প্যান্ডো মূলত কোয়েকিং অ্যাসপেন প্রজাতির একটি বিশাল ক্লোনীয় উপনিবেশ। অ্যাসপেনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো, এটি শুধু বীজের মাধ্যমে নতুন গাছ সৃষ্টি করে না। মাটির নিচে বিস্তৃত শিকড় থেকে নতুন অঙ্কুর বেরিয়ে এসে নতুন কাণ্ড তৈরি করতে পারে। এই প্রক্রিয়ায় একটি মূল জীব ধীরে ধীরে আশপাশের এলাকায় ছড়িয়ে পড়ে। নতুন কাণ্ড দেখতে স্বাধীন গাছের মতো হলেও তার উৎপত্তি একই শিকড়ব্যবস্থা থেকে। দীর্ঘ সময় ধরে এই প্রক্রিয়া চলতে থাকলে একটি মাত্র জিনগত জীবের অসংখ্য কাণ্ড বিশাল এলাকা দখল করতে পারে। প্যান্ডো এই প্রাকৃতিক ব্যবস্থার এক অসাধারণ উদাহরণ।

প্যান্ডোর বিস্তার প্রায় তেতাল্লিশ হেক্টর এলাকাজুড়ে। অর্থাৎ এর আয়তন কয়েক ডজন ফুটবল মাঠের সমান। গবেষকদের বহুল ব্যবহৃত হিসাব অনুযায়ী, এর মোট ভর প্রায় ছয় হাজার টনের কাছাকাছি হতে পারে। এই বিপুল ভরের কারণেই প্যান্ডোকে প্রায়ই পৃথিবীর সবচেয়ে ভারী পরিচিত একক জীব হিসেবে উল্লেখ করা হয়। তবে ‘সবচেয়ে বড়’ কথাটি ব্যবহার করার সময় একটি গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য মনে রাখা দরকার। কোনো জীবকে আয়তন, ক্ষেত্রফল, দৈর্ঘ্য কিংবা মোট ভর—কোন মানদণ্ডে বড় বলা হচ্ছে, তার ওপর উত্তর বদলে যেতে পারে। কিছু ছত্রাক মাটির নিচে প্যান্ডোর চেয়েও বৃহৎ এলাকা দখল করে থাকতে পারে। কিন্তু বিশাল জিনগতভাবে অভিন্ন অ্যাসপেন জীব এবং বিশেষ করে এর বিপুল আনুমানিক ভরের কারণে প্যান্ডোর অবস্থান অনন্য।

প্যান্ডোতে দৃশ্যমান কাণ্ডের সংখ্যা চল্লিশ হাজারেরও বেশি বলে দীর্ঘদিন ধরে অনুমান করা হয়েছে। কিন্তু এই সংখ্যাকে স্থায়ী বলে ভাবলে ভুল হবে। প্যান্ডোর কাণ্ডগুলো চিরস্থায়ী নয়। একটি কাণ্ড কয়েক দশক বা তারও বেশি সময় বেঁচে থাকতে পারে, এরপর রোগ, প্রতিকূল পরিবেশ, প্রতিযোগিতা বা অন্য কারণে মারা যেতে পারে। কিন্তু একটি কাণ্ড মারা যাওয়া মানেই পুরো প্যান্ডোর মৃত্যু নয়। মাটির নিচের জীবন্ত শিকড়ব্যবস্থা থেকে আবার নতুন কাণ্ড জন্মাতে পারে। ফলে প্যান্ডোকে বুঝতে গেলে দৃশ্যমান কাণ্ড এবং মূল জীবের মধ্যে পার্থক্য করতে হয়।

এখানেই ‘প্যান্ডো কি একটি গাছ?’ প্রশ্নটির উত্তর কিছুটা জটিল হয়ে ওঠে। দৈনন্দিন অর্থে আমরা একটি কাণ্ড, তার শাখা-প্রশাখা, পাতা এবং শিকড় মিলিয়ে একটি গাছ কল্পনা করি। সেই অর্থে প্যান্ডো একটি মাত্র কাণ্ডবিশিষ্ট গাছ নয়। বরং এটি একই জিনগত উৎসের অসংখ্য কাণ্ড নিয়ে গঠিত একটি ক্লোনীয় জীব। তাই ‘প্যান্ডো একটি গাছ’ বলা সাধারণ মানুষের কাছে ধারণাটি বোঝানোর সুবিধাজনক উপায় হলেও বৈজ্ঞানিকভাবে ‘একটি বিশাল ক্লোনীয় অ্যাসপেন জীব’ বা ‘ক্লোনীয় উপনিবেশ’ বলা অধিক নির্ভুল। মাটির ওপরে হাজারো কাণ্ড থাকলেও তাদের জিনগত পরিচয়ের ঐক্যই প্যান্ডোকে বিশেষ করে তুলেছে।

এই ঐক্য কীভাবে জানা গেল, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ। শুধু পাশাপাশি থাকা অ্যাসপেন কাণ্ড দেখে এগুলো একই জীব বলে সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না। একই এলাকায় বীজ থেকে জন্ম নেওয়া ভিন্ন ভিন্ন অ্যাসপেনও পাশাপাশি থাকতে পারে। গবেষকেরা প্যান্ডোর বিভিন্ন অংশ থেকে নমুনা সংগ্রহ করে জিনগত বৈশিষ্ট্য তুলনা করেছেন। এতে দেখা যায়, বিশাল এলাকাজুড়ে থাকা কাণ্ডগুলো অত্যন্ত ঘনিষ্ঠভাবে একই জিনগত পরিচয় বহন করে। এর সঙ্গে শিকড় থেকে নতুন কাণ্ড তৈরির অ্যাসপেনের স্বাভাবিক প্রজননপদ্ধতি মিলিয়ে প্যান্ডোর ক্লোনীয় পরিচয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।

প্যান্ডোর বয়স নিয়ে অবশ্য এর আয়তন বা অবস্থানের মতো নিশ্চিত সংখ্যা দেওয়া কঠিন। জনপ্রিয় লেখায় কখনো কখনো একে কয়েক হাজার, দশ হাজার, এমনকি আরও বহু হাজার বছরের পুরোনো বলে উল্লেখ করা হয়। কিন্তু প্যান্ডোর জন্মের সময় সরাসরি নির্ধারণ করার মতো কোনো প্রাচীন মূল কাণ্ড আজ আর দাঁড়িয়ে নেই। একটি সাধারণ পুরোনো গাছের ক্ষেত্রে কাণ্ডের বার্ষিক বলয় পরীক্ষা করে তার বয়স সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। প্যান্ডোর ক্ষেত্রে সেই পদ্ধতি পুরো জীবটির বয়স বলে দিতে পারে না, কারণ বর্তমান কাণ্ডগুলো মূল ক্লোনের তুলনায় অনেক নবীন হতে পারে।

ধরা যাক, হাজার হাজার বছর আগে একটি অ্যাসপেন বীজ থেকে একটি গাছ জন্মেছিল। পরে সেই গাছের শিকড় থেকে নতুন কাণ্ড বের হলো। পুরোনো কাণ্ড মারা গেল, কিন্তু শিকড় এবং নতুন কাণ্ড বেঁচে থাকল। আবার নতুন কাণ্ড তৈরি হলো। এই চক্র শতাব্দীর পর শতাব্দী চলতে থাকলে বর্তমানে দৃশ্যমান কোনো কাণ্ডই মূল গাছটির সমবয়সী হবে না। অথচ জিনগত জীবটি ধারাবাহিকভাবে টিকে থাকতে পারে। প্যান্ডোর বয়স নির্ধারণের সমস্যার মূল কারণ এটিই। তাই এর বয়স সম্পর্কে অত্যন্ত নির্দিষ্ট বিশাল সংখ্যা দাবি করার চেয়ে এটিকে অত্যন্ত প্রাচীন ক্লোনীয় জীব বলা বৈজ্ঞানিকভাবে বেশি সতর্ক অবস্থান।

প্যান্ডোর আরেকটি আশ্চর্য বৈশিষ্ট্য হলো এর পাতার আচরণ। কোয়েকিং অ্যাসপেন নামটির সঙ্গে পাতার কাঁপুনির সরাসরি সম্পর্ক রয়েছে। পাতার ডাঁটার গঠন এমন যে সামান্য বাতাসেও পাতাগুলো দ্রুত নড়তে থাকে। দূর থেকে একটি অ্যাসপেন ঢালের দিকে তাকালে মনে হতে পারে পুরো বনটি একসঙ্গে ঝিকমিক করছে। শরৎকালে পাতাগুলো যখন সবুজ থেকে হলুদ ও সোনালি রঙে পরিবর্তিত হয়, তখন প্যান্ডোর বিশাল বিস্তার আরও দৃশ্যমান হয়ে ওঠে। কিন্তু এই সৌন্দর্যের নিচেই রয়েছে আরও গুরুত্বপূর্ণ জীববৈজ্ঞানিক বাস্তবতা—মাটির নিচের দীর্ঘস্থায়ী ব্যবস্থা।

আগুনও অ্যাসপেনের জীবনচক্রে একটি জটিল ভূমিকা রাখতে পারে। অনেক বনজ উদ্ভিদের জন্য দাবানল সম্পূর্ণ ধ্বংসাত্মক হলেও অ্যাসপেনের ক্ষেত্রে মাটির ওপরের কাণ্ড ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পরও ভূগর্ভস্থ শিকড়ের অংশ বেঁচে থাকতে পারে। উপরের প্রতিযোগী উদ্ভিদ সরে গেলে এবং আলো পৌঁছানোর সুযোগ বাড়লে শিকড় থেকে নতুন অঙ্কুর জন্মাতে পারে। অর্থাৎ প্যান্ডোর স্থায়িত্ব শুধু দীর্ঘজীবী কাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না; বরং বারবার নতুন কাণ্ড তৈরির ক্ষমতাই এর দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের মূল শক্তি।

তবে এত বিশাল এবং দীর্ঘস্থায়ী জীব হওয়া সত্ত্বেও প্যান্ডো অজেয় নয়। বর্তমানে এর সবচেয়ে আলোচিত সমস্যাগুলোর একটি হলো নতুন কাণ্ডের পর্যাপ্তভাবে বড় হয়ে উঠতে না পারা। প্যান্ডোর শিকড় থেকে নতুন অঙ্কুর বের হলেও হরিণ ও অন্যান্য তৃণভোজী প্রাণী সেগুলো খেয়ে ফেলতে পারে। নতুন কাণ্ড যদি বারবার অল্প বয়সেই ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে বৃদ্ধ কাণ্ড মারা যাওয়ার হার এবং নতুন পূর্ণবয়স্ক কাণ্ড তৈরির হারের মধ্যে ভারসাম্য নষ্ট হয়। বাইরে থেকে তখনও বিশাল বন দেখা যেতে পারে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার বয়সের কাঠামো দুর্বল হয়ে পড়ে।

এটি অনেকটা এমন একটি জনপদের মতো, যেখানে বয়স্ক মানুষ রয়েছে কিন্তু নতুন প্রজন্ম বড় হয়ে উঠতে পারছে না। কয়েক বছর দেখে হয়তো সংকট বোঝা যাবে না, কিন্তু কয়েক দশক পরে তার ফল স্পষ্ট হবে। প্যান্ডোর ক্ষেত্রেও নতুন অঙ্কুর জন্মানোই যথেষ্ট নয়; সেগুলোকে তৃণভোজীদের নাগালের বাইরে যাওয়ার মতো উচ্চতা পর্যন্ত বেড়ে উঠতে হবে। এই কারণে প্যান্ডোর কিছু অংশে বেড়া দিয়ে তৃণভোজী প্রাণীর প্রবেশ সীমিত করার চেষ্টা করা হয়েছে। বিভিন্ন অংশের পুনর্জন্মের পার্থক্য পর্যবেক্ষণ করে বিজ্ঞানীরা বোঝার চেষ্টা করছেন কোন ব্যবস্থাপনা দীর্ঘমেয়াদে সবচেয়ে কার্যকর।

মানুষের কার্যকলাপও প্যান্ডোর পরিবেশে প্রভাব ফেলেছে। রাস্তা, বিনোদনমূলক ব্যবহার, বন ব্যবস্থাপনা এবং আশপাশের বাস্তুতন্ত্রে মানুষের দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন প্যান্ডোর বিভিন্ন অংশকে ভিন্নভাবে প্রভাবিত করতে পারে। একই সঙ্গে জলবায়ুর পরিবর্তন, তাপমাত্রা বৃদ্ধি, দীর্ঘমেয়াদি খরা এবং পানির প্রাপ্যতার পরিবর্তন অ্যাসপেনের মতো উদ্ভিদের জন্য ভবিষ্যৎ চাপ সৃষ্টি করতে পারে। একটি ক্লোন হাজার বছর টিকে থাকলেই যে ভবিষ্যতের দ্রুত পরিবর্তিত পরিবেশেও একইভাবে টিকে থাকবে, এমন নিশ্চয়তা নেই।

প্যান্ডোর বিশাল জিনগত ঐক্যের মধ্যেও প্রকৃতি পুরোপুরি স্থির নয়। দীর্ঘ সময় ধরে কোষ বিভাজনের সময় ক্ষুদ্র জিনগত পরিবর্তন ঘটতে পারে। ফলে একই প্রাচীন ক্লোনের বিভিন্ন অংশে সময়ের সঙ্গে সূক্ষ্ম পার্থক্য জমা হতে পারে। বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ ‘একই জিনগত জীব’ কথাটি শুনলে মনে হতে পারে প্যান্ডোর প্রতিটি কোষ একেবারে অপরিবর্তিত অনুলিপি। বাস্তবে দীর্ঘজীবী ক্লোনীয় জীবের মধ্যে দেহকোষীয় পরিবর্তন সৃষ্টি হওয়া সম্ভব। ফলে প্যান্ডো একই সঙ্গে জিনগত ঐক্য এবং দীর্ঘ সময়ে জমা হওয়া ক্ষুদ্র পরিবর্তনের একটি জীবন্ত গবেষণাগার।

প্যান্ডো আমাদের ‘একটি জীব’ সম্পর্কে প্রচলিত ধারণাকেও প্রশ্নের মুখে ফেলে। একটি হাতি কোথায় শুরু এবং কোথায় শেষ তা সহজেই বোঝা যায়। একটি মানুষের ক্ষেত্রেও একই কথা সত্য। কিন্তু ক্লোনীয় উদ্ভিদের ক্ষেত্রে সীমারেখা এত সহজ নয়। মাটির ওপরের একটি কাণ্ড মারা গেলেও জীবটি বেঁচে থাকে। আবার কয়েক মিটার দূরে নতুন কাণ্ড বের হয়। দৃশ্যমান অংশ বদলে যেতে থাকে, অথচ জিনগত ধারাবাহিকতা এবং ভূগর্ভস্থ জীবনব্যবস্থা টিকে থাকে। ফলে জীবের পরিচয় কি তার দৃশ্যমান শরীর, তার জিনগত পরিচয়, নাকি তার অবিচ্ছিন্ন জীবনপ্রক্রিয়া—প্যান্ডো এই মৌলিক প্রশ্নটিকেই সামনে নিয়ে আসে।

এই কারণেই প্যান্ডো শুধু বড় একটি উদ্ভিদ নয়; এটি জীববিজ্ঞান, বনবিদ্যা, বাস্তুবিদ্যা এবং বার্ধক্য গবেষণার জন্য অসাধারণ একটি প্রাকৃতিক উদাহরণ। একটি জীব কীভাবে নিজের পুরোনো অংশ হারিয়ে নতুন অংশ তৈরি করে দীর্ঘ সময় ধরে টিকে থাকতে পারে, তা প্যান্ডো দেখায়। এর বর্তমান কোনো কাণ্ডই হয়তো পুরো জীবটির দীর্ঘ ইতিহাসের ক্ষুদ্র একটি অধ্যায় মাত্র। আজ যে কাণ্ডটির পাশে একজন পর্যটক দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কয়েক দশক পরে সেটি নাও থাকতে পারে। কিন্তু তার কাছাকাছি একই শিকড় থেকে নতুন কাণ্ড উঠে এসে প্যান্ডোর জীবনকে এগিয়ে নিতে পারে।

প্যান্ডোকে তাই একটি বিশাল বন হিসেবে দেখা যেমন ভুল নয়, তেমনি সেটিই পুরো সত্য নয়। বাস্তুতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে সেখানে অসংখ্য কাণ্ড, পাখি, স্তন্যপায়ী প্রাণী, পোকামাকড়, ছত্রাক, অণুজীব এবং অন্যান্য উদ্ভিদ নিয়ে একটি জটিল বনজ পরিবেশ রয়েছে। কিন্তু প্যান্ডো নামটি বিশেষভাবে সেই বিশাল অ্যাসপেন ক্লোনকে নির্দেশ করে, যার হাজার হাজার কাণ্ড একই প্রাচীন জীবের অংশ। একটি সম্পূর্ণ বন এবং একটি একক ক্লোনীয় জীব একই স্থানে দৃশ্যত একে অপরের ওপর আরোপিত হয়েছে—এই দ্বৈত পরিচয়ই প্যান্ডোকে এত আকর্ষণীয় করে তুলেছে।

আর এখানেই ‘দেখতে বন, কিন্তু আসলে কি একটি গাছ?’ প্রশ্নটির সবচেয়ে যথাযথ উত্তর পাওয়া যায়। প্যান্ডোকে আমাদের পরিচিত অর্থে একটি বিশাল কাণ্ড, একটি মুকুট এবং একটি কেন্দ্রীয় শিকড়বিশিষ্ট গাছ ভাবা ঠিক নয়। এটি অসংখ্য দৃশ্যমান কাণ্ড নিয়ে গঠিত একটি বিস্তৃত ক্লোনীয় অ্যাসপেন জীব, যার কাণ্ডগুলো একই জিনগত উৎস থেকে এসেছে এবং ভূগর্ভস্থ ব্যবস্থার মাধ্যমে প্রজন্মের পর প্রজন্ম পুনর্নবীকৃত হয়েছে। তাই দূর থেকে আমরা একটি বন দেখি, কাছে গিয়ে হাজার হাজার গাছ দেখি, আর জীববিজ্ঞানের দৃষ্টিতে তাকালে আবিষ্কার করি এক বিশাল জীবন্ত সত্তার অসংখ্য কাণ্ড।

প্যান্ডোর সবচেয়ে বড় বিস্ময় তাই শুধু তার কয়েক হাজার টন ভর কিংবা কয়েক দশ হেক্টর বিস্তার নয়। বিস্ময়টি হলো জীবনের স্থায়িত্বের এক সম্পূর্ণ ভিন্ন কৌশল। মানুষ বা অধিকাংশ প্রাণীর মতো একই শরীরকে হাজার বছর ধরে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা না করে এই জীব পুরোনো অংশকে হারায়, নতুন অংশ তৈরি করে এবং নিজের পরিচয়কে শিকড়ের ধারাবাহিকতার মধ্যে বহন করে চলে। মাটির ওপরে তার চেহারা ক্রমাগত বদলায়, কিন্তু জীবনের প্রবাহ চলতে থাকে।

একটি প্যান্ডো কাণ্ডের সামনে দাঁড়ালে তাই আমরা শুধু একটি অ্যাসপেন গাছের সামনে দাঁড়াই না। আমাদের পায়ের নিচে ছড়িয়ে থাকতে পারে এমন এক জীবের অংশ, যার বিস্তার মানুষের চোখে একটি বন, যার মোট ভর হাজার হাজার টন এবং যার ইতিহাস বর্তমান দৃশ্যমান কাণ্ডগুলোর জীবনকালের চেয়ে বহুগুণ দীর্ঘ। প্যান্ডো আমাদের মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতিতে ‘একটি জীব’ সব সময় একটি শরীরের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো একটি জীব এত বিশালভাবে ছড়িয়ে থাকতে পারে যে আমরা তাকে প্রতিদিনের চোখে হাজার হাজার গাছ বলে দেখি—অথচ গভীরে তারা একই জীবনের ধারাবাহিক প্রকাশ।


আপনার পছন্দ হতে পারে