বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

কম্বোডিয়া ও লাওসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ: গোপন বোমাবর্ষণ, হো চি মিন ট্রেইল ও লাম সন ৭১৯

সিরিজ: ভিয়েতনাম যুদ্ধ

কম্বোডিয়া ও লাওসে ভিয়েতনাম যুদ্ধ: গোপন বোমাবর্ষণ, হো চি মিন ট্রেইল ও লাম সন ৭১৯
গোপন বোমাবর্ষণে ইন্দোচীনজুড়ে ছড়িয়ে পড়া যুদ্ধ

ভিয়েতনাম যুদ্ধকে প্রায়ই উত্তর ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের মধ্যকার সংঘাত হিসেবে বর্ণনা করা হয়। বাস্তবে যুদ্ধটির ভূগোল আরও বিস্তৃত ছিল। উত্তর ভিয়েতনামের সেনা ও রসদ দক্ষিণে পৌঁছানোর প্রধান পথগুলো লাওস ও কম্বোডিয়ার মধ্য দিয়ে যাওয়ায় এই দুটি আনুষ্ঠানিকভাবে নিরপেক্ষ দেশ ক্রমে যুদ্ধের গোপন রণক্ষেত্রে পরিণত হয়। যুক্তরাষ্ট্র প্রকাশ্যে তাদের নিরপেক্ষতা সম্মান করার কথা বললেও গোপনে গোয়েন্দা অভিযান, স্থানীয় বাহিনীকে সহায়তা এবং ব্যাপক বোমাবর্ষণ চালায়। ভিয়েতনামের যুদ্ধ থামানোর উদ্দেশ্যে নেওয়া এসব পদক্ষেপ শেষ পর্যন্ত সংঘাতকে সমগ্র ইন্দোচীনে ছড়িয়ে দেয় এবং লাখো বেসামরিক মানুষের জীবন বিপর্যস্ত করে।

লাওসের ভৌগোলিক অবস্থান উত্তর ভিয়েতনামের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দেশটির পূর্বাঞ্চলের পাহাড় ও ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে এমন অসংখ্য পথ দক্ষিণের দিকে নেমে গিয়েছিল, যা ভিয়েতনামের অসামরিক অঞ্চল এড়িয়ে চলার সুযোগ দিত। এই পথগুলোর সম্মিলিত ব্যবস্থাই হো চি মিন ট্রেইল নামে পরিচিত হয়। নামটি একটি সরু সড়কের ধারণা দিলেও বাস্তবে এটি ছিল শত শত বিকল্প পথ, নদী পারাপার, গুদাম, চিকিৎসাকেন্দ্র, সামরিক শিবির, যোগাযোগব্যবস্থা এবং পরে জ্বালানি পাইপলাইনের বিশাল নেটওয়ার্ক।

ট্রেইলের প্রথমদিকে রসদ প্রধানত মানুষের কাঁধ, নৌকা ও বিশেষভাবে শক্তিশালী করা সাইকেলে বহন করা হতো। একটি সাইকেলে কয়েক শ কিলোগ্রাম মাল বেঁধে সেটি ঠেলে দুর্গম পথ পাড়ি দেওয়া যেত। যুদ্ধ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে উত্তর ভিয়েতনাম রাস্তা প্রশস্ত করে ট্রাক চলাচলের ব্যবস্থা করে। যানবাহন রাতে চলত, দিনের বেলা গাছপালা বা ছদ্মাবরণের নিচে লুকিয়ে থাকত। কোথাও সেতু ধ্বংস হলে দ্রুত বাঁশের সেতু বানানো হতো, আবার নদীর পানির ঠিক নিচে নির্মিত গোপন পারাপার আকাশ থেকে দেখা যেত না।

১৯৬২ সালের আন্তর্জাতিক সমঝোতায় লাওসকে নিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছিল এবং বিদেশি সামরিক বাহিনী প্রত্যাহারের কথা বলা হয়। কিন্তু চুক্তি বাস্তবে কার্যকর হয়নি। উত্তর ভিয়েতনাম লাওসের পূর্বাঞ্চলে নিজের বাহিনী ও রসদপথ বজায় রাখে এবং সাম্যবাদী পাথেট লাওকে সহায়তা করে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র রাজকীয় লাও সরকার এবং সাম্যবাদবিরোধী বাহিনীকে গোপনে সমর্থন দিতে থাকে। আনুষ্ঠানিকভাবে যুদ্ধ না করেও উভয় পক্ষ দেশটির অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধকে বৃহত্তর ভিয়েতনাম সংঘাতের অংশে পরিণত করে।

লাওসে যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকার একটি বড় অংশ পরিচালনা করত কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা। তারা হমং নেতা ভাং পাওয়ের অধীনে পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর হাজার হাজার যোদ্ধাকে প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও অর্থ দেয়। এই বাহিনী উত্তর ভিয়েতনামের চলাচল পর্যবেক্ষণ, বিমান থেকে উদ্ধার করা বৈমানিকদের সহায়তা, পাথেট লাওয়ের বিরুদ্ধে যুদ্ধ এবং গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় অংশ নেয়। এই গোপন সংঘাত পরে ‘সিক্রেট ওয়ার’ নামে পরিচিত হয়। মার্কিন জনগণ ও কংগ্রেসের বড় অংশ দীর্ঘদিন এর প্রকৃত ব্যাপ্তি সম্পর্কে অবগত ছিল না।

১৯৬৪ সালে লাওসের উত্তরাঞ্চলে অপারেশন ব্যারেল রোল এবং পরে ট্রেইলের বিরুদ্ধে স্টিল টাইগারের মতো বিমান অভিযান শুরু হয়। ১৯৬৮ সাল থেকে অপারেশন কমান্ডো হান্ট-এর মাধ্যমে হো চি মিন ট্রেইলে আঘাত আরও তীব্র করা হয়। বিমান থেকে শব্দ ও কম্পন শনাক্তকারী বৈদ্যুতিন যন্ত্র ফেলা হতো, যেগুলো ট্রাক বা মানুষের চলাচলের সংকেত পাঠাত। সেই তথ্য বিশ্লেষণ করে যুদ্ধবিমান ও বি-৫২ বোমারু বিমান সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত করত। আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে পুরো রসদব্যবস্থাকে একটি পর্যবেক্ষণযোগ্য যুদ্ধক্ষেত্রে পরিণত করার চেষ্টা করা হয়েছিল।

কিন্তু ট্রেইল ধ্বংস করা অত্যন্ত কঠিন ছিল। উত্তর ভিয়েতনামের হাজার হাজার শ্রমিক ও প্রকৌশলী সারারাত বোমার গর্ত ভরাট করতেন, বিকল্প রাস্তা নির্মাণ করতেন এবং ক্ষতিগ্রস্ত ট্রাক সরিয়ে নিতেন। বিমান হামলায় একটি পথ বন্ধ হলে পাশে আরেকটি পথ খুলে দেওয়া হতো। গাছপালার ছদ্মাবরণ ও দুর্গম ভূখণ্ড লক্ষ্য শনাক্ত করা কঠিন করে তুলত। বিমান হামলা বিপুল ক্ষতি ও বিলম্ব ঘটালেও দক্ষিণে সৈন্য, অস্ত্র ও খাদ্যের প্রবাহ বন্ধ করতে পারেনি। যত বেশি বোমা পড়েছে, ট্রেইল তত বেশি বিস্তৃত, বিকেন্দ্রীভূত ও অভিযোজনক্ষম হয়েছে।

লাওসের সাধারণ মানুষ এই গোপন যুদ্ধের ভয়াবহ মূল্য দেয়। সন্দেহভাজন রসদপথ, গ্রাম ও কৃষিজমির আশপাশে দীর্ঘ বোমাবর্ষণে বহু মানুষ নিহত, আহত বা বাস্তুচ্যুত হয়। গুচ্ছবোমা থেকে ছড়িয়ে পড়া ছোট বিস্ফোরকের একটি অংশ তাৎক্ষণিকভাবে বিস্ফোরিত হয়নি। যুদ্ধ শেষ হওয়ার বহু দশক পরও কৃষক জমি চাষ করতে, শিশু খেলতে কিংবা মানুষ নির্মাণকাজ করতে গিয়ে এসব বিস্ফোরকের শিকার হয়েছে। লাওসের মাটিতে যুদ্ধের উত্তরাধিকার তাই এখনো সক্রিয় বিপদের রূপে রয়ে গেছে।

কম্বোডিয়ার পরিস্থিতি কিছুটা ভিন্ন ছিল। যুবরাজ নরোদম সিহানুক দেশটিকে ভিয়েতনাম যুদ্ধ থেকে দূরে রাখার চেষ্টা করলেও উত্তর ভিয়েতনাম ও ভিয়েত কং পূর্ব কম্বোডিয়ার সীমান্তবর্তী অঞ্চলে ঘাঁটি ও রসদভান্ডার স্থাপন করে। কিছু রসদ কম্বোডিয়ার সিহানুকভিল বন্দর দিয়েও তাদের কাছে পৌঁছাত। সিহানুক কখনো এসব উপস্থিতি সহ্য করেছেন, কখনো সীমিত করার চেষ্টা করেছেন; একই সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র ও দক্ষিণ ভিয়েতনামের সীমান্ত লঙ্ঘনের বিরুদ্ধেও প্রতিবাদ করেছেন। তাঁর লক্ষ্য ছিল বৃহৎ শক্তিগুলোর মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করে কম্বোডিয়ার স্বাধীনতা বজায় রাখা।

রিচার্ড নিক্সন প্রেসিডেন্ট হওয়ার পর কম্বোডিয়ার আশ্রয়স্থলগুলোকে দক্ষিণ ভিয়েতনামে যুদ্ধ চালানোর প্রধান সহায়ক হিসেবে দেখেন। ১৯৬৯ সালের মার্চে অপারেশন মেনু নামে গোপন বি-৫২ বোমাবর্ষণ শুরু হয়। পৃথক হামলাগুলোকে ব্রেকফাস্ট, লাঞ্চ, স্ন্যাক, ডিনার, সাপার ও ডেজার্টের মতো সাংকেতিক নাম দেওয়া হয়েছিল। লক্ষ্য ছিল সীমান্তবর্তী উত্তর ভিয়েতনামি ও ভিয়েত কং ঘাঁটি, সামরিক সদর এবং রসদভান্ডার ধ্বংস করা।

অভিযানের অস্তিত্ব শুধু সাধারণ জনগণ নয়, কংগ্রেসের অনেক সদস্যের কাছ থেকেও গোপন রাখা হয়। নথিপত্রে লক্ষ্যস্থানের তথ্য পরিবর্তন এবং দ্বৈত প্রতিবেদন তৈরির মাধ্যমে বোমাবর্ষণের প্রকৃত অবস্থান আড়াল করা হতো। প্রশাসন মনে করেছিল, প্রকাশ্যে অভিযান স্বীকার করলে কম্বোডিয়ার নিরপেক্ষতা লঙ্ঘনের অভিযোগ উঠবে এবং দেশে যুদ্ধবিরোধী প্রতিক্রিয়া বাড়বে। গোপনীয়তা সামরিক অভিযানকে রাজনৈতিক নজরদারি থেকে দূরে রাখলেও নির্বাহী ক্ষমতার অপব্যবহার ও জনগণের আস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।

১৯৭০ সালের মার্চে সিহানুক বিদেশে থাকা অবস্থায় জেনারেল লন নলের নেতৃত্বাধীন সরকার তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করে। নতুন সরকার উত্তর ভিয়েতনামি বাহিনীকে কম্বোডিয়া ছাড়ার নির্দেশ দেয় এবং তাদের বিরুদ্ধে সংঘর্ষ শুরু হয়। এপ্রিলের শেষদিকে দক্ষিণ ভিয়েতনামি ও মার্কিন বাহিনী সীমান্ত পার হয়ে কম্বোডিয়ার অভ্যন্তরে অভিযান চালায়। বিপুল অস্ত্র, গোলাবারুদ, খাদ্য ও চিকিৎসাসামগ্রী দখল করা হয়। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামের প্রধান বাহিনীর বড় অংশ আরও গভীরে সরে যায় এবং নতুন রসদপথ গড়ে তোলে।

নিক্সন দাবি করেছিলেন, কম্বোডিয়া অভিযান শত্রুর ঘাঁটি ধ্বংস করে মার্কিন সেনা প্রত্যাহারকে নিরাপদ করবে। যুক্তরাষ্ট্রে অনেকেই একে যুদ্ধ শেষ করার প্রতিশ্রুতির বিপরীতে নতুন দেশে সংঘাত সম্প্রসারণ হিসেবে দেখেন। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়ে এবং কেন্ট স্টেটে জাতীয় রক্ষীবাহিনীর গুলিতে চার শিক্ষার্থী নিহত হন। ভিয়েতনামের সীমান্তে নেওয়া একটি সামরিক সিদ্ধান্ত এভাবে যুক্তরাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক সংকটকে আরও তীব্র করে তোলে।

কম্বোডিয়ায় বোমাবর্ষণ ও স্থলযুদ্ধ দেশের গ্রামীণ সমাজকে অস্থিতিশীল করে, বহু মানুষকে বাস্তুচ্যুত করে এবং কেন্দ্রীয় সরকারের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল করে। খেমার রুজ এই বিশৃঙ্খলা, বিদেশি হামলার ক্ষোভ, সিহানুকের পরবর্তী সমর্থন এবং গ্রামাঞ্চলের দুর্দশাকে সদস্য সংগ্রহে ব্যবহার করে। তবে খেমার রুজের উত্থানকে শুধু মার্কিন বোমাবর্ষণের ফল বলা অতিসরলীকরণ হবে; কম্বোডিয়ার রাজনৈতিক সংকট, গৃহযুদ্ধ, উত্তর ভিয়েতনামের উপস্থিতি, সিহানুকের ভূমিকা এবং লন নল সরকারের দুর্বলতাও গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তবু যুদ্ধের বিস্তার তাদের শক্তি বৃদ্ধির অনুকূল পরিবেশ তৈরি করেছিল।

১৯৭১ সালে ভিয়েতনামাইজেশন নীতির সক্ষমতা যাচাই এবং হো চি মিন ট্রেইল কেটে দেওয়ার জন্য অপারেশন লাম সন ৭১৯ পরিচালিত হয়। দক্ষিণ ভিয়েতনামি বাহিনীর লক্ষ্য ছিল সীমান্ত থেকে লাওসের অভ্যন্তরে রুট ৯ ধরে অগ্রসর হয়ে চেপোন এলাকার গুরুত্বপূর্ণ রসদকেন্দ্র দখল করা। মার্কিন আইন ও রাজনৈতিক বিধিনিষেধের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের স্থলসেনা লাওসে প্রবেশ করতে পারেনি। তবে মার্কিন হেলিকপ্টার, যুদ্ধবিমান, কামান ও গোয়েন্দা সহায়তা অভিযানের প্রধান ভিত্তি ছিল।

১৯৭১ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি অভিযান শুরু হলে দক্ষিণ ভিয়েতনামি সেনা ও সাঁজোয়া ইউনিট লাওসে প্রবেশ করে। প্রথমদিকে তারা কয়েকটি অবস্থান দখল করলেও অগ্রগতি ধীর হয়ে যায়। উত্তর ভিয়েতনাম দ্রুত বিপুলসংখ্যক সেনা, ট্যাংক, কামান ও বিমানবিধ্বংসী অস্ত্র মোতায়েন করে। বিচ্ছিন্ন দক্ষিণ ভিয়েতনামি ঘাঁটিগুলো একের পর এক আক্রমণের মুখে পড়ে। মার্কিন হেলিকপ্টারগুলো সৈন্য ও রসদ পরিবহনের সময় ঘন বিমানবিধ্বংসী গোলার মুখে পড়ে এবং বহু যান ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়।

দক্ষিণ ভিয়েতনামি বাহিনী শেষ পর্যন্ত চেপোন এলাকায় হেলিকপ্টারে সেনা নামিয়ে প্রতীকীভাবে লক্ষ্য অর্জনের ঘোষণা দেয়। কিন্তু উত্তর ভিয়েতনামের রসদব্যবস্থার প্রধান অংশ আগেই সরিয়ে নেওয়া হয়েছিল। অল্প সময়ের মধ্যে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হলে পরিস্থিতি বিশৃঙ্খল হয়ে পড়ে। সড়ক অবরুদ্ধ, পাহাড়ি ঘাঁটি বিচ্ছিন্ন এবং নির্ধারিত অবতরণস্থলগুলো গোলাবর্ষণের আওতায় চলে আসে। হেলিকপ্টারে ওঠার জন্য মরিয়া সৈন্য এবং যানবাহন ফেলে সীমান্তের দিকে পিছু হটার দৃশ্য সংবাদমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

উভয় পক্ষই লাম সন ৭১৯-এ সাফল্যের দাবি করেছিল। দক্ষিণ ভিয়েতনাম ও যুক্তরাষ্ট্র বলেছিল, উত্তর ভিয়েতনামের রসদব্যবস্থায় ক্ষতি হয়েছে এবং তাদের পরবর্তী অভিযান বিলম্বিত হয়েছে। উত্তর ভিয়েতনাম দাবি করে, তারা আক্রমণ প্রতিহত করে বিপুল ক্ষয়ক্ষতি ঘটিয়েছে। বাস্তবে অভিযান সাময়িকভাবে রসদ প্রবাহ ব্যাহত করলেও ট্রেইল ধ্বংস করতে পারেনি। বরং উত্তর ভিয়েতনাম ক্ষতিগ্রস্ত পথ মেরামত ও নেটওয়ার্ক আরও সম্প্রসারণ করে।

লাম সন ৭১৯ ভিয়েতনামাইজেশনের সীমাবদ্ধতাও প্রকাশ করেছিল। দক্ষিণ ভিয়েতনামের কিছু ইউনিট সাহসিকতার সঙ্গে লড়লেও দুর্বল নেতৃত্ব, সমন্বয়ের অভাব এবং মার্কিন বিমান সহায়তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা স্পষ্ট হয়। একই সঙ্গে মার্কিন স্থলসেনা অনুপস্থিত থাকলেও যুক্তরাষ্ট্র যে যুদ্ধ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়নি, তাও বোঝা যায়। আকাশে মার্কিন বৈমানিকেরা লড়ছিলেন, হেলিকপ্টার ক্রুরা নিহত হচ্ছিলেন এবং ওয়াশিংটনই অভিযানের কৌশলগত ভিত্তি তৈরি করেছিল।

কম্বোডিয়া ও লাওসে যুদ্ধের বিস্তার ছিল ভিয়েতনাম যুদ্ধের মৌলিক দ্বন্দ্বের ফল—একটি আন্তসীমান্ত রসদব্যবস্থাকে নির্দিষ্ট জাতীয় সীমান্তের ভেতর থেকে পরাজিত করা সম্ভব ছিল না। যুক্তরাষ্ট্র হো চি মিন ট্রেইল বন্ধ করতে গোপন যুদ্ধ, বোমাবর্ষণ ও সীমান্ত অতিক্রমকারী অভিযান চালায়; কিন্তু প্রতিটি আঘাতের পর উত্তর ভিয়েতনাম নতুন পথ ও কৌশল তৈরি করে। সামরিক লক্ষ্য পুরোপুরি অর্জিত না হলেও লাওস ও কম্বোডিয়ার গ্রাম, কৃষিজমি, রাজনীতি এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দীর্ঘস্থায়ী ক্ষতির শিকার হয়। ভিয়েতনাম যুদ্ধের মানচিত্রে সীমান্তরেখা ছিল, কিন্তু বোমা, শরণার্থী ও রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতার জন্য সেই রেখাগুলোর কোনো কার্যকর অর্থ ছিল না।


আপনার পছন্দ হতে পারে