বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব: বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন

সিরিজ: আরব বসন্ত

তিউনিসিয়ার জেসমিন বিপ্লব: বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন
গণবিক্ষোভে বেন আলীর ২৩ বছরের শাসনের পতন

বেন আলীর পতনের সংবাদ ছড়িয়ে পড়তেই আরব বিশ্বের দৃষ্টি কায়রোর দিকে ঘুরে গিয়েছিল। কিন্তু মিসরের রাজপথে যে বিশাল গণ-অভ্যুত্থান আসন্ন ছিল, তার শক্তি ও সম্ভাবনা বোঝার জন্য প্রথমে তিউনিসিয়ায় ঘটে যাওয়া অসাধারণ পরিবর্তনটির গভীরে তাকানো জরুরি। সিদি বুজিদে মোহাম্মদ বুয়াজিজির আত্মাহুতি একটি জাতীয় বিদ্রোহের স্ফুলিঙ্গ সৃষ্টি করেছিল, কিন্তু একজন স্বৈরশাসকের পতন কেবল একটি ঘটনার স্বতঃস্ফূর্ত ফল ছিল না। এর পেছনে ছিল বহু বছরের রাজনৈতিক দমন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, সংগঠিত শ্রমিক প্রতিরোধ এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিতভাবে ভয় কাটিয়ে ওঠার ইতিহাস।

জাইন আল-আবিদিন বেন আলী ১৯৮৭ সালের ৭ নভেম্বর তিউনিসিয়ার ক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন। দেশটির স্বাধীনতার নেতা ও প্রথম প্রেসিডেন্ট হাবিব বুরগিবা তখন বৃদ্ধ এবং শারীরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়েছিলেন। প্রধানমন্ত্রী বেন আলী চিকিৎসকদের প্রতিবেদনের ভিত্তিতে বুরগিবাকে রাষ্ট্র পরিচালনায় অক্ষম ঘোষণা করে রক্তপাতহীনভাবে তাঁকে অপসারণ করেন। ঘটনাটি পরে “চিকিৎসাবিষয়ক অভ্যুত্থান” নামে পরিচিত হয়। ক্ষমতা গ্রহণের পর বেন আলী রাজনৈতিক বহুত্ববাদ, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। অনেক তিউনিসীয় প্রথম দিকে তাঁকে দীর্ঘ বুরগিবা যুগের পর পরিবর্তনের প্রতীক হিসেবেই দেখেছিলেন।

কিন্তু সেই আশাবাদ দ্রুত ম্লান হয়ে যায়। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও ফলাফল এমনভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো যে বেন আলী বারবার বিপুল ভোটে জয়ী হতেন। তাঁর দল ডেমোক্রেটিক কনস্টিটিউশনাল র‍্যালি রাষ্ট্রযন্ত্র, প্রশাসন এবং স্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রায় পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। বিরোধী দলগুলোকে সীমিত পরিসরে অস্তিত্ব বজায় রাখতে দেওয়া হলেও প্রকৃত রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতা সম্ভব ছিল না। ইসলামপন্থী আন-নাহদা আন্দোলনের সদস্যসহ বহু বিরোধী নেতা কারারুদ্ধ, নির্বাসিত বা নজরদারির শিকার হন। সংবাদপত্র, টেলিভিশন ও প্রকাশনা কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রিত ছিল; ইন্টারনেট ব্যবহারের ওপরও গোপন নজরদারি চালানো হতো।

বেন আলীর শাসন নিজেকে ধর্মনিরপেক্ষতা, নারীর অধিকার, শিক্ষা, পর্যটন এবং অর্থনৈতিক আধুনিকায়নের সফল উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করত। উপকূলীয় অঞ্চল, রাজধানী ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে উন্নয়নের দৃশ্যও ছিল বাস্তব। কিন্তু এই উন্নয়নের সুফল সমানভাবে বণ্টিত হয়নি। দেশের অভ্যন্তরীণ ও দক্ষিণাঞ্চলের শহরগুলোতে বেকারত্ব, দারিদ্র্য এবং অবকাঠামোগত পশ্চাৎপদতা রয়ে যায়। বিশেষ করে শিক্ষিত তরুণেরা ডিগ্রি অর্জনের পরও চাকরি না পেয়ে হতাশ হয়ে পড়ছিলেন। রাষ্ট্রের আনুষ্ঠানিক উন্নয়নের গল্প এবং সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার মধ্যে ব্যবধান ক্রমেই বিপজ্জনক হয়ে উঠছিল।

এই ক্ষোভ আরও গভীর করেছিল শাসক পরিবারের দুর্নীতি। বেন আলীর স্ত্রী লেইলা ত্রাবেলসি এবং তাঁর আত্মীয়দের বিরুদ্ধে ব্যাংক, আবাসন, গণমাধ্যম, পর্যটন, গাড়ি আমদানি ও বিভিন্ন লাভজনক ব্যবসা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার অভিযোগ ছিল। ত্রাবেলসি পরিবারের সঙ্গে সম্পর্ক ছাড়া বড় ব্যবসা পরিচালনা বা সরকারি সুবিধা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে—এমন ধারণা সমাজে ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। রাজনৈতিক স্বৈরশাসন ও অর্থনৈতিক লুণ্ঠন একে অপরের রক্ষাকবচে পরিণত হয়েছিল। ফলে বুয়াজিজির ঠেলাগাড়ি জব্দ করার ঘটনাকে মানুষ কেবল একজন কর্মকর্তার অন্যায় হিসেবে দেখেনি; তারা এর মধ্যে পুরো ব্যবস্থার ঔদ্ধত্য ও বৈষম্যের প্রতিফলন দেখেছিল।

২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর বুয়াজিজির আত্মাহুতির পর সিদি বুজিদে শুরু হওয়া প্রতিবাদ প্রথমে সরকারকে গুরুতর হুমকিতে ফেলবে বলে মনে হয়নি। অতীতেও শ্রমিক অসন্তোষ ও আঞ্চলিক বিক্ষোভ নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে দমন করা হয়েছিল। কিন্তু এবার পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। মোবাইল ফোনে ধারণ করা ভিডিও এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের মাধ্যমে প্রত্যন্ত অঞ্চলের প্রতিবাদ রাজধানী ও বিদেশে থাকা তিউনিসীয়দের কাছে পৌঁছে যায়। সরকারি গণমাধ্যম নীরব থাকলেও মানুষ কাসেরিন, থালা, গাফসা ও অন্যান্য শহরের বিক্ষোভ এবং পুলিশি দমনের খবর জানতে থাকে।

প্রতিবাদ ছড়িয়ে পড়ার সঙ্গে সঙ্গে আইনজীবীরা আদালত প্রাঙ্গণে লাল ফিতা ধারণ করে সংহতি জানান। শিক্ষার্থী, শিক্ষক, সাংবাদিক, চিকিৎসক ও মানবাধিকারকর্মীরা আন্দোলনে যুক্ত হন। তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়নের জাতীয় নেতৃত্ব প্রথমে সতর্ক অবস্থান নিলেও এর শক্তিশালী আঞ্চলিক শাখাগুলো বিক্ষোভ, ধর্মঘট ও মিছিল সংগঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। এই সংগঠনটির দেশজুড়ে বিস্তৃত কাঠামো থাকায় স্থানীয় ক্ষোভকে জাতীয় আন্দোলনে রূপ দেওয়া সহজ হয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম প্রতিবাদের ছবি ছড়িয়েছিল, কিন্তু রাজপথে মানুষ জড়ো করার ক্ষেত্রে শ্রমিক সংগঠন ও স্থানীয় কর্মীদের ভূমিকা ছিল অপরিহার্য।

সরকারের প্রতিক্রিয়া ছিল দ্বিমুখী। একদিকে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও গুলি ব্যবহার করে; অন্যদিকে বেন আলী চাকরি সৃষ্টি এবং আঞ্চলিক উন্নয়নের প্রতিশ্রুতি দেন। পুলিশের গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যুর পর আন্দোলনের ভাষা আরও কঠোর হয়ে ওঠে। আগে যেখানে কাজ ও ন্যায়বিচারের দাবি ছিল, সেখানে এখন সরাসরি শাসকের পতনের দাবি উঠতে থাকে। বিক্ষোভকারীদের বহুল উচ্চারিত বক্তব্যের অর্থ ছিল—বেন আলী, চলে যাও। মানুষের ব্যক্তিগত ক্ষোভ একটি অভিন্ন রাজনৈতিক লক্ষ্যে মিলিত হচ্ছিল।

২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি বুয়াজিজির মৃত্যু আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। তাঁর জানাজা শোকের অনুষ্ঠানের পাশাপাশি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য প্রতিবাদে পরিণত হয়। ৮ ও ৯ জানুয়ারি কাসেরিন ও থালাসহ কয়েকটি এলাকায় নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে বহু মানুষ নিহত হন। মৃতের সঠিক সংখ্যা নিয়ে মতভেদ থাকলেও রক্তপাতের খবর দেশজুড়ে মানুষের ক্ষোভ বাড়িয়ে দেয়। পরিবারগুলো নিহতদের ছবি প্রকাশ করে, আর সেই মুখগুলো আন্দোলনের নতুন প্রতীকে পরিণত হয়। দমননীতির মাধ্যমে ভয় ফিরিয়ে আনার বদলে সরকার মানুষের মধ্যে এই উপলব্ধি তৈরি করে যে নীরব থাকলেও তারা নিরাপদ নয়।

১৩ জানুয়ারি বেন আলী টেলিভিশনে জাতির উদ্দেশে শেষ গুরুত্বপূর্ণ ভাষণ দেন। তিনি দাবি করেন, তাঁকে ভুল তথ্য দেওয়া হয়েছিল। তিনি পুলিশকে গুলি না চালানোর নির্দেশ, সংবাদমাধ্যম ও ইন্টারনেটের ওপর বিধিনিষেধ শিথিল, নিত্যপণ্যের দাম কমানো এবং ২০১৪ সালে আর নির্বাচনে না দাঁড়ানোর প্রতিশ্রুতি দেন। এমনকি দীর্ঘদিন ফরাসি ভাষাকে প্রাধান্য দেওয়া এই শাসক জনগণের কাছে পৌঁছাতে তিউনিসীয় আরবি ভাষায় বক্তব্য দেন। কয়েক সপ্তাহ আগে এসব ছাড় হয়তো আন্দোলনকে দুর্বল করতে পারত। কিন্তু তত দিনে জনগণ সংস্কারের প্রতিশ্রুতি নয়, শাসনের অবসান চাইছিল।

১৪ জানুয়ারি রাজধানী তিউনিসের হাবিব বুরগিবা অ্যাভিনিউয়ে অসংখ্য মানুষ সমবেত হয়। তারা স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সামনে দাঁড়িয়ে বেন আলীর পদত্যাগ দাবি করে। রাজধানীর কেন্দ্রে এমন প্রকাশ্য সমাবেশ কয়েক সপ্তাহ আগেও অকল্পনীয় ছিল। কাঁদানে গ্যাস ও পুলিশি অভিযান সত্ত্বেও জনতার চাপ কমেনি। একই সময়ে রাজনৈতিক নেতৃত্বের ভেতরে সংকট এবং নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের আনুগত্য নিয়ে অনিশ্চয়তা দেখা দেয়। তিউনিসিয়ার সেনাবাহিনী তুলনামূলকভাবে ছোট ছিল এবং বেন আলীর ক্ষমতার প্রধান ভিত্তি ছিল পুলিশ ও অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা বাহিনী। সেনাবাহিনীকে নির্বিচারে জনতার বিরুদ্ধে ব্যবহার করা সম্ভব না হওয়ায় শাসকের অবস্থান আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।

সেদিনই বেন আলী স্ত্রী ও পরিবারের কয়েকজন সদস্যকে নিয়ে দেশত্যাগ করেন। তাঁর বিমান শেষ পর্যন্ত সৌদি আরবে আশ্রয় পায়। রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে প্রথমে প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ ঘানুশি সাময়িকভাবে ক্ষমতা গ্রহণের ঘোষণা দেন। পরে সাংবিধানিক পরিষদের প্রধান ফুয়াদ মেবাজা অন্তর্বর্তী প্রেসিডেন্ট হন। তবে শাসক পালিয়ে গেলেও পুরোনো ব্যবস্থার কর্মকর্তারা ক্ষমতায় রয়ে যাওয়ায় বিক্ষোভ থামেনি। জনগণ বেন আলীর দল ও তার প্রভাব অপসারণের দাবিতে আবার রাজপথে নামে। এই চাপের ফলে পুরোনো শাসকগোষ্ঠীর অনেক সদস্যকে অন্তর্বর্তী সরকার থেকে সরতে হয় এবং বেন আলীর দল বিলুপ্ত করা হয়।

“জেসমিন বিপ্লব” নামটি আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে জনপ্রিয় হলেও অনেক তিউনিসীয় একে “মর্যাদার বিপ্লব” বা “১৭ ডিসেম্বর বিপ্লব” বলতে পছন্দ করেন। কারণ জুঁই ফুলের কোমল প্রতীকের আড়ালে ছিল নিহত বিক্ষোভকারী, দরিদ্র অঞ্চলের দীর্ঘ বঞ্চনা এবং নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর দমন। এই বিপ্লবের সাফল্য শুধু বেন আলীর পলায়নে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরবর্তী সময়ে তিউনিসিয়া গণপরিষদ নির্বাচন, নতুন সংবিধান এবং প্রতিদ্বন্দ্বী রাজনৈতিক শক্তির মধ্যে সমঝোতার পথে এগিয়ে যায়। সেই গণতান্ত্রিক যাত্রা সংকট, রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ড, অর্থনৈতিক দুর্বলতা এবং পরবর্তী পশ্চাৎমুখী পরিবর্তনে বাধাগ্রস্ত হলেও ২০১১ সালের অর্জনের ঐতিহাসিক গুরুত্ব তাতে মুছে যায় না।

তিউনিসিয়ার বিপ্লব আরব বিশ্বের প্রথম গণ-আন্দোলন ছিল না, কিন্তু এটি ছিল আরব বসন্তের প্রথম সফল শাসক-পতন। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল এর গতি—মাত্র কয়েক সপ্তাহের আন্দোলনে তেইশ বছর ক্ষমতায় থাকা একজন শাসক পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। এত দিন মানুষ মনে করত নিরাপত্তা বাহিনী, জরুরি আইন ও বিদেশি সমর্থনে সুরক্ষিত আরব শাসনগুলো প্রায় অপরিবর্তনীয়। তিউনিসিয়া সেই ধারণা ভেঙে দেয়। স্যাটেলাইট টেলিভিশন ও অনলাইন মাধ্যমে বেন আলীর পতনের দৃশ্য যখন ঘরে ঘরে পৌঁছায়, তখন অন্য দেশের মানুষ নিজেদের শাসকদের দিকেও নতুন চোখে তাকাতে শুরু করে।

এই বিজয়ের সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিধ্বনি শোনা যায় মিসরে। সেখানে হোসনি মুবারক প্রায় তিন দশক ধরে জরুরি আইন, পুলিশি ক্ষমতা ও নিয়ন্ত্রিত নির্বাচনের মাধ্যমে শাসন করছিলেন। তিউনিসিয়ার মানুষ যদি বেন আলীকে সরাতে পারে, তবে মিসরীয়রা কেন পারবে না—এই প্রশ্ন দ্রুত রাজনৈতিক আহ্বানে পরিণত হয়। সিদি বুজিদের আগুন তিউনিসে স্বৈরশাসন ভেঙেছিল; এবার সেই বিপ্লবী শক্তি নীল নদের তীরে পৌঁছে কায়রোর তাহরির স্কয়ারকে আরব বসন্তের সবচেয়ে পরিচিত মঞ্চে পরিণত করতে চলেছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে