বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আরব বসন্তের সূচনা: বুয়াজিজির আত্মাহুতি থেকে তিউনিসিয়ার গণবিপ্লব

সিরিজ: আরব বসন্ত

আরব বসন্তের সূচনা: বুয়াজিজির আত্মাহুতি থেকে তিউনিসিয়ার গণবিপ্লব
বুয়াজিজির আত্মাহুতি থেকে আরব বসন্তের আগুন

২০১০ সালের শেষ দিকে আরব বিশ্বের অধিকাংশ দেশকে বাইরে থেকে স্থিতিশীল বলেই মনে হতো। কয়েক দশক ধরে একই শাসক বা একই ক্ষমতাকেন্দ্র রাষ্ট্র পরিচালনা করছিল, নিরাপত্তা বাহিনী বিরোধী কণ্ঠ নিয়ন্ত্রণ করছিল এবং নির্বাচন অনুষ্ঠিত হলেও প্রকৃত রাজনৈতিক পরিবর্তনের সুযোগ ছিল সামান্য। কিন্তু এই দৃশ্যমান স্থিতিশীলতার নিচে জমছিল বেকারত্ব, মূল্যবৃদ্ধি, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি, পুলিশি নিপীড়ন এবং মর্যাদাহীন জীবনের গভীর ক্ষোভ। সেই চাপা ক্ষোভের বিস্ফোরণ ঘটেছিল কোনো রাজধানীর বড় রাজনৈতিক মঞ্চে নয়, তিউনিসিয়ার অপেক্ষাকৃত অনুন্নত শহর সিদি বুজিদে এক তরুণ ফেরিওয়ালার ব্যক্তিগত অপমান ও অসহায়তার মধ্য দিয়ে।

মোহাম্মদ বুয়াজিজি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ১৯৮৪ সালের ২৯ মার্চ। তাঁর পরিবার ছিল দরিদ্র, আর অল্প বয়সেই বাবাকে হারানোর কারণে সংসারের দায়ভার অনেকাংশে তাঁর কাঁধে এসে পড়ে। প্রচলিত কিছু প্রতিবেদনে তাঁকে বিশ্ববিদ্যালয়-স্নাতক বেকার হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও বাস্তবে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়েননি। স্থায়ী চাকরির সুযোগ না পেয়ে তিনি ফল ও সবজি বিক্রি করে মা, ভাইবোন ও পরিবারের অন্য সদস্যদের সহায়তা করতেন। প্রতিদিন ভোরে বাজার থেকে পণ্য কিনে ঠেলাগাড়িতে সাজিয়ে রাস্তায় বিক্রি করাই ছিল তাঁর জীবিকা। তিনি কোনো প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক কর্মী ছিলেন না; ছিলেন রাষ্ট্রের প্রান্তে ঠেলে দেওয়া অসংখ্য সাধারণ তরুণের একজন।

তিউনিসিয়ার উপকূলীয় শহরগুলো পর্যটন, বিনিয়োগ ও অবকাঠামোর সুবিধা পেলেও সিদি বুজিদের মতো অভ্যন্তরীণ অঞ্চলে কর্মসংস্থান ছিল অপ্রতুল। শিক্ষিত তরুণদের মধ্যেও বেকারত্ব ছিল ব্যাপক, আর অনানুষ্ঠানিকভাবে জীবিকা নির্বাহকারীদের নিয়মিত প্রশাসনিক হয়রানির মুখে পড়তে হতো। সরকারি অনুমতি, ঘুষ এবং স্থানীয় কর্মকর্তাদের ইচ্ছার ওপর নির্ভর করত ছোট ব্যবসায়ীদের দৈনন্দিন জীবন। প্রেসিডেন্ট জাইন আল-আবিদিন বেন আলীর শাসন উন্নয়ন ও আধুনিকতার ভাবমূর্তি তুলে ধরলেও রাষ্ট্রের সম্পদ ও সুযোগের বড় অংশ শাসক পরিবার, বিশেষ করে তাঁর স্ত্রী লেইলা ত্রাবেলসির আত্মীয়স্বজনের নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল।

২০১০ সালের ১৭ ডিসেম্বর সকালে বুয়াজিজির ঠেলাগাড়ি ও পণ্য স্থানীয় পৌর কর্মকর্তারা জব্দ করেন। তাঁর কাছে প্রয়োজনীয় অনুমতি ছিল না—এমন দাবি করা হলেও তিউনিসিয়ায় ওই ধরনের ভ্রাম্যমাণ বিক্রির জন্য আদৌ নির্দিষ্ট অনুমতি বাধ্যতামূলক ছিল কি না, তা নিয়ে পরে প্রশ্ন ওঠে। বুয়াজিজিকে একজন নারী কর্মকর্তা চড় মেরেছিলেন বলে বহুল প্রচারিত কাহিনি রয়েছে; তবে ঘটনার সেই অংশ নিয়ে সাক্ষ্য পরস্পরবিরোধী। কিন্তু পণ্য ও দাঁড়িপাল্লা কেড়ে নেওয়া, প্রকাশ্যে অপমান এবং অভিযোগ জানানোর সুযোগ না পাওয়ার ঘটনা তাঁর পরিবারের বিবরণ ও পরবর্তী অনুসন্ধানে কেন্দ্রীয় সত্য হিসেবেই উঠে আসে।

বুয়াজিজি স্থানীয় প্রশাসনের কাছে নিজের পণ্য ফেরত চেয়ে এবং হয়রানির প্রতিবাদ জানিয়ে ব্যর্থ হন। প্রাদেশিক গভর্নরের সঙ্গে দেখা করার চেষ্টাও ফলপ্রসূ হয়নি। তাঁর জীবনধারণের সামান্য উপকরণগুলো কেড়ে নেওয়ার অর্থ ছিল শুধু এক দিনের আয় হারানো নয়; এটি ছিল পরিবারকে খাওয়ানোর সক্ষমতা, ব্যক্তিগত সম্মান এবং ভবিষ্যতের শেষ আশাটুকুও হারানো। হতাশ ও ক্ষুব্ধ বুয়াজিজি গভর্নরের কার্যালয়ের সামনে নিজের শরীরে দাহ্য পদার্থ ঢেলে আগুন ধরিয়ে দেন। এটি ছিল এমন এক ব্যক্তির চূড়ান্ত প্রতিবাদ, যার মনে হয়েছিল রাষ্ট্র তাঁর কথা শোনার সব দরজা বন্ধ করে দিয়েছে।

ঘটনার পর বুয়াজিজিকে হাসপাতালে নেওয়া হয়। কিন্তু তাঁর আত্মাহুতির সংবাদ সিদি বুজিদে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। পরিবারের সদস্য, বন্ধু, শ্রমিক, শিক্ষার্থী এবং স্থানীয় বাসিন্দারা সরকারি কার্যালয়ের সামনে জড়ো হয়ে বিচার ও মর্যাদার দাবি জানান। শুরুতে এটি ছিল স্থানীয় প্রশাসনের অন্যায়ের বিরুদ্ধে সীমিত প্রতিবাদ। নিরাপত্তা বাহিনী যখন বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে বলপ্রয়োগ করে, তখন ক্ষোভ আরও বেড়ে যায়। আশপাশের শহরে মিছিল ছড়িয়ে পড়ে এবং বুয়াজিজির ব্যক্তিগত দুর্দশা ধীরে ধীরে একটি জাতীয় সংকটের প্রতীকে পরিণত হয়।

বেন আলীর সরকার সংবাদমাধ্যম কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। ফলে রাষ্ট্রায়ত্ত গণমাধ্যম প্রথম দিকে সিদি বুজিদের ঘটনাকে আড়াল করার চেষ্টা করে। কিন্তু মোবাইল ফোনে ধারণ করা বিক্ষোভের ভিডিও, ছবি ও প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এবং বিদেশি সংবাদমাধ্যমের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। ফেসবুক, ইউটিউব ও অন্যান্য অনলাইন মাধ্যম তথ্যের ওপর সরকারের একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভেঙে দেয়। প্রবাসী তিউনিসীয়দের নেটওয়ার্কও এসব দৃশ্য বহির্বিশ্বে পৌঁছে দিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বিপ্লব সৃষ্টি করেনি; এটি আগে থেকেই জমে থাকা ক্ষোভকে দৃশ্যমান, সংযুক্ত ও দ্রুত বিস্তৃত করেছিল।

প্রতিবাদ যখন সিদি বুজিদ থেকে কাসেরিন, থালা এবং অন্য শহরে ছড়িয়ে পড়ে, তখন দাবিও বদলাতে থাকে। মানুষ শুধু একজন ফেরিওয়ালার জন্য বিচার নয়, কাজের অধিকার, দুর্নীতির অবসান, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এবং স্বৈরশাসনের পতন দাবি করতে শুরু করে। পুলিশি গুলিতে বিক্ষোভকারীদের মৃত্যু আন্দোলনকে আরও তীব্র করে। আইনজীবী, শিক্ষক, মানবাধিকারকর্মী, সাংবাদিক এবং শক্তিশালী শ্রমিক সংগঠন তিউনিসিয়ান জেনারেল লেবার ইউনিয়নের স্থানীয় শাখাগুলো আন্দোলনে যুক্ত হলে বিচ্ছিন্ন প্রতিবাদ একটি দেশব্যাপী গণ-আন্দোলনের রূপ নেয়।

এই সময় হাসপাতালে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন বুয়াজিজি। জনরোষ প্রশমিত করতে প্রেসিডেন্ট বেন আলী হাসপাতালে গিয়ে তাঁকে দেখতে যান। রাষ্ট্রনিয়ন্ত্রিত টেলিভিশনে সেই দৃশ্য প্রচার করা হয়, কিন্তু তাতে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা ফেরেনি। বরং অনেকের কাছে সফরটি ছিল দীর্ঘদিনের অবহেলা ঢাকার ব্যর্থ প্রচেষ্টা। শরীরের অধিকাংশ অংশ মারাত্মকভাবে দগ্ধ হওয়ার পর ২০১১ সালের ৪ জানুয়ারি মোহাম্মদ বুয়াজিজি মারা যান। তাঁর জানাজায় হাজারো মানুষ অংশ নেয় এবং তাঁর মৃত্যু আন্দোলনকে এমন নৈতিক শক্তি দেয়, যা দমন করা সরকারের পক্ষে ক্রমেই কঠিন হয়ে ওঠে।

রাজধানী তিউনিসে বিক্ষোভ পৌঁছানোর পর শাসনব্যবস্থার ভিত্তি কেঁপে ওঠে। বেন আলী প্রথমে কঠোর দমননীতি অনুসরণ করেন, পরে মূল্য কমানো, চাকরি সৃষ্টি এবং রাজনৈতিক সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দেন। তিনি এমনকি ঘোষণা করেন যে ২০১৪ সালে আর প্রেসিডেন্ট পদে দাঁড়াবেন না। কিন্তু তখন মানুষের দাবি সংস্কারের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। যে শাসক তেইশ বছর ধরে ভয় ও নজরদারির মাধ্যমে ক্ষমতা ধরে রেখেছিলেন, তাঁর কথায় জনগণ আর বিশ্বাস করতে প্রস্তুত ছিল না। সেনাবাহিনীও ব্যাপকভাবে বিক্ষোভকারীদের বিরুদ্ধে গুলি চালিয়ে শাসন রক্ষার পথে যায়নি।

অবশেষে ২০১১ সালের ১৪ জানুয়ারি বেন আলী পরিবারসহ তিউনিসিয়া ছেড়ে সৌদি আরবে পালিয়ে যান। মাত্র আটাশ দিনের আন্দোলনে আরব বিশ্বের সবচেয়ে দৃঢ় বলে বিবেচিত স্বৈরশাসনগুলোর একটি ভেঙে পড়ে। তিউনিসিয়ার এই বিপ্লব পরে দেশটির জাতীয় ফুলের নামে “জেসমিন বিপ্লব” হিসেবে পরিচিত হয়। এর সাফল্য আরব বিশ্বের মানুষকে একটি যুগান্তকারী বার্তা দেয়—দীর্ঘদিন ক্ষমতায় থাকা শাসকও অজেয় নয়, ভয়ের প্রাচীরও ভেঙে ফেলা সম্ভব।

বুয়াজিজির আত্মাহুতি এত বিস্তৃত প্রভাব ফেলেছিল, কারণ তাঁর জীবনের অভিজ্ঞতা শুধু তিউনিসিয়ার ছিল না। মিসর, লিবিয়া, ইয়েমেন, সিরিয়া, বাহরাইনসহ বহু দেশের তরুণেরা নিজেদের জীবনেও একই বেকারত্ব, দুর্নীতি, পুলিশি অপমান, রাজনৈতিক অক্ষমতা এবং ভবিষ্যৎহীনতা দেখতে পেয়েছিল। খাদ্যের মূল্য বৃদ্ধি, বৈষম্য, দ্রুত বেড়ে ওঠা তরুণ জনগোষ্ঠী এবং রাষ্ট্রের জবাবদিহির অভাব অঞ্চলজুড়ে একই ধরনের বিস্ফোরক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল। বুয়াজিজির আগুন তাই একটি কারণের চেয়ে বেশি ছিল একটি স্ফুলিঙ্গ—দাহ্য উপাদান বহু বছর ধরেই সমগ্র অঞ্চলে জমা হচ্ছিল।

তিউনিসিয়ার ঘটনার অনুকরণে আলজেরিয়া, মিসর, মৌরিতানিয়া ও অন্য কয়েকটি দেশে মানুষ আত্মাহুতির চেষ্টা করে। জর্ডান, মরক্কো, ওমান ও অন্যান্য দেশে সংস্কারের দাবিতে বিক্ষোভ শুরু হয়। ইয়েমেন ও বাহরাইনে শাসনবিরোধী সমাবেশ শক্তিশালী হতে থাকে; লিবিয়া ও সিরিয়ায় অস্থিরতার প্রাথমিক লক্ষণ দেখা দেয়। বিভিন্ন দেশে প্রতিবাদের কারণ ও পরিণতি এক ছিল না, কিন্তু সবার মুখে ঘুরে ফিরে আসছিল রুটি, স্বাধীনতা, সামাজিক ন্যায়বিচার ও মানবিক মর্যাদার দাবি।

তিউনিসিয়ার বিপ্লব প্রমাণ করেছিল যে একটি আপাতদৃষ্টিতে ব্যক্তিগত ঘটনা রাষ্ট্রের গভীর কাঠামোগত অন্যায়কে প্রকাশ করে দিলে তা ইতিহাসের গতিপথ বদলে দিতে পারে। বুয়াজিজি কোনো আঞ্চলিক বিপ্লবের পরিকল্পনা করেননি, তবু তাঁর মৃত্যু কোটি মানুষের দীর্ঘদিনের অপমানকে একটি পরিচিত মুখ দিয়েছিল। সিদি বুজিদের সেই ঠেলাগাড়ির পাশে শুরু হওয়া প্রতিবাদ কয়েক সপ্তাহের মধ্যে তিউনিসিয়ার স্বৈরশাসন ভেঙে দেয় এবং অচিরেই তার প্রতিধ্বনি পৌঁছে যায় কায়রোর রাস্তায়। বেন আলীর পতনের পর আরব বিশ্বের দৃষ্টি এবার স্থির হয়েছিল মিসরের তাহরির স্কয়ারে—যেখানে হোসনি মুবারকের তিন দশকের শাসনকে চ্যালেঞ্জ জানাতে প্রস্তুত হচ্ছিল আরও বৃহৎ এক জনসমুদ্র।


আপনার পছন্দ হতে পারে