বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মিশরের তাহরির স্কয়ার বিপ্লব: ১৮ দিনে মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের পতন

সিরিজ: আরব বসন্ত

মিশরের তাহরির স্কয়ার বিপ্লব: ১৮ দিনে মুবারকের ৩০ বছরের শাসনের পতন
তাহরিরের ১৮ দিনে মুবারকের শাসনের পতন

সিদি বুজিদের আগুন তিউনিসে স্বৈরশাসন ভেঙেছিল; এবার সেই বিপ্লবী শক্তি নীল নদের তীরে পৌঁছে কায়রোর তাহরির স্কয়ারকে আরব বসন্তের সবচেয়ে পরিচিত মঞ্চে পরিণত করতে চলেছিল। বেন আলীর পলায়ন মিশরীয়দের সামনে একটি অকল্পনীয় সম্ভাবনা হাজির করেছিল—জনগণ ঐক্যবদ্ধ হলে দীর্ঘদিনের শাসককেও সরানো যায়। কিন্তু মিসর ছিল তিউনিসিয়ার চেয়ে অনেক বড়, জনবহুল ও ভূরাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্র। প্রেসিডেন্ট হোসনি মুবারকের পেছনে ছিল শক্তিশালী নিরাপত্তাব্যবস্থা, বিশাল আমলাতন্ত্র, ক্ষমতাসীন দল এবং কয়েক দশক ধরে রাষ্ট্রের কেন্দ্রে থাকা সামরিক প্রতিষ্ঠান। তাই তাঁর পতন সহজ হবে বলে কেউ নিশ্চিত ছিল না।

১৯৮১ সালের অক্টোবরে প্রেসিডেন্ট আনোয়ার সাদাত নিহত হওয়ার পর মুবারক ক্ষমতায় এসেছিলেন। শুরুতে তিনি স্থিতিশীলতা রক্ষা ও রাজনৈতিক উন্মুক্ততার প্রতিশ্রুতি দিলেও দেশটি দীর্ঘস্থায়ী জরুরি আইনের অধীনেই পরিচালিত হয়। এই আইনে পুলিশকে বিনা বিচারে আটক, বিরোধী সমাবেশ নিষিদ্ধ এবং বিশেষ আদালতে বিচার পরিচালনার ব্যাপক ক্ষমতা দেওয়া হয়। মুবারকের ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক পার্টি নির্বাচন, প্রশাসন ও সংসদের ওপর আধিপত্য বিস্তার করে। নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা থাকলেও ক্ষমতার শান্তিপূর্ণ পরিবর্তনের বাস্তব সুযোগ প্রায় অনুপস্থিত ছিল।

মুবারকের শাসনে মিসর যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ মিত্র এবং ইসরায়েলের সঙ্গে শান্তিচুক্তি বজায় রাখা আঞ্চলিক শক্তি হিসেবে পরিচিত ছিল। বিদেশি সহায়তা, পর্যটন, সুয়েজ খালের আয় এবং অর্থনৈতিক সংস্কারের ফলে কিছু খাতে প্রবৃদ্ধি ঘটেছিল। কিন্তু সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সমাজের বৃহৎ অংশের কাছে পৌঁছায়নি। খাদ্যমূল্য বৃদ্ধি, কম মজুরি, যুব বেকারত্ব, অপ্রতুল আবাসন ও দুর্নীতি সাধারণ মানুষের জীবন কঠিন করে তুলেছিল। একই সঙ্গে রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বেসরকারীকরণ ও প্রভাবশালী ব্যবসায়ীদের উত্থান মুবারকের ছেলে গামালকে ঘিরে নতুন ক্ষমতাশালী গোষ্ঠী তৈরি করে। অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, বৃদ্ধ মুবারকের পর তাঁর ছেলেকেই রাষ্ট্রক্ষমতায় বসানো হবে।

পুলিশি নির্যাতন ছিল শাসনব্যবস্থার বিরুদ্ধে ক্ষোভের অন্যতম প্রধান কারণ। ২০১০ সালের জুনে আলেকজান্দ্রিয়ার তরুণ খালেদ সাঈদ পুলিশের হাতে ধরা পড়ে নিহত হন। তাঁর ক্ষতবিক্ষত মুখের ছবি অনলাইনে ছড়িয়ে পড়লে রাষ্ট্রীয় নির্যাতনের প্রতীক হয়ে ওঠে। “আমরা সবাই খালেদ সাঈদ” নামে একটি ফেসবুক পাতা গড়ে ওঠে, যার অন্যতম প্রশাসক ছিলেন গুগলের কর্মকর্তা ওয়ায়েল ঘোনিম। পাতাটি তরুণদের মধ্যে পুলিশি সহিংসতা নিয়ে আলোচনা এবং প্রতিবাদ সংগঠনের গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র তৈরি করে। এর আগেই ৬ এপ্রিল যুব আন্দোলন শ্রমিক ধর্মঘটের প্রতি সংহতি জানিয়ে অনলাইনভিত্তিক সংগঠনের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিল।

তিউনিসিয়ায় বেন আলীর পতনের চার দিন পর, ২০১১ সালের ১৮ জানুয়ারি, মিশরীয় কর্মী আসমা মাহফুজ একটি ভিডিও বার্তায় মানুষকে রাজপথে নামার আহ্বান জানান। প্রতিবাদের দিন হিসেবে বেছে নেওয়া হয় ২৫ জানুয়ারি—মিসরের জাতীয় পুলিশ দিবস। রাষ্ট্র যে দিন পুলিশকে সম্মান জানাত, আন্দোলনকারীরা সেই দিনকেই পুলিশি নির্যাতনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের দিনে রূপান্তর করেন। আয়োজকদের প্রাথমিক লক্ষ্য ছিল কায়রো ও কয়েকটি শহরে সীমিত সমাবেশ। কিন্তু প্রত্যাশার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বেরিয়ে আসে এবং বিভিন্ন মিছিল তাহরির স্কয়ারে মিলিত হয়।

“তাহরির” শব্দের অর্থ মুক্তি। কায়রোর কেন্দ্রস্থলে অবস্থিত এই স্কয়ার সরকারি ভবন, প্রধান সড়ক এবং গুরুত্বপূর্ণ যোগাযোগপথের কাছে হওয়ায় রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ ছিল। ২৫ জানুয়ারির সন্ধ্যায় সেখানে হাজারো মানুষ অবস্থান নিলে পুলিশ তাঁদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে। কাঁদানে গ্যাস, লাঠিচার্জ ও জলকামান ব্যবহার করা হয়; বহু আন্দোলনকারীকে আটক করা হয়। কিন্তু দমননীতি প্রতিবাদ শেষ করতে পারেনি। বরং নিহত ও আহত মানুষের সংবাদ আলেকজান্দ্রিয়া, সুয়েজ, মানসুরা এবং অন্যান্য শহরে আরও মানুষকে ক্ষুব্ধ করে তোলে।

আন্দোলনকারীরা ২৮ জানুয়ারিকে “ক্রোধের শুক্রবার” ঘোষণা করেন। সরকার তার আগে মোবাইল যোগাযোগ ও প্রায় পুরো দেশের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমকে আন্দোলনের প্রধান কারণ মনে করে তথ্যপ্রবাহ বন্ধ করার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু এর উল্টো ফল ঘটে। অনলাইনে আটকে থাকার পরিবর্তে মানুষ মসজিদ, গির্জা, মহল্লা ও পরিচিত সমাবেশস্থল থেকে সরাসরি রাজপথে নামে। জুমার নামাজের পর কায়রোসহ বিভিন্ন শহরে বিশাল মিছিল শুরু হয়। কাসর আল-নিল সেতুতে পুলিশ জলকামান ও কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করেও জনতাকে থামাতে পারেনি।

সেদিন অনেক থানা ও ক্ষমতাসীন দলের কার্যালয়ে আগুন লাগে। পুলিশ একপর্যায়ে রাজপথ থেকে সরে যায় এবং সেনাবাহিনী মোতায়েন করা হয়। তাহরির স্কয়ারে ট্যাংক প্রবেশ করলেও সেনারা সঙ্গে সঙ্গে জনতার ওপর ব্যাপক গুলি চালায়নি। বিক্ষোভকারীরা সেনাদের স্বাগত জানায় এবং ট্যাংকের ওপর উঠে পতাকা ও স্লোগান লিখে দেয়। সেনাবাহিনী আন্দোলনের নেতৃত্ব দেয়নি, কিন্তু পুলিশি পদ্ধতিতে গণহত্যা করে মুবারককে রক্ষার পথও গ্রহণ করেনি। এই অবস্থান শাসকের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে।

মুবারক সরকার ভেঙে দিয়ে নতুন মন্ত্রিসভা গঠন করেন এবং গোয়েন্দাপ্রধান ওমর সুলেইমানকে ভাইস প্রেসিডেন্ট নিয়োগ দেন। প্রায় তিন দশকের শাসনে এই প্রথম একজন ভাইস প্রেসিডেন্ট নিযুক্ত হলেন। মুবারক ঘোষণা করেন, তিনি সেপ্টেম্বরের নির্বাচনে আর দাঁড়াবেন না; তবে তাৎক্ষণিকভাবে পদত্যাগও করবেন না। তাঁর বক্তব্য ছিল, ক্ষমতার হঠাৎ পরিবর্তন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করবে। কিন্তু তাহরিরের মানুষ বুঝেছিল—আন্দোলন থেমে গেলে প্রতিশ্রুতি প্রত্যাহার, গ্রেপ্তার এবং পুরোনো দমননীতি ফিরে আসতে পারে। তাই তাদের স্লোগান স্পষ্ট ছিল: শাসনব্যবস্থার পতন চাই।

১ ফেব্রুয়ারি তাহরির স্কয়ারে “লক্ষ মানুষের মিছিল” অনুষ্ঠিত হয়। মুসলিম, খ্রিষ্টান, ধর্মনিরপেক্ষ তরুণ, ইসলামপন্থী, নারী, শ্রমিক ও মধ্যবিত্ত পেশাজীবীরা সেখানে পাশাপাশি অবস্থান নেন। আন্দোলনকারীরা প্রবেশপথে তল্লাশি চালাতেন, রাস্তা পরিষ্কার করতেন, খাবার ভাগ করে দিতেন এবং অস্থায়ী চিকিৎসাকেন্দ্র পরিচালনা করতেন। মুসলিমদের নামাজের সময় খ্রিষ্টানরা নিরাপত্তাবলয় তৈরি করেন; আবার খ্রিষ্টানদের প্রার্থনার সময় অন্যরা তাঁদের রক্ষা করেন। তাহরির সাময়িকভাবে এমন একটি মিশরের প্রতিচ্ছবি হয়ে উঠেছিল, যেখানে নাগরিক পরিচয় ধর্মীয় ও রাজনৈতিক বিভাজনকে অতিক্রম করেছিল।

২ ফেব্রুয়ারি পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে সহিংস হয়ে ওঠে। মুবারকপন্থী লোকজন ঘোড়া ও উটে চড়ে তাহরিরে প্রবেশ করে বিক্ষোভকারীদের ওপর হামলা চালায়। ঘটনাটি “উটের যুদ্ধ” নামে পরিচিত হয়। পাথর, লাঠি ও অগ্নিবোমা ব্যবহার করে ঘণ্টার পর ঘণ্টা সংঘর্ষ চলে। আন্দোলনকারীরা স্কয়ার রক্ষা করতে ব্যারিকেড নির্মাণ করে এবং আহতদের চিকিৎসা দেয়। এই আক্রমণের পেছনে ক্ষমতাসীন দলের সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের ভূমিকার অভিযোগ ওঠে। উদ্দেশ্য ছিল জনতার অবস্থান ভেঙে দেওয়া এবং আন্দোলনকে বিশৃঙ্খল সংঘর্ষ হিসেবে তুলে ধরা। কিন্তু হামলার পরও তাহরির খালি হয়নি।

পরবর্তী দিনগুলোতে সরকার সময়ক্ষেপণ, আলোচনা এবং ভয় প্রদর্শনের কৌশল গ্রহণ করে। সাংবাদিক ও মানবাধিকারকর্মীদের ওপর হামলা হয়, বিদেশিদের বিরুদ্ধে সন্দেহ ছড়ানো হয় এবং রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম আন্দোলনকারীদের বিদেশি ষড়যন্ত্রকারী হিসেবে উপস্থাপন করে। অন্যদিকে ওমর সুলেইমান বিরোধী দল ও মুসলিম ব্রাদারহুডের প্রতিনিধিদের সঙ্গে আলোচনা শুরু করেন। আন্দোলনের কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব একক ছিল না; তবু মুবারকের তাৎক্ষণিক প্রস্থানের দাবিতে বিভিন্ন গোষ্ঠীর ঐকমত্য অটুট থাকে।

আন্দোলনের শেষ পর্যায়ে শ্রমিকদের ভূমিকা বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। সুয়েজ খাল অঞ্চল, বস্ত্রকল, পরিবহনব্যবস্থা, সরকারি দপ্তর ও বিভিন্ন শিল্পপ্রতিষ্ঠানে ধর্মঘট ছড়িয়ে পড়ে। শ্রমিকেরা শুধু মুবারকের পদত্যাগ নয়, মজুরি বৃদ্ধি, দুর্নীতিগ্রস্ত ব্যবস্থাপক অপসারণ এবং উন্নত কর্মপরিবেশ দাবি করেন। এতে আন্দোলন তাহরির স্কয়ারের প্রতীকী অবস্থান থেকে দেশের অর্থনৈতিক কাঠামোর ভেতরে প্রবেশ করে। রাষ্ট্রের স্বাভাবিক কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা সামরিক ও রাজনৈতিক নেতৃত্বের ওপর সিদ্ধান্ত নেওয়ার চাপ বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

১০ ফেব্রুয়ারি সবাই ধারণা করেছিল মুবারক পদত্যাগ করবেন। কিন্তু টেলিভিশন ভাষণে তিনি কিছু ক্ষমতা সুলেইমানের কাছে হস্তান্তরের কথা বললেও প্রেসিডেন্ট পদে থাকার ঘোষণা দেন। তাহরির স্কয়ারে হতাশা মুহূর্তেই তীব্র ক্ষোভে পরিণত হয়। পরদিন আরও বড় মিছিল, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান ঘেরাও এবং সেনাবাহিনীর সদর দপ্তরের দিকে অগ্রসর হওয়ার আহ্বান ওঠে। পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছায় যে মুবারককে রেখে শাসনব্যবস্থা রক্ষা করা সামরিক নেতৃত্বের জন্য ক্রমেই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে পড়ে।

২০১১ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় ওমর সুলেইমান সংক্ষিপ্ত টেলিভিশন ঘোষণায় জানান, হোসনি মুবারক প্রেসিডেন্ট পদ থেকে সরে দাঁড়িয়েছেন এবং দেশের দায়িত্ব সশস্ত্র বাহিনীর সর্বোচ্চ পরিষদের কাছে হস্তান্তর করেছেন। মাত্র ১৮ দিনের আন্দোলনে প্রায় ৩০ বছরের শাসনের অবসান ঘটে। তাহরির স্কয়ার উল্লাসে ফেটে পড়ে; মানুষ কাঁদতে কাঁদতে পতাকা নাড়ায়, প্রার্থনা করে এবং পরস্পরকে আলিঙ্গন করে। প্রথমবারের মতো লক্ষাধিক মিশরীয় অনুভব করেছিল, রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে তাদের সম্মিলিত কণ্ঠ সত্যিই কার্যকর হতে পারে।

তবে মুবারকের পতন মানেই পুরোনো রাষ্ট্রব্যবস্থার সম্পূর্ণ পতন ছিল না। ক্ষমতা গ্রহণ করেছিল সেই সামরিক প্রতিষ্ঠান, যার ভেতর থেকেই মুবারক উঠে এসেছিলেন। জরুরি আইন, নিরাপত্তা সংস্থা, আমলাতন্ত্র ও অর্থনৈতিক ক্ষমতার পুরোনো কাঠামোর বড় অংশ অক্ষত থাকে। তাই ১১ ফেব্রুয়ারি ছিল একই সঙ্গে একটি ঐতিহাসিক বিজয় এবং অনিশ্চিত রাজনৈতিক যাত্রার সূচনা। তিউনিসিয়ার পর মিসরেও স্বৈরশাসকের পতন আরব বসন্তকে আঞ্চলিক আন্দোলন থেকে এক প্রবল বিপ্লবী ঢেউয়ে পরিণত করল—যে ঢেউ এবার লিবিয়ায় মুয়াম্মার গাদ্দাফির দীর্ঘ শাসনের বিরুদ্ধে আরও রক্তক্ষয়ী সংঘাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছিল।


আপনার পছন্দ হতে পারে