গ্যালিপলি অভিযান: ব্রিটিশ মিত্রবাহিনীর বিপর্যয় ও অটোমানদের ঐতিহাসিক বিজয়ের সম্পূর্ণ ইতিহাস
সিরিজ: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী
গ্যালিপলি অভিযান
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের ইতিহাসে এমন কিছু সামরিক অভিযান রয়েছে, যেগুলো শুধু যুদ্ধক্ষেত্রের ফলাফলের জন্য নয়, সংশ্লিষ্ট জাতিগুলোর জাতীয় স্মৃতি ও পরিচয়ের অংশ হয়ে উঠেছে। ১৯১৫ সালের গ্যালিপলি অভিযান ছিল তেমনই একটি ঘটনা। ব্রিটেন ও তার মিত্ররা দার্দানেলিস প্রণালি দখল করে অটোমান সাম্রাজ্যকে যুদ্ধ থেকে সরিয়ে দেওয়া, কনস্টান্টিনোপলের ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং রাশিয়ার সঙ্গে একটি নিরাপদ সমুদ্রপথ খুলে দেওয়ার উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা করেছিল। কিন্তু কয়েক মাসের নৌ ও স্থলযুদ্ধের পর সেই অভিযান মিত্রশক্তির জন্য বিপর্যয়ে পরিণত হয়। বিপরীতে অটোমানদের জন্য গ্যালিপলি হয়ে ওঠে সাম্রাজ্যের শেষ যুগের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সামরিক বিজয়গুলোর একটি।
অটোমান সাম্রাজ্য ১৯১৪ সালের শেষ দিকে কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে যুদ্ধে প্রবেশ করার পর মিত্রশক্তির সামনে একটি গুরুতর কৌশলগত সমস্যা তৈরি হয়। অটোমান নিয়ন্ত্রণাধীন দার্দানেলিস ও বসফরাস প্রণালি কৃষ্ণসাগরকে ভূমধ্যসাগরের সঙ্গে যুক্ত করত। প্রণালিগুলো বন্ধ থাকায় রাশিয়াকে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে সমুদ্রপথে বিপুল অস্ত্র ও সরঞ্জাম পাঠানো কঠিন হয়ে পড়ে এবং রুশ শস্য রপ্তানির পথও সংকুচিত হয়। ব্রিটিশ নেতৃত্বের একটি অংশ মনে করেছিল, দার্দানেলিস খুলতে পারলে রাশিয়াকে শক্তিশালী করা এবং একই সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্যের রাজধানী কনস্টান্টিনোপলকে সরাসরি হুমকির মুখে ফেলা সম্ভব হবে।
এই পরিকল্পনার সবচেয়ে পরিচিত রাজনৈতিক সমর্থকদের একজন ছিলেন ব্রিটিশ অ্যাডমিরালটির ফার্স্ট লর্ড উইনস্টন চার্চিল। পশ্চিম রণাঙ্গনের রক্তক্ষয়ী অচলাবস্থার বাইরে কেন্দ্রীয় শক্তির তুলনামূলক দুর্বল অংশে আঘাত করার ধারণা তাঁর কাছে আকর্ষণীয় ছিল। আশা করা হচ্ছিল, অটোমানরা দ্রুত পরাজিত হলে বলকানের নিরপেক্ষ রাষ্ট্রগুলোর অবস্থানও মিত্রশক্তির পক্ষে বদলে যেতে পারে।
প্রথম পরিকল্পনা ছিল মূলত নৌবাহিনীনির্ভর। ব্রিটিশ ও ফরাসি যুদ্ধজাহাজ দার্দানেলিসের অটোমান দুর্গ ও কামান ধ্বংস করে প্রণালি অতিক্রম করবে। এরপর কনস্টান্টিনোপলের দিকে এগিয়ে অটোমান সরকারকে আত্মসমর্পণে বাধ্য করার চেষ্টা করা হবে। সমস্যা ছিল—দার্দানেলিস শুধু উপকূলীয় কামানের মাধ্যমে সুরক্ষিত ছিল না; এর পানির নিচে বিস্তৃত মাইনক্ষেত্রও তৈরি করা হয়েছিল।
১৯১৫ সালের ফেব্রুয়ারি থেকে মিত্রবাহিনীর নৌ অভিযান তীব্র হয়। বাইরের অটোমান দুর্গগুলোর ওপর গোলাবর্ষণে কিছু সাফল্য পাওয়া গেলেও প্রণালির গভীরে অগ্রসর হওয়া কঠিন হয়ে ওঠে। মোবাইল অটোমান কামান, মাইন এবং সংকীর্ণ জলপথ মিত্রবহরের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি সৃষ্টি করছিল। মাইন পরিষ্কারকারী জাহাজগুলোকেও রাতের অন্ধকারে অটোমান গোলাবর্ষণের মুখে কাজ করতে হতো।
সবচেয়ে নাটকীয় ঘটনা ঘটে ১৮ মার্চ ১৯১৫। ব্রিটিশ ও ফরাসি যুদ্ধজাহাজের একটি শক্তিশালী বহর দার্দানেলিসের প্রতিরক্ষা ভাঙার চেষ্টা করে। কিন্তু অটোমান মাইনবাহী জাহাজ নুসরেত আগে গোপনে এমন একটি এলাকায় মাইন বসিয়েছিল, যেখান দিয়ে মিত্র যুদ্ধজাহাজগুলো ঘুরে যাওয়ার সময় চলাচল করছিল। ফরাসি যুদ্ধজাহাজ বুভে মাইনে আঘাত করে দ্রুত ডুবে যায়। ব্রিটিশ এইচএমএস ইরেজিস্টিবল ও এইচএমএস ওশানও হারিয়ে যায়, আরও কয়েকটি যুদ্ধজাহাজ গুরুতর ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
১৮ মার্চের ব্যর্থতা প্রমাণ করে যে শুধু যুদ্ধজাহাজের গোলাবর্ষণ দিয়ে দার্দানেলিস জোর করে অতিক্রম করা প্রত্যাশার তুলনায় অনেক বেশি বিপজ্জনক। এরপর মিত্র নেতৃত্ব সিদ্ধান্ত নেয়, উপদ্বীপে সৈন্য নামিয়ে অটোমান কামান ও প্রতিরক্ষা অবস্থান স্থল থেকে দখল করতে হবে। এই সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়েই গ্যালিপলি অভিযান একটি বিশাল উভচর স্থলযুদ্ধে রূপ নেয়।
স্থল অভিযানের নেতৃত্ব দেওয়া হয় জেনারেল ইয়ান হ্যামিল্টনকে। তাঁর অধীন ভূমধ্যসাগরীয় অভিযানকারী বাহিনীতে ব্রিটিশ, ফরাসি, অস্ট্রেলীয়, নিউজিল্যান্ডীয় এবং ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বিভিন্ন অংশের সৈন্য ছিল। পরিকল্পনা অনুযায়ী গ্যালিপলি উপদ্বীপের দক্ষিণে কেপ হেলেস এবং আরও উত্তরে গাবা তেপে অঞ্চলে প্রধান অবতরণ করা হবে। ফরাসি বাহিনীও অভিযানে অংশ নেবে।
২৫ এপ্রিল ১৯১৫ ভোরে মিত্রবাহিনীর প্রধান স্থল অবতরণ শুরু হয়। কেপ হেলেসের বিভিন্ন সৈকতে ব্রিটিশ বাহিনী নামে। কিছু স্থানে তুলনামূলক কম প্রতিরোধের মুখোমুখি হলেও অন্য সৈকতে অটোমান প্রতিরক্ষা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। বিশেষ করে ভি বিচে অবতরণকারী সৈন্যদের প্রচণ্ড ক্ষয়ক্ষতি হয়। পরিকল্পনা ছিল দ্রুত উপদ্বীপের গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমি দখল করা; কিন্তু প্রথম দিনের মধ্যেই সময়সূচি ভেঙে পড়তে থাকে।
আরও উত্তরে অস্ট্রেলিয়ান অ্যান্ড নিউজিল্যান্ড আর্মি কর্পস বা আনজাক বাহিনী অবতরণ করে। তাদের অবতরণস্থল পরে আনজাক কোভ নামে পরিচিত হয়। সৈন্যদের সামনে যে ভূখণ্ড ছিল, তা সামরিক অভিযানের জন্য ভয়াবহ—খাড়া পাহাড়, সরু গিরিখাত, ঝোপঝাড় এবং জটিল রিজলাইন। সমুদ্রসৈকত থেকে অল্প দূরত্বের মধ্যেই ভূমি দ্রুত উঁচু হয়ে গেছে। ফলে ভারী সরঞ্জাম ও কামান ওপরে তোলা কঠিন ছিল এবং ইউনিটগুলো সহজেই বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ছিল।
এই সংকটময় মুহূর্তে অটোমান প্রতিরক্ষায় বিশেষ ভূমিকা পালন করেন লেফটেন্যান্ট কর্নেল মুস্তাফা কামাল, যিনি পরবর্তী সময়ে মুস্তাফা কামাল আতাতুর্ক নামে আধুনিক তুরস্কের প্রতিষ্ঠাতা হবেন। তিনি অটোমান উনিশতম ডিভিশনের নেতৃত্বে ছিলেন। আনজাক অবতরণের খবর পাওয়ার পর পরিস্থিতির গুরুত্ব বুঝে তিনি ঊর্ধ্বতন নির্দেশের জন্য নিষ্ক্রিয়ভাবে অপেক্ষা না করে নিজের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমির দিকে সৈন্য পাঠান।
চুনুক বাইর ও সংশ্লিষ্ট রিজগুলো নিয়ন্ত্রণে রাখা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মিত্রবাহিনী যদি দ্রুত এই উচ্চভূমি দখল করতে পারত, তাহলে অটোমানদের প্রতিরক্ষা গভীরভাবে বিপন্ন হতে পারত। মুস্তাফা কামালের সৈন্যরা অগ্রসর হয়ে আনজাকদের পথ আটকে দেয়। তাঁর সঙ্গে যুক্ত বিখ্যাত নির্দেশের সারমর্ম ছিল—তিনি সৈন্যদের শুধু আক্রমণের নির্দেশ দিচ্ছেন না, প্রয়োজনে মৃত্যুবরণ করে পরবর্তী বাহিনী পৌঁছানোর সময় তৈরি করতে বলছেন। অটোমান প্রতিরোধ মিত্রবাহিনীকে সৈকতের কাছাকাছি সংকীর্ণ এলাকায় আটকে দেয়।
প্রথম কয়েক দিনের মধ্যেই মিত্রশক্তির দ্রুত অগ্রযাত্রার আশা শেষ হয়ে যায়। কেপ হেলেস ও আনজাক অঞ্চলে উভয় পক্ষ মাটিতে প্রতিরক্ষামূলক অবস্থান খুঁড়তে শুরু করে। পশ্চিম রণাঙ্গনের মতো গ্যালিপলিতেও ট্রেঞ্চ যুদ্ধ সৃষ্টি হয়, কিন্তু এখানে পাহাড়ি ও পাথুরে ভূখণ্ড পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তোলে। কোথাও কোথাও দুই পক্ষের ট্রেঞ্চ এত কাছাকাছি ছিল যে একে অন্যের অবস্থানে গ্রেনেড নিক্ষেপ করা সম্ভব হতো।
মে ও জুন মাসে মিত্রবাহিনী কেপ হেলেস থেকে বারবার অগ্রসর হওয়ার চেষ্টা করে। ক্রিথিয়া ও আচি বাবা অঞ্চলের দিকে আক্রমণ চালানো হলেও উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করা যায়নি। কামান, মেশিনগান ও সুরক্ষিত অটোমান অবস্থানের বিরুদ্ধে সরাসরি পদাতিক আক্রমণে ব্যাপক হতাহত হয়। অটোমানরাও মিত্রবাহিনীকে সমুদ্রে ঠেলে দেওয়ার জন্য পাল্টা আক্রমণ চালায় এবং তারাও ভয়াবহ ক্ষয়ক্ষতি সহ্য করে।
যুদ্ধক্ষেত্রের পরিবেশ দ্রুত অসহনীয় হয়ে ওঠে। গ্রীষ্মে প্রচণ্ড গরম, পর্যাপ্ত বিশুদ্ধ পানির অভাব, অপর্যাপ্ত স্যানিটেশন এবং হাজার হাজার মৃতদেহের উপস্থিতি রোগ ছড়িয়ে দেয়। মাছি ছিল গ্যালিপলির সৈন্যদের দৈনন্দিন যন্ত্রণার অন্যতম প্রতীক। খাবার ও মৃতদেহের ওপর অসংখ্য মাছি বসত এবং আমাশয়সহ অন্ত্রের রোগ ব্যাপক আকার ধারণ করে। অনেক সৈন্য সরাসরি যুদ্ধে আহত না হয়েও অসুস্থ হয়ে যুদ্ধক্ষমতা হারায়।
মিত্রশক্তি বুঝতে পারে যে নতুন কোনো বড় পদক্ষেপ ছাড়া অভিযান অচলাবস্থায় আটকে থাকবে। তাই আগস্টে একটি উচ্চাভিলাষী নতুন আক্রমণ পরিকল্পনা করা হয়। আনজাক অঞ্চল থেকে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমির দিকে আক্রমণের পাশাপাশি সুভলা বে এলাকায় নতুন ব্রিটিশ বাহিনী অবতরণ করবে। উদ্দেশ্য ছিল দ্রুত উচ্চভূমি দখল করে অটোমান প্রতিরক্ষা ভেঙে দেওয়া।
৬ আগস্ট থেকে অভিযান শুরু হয়। সুভলা বেতে প্রাথমিক অবতরণ তুলনামূলকভাবে কম প্রতিরোধের মুখে সফল হলেও ব্রিটিশ বাহিনী দ্রুত উচ্চভূমি দখল করতে ব্যর্থ হয়। কমান্ডের দ্বিধা, ক্লান্তি, পানির সংকট এবং সমন্বয়ের সমস্যায় মূল্যবান সময় নষ্ট হয়। এই সময় অটোমানরা নতুন বাহিনী এনে প্রতিরক্ষা শক্তিশালী করতে সক্ষম হয়।
একই সময়ে আনজাক বাহিনী চুনুক বাইর ও আশপাশের উচ্চভূমিতে ভয়াবহ লড়াই চালায়। নিউজিল্যান্ডীয় সৈন্যরা সাময়িকভাবে চুনুক বাইরের অংশ দখল করতে সক্ষম হলেও অবস্থান ধরে রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। কয়েক দিনের তীব্র লড়াইয়ের পর অটোমান পাল্টা আক্রমণে গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমির নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার করা হয়। আগস্ট অভিযানের ব্যর্থতার পর গ্যালিপলিতে বড় ধরনের কৌশলগত বিজয়ের সম্ভাবনা কার্যত শেষ হয়ে যায়।
মিত্রবাহিনীর সমস্যাগুলো ছিল বহুমাত্রিক। অভিযানের উদ্দেশ্য অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী হলেও শুরুতে পর্যাপ্ত স্থলবাহিনী ও সুসংহত উভচর অভিযানের প্রস্তুতি ছিল না। গোয়েন্দা তথ্য ও মানচিত্রের সীমাবদ্ধতা, কঠিন ভূখণ্ডকে অবমূল্যায়ন, বিভিন্ন বাহিনীর মধ্যে সমন্বয়ের সমস্যা, অটোমানদের প্রতিরোধক্ষমতা সম্পর্কে ভুল ধারণা এবং গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে ধীর সিদ্ধান্ত—সবকিছু মিলিয়ে অভিযান ক্রমে ব্যর্থতার দিকে যায়।
অন্যদিকে অটোমান বিজয়কে শুধু মিত্রশক্তির ভুল দিয়ে ব্যাখ্যা করলে তাদের প্রতিরোধের গুরুত্ব কমিয়ে দেখা হয়। জার্মান জেনারেল অটো লিমান ফন স্যান্ডার্সের অধীনে অটোমান পঞ্চম সেনাবাহিনী উপদ্বীপ রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। বিভিন্ন অটোমান কমান্ডার ও ইউনিট কঠিন পরিস্থিতিতে দীর্ঘদিন প্রতিরক্ষা ধরে রাখে। মুস্তাফা কামালের দ্রুত সিদ্ধান্ত এবং গুরুত্বপূর্ণ উচ্চভূমি রক্ষার ক্ষমতা তাঁকে বিশেষ খ্যাতি এনে দেয়।
শরৎ আসার পর মিত্র নেতৃত্বের সামনে প্রশ্ন দাঁড়ায়—অভিযান চালিয়ে যাওয়া হবে, নাকি বাহিনী প্রত্যাহার করা হবে? অক্টোবর মাসে হ্যামিল্টনকে সরিয়ে চার্লস মনরোকে দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করে প্রত্যাহারের পক্ষে মত দেন। ইতিমধ্যে বুলগেরিয়া কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে যুদ্ধে প্রবেশ করায় জার্মানি থেকে অটোমান সাম্রাজ্যে স্থলপথে সরবরাহের সুযোগও উন্নত হচ্ছিল। শীতের আবহাওয়া সৈন্যদের দুর্ভোগ আরও বাড়িয়ে দেয়।
শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তি গ্যালিপলি ছেড়ে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। আশ্চর্যজনকভাবে, পুরো অভিযানের সবচেয়ে দক্ষতার সঙ্গে পরিচালিত অংশগুলোর একটি ছিল প্রত্যাহার। ডিসেম্বর ১৯১৫-তে আনজাক ও সুভলা অঞ্চল থেকে এবং ১৯১৬ সালের জানুয়ারির শুরুতে কেপ হেলেস থেকে সৈন্য সরিয়ে নেওয়া হয়। বিভিন্ন কৌশল ব্যবহার করে অটোমানদের কাছে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত উপস্থিতির ধারণা বজায় রাখা হয়। প্রত্যাহারের সময় প্রত্যাশিত বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি এড়ানো সম্ভব হয়।
প্রায় আট মাসের অভিযানে উভয় পক্ষ মিলিয়ে কয়েক লক্ষ মানুষ নিহত, আহত বা অসুস্থ হয়। সুনির্দিষ্ট হিসাব উৎসভেদে পরিবর্তিত হলেও মিত্রশক্তির প্রায় আড়াই লক্ষ এবং অটোমান বাহিনীরও প্রায় সমপরিমাণ যুদ্ধক্ষয় ও অসুস্থতার শিকার হওয়ার হিসাব বহুল ব্যবহৃত। এই বিপুল মানবিক মূল্য দিয়েও মিত্রশক্তি দার্দানেলিস খুলতে পারেনি, কনস্টান্টিনোপল দখল করতে পারেনি এবং অটোমান সাম্রাজ্যকে যুদ্ধ থেকে বের করে দিতে পারেনি।
ব্যর্থতার রাজনৈতিক মূল্যও ছিল গুরুতর। ব্রিটেনে অভিযান নিয়ে ব্যাপক বিতর্ক সৃষ্টি হয় এবং উইনস্টন চার্চিল অ্যাডমিরালটির পদ হারান। সামরিক পরিকল্পনা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের ব্যর্থতা নিয়ে তদন্ত হয়। রাশিয়ার জন্য কাঙ্ক্ষিত সমুদ্রপথও বন্ধই থেকে যায়। যে অভিযান অটোমান সাম্রাজ্যকে দ্রুত পরাজিত করার শর্টকাট হিসেবে কল্পনা করা হয়েছিল, সেটিই শেষ পর্যন্ত মিত্রশক্তির জন্য দীর্ঘ ও ব্যয়বহুল অচলাবস্থায় পরিণত হয়।
গ্যালিপলির উত্তরাধিকার যুদ্ধক্ষেত্রের বাইরেও গভীর। অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে ২৫ এপ্রিলের আনজাক অবতরণ জাতীয় স্মৃতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে ওঠে এবং দিনটি আনজাক ডে হিসেবে স্মরণ করা হয়। তুর্কি ইতিহাসে গ্যালিপলি বা চানাক্কালে বিজয় অটোমান সাম্রাজ্যের শেষ যুগের অসাধারণ প্রতিরোধের প্রতীক। একই যুদ্ধ মুস্তাফা কামালকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে; কয়েক বছরের মধ্যে অটোমান সাম্রাজ্যের পতনের পর তিনিই তুর্কি স্বাধীনতা আন্দোলনের নেতৃত্ব দেবেন।
গ্যালিপলি অভিযান তাই প্রথম বিশ্বযুদ্ধের একটি বিরল অধ্যায়, যেখানে ভূগোল, কৌশল, নেতৃত্ব এবং সৈনিকের সহনশীলতা একই সঙ্গে যুদ্ধের ফল নির্ধারণ করেছে। দার্দানেলিসের মাইন নৌবহরের পথ আটকে দিয়েছিল, খাড়া পাহাড় ও সরু উপত্যকা মিত্রবাহিনীর অগ্রযাত্রাকে ধীর করেছিল এবং অটোমান সেনাদের দৃঢ় প্রতিরোধ সেই বিলম্বকে সামরিক ব্যর্থতায় পরিণত করেছিল। ১৯১৫ সালে গ্যালিপলির উপকূলে মিত্রশক্তি শুধু একটি অভিযান হারায়নি; তারা বুঝতে বাধ্য হয়েছিল যে অটোমান সাম্রাজ্যকে দ্রুত ভেঙে ফেলার ধারণা ছিল মারাত্মক ভুল। অন্যদিকে অটোমানদের জন্য এই বিজয় হয়ে ওঠে পতনশীল একটি সাম্রাজ্যের শেষ মহান সামরিক সাফল্যগুলোর একটি—যার স্মৃতি তুরস্ক, অস্ট্রেলিয়া ও নিউজিল্যান্ডে এক শতাব্দীরও বেশি সময় পরও জীবন্ত।
জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
মন্টেস্কু ও ভলতেয়ার: ক্ষমতার বিভাজন, ধর্মীয় সহনশীলতা ও মতপ্রকাশের স্বাধীনতা
জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি
আলোকায়ন যুগের সূচনা: বৈজ্ঞানিক বিপ্লব ও যুক্তিবাদে বদলে যাওয়া ইউরোপ
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান