বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান

সিরিজ: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা

লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
পরমাণুর বিভাজন বুঝিয়েও নোবেলের স্বীকৃতি পাননি লিজে মাইটনার।

১৯৩৮ সালের ডিসেম্বর। নাৎসি জার্মানি থেকে পালিয়ে সুইডেনে আশ্রয় নেওয়া লিজে মাইটনারের কাছে বার্লিন থেকে একটি অস্বাভাবিক গবেষণার খবর পৌঁছাল। তাঁর দীর্ঘদিনের সহকর্মী অটো হান জানাচ্ছিলেন, ইউরেনিয়ামে নিউট্রন নিক্ষেপের পর এমন পদার্থ পাওয়া যাচ্ছে, যার রাসায়নিক আচরণ বেরিয়ামের মতো। সমস্যাটি গভীর: ইউরেনিয়ামের মতো ভারী পরমাণু থেকে এত হালকা মৌল আসবে কীভাবে? মাইটনার ও তাঁর ভাগনে অটো রবার্ট ফ্রিশ বুঝলেন, নিউক্লিয়াস সত্যিই দুই বড় খণ্ডে ভেঙে যেতে পারে। এই বিভাজনের সঙ্গে বিপুল শক্তি মুক্তির ব্যাখ্যাই পারমাণবিক যুগের বৈজ্ঞানিক ভিত্তিকে নতুন রূপ দিয়েছিল। অথচ আবিষ্কারের নোবেল স্বীকৃতিতে মাইটনারের নাম থাকেনি।

১৮৭৮ সালের ৭ নভেম্বর ভিয়েনায় একটি ইহুদি পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন লিজে মাইটনার। ছোটবেলা থেকেই গণিত ও প্রকৃতির নিয়মের প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল। কিন্তু সে সময় অস্ট্রিয়ায় মেয়েদের উচ্চশিক্ষার পথ অত্যন্ত সংকীর্ণ। বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের উপযোগী প্রস্তুতি নিতে তাঁকে ব্যক্তিগতভাবে পড়াশোনা করতে হয়। ১৯০১ সালে তিনি ভিয়েনা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হন এবং লুডভিগ বোলৎসমানের শিক্ষায় পদার্থবিজ্ঞানের প্রতি তাঁর আকর্ষণ আরও গভীর হয়। ১৯০৬ সালে পদার্থবিজ্ঞানে ডক্টরেট অর্জন করেন। নারী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতিকূল পরিবেশে এই সাফল্য ছিল দীর্ঘ প্রস্তুতির ফল; গবেষণায় প্রবেশের বাধাগুলো অবশ্য তখনও শেষ হয়নি।

১৯০৭ সালে মাইটনার বার্লিনে যান ম্যাক্স প্ল্যাঙ্কের কাছে নতুন পদার্থবিজ্ঞান শিখতে। সেখানে রসায়নবিদ অটো হানের সঙ্গে তাঁর পরিচয় হয়। তেজস্ক্রিয় পদার্থ নিয়ে দুজনের আগ্রহ মিললেও গবেষণাগারের দরজা মাইটনারের জন্য সমানভাবে খোলা ছিল না। প্রতিষ্ঠানের বিধিনিষেধের কারণে প্রথমদিকে তাঁকে পুরোনো কাঠের কর্মশালায় কাজ করতে হতো। নিয়মিত বেতনও ছিল না। হান রাসায়নিক পদ্ধতিতে পদার্থ আলাদা করতেন, মাইটনার বিকিরণ ও ভৌত বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা করতেন। রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের এই সহযোগিতাই তাঁদের গবেষণাকে শক্তিশালী করেছিল। পরবর্তী সময়ে কাইজার ভিলহেল্ম ইনস্টিটিউট ফর কেমিস্ট্রিতে তিনি নিজস্ব গবেষণাদলের নেতৃত্ব পান।

মাইটনারের বৈজ্ঞানিক পরিচয় কেবল পারমাণবিক বিভাজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। ১৯১৭–১৯১৮ সালে হানের সঙ্গে তিনি প্রোট্যাক্টিনিয়ামের দীর্ঘায়ু আইসোটোপ শনাক্ত করেন, যা মৌলটির পরিচয় প্রতিষ্ঠায় গুরুত্বপূর্ণ ছিল। তেজস্ক্রিয় ক্ষয়, বিটা বিকিরণ ও নিউক্লিয়াসের বৈশিষ্ট্য নিয়েও তাঁর উল্লেখযোগ্য গবেষণা ছিল। ১৯২০-এর দশকে বার্লিন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা ও অধ্যাপনার মাধ্যমে তিনি প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞানীতে পরিণত হন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় এক্স-রে সেবায় কাজ করার অভিজ্ঞতাও তাঁর ছিল। অর্থাৎ, ১৯৩৮ সালের যুগান্তকারী ব্যাখ্যার আগে তিনি কয়েক দশকের পরীক্ষালব্ধ জ্ঞান ও স্বতন্ত্র গবেষণার অভিজ্ঞতা অর্জন করেছিলেন।

১৯৩০-এর দশকে নিউট্রনের সাহায্যে পরমাণুর নিউক্লিয়াস পরিবর্তনের গবেষণা দ্রুত এগোচ্ছিল। এনরিকো ফার্মির পরীক্ষার অনুপ্রেরণায় মাইটনার, হান ও রসায়নবিদ ফ্রিৎজ স্ট্রাসমান ইউরেনিয়াম নিয়ে কাজ শুরু করেন। ইউরেনিয়ামের পারমাণবিক সংখ্যা ৯২; বিজ্ঞানীদের ধারণা ছিল, নিউট্রন শোষণের পর কিছু বিক্রিয়ায় এর চেয়েও ভারী মৌল তৈরি হতে পারে। পরীক্ষায় পাওয়া বিচিত্র তেজস্ক্রিয় পদার্থকে তাই অনেক সময় সম্ভাব্য ইউরেনিয়ামোত্তর মৌল হিসেবে বোঝার চেষ্টা করা হচ্ছিল। সেই প্রত্যাশা গবেষণার দিক নির্ধারণ করলেও ফলাফলগুলোর ব্যাখ্যা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছিল। মাইটনার এই অনুসন্ধানে পরীক্ষার পরিকল্পনা ও ভৌত বিশ্লেষণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

এর মধ্যেই নাৎসি শাসন তাঁর জীবন বিপন্ন করে তোলে। ১৯৩৩ সালে ইহুদি বংশপরিচয়ের কারণে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ানোর অধিকার হারান। খ্রিস্টধর্ম গ্রহণ করেও নাৎসি বর্ণনীতির হাত থেকে রেহাই পাননি। অস্ট্রিয়ার নাগরিকত্ব কিছুদিন তাঁকে গবেষণাপ্রতিষ্ঠানে থাকার সুযোগ দিয়েছিল। কিন্তু ১৯৩৮ সালে জার্মানি অস্ট্রিয়া দখল করলে সেই সুরক্ষাও ভেঙে পড়ে। জুলাইয়ে সহকর্মীদের সহায়তায় তিনি জার্মানি থেকে নেদারল্যান্ডসে পালিয়ে যান; পরে সুইডেনে আশ্রয় নেন। প্রায় ষাট বছর বয়সে তাঁকে পরিচিত কর্মস্থল, যন্ত্রপাতি ও প্রতিষ্ঠিত জীবন ছেড়ে নতুনভাবে শুরু করতে হয়। নির্বাসন তাঁকে বার্লিনের পরীক্ষাগার থেকে সরিয়ে দিলেও গবেষণার আলোচনা থামাতে পারেনি।

সুইডেনে মাইটনারের কাজের সুযোগ প্রথমদিকে সীমিত ছিল। তবু হানের সঙ্গে চিঠিপত্রে ইউরেনিয়াম গবেষণার ফলাফল নিয়ে আলোচনা চলতে থাকে। ১৯৩৮ সালের ডিসেম্বরে হান ও স্ট্রাসমান রাসায়নিক পরীক্ষায় নিশ্চিত হতে থাকেন যে উৎপন্ন পদার্থের মধ্যে বেরিয়াম রয়েছে। বিষয়টি প্রচলিত ধারণার সঙ্গে মিলছিল না: পরিচিত নিউক্লীয় বিক্রিয়ায় সাধারণত ছোট কণা নির্গত হতো, এত বড় ভাঙন প্রত্যাশিত ছিল না। হান মাইটনারের কাছে ব্যাখ্যা চান। বেরিয়ামের উপস্থিতির রাসায়নিক প্রমাণ ছিল হান ও স্ট্রাসমানের মৌলিক অর্জন; সেই ফলাফলের ভৌত অর্থ নির্ণয়ে মাইটনার ও ফ্রিশের কাজ ছিল অপরিহার্য।

বড়দিনের ছুটিতে সুইডেনে মাইটনারের সঙ্গে দেখা করতে আসেন ফ্রিশ। তাঁরা নিউক্লিয়াসের তরলবিন্দু মডেল ব্যবহার করে সমস্যাটি ভাবতে শুরু করেন। এই মডেলে নিউক্লিয়াসকে এমন এক ক্ষুদ্র তরলবিন্দুর সঙ্গে তুলনা করা যায়, যার উপাদানগুলো সম্মিলিতভাবে আচরণ করে। নিউট্রন শোষণের পর ভারী নিউক্লিয়াস বিকৃত ও প্রসারিত হতে পারে। এক পর্যায়ে ধনাত্মক আধানগুলোর পারস্পরিক বিকর্ষণের প্রভাবে সেটি দুটি বড় খণ্ডে বিচ্ছিন্ন হতে পারে। এতে বেরিয়ামের মতো অপেক্ষাকৃত হালকা মৌল পাওয়ার রহস্যের যৌক্তিক ব্যাখ্যা মিলল। নিউক্লিয়াসকে আর অবিভাজ্য বা কেবল সামান্য পরিবর্তনশীল কাঠামো হিসেবে দেখা সম্ভব রইল না।

এরপর প্রশ্ন উঠল, এই প্রক্রিয়ায় শক্তি আসছে কোথা থেকে? মাইটনার ও ফ্রিশের হিসাবে মুক্ত শক্তির পরিমাণ দাঁড়াল প্রায় ২০০ মিলিয়ন ইলেকট্রনভোল্ট। সাধারণ রাসায়নিক বিক্রিয়ার তুলনায় একটি নিউক্লিয়াসের জন্য এটি বিপুল শক্তি। বিভাজনের আগে ও পরের মোট ভরের সামান্য পার্থক্যের সঙ্গে আইনস্টাইনের E=mc² সম্পর্ক যুক্ত করে বিষয়টি বোঝা গেল। বিভাজনে উৎপন্ন নিউক্লিয়াসগুলোর বাঁধনশক্তির পরিবর্তনই শক্তি মুক্তির মূল চাবিকাঠি। এখানে পরমাণুর সম্পূর্ণ ভর শক্তিতে পরিণত হয় না; ভরের অতি ক্ষুদ্র পার্থক্যই বিপুল শক্তির সমতুল্য হয়। এই হিসাব পরীক্ষার আপাত অসম্ভব ফলাফলকে পরিচিত পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে স্থান দিল।

ফ্রিশ জীববিজ্ঞানের কোষ বিভাজনের নাম থেকে প্রক্রিয়াটির জন্য ফিশন শব্দটি গ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালের ১১ ফেব্রুয়ারি মাইটনার ও ফ্রিশের যৌথ ব্যাখ্যা ‘নেচার’ সাময়িকীতে প্রকাশিত হয়। এর আগে জানুয়ারিতে হান ও স্ট্রাসমানের রাসায়নিক ফলাফল প্রকাশিত হয়েছিল। ফ্রিশ পৃথক পরীক্ষায় বিভাজনজাত খণ্ডের শক্তিশালী সংকেতও শনাক্ত করেন। দ্রুত অন্য গবেষকেরা মুক্ত নিউট্রন ও শৃঙ্খল বিক্রিয়ার সম্ভাবনা অনুসন্ধান করতে থাকেন। তবে মাইটনারের ব্যাখ্যা, শৃঙ্খল বিক্রিয়া প্রতিষ্ঠা এবং পারমাণবিক বোমা নির্মাণ ছিল আলাদা বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত ধাপ। সব অর্জনকে একজনের আবিষ্কার বলা যেমন ভুল, তেমনি তাঁর মৌলিক ব্যাখ্যাকে নিছক পরবর্তী মন্তব্য হিসেবে দেখাও বিভ্রান্তিকর।

১৯৪৪ সালের রসায়নে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয় এককভাবে অটো হানকে; সিদ্ধান্ত ঘোষণা করা হয় ১৯৪৫ সালে। মাইটনারের পাশাপাশি স্ট্রাসমান ও ফ্রিশও পুরস্কারের বাইরে থাকেন। মাইটনারের বঞ্চনার পেছনে নির্বাসনে গবেষণাদল থেকে বিচ্ছিন্নতা, নারী ও ইহুদি বিজ্ঞানী হিসেবে প্রান্তিক অবস্থান এবং রসায়ন ও পদার্থবিজ্ঞানের মধ্যে কাজটির মূল্যায়ন বিভক্ত হয়ে যাওয়া গুরুত্বপূর্ণ ছিল। গবেষণার ইতিহাসে তাঁর ভূমিকা ছোট করে উপস্থাপিত হওয়াও সমস্যাটি বাড়ায়। তবে হানের পরীক্ষালব্ধ অর্জন অস্বীকার করে ঘটনাটিকে সরল চুরির গল্প বানালে প্রকৃত ইতিহাস আড়াল হয়। অন্যায়টি ছিল যৌথ আবিষ্কারের স্বীকৃতিতে মাইটনারের কেন্দ্রীয় অবদান যথাযথভাবে স্থান না পাওয়া।

মাইটনার ম্যানহাটন প্রকল্পে কাজ করেননি এবং পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে দূরে ছিলেন। যুদ্ধের পরে তিনি গবেষণা, বক্তৃতা ও বিজ্ঞানের সামাজিক দায়িত্ব নিয়ে সক্রিয় থাকেন। ১৯৬৬ সালে হান ও স্ট্রাসমানের সঙ্গে এনরিকো ফার্মি পুরস্কার পান। তাঁর সম্মানে ১০৯ নম্বর মৌলের নাম হয় মাইটনারিয়াম। ১৯৬৮ সালের ২৭ অক্টোবর কেমব্রিজে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর জীবন দেখায়, বৈজ্ঞানিক সত্য প্রতিষ্ঠিত হলেও অবদানের ন্যায্য স্বীকৃতি স্বয়ংক্রিয়ভাবে আসে না। লিজে মাইটনারকে স্মরণ করার যথার্থ কারণ তাই নোবেলবঞ্চনা ছাড়িয়ে আরও গভীরে: তিনি এমন এক ব্যাখ্যা দিয়েছিলেন, যা পদার্থের অন্তর্গত শক্তি সম্পর্কে মানুষের ধারণা বদলে দিয়েছিল।