জন লক ও আধুনিক গণতন্ত্র: প্রাকৃতিক অধিকার, সামাজিক চুক্তি ও জনগণের সম্মতি
সিরিজ: আলোকায়নের যুগ
শাসকের ক্ষমতার উৎস জনগণের সম্মতি—লকের রাজনৈতিক দর্শনের কেন্দ্রীয় দাবি।
প্রকৃতির নিয়মকে পরীক্ষা ও যুক্তির সাহায্যে বোঝার যে আত্মবিশ্বাস সপ্তদশ শতাব্দীর ইউরোপে জন্ম নিচ্ছিল, তা শেষ পর্যন্ত রাজসিংহাসনের সামনেও প্রশ্ন তুলল। গ্রহের গতি নিয়ে পুরোনো ব্যাখ্যা সংশোধন করা গেলে রাজার ক্ষমতার প্রচলিত ব্যাখ্যাও কি যাচাই করা যায় না? মানুষ জন্মগতভাবে কোনো শাসকের অধীন, নাকি স্বাধীন মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে সরকার প্রতিষ্ঠা করে? জন লক এই প্রশ্নের এমন একটি প্রভাবশালী উত্তর দেন, যা পরবর্তী সাংবিধানিক শাসন ও গণতান্ত্রিক আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক ভিত্তি হয়ে ওঠে: সরকারের বৈধ ক্ষমতা আসে শাসিত মানুষের সম্মতি থেকে।
লকের চিন্তা জন্মেছিল ইংল্যান্ডের অস্থির রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার মধ্যে। ১৬৩২ সালে জন্ম নেওয়া লক শৈশবে গৃহযুদ্ধ, পরে প্রথম চার্লসের মৃত্যুদণ্ড, প্রজাতান্ত্রিক শাসন এবং ১৬৬০ সালে রাজতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠার পরিবর্তন দেখেন। রাজা, পার্লামেন্ট ও ধর্মীয় সম্প্রদায়গুলোর দ্বন্দ্ব তখন বিমূর্ত বিতর্ক ছিল না; মানুষের সম্পদ, স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা এর ওপর নির্ভর করত। অক্সফোর্ডে শিক্ষিত লক চিকিৎসাবিদ্যা ও পর্যবেক্ষণমূলক অনুসন্ধানেও আগ্রহী ছিলেন। ফলে কর্তৃত্ব মেনে নেওয়ার বদলে তার ভিত্তি বিচার করার প্রবণতা তাঁর চিন্তায় বিশেষ গুরুত্ব পায়।
অ্যান্থনি অ্যাশলি কুপার, পরবর্তী আর্ল অব শ্যাফ্টসবেরির সঙ্গে সম্পর্ক লককে রাজনৈতিক ক্ষমতার কাছাকাছি নিয়ে আসে। ক্যাথলিক উত্তরাধিকারী জেমসকে সিংহাসন থেকে বাদ দেওয়া নিয়ে ১৬৭৯–১৬৮১ সালের সংকটে শ্যাফ্টসবেরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা নেন। এই সময়ের সংঘাত লকের রাজনৈতিক রচনার পটভূমি গড়ে তোলে। ১৬৮৩ সালে তিনি নেদারল্যান্ডসে চলে যান এবং ১৬৮৯ সালে ইংল্যান্ডে ফেরেন। তাঁর টু ট্রিটিসেস অব গভর্নমেন্ট ১৬৮৯ সালে প্রকাশিত হলেও বইটির মুদ্রিত তারিখ ছিল ১৬৯০; এর মূল অংশ আগের রাজনৈতিক সংকটের সময় রচিত হয়েছিল।
বইটির প্রথম অংশে লক রবার্ট ফিলমারের পিতৃতান্ত্রিক রাজক্ষমতার যুক্তি আক্রমণ করেন। ফিলমার রাজাদের কর্তৃত্বের উৎস খুঁজেছিলেন আদমের পিতৃত্ব এবং তার কথিত উত্তরাধিকারে। লক দেখাতে চান, পিতার পারিবারিক কর্তৃত্ব থেকে সমগ্র সমাজের ওপর সীমাহীন রাজনৈতিক ক্ষমতা প্রতিষ্ঠা করা যায় না। আদমের উত্তরাধিকারী কে, সেটিও নির্ভরযোগ্যভাবে নির্ধারণ অসম্ভব। এই সমালোচনার তাৎপর্য ছিল মৌলিক: বংশপরিচয় কিংবা ধর্মীয় বংশানুক্রমের দাবি দিয়ে মানুষের রাজনৈতিক আনুগত্যের বাধ্যবাধকতা প্রমাণ করা যায় না।
দ্বিতীয় অংশে লক রাজনৈতিক সমাজের আগের একটি কাল্পনিক অবস্থা বিবেচনা করেন, যাকে বলা হয় প্রাকৃতিক অবস্থা। এটি নির্দিষ্ট কোনো যুগের সরল ইতিহাস নয়; বৈধ কর্তৃত্ব বোঝার দার্শনিক উপায়। সেখানে মানুষ স্বাভাবিকভাবে স্বাধীন ও সমান। কারও জন্ম অন্য মানুষের প্রভু হওয়ার অনুমতিপত্র নয়। তবে স্বাধীনতা মানে যা ইচ্ছা করার অধিকারও নয়। প্রাকৃতিক বিধান মানুষকে অন্যের জীবন, স্বাস্থ্য, স্বাধীনতা ও সম্পদের ক্ষতি করতে নিষেধ করে। লকের কাছে যুক্তি এই বিধান উপলব্ধির উপায়, আর তাঁর ধর্মীয় বিশ্বাসও মানবসমতার ব্যাখ্যায় ভূমিকা রাখে।
এখানেই আসে প্রাকৃতিক অধিকার। জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পত্তির ওপর মানুষের দাবি সরকার তৈরি হওয়ার আগেই বিদ্যমান—এই ছিল লকের যুক্তির কেন্দ্র। সরকার অধিকার সৃষ্টি করে মানুষকে দান করছে, এমন ধারণা তিনি গ্রহণ করেননি। বরং অধিকার রক্ষার প্রয়োজন থেকেই সরকার প্রতিষ্ঠিত হয়। তাঁর লেখায় ‘সম্পত্তি’ শব্দ কখনো জমি বা মালিকানাধীন বস্তু বোঝায়, আবার বিস্তৃত অর্থে জীবন, স্বাধীনতা ও সম্পদকেও অন্তর্ভুক্ত করে। তাই লকের সম্পত্তির ধারণা বুঝতে প্রতিটি ব্যবহারের প্রসঙ্গ বিবেচনা করা জরুরি।
ব্যক্তিগত সম্পত্তির উৎপত্তি ব্যাখ্যা করতে লক শ্রমের কথা বলেন। প্রকৃতির সম্পদ সাধারণভাবে মানুষের জন্য থাকলেও ব্যক্তি নিজের শ্রম দিয়ে কোনো বস্তু সংগ্রহ বা জমি চাষ করলে তার ওপর মালিকানার দাবি তৈরি হতে পারে। তবে এই দাবির সঙ্গে শর্তও ছিল: অপচয় করা যাবে না এবং অন্যদের জন্য যথেষ্ট ও সমমানের সম্পদ থাকতে হবে। অর্থের ব্যবহার সঞ্চয় ও অসম সম্পদবণ্টনের সুযোগ বাড়ায় বলে তিনি ব্যাখ্যা করেন। কিন্তু শ্রমের ভিত্তিতে মালিকানার এই যুক্তি ভূমির প্রচলিত যৌথ ব্যবহার ও আদিবাসী অধিকারের প্রশ্নে গভীর বিতর্ক সৃষ্টি করেছে।
অধিকার যদি আগে থেকেই থাকে, তবে সরকার দরকার কেন? লকের উত্তর ছিল প্রাকৃতিক অবস্থার বাস্তব অসুবিধা। মানুষ নিজের বিরোধে নিজেই বিচারক হলে পক্ষপাত জন্মায়; অপরাধের উপযুক্ত শাস্তি নিয়ে মতভেদ হয়; সিদ্ধান্ত কার্যকর করার নিরপেক্ষ শক্তিও অনুপস্থিত থাকে। নিজের অধিকার নিজে রক্ষার অনিশ্চয়তা কাটাতেই মানুষ রাজনৈতিক সমাজ গঠন করে। টমাস হবসের মতো লক প্রাকৃতিক অবস্থাকে অবধারিতভাবে সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ হিসেবে দেখেননি। তাঁর কাছে সমস্যাটি ছিল স্বাধীনতার পাশাপাশি নিরপেক্ষ বিচার ও নিরাপত্তার অভাব।
সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে মানুষ একটি রাজনৈতিক সম্প্রদায় প্রতিষ্ঠা করে এবং প্রাকৃতিক বিধান কার্যকর করার ব্যক্তিগত ক্ষমতা সমাজের হাতে অর্পণ করে। সম্প্রদায় গঠনের পর যৌথ সিদ্ধান্তের জন্য সংখ্যাগরিষ্ঠতার নীতি প্রয়োজন হয়। সবাই একমত না হলে কোনো কাজই করা যাবে না—এমন শর্তে সমাজ অচল হয়ে পড়বে। কিন্তু সংখ্যাগরিষ্ঠের সিদ্ধান্ত গ্রহণের অর্থ সীমাহীন ক্ষমতা অনুমোদন নয়। মানুষ যে অধিকার রক্ষার উদ্দেশ্যে একত্র হয়েছে, রাজনৈতিক কর্তৃত্ব সেই উদ্দেশ্য ধ্বংস করার বৈধ অধিকার পেতে পারে না।
লক স্পষ্ট সম্মতি এবং প্রচ্ছন্ন সম্মতির মধ্যে পার্থক্য করেন। কেউ প্রত্যক্ষভাবে রাজনৈতিক সমাজের সদস্য হতে সম্মতি দিতে পারেন। আবার কোনো ভূখণ্ডের সুরক্ষা ও সুযোগ ভোগ করার মধ্য দিয়েও সেখানকার আইন মানার সাময়িক বাধ্যবাধকতা তৈরি হতে পারে। এই দ্বিতীয় যুক্তি বিতর্কিত: জন্মস্থান ছেড়ে চলে যাওয়া কঠিন হলে সেখানে বসবাসকে কতটা স্বাধীন সম্মতি বলা যায়? তবু লকের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনটি ছিল এখানেই—শাসক কেন আদেশ দিতে পারেন, সেই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে প্রজার জন্মগত আনুগত্যের পরিবর্তে মানুষের অনুমোদন সামনে আসে।
সরকারের হাতে দেওয়া ক্ষমতাকে লক একটি অর্পিত দায়িত্ব হিসেবে দেখেন। আইনসভা প্রধান রাজনৈতিক প্রতিষ্ঠান হলেও তা স্বেচ্ছাচারী হতে পারে না। প্রতিষ্ঠিত আইন, জনকল্যাণ এবং নিরপেক্ষ বিচার তার কার্যক্রমকে নিয়ন্ত্রণ করবে। জনগণের সম্মতি, সরাসরি কিংবা প্রতিনিধিদের মাধ্যমে, ছাড়া কর আরোপ বৈধ নয়। আইন প্রণয়ন ও কার্যকর করার ক্ষমতা আলাদা রাখারও কারণ আছে: একই মানুষ আইন তৈরি করে নিজের সুবিধায় তা প্রয়োগ করলে অপব্যবহার বাড়তে পারে। তবে লকের কাঠামো পরবর্তী পূর্ণাঙ্গ ত্রিবিভক্ত ক্ষমতা-বিভাজনের সঙ্গে অভিন্ন ছিল না।
সরকার এই আস্থা ভঙ্গ করলে কী হবে? শাসক আইনসভাকে অকার্যকর করলে, ইচ্ছামতো সম্পদ কেড়ে নিলে বা জনগণকে অধীনস্থ করার পরিকল্পনা করলে লকের মতে প্রতিরোধের অধিকার জন্মায়। সরকারের পতন মানেই রাজনৈতিক সমাজের বিলুপ্তি নয়; মানুষ নতুন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করতে পারে। অবশ্য সামান্য ভুল বা প্রতিটি অসন্তোষকে তিনি বিদ্রোহের যথেষ্ট কারণ বলেননি। দীর্ঘস্থায়ী ক্ষমতার অপব্যবহারই ছিল গুরুত্বপূর্ণ। এতে শাসকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে কেবল অপরাধ হিসেবে দেখার বদলে অত্যাচার থেকে অধিকার উদ্ধারের সম্ভাব্য বৈধ পদক্ষেপ হিসেবে বিচার করা হয়।
ধর্মীয় সহিষ্ণুতার ক্ষেত্রেও লক রাষ্ট্রের সীমা নির্ধারণ করেন। ১৬৮৯ সালের এ লেটার কনসার্নিং টলারেশন-এ তিনি যুক্তি দেন, বলপ্রয়োগ মানুষের অন্তরের বিশ্বাস তৈরি করতে পারে না। তবে তাঁর সহিষ্ণুতা বর্তমান অর্থে সর্বজনীন ছিল না; নাস্তিকদের এবং বিদেশি রাজনৈতিক আনুগত্যের সঙ্গে যুক্ত বলে বিবেচিত ধর্মীয় গোষ্ঠীর ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধতা ছিল। একইভাবে তাঁর সম্মতির তত্ত্ব সর্বজনীন প্রাপ্তবয়স্ক ভোটাধিকারের সুস্পষ্ট কর্মসূচি দেয়নি। ঔপনিবেশিক কর্মকাণ্ড ও ক্যারোলিনার শাসনসংক্রান্ত কাজে তাঁর সংশ্লিষ্টতা স্বাধীনতার দর্শনের সঙ্গে দাসপ্রথার বাস্তব সম্পর্ক নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তোলে।
তবু লক রাজনীতির আলোচনায় স্থায়ী পরিবর্তন আনেন। সরকার অধিকার রক্ষায় ব্যর্থ হলে জনগণ তার বৈধতা বিচার করতে পারে—এই ধারণা আমেরিকার স্বাধীনতার আন্দোলনসহ পরবর্তী বহু রাজনৈতিক বিতর্কে প্রভাব ফেলে। আধুনিক গণতন্ত্র অবশ্য একা তাঁর সৃষ্টি নয়; দীর্ঘ সংগ্রামে এর পরিসর বিস্তৃত হয়েছে। লকের অবদান ছিল ক্ষমতাকে উত্তরদায়ী করার শক্তিশালী যুক্তি নির্মাণ। এখন প্রশ্নটি আরও বিস্তৃত হওয়ার পথ পেল: মানুষের অধিকার রক্ষার জন্য রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠানগুলো কীভাবে সাজাতে হবে, যাতে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী সেই ক্ষমতা নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে না পারে?
জঁ-জাক রুশোর সামাজিক চুক্তি: জনগণের সার্বভৌমত্ব, সাম্য ও স্বাধীনতা
লিজে মাইটনার: পারমাণবিক বিভাজনে নোবেলবঞ্চিত বিজ্ঞানীর অবদান
রোজালিন্ড ফ্র্যাঙ্কলিন: ডিএনএর গঠন আবিষ্কারে তাঁর প্রকৃত অবদান
হেডি লামার: হলিউড তারকা থেকে বেতার প্রযুক্তির পথিকৃৎ