বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

টাঙ্গুস্কা বিস্ফোরণ: ১৯০৮ সালে সাইবেরিয়ার বন ধ্বংস করেছিল কী?

টাঙ্গুস্কা বিস্ফোরণ: ১৯০৮ সালে সাইবেরিয়ার বন ধ্বংস করেছিল কী?
মাটিতে আঘাতের আগেই আকাশে শক্তি ছেড়ে বিশাল বনভূমি ধ্বংস করেছিল মহাজাগতিক বস্তুটি।

১৯০৮ সালের ৩০ জুন সকালে সাইবেরিয়ার আকাশে একটি উজ্জ্বল অগ্নিগোলক দেখা যায়। এরপর প্রচণ্ড বিস্ফোরণ, তাপের ঝলক এবং শক্তিশালী চাপতরঙ্গ চারপাশে ছড়িয়ে পড়ে। পোদকামেন্নায়া টাঙ্গুস্কা নদীর অববাহিকার প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার বনভূমিতে বিপুলসংখ্যক গাছ উপড়ে বা ভেঙে পড়ে। অথচ পরে গবেষকেরা সেখানে বিশাল কোনো সংঘর্ষগর্ত খুঁজে পাননি। এই বৈপরীত্যই টাঙ্গুস্কাকে বিংশ শতাব্দীর অন্যতম আলোচিত বৈজ্ঞানিক অনুসন্ধানে পরিণত করে: এত বড় ধ্বংস হলো, কিন্তু আঘাতকারী বস্তুটি কোথায় গেল?

বর্তমান বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যায় সবচেয়ে সম্ভাব্য অপরাধী একটি ছোট পাথুরে গ্রহাণু। বস্তুটি পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে অত্যন্ত দ্রুত প্রবেশ করে এবং মাটিতে পৌঁছানোর আগেই ভেঙে বিপুল গতিশক্তি আশপাশের বায়ুতে ছেড়ে দেয়। এই ঘটনাকে বায়বীয় বিস্ফোরণ বলা হয়। এখানে ‘বিস্ফোরণ’ বলতে ভেতরে জমা রাসায়নিক বিস্ফোরক ফেটে যাওয়া বোঝায় না। মহাজাগতিক গতিতে চলা একটি বস্তুর হঠাৎ ধীর হয়ে ভেঙে পড়ার মাধ্যমেই বিধ্বংসী শক্তি মুক্ত হতে পারে।

টাঙ্গুস্কার প্রত্যক্ষ প্রমাণ সীমিত, তবে বিচিত্র। স্থানীয় এভেনকি জনগোষ্ঠীর সদস্যসহ আশপাশের প্রত্যক্ষদর্শীরা আলো, প্রচণ্ড শব্দ এবং তাপের অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছিলেন। পরবর্তী অনুসন্ধানে পোড়া গাছ, উপড়ে পড়া কাণ্ড এবং বিস্তৃত ধ্বংসের বিন্যাস নথিভুক্ত হয়। দূরের যন্ত্রেও ভূকম্পীয় সংকেত ও বায়ুচাপের পরিবর্তন ধরা পড়েছিল। এসব তথ্য একত্রে একটি বড় আকাশীয় বিস্ফোরণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ। তবে বহু সাক্ষ্য পরে সংগ্রহ করা হয়েছে বলে সময়, দিক ও দূরত্বের প্রতিটি বিবরণকে সমান নির্ভুল ধরে নেওয়া যায় না।

বিস্ফোরণের পরপরই ঘটনাস্থলে বড় বৈজ্ঞানিক অভিযান পৌঁছায়নি। অঞ্চলটি দুর্গম ছিল; পরে বিশ্বযুদ্ধ, রুশ বিপ্লব ও গৃহযুদ্ধ অনুসন্ধান আরও পিছিয়ে দেয়। খনিজবিদ লিওনিদ কুলিক ১৯২১ সালে তদন্তের উদ্যোগ নিলেও মূল ধ্বংসস্থলে পৌঁছাতে পারেননি। তিনি সফল হন ১৯২৭ সালে, ঘটনার উনিশ বছর পরে। তখনো বনভূমিতে ধ্বংসের চিহ্ন স্পষ্ট ছিল। কিন্তু ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর দীর্ঘ বিলম্ব নমুনা সংগ্রহ এবং বিস্ফোরণের আগের পরিবেশের সঙ্গে তুলনা করা কঠিন করে তোলে।

পড়ে থাকা গাছগুলো গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। বড় এলাকায় কাণ্ডের অবস্থান মোটামুটি বিস্ফোরণকেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে ছড়ানো চাপের ইঙ্গিত বহন করে। সামগ্রিক ক্ষতিগ্রস্ত অঞ্চলটি নিখুঁত বৃত্ত নয়; মানচিত্রে অনেকটা প্রজাপতির মতো বিন্যাস দেখা যায়। আগত বস্তুর তির্যক গতিপথ, বায়ুতে শক্তি জমা হওয়ার ধরন এবং ভূপ্রকৃতি এমন অসমতা তৈরিতে ভূমিকা রাখতে পারে। কেন্দ্রের কাছাকাছি কিছু গাছ ডালপালা হারিয়েও দাঁড়িয়ে ছিল। ওপর থেকে আসা প্রবল চাপতরঙ্গের ব্যাখ্যার সঙ্গে এই দৃশ্যও মেলে।

মহাকাশের পাথর বায়ুমণ্ডলে এত শক্তিশালী হয় কীভাবে? এর মূল কারণ বেগ। গতিশক্তি বস্তুর ভরের সমানুপাতে এবং বেগের বর্গের সমানুপাতে বাড়ে। ফলে কয়েক দশ মিটার চওড়া একটি বস্তু প্রতি সেকেন্ডে বহু কিলোমিটার বেগে চললে বিপুল শক্তি বহন করতে পারে। বায়ুমণ্ডলের ঘন স্তরে ঢোকার সময় তার সামনে বায়ু অত্যন্ত সংকুচিত ও উত্তপ্ত হয়। শুধু পৃষ্ঠে সাধারণ ঘর্ষণ হচ্ছে—এভাবে পুরো প্রক্রিয়া বোঝানো যথেষ্ট নয়; প্রবল অভিঘাত ও বায়ুগতীয় চাপ এখানে প্রধান বিষয়।

চাপ বস্তুটির সহ্যক্ষমতা ছাড়িয়ে গেলে সেটি ভাঙতে শুরু করে। খণ্ডগুলো ছড়িয়ে পড়ায় বায়ুর সঙ্গে মিথস্ক্রিয়ার মোট ক্ষেত্রফল বেড়ে যায়। তখন আরও দ্রুত ধীর হওয়া, উত্তাপ সৃষ্টি এবং নতুন করে ভাঙন ঘটতে পারে। অল্প সময়ে বড় পরিমাণ গতিশক্তি বায়ুতে স্থানান্তরিত হলে উত্তপ্ত গ্যাসের দ্রুত প্রসারণ ও অভিঘাততরঙ্গ তৈরি হয়। সেই তরঙ্গ মাটিতে পৌঁছে গাছ ভাঙে ও উপড়ে দেয়। বস্তুটির বড় অংশ বাষ্পীভূত বা সূক্ষ্ম খণ্ডে পরিণত হওয়ায় বিশাল অক্ষত পাথর পাওয়া অপরিহার্য নয়।

তবে টাঙ্গুস্কার বস্তুর আকার, বিস্ফোরণের উচ্চতা ও শক্তির একটিমাত্র নিশ্চিত মান নেই। বিভিন্ন গবেষণায় ভিন্ন অনুমান এসেছে। ২০১৯ সালে নাসা প্রকাশিত একটি গবেষণা-সংশ্লেষে সম্ভাব্য পাথুরে বস্তুর ব্যাস প্রায় পঞ্চাশ থেকে আশি মিটার এবং শক্তি দশ থেকে ত্রিশ মেগাটন বিস্ফোরকের সমতুল্য বলা হয়েছিল। অন্য বিশ্লেষণে কম শক্তি বা ভিন্ন উচ্চতা পাওয়া যায়। এগুলো ধ্বংসের চিহ্ন ও গণনামূলক মডেল থেকে পুনর্গঠন; ১৯০৮ সালে সরাসরি মাপা ফল নয়।

এই শক্তির তুলনায় পারমাণবিক অস্ত্রের কথা আসলেও ঘটনাটি পারমাণবিক বিস্ফোরণ ছিল না। তুলনাটি শুধু মুক্ত শক্তির পরিমাণ বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। একইভাবে কোটি কোটি গাছ ধ্বংসের বহুল প্রচারিত নির্দিষ্ট সংখ্যাকেও সরাসরি গণনা হিসেবে দেখা উচিত নয়। বিশাল এলাকায় গাছের ঘনত্ব ও ক্ষতির মাত্রা সমান ছিল না। তুলনামূলকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত তথ্য হলো, প্রায় দুই হাজার বর্গকিলোমিটার বনভূমিতে ব্যাপকভাবে গাছ ভেঙে বা উপড়ে পড়েছিল।

ধূমকেতু নিয়ে বিতর্কও দীর্ঘদিনের। বরফসমৃদ্ধ একটি বস্তু বায়ুমণ্ডলে ভেঙে গেলে বড় পাথুরে অবশেষ কম পাওয়া যেতে পারে—এই যুক্তি ধূমকেতুর ধারণাকে আকর্ষণীয় করেছিল। কিন্তু পাথুরে গ্রহাণুও আকাশে খণ্ডবিখণ্ড হয়ে একই ধরনের ধ্বংস ঘটাতে পারে। আধুনিক অনেক মডেল পাথুরে বস্তুর ব্যাখ্যাকে সমর্থন করে। তবু মূল বস্তুর সঙ্গে সর্বসম্মতভাবে সম্পর্কিত নমুনা না থাকায় তার সুনির্দিষ্ট খনিজগঠন, ঘনত্ব ও আগের কক্ষপথ পুরোপুরি জানা যায়নি।

ঘটনাস্থলের কাছে চেকো হ্রদকে কখনো পতিত খণ্ডের তৈরি গর্ত হিসেবে প্রস্তাব করা হয়েছে। কিন্তু এই ব্যাখ্যা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আপত্তি রয়েছে; হ্রদটিকে টাঙ্গুস্কার নিশ্চিত সংঘর্ষগর্ত বলা যায় না। বিভিন্ন ক্ষুদ্র কণা, পাথর ও খনিজকেও বিস্ফোরণের অবশেষ হিসেবে দাবি করা হয়েছে। সেগুলোর উৎস, বয়স ও ঘটনাটির সঙ্গে সম্পর্ক আলাদাভাবে প্রমাণ করতে হয়। কেবল কোনো নমুনায় উল্কাপিণ্ডে পাওয়া যায় এমন উপাদান থাকলেই সেটি ১৯০৮ সালের বস্তুটির অংশ হয়ে যায় না।

২০১৩ সালের চেলিয়াবিনস্ক ঘটনা টাঙ্গুস্কা বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ তুলনা দেয়। রাশিয়ার আকাশে অপেক্ষাকৃত ছোট একটি গ্রহাণু ভেঙে চাপতরঙ্গ তৈরি করেছিল; জানালা ভাঙা ও বহু মানুষের আহত হওয়ার ঘটনা ঘটে। এবার প্রচুর ভিডিও, যন্ত্রের তথ্য এবং উদ্ধার করা উল্কাপিণ্ড ছিল। গবেষকেরা সেই তথ্য দিয়ে বায়ুমণ্ডলীয় ভাঙনের মডেল পরীক্ষা করতে পেরেছেন। দুটি ঘটনার আকার ও পরিস্থিতি এক নয়, কিন্তু চেলিয়াবিনস্ক দেখিয়েছে যে মাটিতে বিশাল গর্ত ছাড়াও মহাজাগতিক বস্তু ক্ষতি করতে পারে।

টাঙ্গুস্কার মূল ব্যাখ্যা তাই অজানা কোনো প্রযুক্তি বা ভিনগ্রহের যান দাবি করে না। আকাশে মহাজাগতিক বস্তুর ভাঙন পর্যবেক্ষিত ধ্বংসের কার্যকর ব্যাখ্যা দেয়। অমীমাংসিত অংশগুলো মূলত বস্তুটির সঠিক বৈশিষ্ট্য এবং শক্তি মুক্তির বিস্তারিত নিয়ে। ঘটনাটি পৃথিবীর প্রতিরক্ষার একটি বাস্তব সমস্যাও তুলে ধরে: শুধু বিশাল গ্রহাণু নয়, অপেক্ষাকৃত ছোট বস্তু কোথায় এবং কত উচ্চতায় ভাঙছে, তার ওপরও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ভর করে। তাই গ্রহাণুর কক্ষপথ অনুসরণের পাশাপাশি বায়ুমণ্ডলে তাদের আচরণ বোঝাও জরুরি।


আপনার পছন্দ হতে পারে