রংধনু আসলে গোলাকার—আমরা অর্ধবৃত্ত দেখি কেন? আলোর জ্যামিতির ব্যাখ্যা
রংধনুর পূর্ণ বৃত্ত দেখতে হলে দৃষ্টিসীমার নিচেও সূর্যালোকিত জলকণা থাকতে হয়।
বৃষ্টির পর আকাশে রংধনু উঠলে আমরা সাধারণত একটি রঙিন খিলান দেখি। দুই প্রান্ত যেন দূরের মাঠ, নদী কিংবা পাহাড়ে গিয়ে ঠেকেছে। এই পরিচিত দৃশ্য থেকেই রংধনুকে অর্ধবৃত্ত ভাবা স্বাভাবিক। কিন্তু রংধনুর আলোকীয় জ্যামিতি আসলে একটি পূর্ণ বৃত্ত নির্ধারণ করে। মাটি থেকে দাঁড়িয়ে তার পুরোটা দেখা যায় না, কারণ বৃত্তের বড় অংশ দিগন্তের নিচে পড়ে থাকে। তবে শুধু ‘মাটি ঢেকে রাখে’ বললে ব্যাখ্যা অসম্পূর্ণ থেকে যায়; বৃত্তটি কোথায় এবং কীভাবে তৈরি হচ্ছে, সেটিও বোঝা দরকার।
রংধনু আকাশে ঝুলে থাকা কোনো রঙিন বস্তু নয়। এটি সূর্যের আলো, অসংখ্য জলকণা এবং পর্যবেক্ষকের অবস্থানের ওপর নির্ভরশীল একটি আলোকীয় দৃশ্য। সাধারণ রংধনু দেখার সময় সূর্য থাকে আপনার পেছনে এবং সূর্যালোকিত বৃষ্টির ফোঁটা সামনে। ওই ফোঁটাগুলোর মধ্য দিয়ে যাওয়া আলোর একটি অংশ বিশেষ কোণে আপনার চোখে ফিরে আসে। সব ফোঁটা থেকে আসা আলো সমানভাবে রংধনু তৈরি করে না; সঠিক দিকে অবস্থান করা ফোঁটাগুলোই দৃশ্যমান রঙিন খিলানে অবদান রাখে।
সূর্যের সাদা আলো একটি জলকণায় প্রবেশ করলে তার গতি ও দিক বদলে যায়। এই দিক পরিবর্তনের নাম প্রতিসরণ। আলোর একটি অংশ ফোঁটার পেছনের ভেতরপৃষ্ঠে প্রতিফলিত হয় এবং সামনে দিয়ে বেরিয়ে আসার সময় আবার প্রতিসরিত হয়। প্রধান রংধনুর ক্ষেত্রে আলোর পথে এই একটি অভ্যন্তরীণ প্রতিফলন থাকে। জলকণার ভেতরে আলোর এমন যাত্রার ফলে নির্দিষ্ট কিছু বহির্গমন কোণের কাছে তুলনামূলক বেশি আলো জমা হয়। সেই দিকেই রংধনুর উজ্জ্বল অংশ দেখা যায়।
সাদা আলোয় থাকা বিভিন্ন রঙের প্রতিসরণ সমান নয়। পানির মধ্যে বেগুনি আলো লাল আলোর তুলনায় বেশি বাঁকে। ফলে ফোঁটা থেকে বের হওয়ার পর বিভিন্ন রঙের আলো কিছুটা আলাদা দিকে ছড়িয়ে যায়। প্রধান রংধনুর বাইরের প্রান্তে তাই লাল এবং ভেতরের প্রান্তে বেগুনি থাকে। পরিচিত সাত রঙের নাম দিয়ে বর্ণনা করা হলেও বাস্তবে রংগুলো বিচ্ছিন্ন সাতটি ফিতে নয়; এক রং থেকে অন্য রঙে পরিবর্তন ধারাবাহিকভাবে ঘটে।
বৃত্তের কেন্দ্র খুঁজতে হলে সূর্যের ঠিক বিপরীত দিকটি ভাবতে হবে। সূর্য থেকে আপনার চোখের মধ্য দিয়ে একটি কাল্পনিক সরলরেখা সামনে বাড়িয়ে দিলে সেটি যে দিকে যায়, সেটিই সূর্যবিরোধী দিক। আকাশের সেই বিন্দুকে কেন্দ্র করে প্রধান রংধনুর লাল প্রান্ত প্রায় বিয়াল্লিশ ডিগ্রি কৌণিক দূরত্বে দেখা যায়। বেগুনি প্রান্তের দূরত্ব প্রায় চল্লিশ ডিগ্রি। এখানে ডিগ্রি দিয়ে রংধনুর প্রকৃত দৈর্ঘ্য নয়, চোখ থেকে দেখা দিকগুলোর মধ্যকার কোণ বোঝানো হচ্ছে।
কোনো একটি কেন্দ্রের চারপাশে সব দিকে সমান কৌণিক দূরত্বে বিন্দু নির্বাচন করলে একটি বৃত্তাকার রেখা পাওয়া যায়। রংধনুর ক্ষেত্রেও একই নীতি কাজ করে। আপনার চোখ থেকে উপযুক্ত ফোঁটাগুলোর দিকে টানা দৃষ্টিরেখাগুলো একটি কাল্পনিক শঙ্কুর পৃষ্ঠ বরাবর থাকে। সেই শঙ্কুর চূড়া আপনার চোখে এবং অক্ষ সূর্যবিরোধী দিকে। আকাশে আমরা এই বিন্যাসের বৃত্তাকার চেহারা দেখি। তাই রংধনু গোল হয় শুধু বৃষ্টির ফোঁটা গোল বলেই—এমন ব্যাখ্যা যথেষ্ট নয়; নির্দিষ্ট কোণে আলো ফেরার বিষয়টিই মূল।
এবার বোঝা যায় কেন মাটি থেকে পুরো বৃত্ত দেখা কঠিন। সূর্য দিগন্তের ওপরে থাকলে তার বিপরীত বিন্দুটি আপনার দিগন্তের নিচে থাকে। ফলে রংধনুর কেন্দ্রও নিচে সরে যায়। সমতল ভূমিতে দাঁড়ালে নিচের দিকের প্রয়োজনীয় দৃষ্টিরেখা মাটিতে আটকে যায় এবং সেই দিকে পর্যাপ্ত দূরত্বজুড়ে সূর্যালোকিত বৃষ্টির ফোঁটাও দেখা যায় না। আমরা তাই বৃত্তের কেবল দিগন্তের ওপরের অংশটুকু দেখতে পাই।
এ কারণে আমরা সব সময় ঠিক অর্ধবৃত্তও দেখি না। সূর্য দিগন্তের খুব কাছে থাকলে রংধনুর কেন্দ্র দিগন্তের কাছাকাছি থাকে এবং খিলানটি প্রায় অর্ধবৃত্ত হয়। সূর্য যত ওপরে ওঠে, কেন্দ্র তত নিচে নামে এবং দৃশ্যমান খিলান ছোট হয়। আদর্শ সমতল দিগন্ত ধরে সূর্য বিশ ডিগ্রি ওপরে থাকলে লাল খিলানের সর্বোচ্চ অংশ প্রায় বাইশ ডিগ্রি ওপরে থাকবে। সূর্য প্রায় বিয়াল্লিশ ডিগ্রির বেশি ওপরে উঠলে প্রধান রংধনুর পুরো বৃত্তই স্থানীয় অনুভূমিক রেখার নিচে চলে যায়।
পূর্ণ বৃত্ত দেখার সুযোগ তৈরি হয় উঁচু স্থান থেকে নিচের দিকে তাকালে। বিমান, উঁচু পাহাড় কিংবা গভীর উপত্যকার ওপর থেকে পর্যবেক্ষকের নিচের দিকেও জলকণা দেখা সম্ভব হতে পারে। সূর্য পেছনে থাকলে এবং প্রয়োজনীয় সব দিকে সূর্যালোকিত ফোঁটা থাকলে তখন বৃত্তের নিচের অংশও দৃশ্যমান হয়। তবে শুধু উঁচুতে উঠলেই পূর্ণ রংধনু দেখা যাবে না। সঠিক কোণে যথেষ্ট জলকণা, বাধাহীন দৃষ্টিসীমা এবং উপযুক্ত আলোকসজ্জা—সবগুলো শর্তই দরকার।
জলপ্রপাতের ছিটা বা বাগানের জল ছিটানোর যন্ত্র থেকেও ছোট পরিসরে রংধনু দেখা যায়। এখানেও একই কোণ ও অবস্থানের সম্পর্ক কার্যকর। সূর্য পেছনে রেখে জলকণার দিকে তাকালে রঙিন খিলান দেখা যেতে পারে। অবস্থান ও ছিটার বিস্তার অনুকূল হলে বৃত্তের বড় অংশও ধরা পড়ে। ফলে গোল রংধনু কেবল অনেক উঁচু আকাশের কোনো বিরল নিয়ম নয়; পর্যাপ্ত জলকণা দিয়ে আলোর প্রয়োজনীয় জ্যামিতি পূরণ হওয়াই আসল শর্ত।
রংধনুর দুই প্রান্তে পৌঁছানো যায় না কেন, তার উত্তরও এই পর্যবেক্ষকনির্ভর জ্যামিতিতে রয়েছে। আপনি এগিয়ে গেলে আপনার চোখের অবস্থান বদলায়। তখন অন্য ফোঁটা থেকে আসা আলো উপযুক্ত কোণে চোখে পৌঁছায় এবং নতুন অবস্থানের জন্য রংধনু দেখা যায়। পাশের মানুষটি কাছাকাছি একই দৃশ্য দেখলেও হুবহু একই ফোঁটার আলো দেখছেন না। রংধনুর আপাত প্রান্ত তাই কোনো নির্দিষ্ট মাঠ বা বাড়ির ওপর স্থায়ীভাবে আটকে থাকে না।
কখনো প্রধান রংধনুর বাইরে আরও একটি ম্লান খিলান দেখা যায়। সেটি দ্বিতীয় রংধনু, যার আলো জলকণার ভেতরে দুবার প্রতিফলিত হয়েছে। তার কৌণিক ব্যাসার্ধ বড় এবং রঙের ক্রম উল্টো: লাল ভেতরে, বেগুনি বাইরে। সেটির জ্যামিতিও বৃত্তাকার। অর্থাৎ আকাশে দেখা একক বা জোড়া খিলানের আকৃতির পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট কোণে আলো ফেরার নিয়ম। আমরা বৃত্তের কতটা দেখব, তা নির্ধারণ করে সূর্যের উচ্চতা, জলকণার বিস্তার এবং আমাদের দেখার অবস্থান।
নুগেট পয়েন্ট বাতিঘর: নিউজিল্যান্ডের পাথুরে উপকূলের ইতিহাস
মর্নিং গ্লোরি মেঘ: আকাশে হাজার কিলোমিটার লম্বা মেঘ তৈরি হয় কীভাবে?
লেক হিলিয়ার গোলাপি কেন? অস্ট্রেলিয়ার অদ্ভুত হ্রদের রঙের রহস্য
আকাশ থেকে মাছ বা ব্যাঙ পড়ে কি সত্যিই? প্রাণীবৃষ্টির বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা
মরুভূমিতে বরফ পড়তে পারে? সাহারায় তুষারপাতের কারণ ও বিস্ময়কর ঘটনা
ক্রনবর্গ ক্যাসেল: শেক্সপিয়ারের ‘হ্যামলেট’-এর এলসিনোর দুর্গের বাস্তব ইতিহাস