বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাবিশ্ব কোথায় প্রসারিত হচ্ছে? স্থান, সীমানা ও মহাবিস্ফোরণের সহজ ব্যাখ্যা

মহাবিশ্ব কোথায় প্রসারিত হচ্ছে? স্থান, সীমানা ও মহাবিস্ফোরণের সহজ ব্যাখ্যা
মহাবিশ্বের প্রসারণে বৃহৎ পরিসরে দূরত্ব বাড়ে; বাইরের পাত্রের প্রয়োজন হয় না।

বেলুন ফুললে সেটি চারপাশের বাতাসের জায়গা দখল করে। পুকুর বড় হলে তার পানি আশপাশের জমিতে ছড়ায়। তাই মহাবিশ্ব প্রসারিত হচ্ছে শুনলে স্বাভাবিক প্রশ্ন আসে: সেটি কোন জায়গায় ছড়িয়ে পড়ছে? আধুনিক মহাবিশ্বতত্ত্বের উত্তর হলো, প্রসারণ ব্যাখ্যা করতে মহাবিশ্বের বাইরে আগে থেকে থাকা কোনো ফাঁকা পাত্রের প্রয়োজন নেই। এখানে বৃহৎ পরিসরে স্থানের জ্যামিতি বদলাচ্ছে, ফলে মহাজাগতিক প্রবাহ অনুসরণ করা দূরবর্তী অঞ্চলগুলোর মধ্যকার দূরত্ব বাড়ছে। আমাদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার প্রসারণের সঙ্গে পার্থক্যটি এখানেই।

সাধারণ কোনো বস্তু প্রসারিত হলে আমরা তাকে বাইরের স্থানের সঙ্গে তুলনা করি। কিন্তু মহাবিশ্বের ক্ষেত্রে স্থান নিজেই আলোচনার অংশ। আইনস্টাইনের সাধারণ আপেক্ষিকতায় স্থানকাল কোনো অপরিবর্তনীয় মঞ্চ নয়; এর জ্যামিতি পদার্থ ও শক্তির সঙ্গে সম্পর্কিত এবং সময়ের সঙ্গে বিবর্তিত হতে পারে। মহাবিশ্বের প্রসারণ বলতে সেই বৃহৎ পরিসরের জ্যামিতির পরিবর্তন বোঝানো হয়। এটি বর্ণনা করতে বাইরের দেয়াল থেকে মহাবিশ্বের দূরত্ব মাপতে হয় না; মহাবিশ্বের ভেতরের অঞ্চলগুলোর পারস্পরিক দূরত্ব মাপাই যথেষ্ট।

একটি সংখ্যার উদাহরণ বিষয়টি পরিষ্কার করে। ধরা যাক, মহাজাগতিক প্রবাহে থাকা দুটি দূরবর্তী অঞ্চলের মধ্যকার দূরত্ব কোনো এক সময়ে একশ কোটি আলোকবর্ষ। পরে মহাবিশ্বের দৈর্ঘ্যের সামগ্রিক মাপক দুই গুণ হলে একই সময়ে মাপা তাদের দূরত্ব হবে দুইশ কোটি আলোকবর্ষ। এই পরিবর্তন প্রকাশের জন্য বিজ্ঞানীরা একটি ‘মাত্রা গুণক’ ব্যবহার করেন। এটি বাড়লে বৃহৎ পরিসরের দূরত্ব বাড়ে। নতুন কোনো সীমান্ত এগিয়ে গিয়ে বাইরের অঞ্চল দখল করছে—এমন ঘটনা এই হিসাবের শর্ত নয়।

এই ধারণা থেকে মহাবিস্ফোরণের একটি প্রচলিত ভুল ছবিও সংশোধন করা যায়। মহাবিস্ফোরণকে ফাঁকা মহাকাশের একটি বিন্দুতে বোমা ফাটার মতো ভাবলে একটি কেন্দ্র, বাইরে ছুটে যাওয়া পদার্থ এবং বিস্ফোরণের সামনের সীমানা কল্পনা করতে হয়। কিন্তু মহাবিস্ফোরণ মডেল মহাবিশ্বের আগেকার অত্যন্ত উত্তপ্ত ও ঘন অবস্থা থেকে প্রসারণের ইতিহাস বর্ণনা করে। আজ আমাদের চারপাশের যে অঞ্চল দেখি, তার সব অংশই সেই ঘন অতীতের অংশ ছিল। মহাবিস্ফোরণের স্থান খুঁজতে তাই আকাশের কোনো একটি দিকে তাকানো যায় না।

তাহলে দূরের ছায়াপথগুলো আমাদের থেকে সরে যাচ্ছে কেন? বৃহৎ পরিসরে প্রসারণের কারণে গড় দূরত্ব বাড়ছে। কাছাকাছি মহাজাগতিক দূরত্বে এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সম্পর্ক হলো, যত দূরের ছায়াপথ, তার প্রসারণজনিত পশ্চাদপসরণের হার তত বেশি। এতে মনে হতে পারে আমরা কেন্দ্রে আছি। কিন্তু একই ধরনের মহাবিশ্বে অন্য কোনো ছায়াপথের পর্যবেক্ষকও নিজের চারপাশে একই গড় প্রবণতা দেখবেন। প্রতিটি স্থানকে কেন্দ্র মনে হওয়া এবং সত্যিকারের একটি বিশেষ কেন্দ্র থাকা এক বিষয় নয়।

বেলুনের পৃষ্ঠে কয়েকটি বিন্দু আঁকলে এই সম্পর্কের একটি অংশ বোঝা যায়। বেলুন ফুললে পৃষ্ঠের বিন্দুগুলো একে অন্যের থেকে দূরে যায়। পৃষ্ঠের ওপর বসবাসকারী কাল্পনিক প্রাণীর কাছে কোনো একটি বিন্দু প্রসারণের কেন্দ্র হবে না। তবে উপমাটির সীমা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এখানে শুধু দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠটি স্থানের প্রতীক; বেলুনের ভেতর, ঘরের বাতাস কিংবা বেলুনের কেন্দ্রের সমতুল্য কিছু বাস্তব মহাবিশ্বে আছে বলে ধরে নেওয়া যাবে না। উপমা দূরত্ব বৃদ্ধির সম্পর্ক বোঝায়, বাইরের জগতের অস্তিত্ব প্রমাণ করে না।

মহাবিশ্ব অসীম হলে প্রসারণ কীভাবে সম্ভব, সেটিও আলাদা প্রশ্ন। অসীম স্থানের মোট আকার আরও বড় কোনো সসীম সংখ্যায় বদলাতে হবে না। বরং নির্দিষ্ট দুটি অঞ্চলের মধ্যকার দূরত্ব বাড়তে পারে, যদিও সমগ্র স্থান আগেও অসীম ছিল এবং পরেও অসীম থাকে। অন্যদিকে সসীম আয়তনের স্থানও প্রান্তহীন হতে পারে। গোলকের দ্বিমাত্রিক পৃষ্ঠ তার পরিচিত উদাহরণ। বাস্তব মহাবিশ্বের সামগ্রিক আকৃতি ও বিস্তার সম্পর্কে পর্যবেক্ষণ এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেয়নি।

এখানে পর্যবেক্ষণযোগ্য মহাবিশ্বকে পুরো মহাবিশ্ব থেকে আলাদা করা জরুরি। আলো সীমিত বেগে চলে এবং মহাবিশ্বের একটি সসীম বয়স রয়েছে। ফলে সব অঞ্চলের সংকেত আমাদের কাছে পৌঁছানোর সময় পায়নি। আমরা যে মহাজাগতিক দিগন্তের কথা বলি, সেটি তথ্য পাওয়ার সীমা। এর ওপারে কোনো দেয়াল আছে বা স্থান শেষ হয়ে গেছে, এমন অর্থ হয় না। দূরের অন্য কোনো পর্যবেক্ষকের নিজের অবস্থানকে কেন্দ্র করে আলাদা পর্যবেক্ষণযোগ্য অঞ্চল থাকবে।

প্রসারণের পক্ষে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ আসে দূরের ছায়াপথের আলো থেকে। বৃহৎ পরিসরে মহাবিশ্ব প্রসারিত হওয়ার সময় আমাদের দিকে আসা আলোর তরঙ্গদৈর্ঘ্যও বাড়ে। ফলে পরিচিত বর্ণালির রেখা দীর্ঘতর তরঙ্গদৈর্ঘ্যের দিকে সরে যায়; একে মহাজাগতিক লোহিতসরণ বলে। স্বাধীনভাবে মাপা দূরত্বের সঙ্গে এই সরণের সম্পর্ক পরীক্ষা করা যায়। তবে কোনো একক ছায়াপথের আলো বিশ্লেষণে তার স্থানীয় গতি এবং অন্য প্রভাবও বিবেচনা করতে হয়। শুধু একটি রেখা লাল দিকে সরেছে দেখেই সম্পূর্ণ ইতিহাস নির্ধারণ করা যায় না।

সবকিছু প্রসারিত হলে আমাদের শরীর, পৃথিবী কিংবা পরিমাপের দণ্ড কেন বড় হচ্ছে না? কারণ মহাবিশ্বের সমসত্ত্ব প্রসারণের বর্ণনা সব আকারের ব্যবস্থায় সরাসরি প্রয়োগ করা যায় না। পরমাণু ও কঠিন বস্তু তড়িৎচৌম্বকীয় মিথস্ক্রিয়ায় আবদ্ধ। সৌরজগৎ এবং ছায়াপথের মতো ব্যবস্থায় স্থানীয় মহাকর্ষীয় গতিবিদ্যা গুরুত্বপূর্ণ। এসব আবদ্ধ ব্যবস্থা সাধারণ মহাজাগতিক প্রবাহ অনুসরণ করে ফুলে ওঠে না। তাই মহাবিশ্বের প্রসারণ মানেই পৃথিবী ও সূর্যের দূরত্ব একই অনুপাতে বাড়ছে, এমন সিদ্ধান্ত ভুল।

একই কারণে প্রতিটি ছায়াপথও অন্য প্রতিটি ছায়াপথ থেকে অবধারিতভাবে দূরে যাচ্ছে না। কাছাকাছি ছায়াপথের নিজস্ব গতি, পারস্পরিক আকর্ষণ এবং সংঘর্ষ থাকতে পারে। প্রসারণের নিয়ম সবচেয়ে পরিষ্কার হয় যথেষ্ট বড় পরিসরে গড় আচরণ দেখলে। আরও একটি সূক্ষ্ম বিষয় হলো, অত্যন্ত দূরের অঞ্চলের প্রসারণজনিত দূরত্ব বৃদ্ধির হার আলোর বেগের চেয়েও বেশি হতে পারে। এটি পাশাপাশি অবস্থানকারী দুটি বস্তুর মধ্যে স্থানীয়ভাবে আলোর বেগ অতিক্রম করার সমতুল্য নয়; দূরবর্তী স্থানের দূরত্ব নির্ধারণের সঙ্গে এর সম্পর্ক।

পর্যবেক্ষণ মহাবিশ্বের সাম্প্রতিক প্রসারণের ত্বরণেরও প্রমাণ দেয়। প্রচলিত মডেলে এই আচরণ ব্যাখ্যায় অন্ধকার শক্তির ভূমিকা রয়েছে, যদিও তার প্রকৃতি পুরোপুরি জানা যায়নি। কিন্তু প্রসারণের হার কীভাবে বদলাচ্ছে এবং মহাবিশ্ব কোথায় প্রসারিত হচ্ছে—প্রশ্ন দুটি আলাদা। প্রথমটি মহাবিশ্বের বিবর্তনের হিসাব; দ্বিতীয়টি প্রায়ই বাইরের পাত্রের ধারণা থেকে আসে। বর্তমান প্রতিষ্ঠিত বর্ণনায় সেই পাত্র দরকার হয় না। মহাবিশ্বের ভেতরে দূরত্ব কীভাবে বদলাচ্ছে, সেটিই মাপযোগ্য মূল বিষয়; কোনো বাহ্যিক জগতের অস্তিত্ব এই প্রসারণ থেকে প্রমাণিত হয় না।