বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

লেনটিকুলার ক্লাউড: উড়ন্ত সসারের মতো মেঘ তৈরি হয় কীভাবে?

লেনটিকুলার ক্লাউড: উড়ন্ত সসারের মতো মেঘ তৈরি হয় কীভাবে?
পাহাড়ি বায়ুতরঙ্গের নির্দিষ্ট অংশে তৈরি হয় মসৃণ, লেন্সের মতো মেঘ।

পাহাড়ের পাশে আকাশে একটি চ্যাপ্টা, গোলাকার মেঘ ভাসছে। মাঝের অংশ মোটা, দুই প্রান্ত সরু, কিনারা এত মসৃণ যে দূর থেকে সেটিকে ধাতব কোনো বস্তুও মনে হতে পারে। কখনো তার ওপর আরও কয়েকটি একই আকৃতির স্তর দেখা যায়। বিজ্ঞানকল্পকাহিনির উড়ন্ত সসারের সঙ্গে এই চেহারার মিল থেকেই মেঘটি বিশেষ পরিচিতি পেয়েছে। এর নাম লেনটিকুলার মেঘ। অস্বাভাবিক দেখালেও এটি বায়ুর প্রবাহ, তাপমাত্রা ও জলীয় বাষ্পের পারস্পরিক ক্রিয়ায় তৈরি একটি সুপরিচিত আবহাওয়াগত ঘটনা।

‘লেনটিকুলার’ শব্দের অর্থ লেন্সের মতো। পাশ থেকে দেখলে একটি উত্তল লেন্সের মাঝখান যেমন মোটা এবং প্রান্ত সরু, এই মেঘেও তেমন গঠন দেখা যায়। তবে এটি আলাদা কোনো কঠিন চাকতি নয়। অন্য অনেক মেঘের মতোই এর দৃশ্যমান অংশ অসংখ্য ক্ষুদ্র জলকণা দিয়ে তৈরি; যথেষ্ট ঠান্ডা ও উঁচু স্তরে বরফকণাও থাকতে পারে। বিশেষত্ব উপাদানে যতটা, তার চেয়ে বেশি হলো কোন বায়ুপ্রবাহে এবং কোন সীমার মধ্যে সেই কণাগুলো তৈরি হচ্ছে।

লেনটিকুলার মেঘ গঠনের সবচেয়ে পরিচিত পরিবেশ হলো পাহাড়ি অঞ্চল। তুলনামূলক স্থিতিশীল ও আর্দ্র বায়ু পাহাড়ের দিকে প্রবাহিত হলে বাধা পেয়ে ওপরে ওঠে। পাহাড় পেরোনোর পর সেই বায়ু আবার নিচে নামতে পারে এবং পরবর্তী অংশে পুনরায় ওপরে উঠতে পারে। অনুকূল অবস্থায় এই ওঠানামা পরপর কয়েকটি তরঙ্গ তৈরি করে। নদীর স্রোত পাথরের ওপর দিয়ে যাওয়ার সময় যে ঢেউ দেখা যায়, তার সঙ্গে একটি সীমিত তুলনা করা যায়। এখানে অবশ্য তরঙ্গটি তৈরি হচ্ছে বায়ুমণ্ডলের ভেতরে।

‘স্থিতিশীল বায়ুমণ্ডল’ বলতে বাতাস একেবারে নিশ্চল বোঝায় না। এর অর্থ, কোনো বায়ুখণ্ডকে ওপরের দিকে সরালে চারপাশের পরিবেশের তুলনায় তার আবার আগের উচ্চতার দিকে ফেরার প্রবণতা থাকে। পাহাড় সেই বায়ুকে জোর করে ওপরে তোলে। এরপর ভাসমানতার পরিবর্তনের কারণে সেটি নিচে নামে এবং কখনো ভারসাম্যের অবস্থান পেরিয়ে যায়। এই পুনঃস্থাপন প্রবণতা থেকেই দোলন তৈরি হতে পারে। বায়ুমণ্ডলীয় এই তরঙ্গের সঙ্গে মহাকাশের মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সম্পর্ক নেই।

তরঙ্গ তৈরি হলেই অবশ্য মেঘ হবে না। বায়ুতে যথেষ্ট আর্দ্রতা থাকতে হবে এবং ওপরে ওঠার সময় তাকে সম্পৃক্ত অবস্থায় পৌঁছাতে হবে। উচ্চতা বাড়লে চারপাশের চাপ কমে; বায়ুখণ্ড প্রসারিত হয়ে ঠান্ডা হয়। যথেষ্ট ঠান্ডা হলে জলীয় বাষ্প ক্ষুদ্র কণার ওপর ঘনীভূত হয়ে দৃশ্যমান জলকণা তৈরি করে। তরঙ্গের যে অংশে এই শর্ত পূরণ হয়, সেখানেই মেঘ দেখা দেয়। আশপাশের বাতাসে একই শর্ত না থাকলে আকাশ পরিষ্কার থাকে।

এরপর বায়ু তরঙ্গের নিম্নগামী অংশে প্রবেশ করলে চাপ বাড়ে, সংকোচনের সঙ্গে উষ্ণ হয় এবং জলকণাগুলো আবার বাষ্পে পরিণত হতে পারে। ফলে মেঘের এক পাশে নতুন জলকণা তৈরি হয়, অন্য পাশে সেগুলো অদৃশ্য হয়। দৃশ্যমান মেঘটি তাই বায়ুর একটি নির্দিষ্ট আর্দ্র ও ঠান্ডা অঞ্চলের চিহ্ন। বাতাসের পুরো তরঙ্গ দেখা যায় না; শুধু যে অংশে ঘনীভবন ঘটছে, সেই অংশ চোখে পড়ে।

এই সীমাবদ্ধ ঘনীভবনই মেঘের লেন্সের মতো আকৃতি তৈরি করতে সাহায্য করে। অনুকূল বায়ুপ্রবাহে সম্পৃক্ত অঞ্চলের মাঝখান তুলনামূলক পুরু এবং পাশের অংশ সরু হতে পারে। তার চারপাশে জলকণা দ্রুত বাষ্পীভূত হওয়ায় সীমানাও স্পষ্ট দেখায়। বজ্রমেঘের মতো প্রবল, এলোমেলো ঊর্ধ্বমুখী প্রবাহের বদলে তুলনামূলক সুশৃঙ্খল তরঙ্গপ্রবাহ কাজ করায় গঠনটি মসৃণ থাকে। তবে সব লেনটিকুলার মেঘ নিখুঁত গোল নয়; অনেকগুলো দীর্ঘায়িত, বাদামের মতো কিংবা কিছুটা অসম হয়।

একই জায়গায় স্থির দেখানো এই মেঘের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। মেঘের উচ্চতায় প্রবল বাতাস বইতে থাকলেও পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্কিত তরঙ্গের অবস্থান প্রায় অপরিবর্তিত থাকতে পারে। বাতাস সেই তরঙ্গের মধ্য দিয়ে চলতে থাকে, অথচ ঘনীভবনের অঞ্চলটি সরে যায় না। তাই আমরা একই জলকণাকে দীর্ঘক্ষণ একই স্থানে দেখছি না; নতুন কণা তৈরি ও পুরোনো কণার বাষ্পীভবনের ধারাবাহিক ফল দেখছি। মেঘের ভেতরের ছোট গঠন বদলাতে দেখলে চলমান বাতাসের এই প্রভাব বোঝা যেতে পারে।

কখনো একটির ওপর আরেকটি থালা সাজানোর মতো বহুস্তর মেঘ দেখা যায়। বায়ুমণ্ডলের বিভিন্ন উচ্চতায় আর্দ্রতার পরিমাণ এক নয়। একাধিক আর্দ্র স্তর একই তরঙ্গব্যবস্থায় পর্যাপ্ত ওপরে উঠলে প্রত্যেক স্তরে আলাদাভাবে ঘনীভবন ঘটতে পারে। মাঝের অপেক্ষাকৃত শুষ্ক অংশে মেঘ না থাকায় স্তরগুলো বিচ্ছিন্ন দেখায়। আবার পরপর তরঙ্গশীর্ষে মেঘ তৈরি হলে পাহাড়ের পেছনে আকাশজুড়ে একাধিক মেঘের সারিও দেখা যায়। স্তূপ এবং সারি—দুটি আলাদা দৃশ্যের পেছনেই বায়ুতরঙ্গের ভূমিকা থাকতে পারে।

আলো এই মেঘের অস্বাভাবিক চেহারা আরও বাড়িয়ে দেয়। সূর্য নিচু অবস্থানে থাকলে ওপরের অংশ উজ্জ্বল এবং নিচের অংশ ছায়াচ্ছন্ন হতে পারে। মসৃণ প্রান্তে সোনালি বা কমলা আভা পড়লে তা ধাতব চাকতির কিনারার মতো লাগে। পাশ থেকে দেখার কোণও গুরুত্বপূর্ণ: চ্যাপ্টা মেঘটি তখন আরও সরু ও সুসংবদ্ধ দেখায়। ফলে উড়ন্ত সসারের সঙ্গে মিলটি মূলত আকৃতি, আলোকসজ্জা এবং পর্যবেক্ষণের কোণের সম্মিলিত ফল।

লেনটিকুলার কোনো একটি নির্দিষ্ট উচ্চতার মেঘের নাম নয়; এটি আকৃতিভিত্তিক পরিচয়। বিভিন্ন উচ্চতায় স্তরপুঞ্জ, উচ্চস্তরপুঞ্জ কিংবা অলকপুঞ্জ মেঘে এই বৈশিষ্ট্য থাকতে পারে। পাহাড়ের সঙ্গে সম্পর্ক সবচেয়ে পরিচিত হলেও পাহাড় ছাড়াও উপযুক্ত বায়ুতরঙ্গের পরিবেশে লেন্সের মতো মেঘ তৈরি হতে পারে। আবার পাহাড়ের মাথায় দেখা প্রতিটি মেঘই লেনটিকুলার নয়। চূড়াকে ঢেকে রাখা টুপির মতো মেঘ এবং পাহাড়ের এক পাশে পতাকার মতো ঝুলে থাকা মেঘের গঠন আলাদাভাবে বিচার করতে হয়।

বিমানচালনার ক্ষেত্রে এসব মেঘের গুরুত্ব আছে। মেঘটি নিজে শক্ত কোনো বাধা নয়, কিন্তু তার উপস্থিতি পাহাড়ি বায়ুতরঙ্গের সংকেত দিতে পারে। সংশ্লিষ্ট অঞ্চলে শক্তিশালী ঊর্ধ্বপ্রবাহ, নিম্নপ্রবাহ এবং বিশেষ করে নিচের কিছু অংশে বিপজ্জনক ঘূর্ণিবায়ু থাকতে পারে। মসৃণ মেঘ দেখে তাই আশপাশের পুরো বায়ুমণ্ডল শান্ত ধরে নেওয়া যায় না। আবার আর্দ্রতা কম হলে মেঘ ছাড়াই পাহাড়ি তরঙ্গ থাকতে পারে। দৃশ্যমান মেঘের অনুপস্থিতিও নিরাপদ বায়ুপ্রবাহের নিশ্চয়তা দেয় না।

লেনটিকুলার মেঘ দেখলেই বৃষ্টি, বজ্রঝড় বা অন্য কোনো দুর্যোগ আসবে—এমন নির্দিষ্ট সিদ্ধান্তও ঠিক নয়। এটি প্রধানত নির্দিষ্ট উচ্চতায় বায়ুর প্রবাহ ও আর্দ্রতার তথ্য দেয়। এর উড়ন্ত সসারের মতো আকৃতির ব্যাখ্যাও সেই বায়ুর মধ্যেই রয়েছে: তরঙ্গের ঠান্ডা অংশে জলকণা তৈরি হচ্ছে, উষ্ণ অংশে অদৃশ্য হচ্ছে এবং এই পরিবর্তনের সীমানা একটি মসৃণ লেন্স এঁকে দিচ্ছে। আকাশে স্থির মনে হওয়া চাকতিটি আসলে চলমান বাতাসের মধ্যে ক্রমাগত তৈরি হতে থাকা মেঘ।