ট্রুম্যানের পারমাণবিক বোমা হামলার সিদ্ধান্ত: ১৯৪৫ সালে বিশ্বযুদ্ধের অবসান
যুদ্ধের অবসানের সঙ্গে শুরু হয়েছিল পারমাণবিক ধ্বংসের নতুন যুগ।
- পরাজয়ের মুখে জাপান, কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে ট্রুম্যান
- ম্যানহাটন প্রকল্প থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন
- হিরোশিমা ও নাগাসাকি: সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে নাগরিক বিপর্যয়
- জাপানের আত্মসমর্পণ: বোমার পাশাপাশি সোভিয়েত আক্রমণ
- যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা, নাকি সোভিয়েত শক্তিকে বার্তা দেওয়া?
- যুদ্ধের অবসান ও পারমাণবিক যুগের নৈতিক উত্তরাধিকার
পরাজয়ের মুখে জাপান, কঠিন সিদ্ধান্তের সামনে ট্রুম্যান
১৯৪৫ সালের গ্রীষ্মে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ শেষ হলেও প্রশান্ত মহাসাগরে যুদ্ধ চলছিল। জার্মানি আত্মসমর্পণ করেছে, কিন্তু জাপানের সামরিক নেতৃত্ব লড়াই অব্যাহত রেখেছে। দেশটির নৌক্ষমতা বিপর্যস্ত, শহরগুলো বিমান হামলায় বিধ্বস্ত এবং সামুদ্রিক অবরোধে সরবরাহ সংকুচিত। তবু সামরিকভাবে পরাজিত হওয়া এবং রাজনৈতিকভাবে আত্মসমর্পণ করা এক বিষয় ছিল না।
১২ এপ্রিল প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্টের মৃত্যুর পর হ্যারি এস ট্রুম্যান যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হন। উত্তরাধিকারসূত্রে তিনি পান যুদ্ধ শেষ করার দায়িত্ব এবং ম্যানহাটন প্রকল্পের গোপন অস্ত্র—পারমাণবিক বোমা।
স্থল আক্রমণের আশঙ্কা
ইও জিমা ও ওকিনাওয়ার রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ মার্কিন নেতৃত্বকে বুঝিয়েছিল, জাপানের মূল ভূখণ্ডে আক্রমণ অত্যন্ত ব্যয়বহুল হতে পারে। পরিকল্পিত অভিযানে প্রথমে কিউশু এবং পরে হোনশুতে নামার প্রস্তুতি চলছিল।
সম্ভাব্য হতাহতের হিসাব অবশ্য এক ছিল না। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অনুমান করা হয়েছিল। তাই বোমা ব্যবহার নিশ্চিতভাবে নির্দিষ্ট কয়েক লাখ বা দশ লাখ মানুষের জীবন বাঁচিয়েছিল—এমন দাবিকে প্রতিষ্ঠিত সংখ্যা হিসেবে উপস্থাপন করা যথাযথ নয়। তবে দীর্ঘ যুদ্ধ ও বিপুল প্রাণহানির আশঙ্কা ট্রুম্যানের সিদ্ধান্তের গুরুত্বপূর্ণ পটভূমি ছিল।
ম্যানহাটন প্রকল্প থেকে যুদ্ধক্ষেত্রে ব্যবহারের অনুমোদন
পারমাণবিক অস্ত্র তৈরির উদ্যোগ শুরু হয়েছিল নাৎসি জার্মানি আগে এমন অস্ত্র তৈরি করতে পারে—এই আশঙ্কা থেকে। কিন্তু জার্মানির পরাজয়ের পরও প্রকল্প বন্ধ হয়নি। ১৬ জুলাই ১৯৪৫ নিউ মেক্সিকোতে ট্রিনিটি পরীক্ষায় প্রথম পারমাণবিক বিস্ফোরণ সফল হয়।
বিকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছিল
যুক্তরাষ্ট্রের সামনে প্রচলিত বোমাবর্ষণ ও অবরোধ চালিয়ে যাওয়া, স্থল আক্রমণ করা, জনবসতিহীন স্থানে বোমার প্রদর্শনী ঘটানো এবং সরাসরি জাপানি শহরে আঘাত করার মতো বিকল্প ছিল।
কিছু বিজ্ঞানী প্রদর্শনীর পক্ষে যুক্তি দিয়েছিলেন। কিন্তু পরীক্ষামূলক বিস্ফোরণ ব্যর্থ হওয়া, সীমিতসংখ্যক প্রস্তুত বোমা এবং প্রদর্শনী দেখেও জাপান আত্মসমর্পণ না করার আশঙ্কা সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করে। অন্তর্বর্তী কমিটির পরামর্শ সরাসরি ব্যবহারের পক্ষে যায়।
২৬ জুলাই যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও চীন পটসডাম ঘোষণায় জাপানের সশস্ত্র বাহিনীর নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ দাবি করে। অমান্য করলে ব্যাপক ধ্বংসের হুমকি দেওয়া হয়, কিন্তু পারমাণবিক বোমার কথা স্পষ্ট করা হয়নি।
একটি সিদ্ধান্ত, বহু প্রশাসনিক ধাপ
২৫ জুলাইয়ের সামরিক নির্দেশে উপযুক্ত আবহাওয়ায় নির্ধারিত শহরগুলোর একটিতে প্রথম বোমা ব্যবহারের ব্যবস্থা করা হয়। পরবর্তী বোমাগুলো প্রস্তুত হলে ব্যবহারের ব্যবস্থাও ছিল। ফলে পুরো ঘটনাকে ট্রুম্যানের এক মুহূর্তের ব্যক্তিগত নির্দেশ হিসেবে দেখলে সামরিক পরিকল্পনা ও প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার ভূমিকা আড়াল হয়। তবে প্রেসিডেন্ট হিসেবে ব্যবহারের রাজনৈতিক দায় তাঁরই ছিল।
হিরোশিমা ও নাগাসাকি: সামরিক লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে নাগরিক বিপর্যয়
৬ আগস্ট সকাল আটটা পনেরো মিনিটে মার্কিন বোমারু বিমান এনোলা গে হিরোশিমায় ইউরেনিয়ামভিত্তিক বোমা ফেলে। বিস্ফোরণের প্রচণ্ড তাপ, চাপ ও বিকিরণ মুহূর্তের মধ্যে নগরজীবন বিপর্যস্ত করে দেয়।
হিরোশিমায় সেনা সদর দপ্তর ও সামরিক যোগাযোগব্যবস্থা ছিল। কিন্তু এটি বিপুল নাগরিক জনসংখ্যার শহরও ছিল। সামরিক গুরুত্বের উল্লেখ তাই হামলার বেসামরিক পরিণতিকে ছোট করে না।
মৃত্যু বিস্ফোরণের মুহূর্তেই শেষ হয়নি
হিরোশিমা নগর কর্তৃপক্ষের হিসাবে, ১৯৪৫ সালের শেষ পর্যন্ত প্রায় এক লাখ চল্লিশ হাজার মানুষ মারা যান। সংখ্যাটি আনুমানিক; নথি ধ্বংস, নিখোঁজ মানুষ এবং পরবর্তী মৃত্যুর কারণে নির্ভুল হিসাব অসম্ভব।
৯ আগস্ট সকাল এগারোটা দুই মিনিটে নাগাসাকিতে প্লুটোনিয়ামভিত্তিক দ্বিতীয় বোমা বিস্ফোরিত হয়। অভিযানের প্রথম লক্ষ্য ছিল কোকুরা; লক্ষ্য স্পষ্ট দেখা না যাওয়ায় বিমান নাগাসাকির দিকে যায়। সেখানে বছরের শেষ নাগাদ প্রায় চুয়াত্তর হাজার মানুষের মৃত্যুর হিসাব দেওয়া হয়।
দ্বিতীয় হামলার পৃথক প্রশ্ন
দুই হামলার ব্যবধান ছিল মাত্র তিন দিন। হিরোশিমার ধ্বংস পুরোপুরি বোঝা এবং আত্মসমর্পণের সিদ্ধান্ত নেওয়ার জন্য জাপানকে যথেষ্ট সময় দেওয়া হয়েছিল কি না—এ প্রশ্ন বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। নাগাসাকির প্রয়োজনীয়তা তাই হিরোশিমার সঙ্গে যুক্ত হলেও আলাদাভাবে বিচারযোগ্য।
জাপানের আত্মসমর্পণ: বোমার পাশাপাশি সোভিয়েত আক্রমণ
পারমাণবিক বোমাই এককভাবে জাপানকে আত্মসমর্পণ করিয়েছিল—এ ব্যাখ্যা ঘটনাপ্রবাহকে অতিরিক্ত সরল করে। আগস্টের সেই কয়েক দিনে জাপানের ওপর একাধিক আঘাত একসঙ্গে এসে পড়ে।
মস্কোর মধ্যস্থতার আশা ভেঙে যায়
জাপানি নেতৃত্বের একটি অংশ সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যস্থতায় যুদ্ধ শেষ করার সম্ভাবনা খুঁজছিল। কিন্তু ৮ আগস্ট মস্কো জাপানের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। ৯ আগস্ট সোভিয়েত বাহিনী মাঞ্চুরিয়ায় জাপানি বাহিনীর বিরুদ্ধে ব্যাপক অভিযান শুরু করে।
এতে কেবল সামরিক পরিস্থিতি খারাপ হয়নি; জাপানের অবশিষ্ট কূটনৈতিক পথও ভেঙে পড়ে। এখন দেশটিকে যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি সোভিয়েত শক্তির মুখোমুখি হতে হচ্ছিল।
সম্রাটের হস্তক্ষেপ
জাপানের শীর্ষ নেতৃত্ব আত্মসমর্পণের শর্ত নিয়ে বিভক্ত ছিল। সম্রাট হিরোহিতো অচলাবস্থা ভাঙতে হস্তক্ষেপ করেন। সম্রাটের অবস্থান বজায় থাকবে কি না, তা ছিল আলোচনার কেন্দ্রীয় প্রশ্ন। মিত্রপক্ষ জানায়, সম্রাট ও জাপানি সরকারের কর্তৃত্ব সর্বোচ্চ মিত্র সেনাপতির অধীন থাকবে।
১৪ আগস্ট আত্মসমর্পণ গ্রহণের সিদ্ধান্ত চূড়ান্ত হয়; ১৫ আগস্ট সম্রাটের বেতার ভাষণ সম্প্রচারিত হয়। ২ সেপ্টেম্বর টোকিও উপসাগরে আনুষ্ঠানিক দলিলে স্বাক্ষরের মাধ্যমে যুদ্ধের সমাপ্তি ঘটে। পারমাণবিক হামলা, সোভিয়েত প্রবেশ ও আগের সামরিক বিপর্যয়ের আপেক্ষিক গুরুত্ব নিয়ে বিতর্ক থাকলেও সবগুলোই এই সংকটের অংশ।
যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা, নাকি সোভিয়েত শক্তিকে বার্তা দেওয়া?
ট্রুম্যানের প্রকাশ্য যুক্তি ছিল যুদ্ধ দ্রুত শেষ করা এবং আরও প্রাণহানি ঠেকানো। তাঁর সমর্থকেরা বলেন, জাপানি সামরিক নেতৃত্বের অনমনীয়তা বিবেচনায় প্রচণ্ড অভিঘাত ছাড়া আত্মসমর্পণ আদায় কঠিন হতে পারত।
সমালোচকেরা প্রশ্ন করেন, জাপান যখন ইতিমধ্যে দুর্বল, তখন সম্রাটের ভবিষ্যৎ সম্পর্কে পরিষ্কার নিশ্চয়তা, সোভিয়েত আক্রমণের ফল দেখার অপেক্ষা কিংবা অন্য কূটনৈতিক পদক্ষেপের সুযোগ আরও পরীক্ষা করা যেত কি না।
পারমাণবিক কূটনীতির বিতর্ক
অস্ত্রটির যুদ্ধোত্তর গুরুত্বও মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাবনায় ছিল। সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আলোচনায় একমাত্র পারমাণবিক শক্তি হওয়া যুক্তরাষ্ট্রকে বাড়তি আত্মবিশ্বাস দিয়েছিল।
তবে সোভিয়েত নেতৃত্বকে ভয় দেখানোই বোমা ব্যবহারের একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল—এ দাবিও সর্বসম্মত নয়। যুদ্ধ শেষ করার সামরিক লক্ষ্য এবং যুদ্ধোত্তর ক্ষমতার হিসাব পাশাপাশি কাজ করতে পারে।
ইতিহাসের সীমাবদ্ধতাও এখানে মনে রাখা দরকার। বোমা ব্যবহার না করলে ঠিক কবে, কী শর্তে জাপান আত্মসমর্পণ করত, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায় না। বিকল্পের সম্ভাবনা বিশ্লেষণ করা যায়; বাস্তবে না ঘটা ভবিষ্যৎকে প্রমাণিত ঘটনা বলা যায় না।
যুদ্ধের অবসান ও পারমাণবিক যুগের নৈতিক উত্তরাধিকার
হিরোশিমা ও নাগাসাকি যুদ্ধের শেষ পর্যায়কে ত্বরান্বিত করেছিল, কিন্তু সেই ফলাফল দিয়ে ব্যবহৃত পদ্ধতির নৈতিক প্রশ্ন মিটে যায় না। সামরিক সাফল্য এবং জনবসতিপূর্ণ শহরে গণবিধ্বংসী অস্ত্র ব্যবহারের ন্যায্যতা আলাদা বিচার দাবি করে।
বেঁচে থাকাও দীর্ঘ সংগ্রাম ছিল
বিস্ফোরণ থেকে বেঁচে যাওয়া মানুষদের অনেকে পোড়া ক্ষত, বিকিরণজনিত অসুস্থতা, পরবর্তী ক্যানসারের ঝুঁকি এবং মানসিক আঘাত বহন করেন। তাঁদের অভিজ্ঞতা দেখায়, পারমাণবিক হামলার ক্ষতি কোনো এক দিনের মৃত্যুপরিসংখ্যানে সীমাবদ্ধ থাকে না।
ট্রুম্যানের সিদ্ধান্ত তাই শুধু একজন প্রেসিডেন্ট কীভাবে যুদ্ধ শেষ করেছিলেন, সেই ইতিহাস নয়। এটি দেখায়, রাষ্ট্রের নিরাপত্তার যুক্তি কীভাবে অসংখ্য সাধারণ মানুষের জীবনের ওপর চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়ে নেমে আসে।
১৯৪৫ সালে যুদ্ধ থেমেছিল, কিন্তু মানবসভ্যতার সামনে নতুন প্রশ্ন দাঁড়ায়: যুদ্ধের অবসান ঘটানোর ক্ষমতা কি এমন অস্ত্র ব্যবহারের যথেষ্ট নৈতিক অনুমতি দেয়, যার ধ্বংস থেকে সৈনিক ও শিশুকে আলাদা করা যায় না?
রুয়ান্ডার গণহত্যার সমাপ্তি ও বিচার: আরপিএফের বিজয় থেকে জাতীয় পুনর্গঠন
রুয়ান্ডার গণহত্যায় জাতিসংঘ ও বিশ্বশক্তির ব্যর্থতা: কেন থামেনি হত্যাযজ্ঞ?
রুয়ান্ডার ১০০ দিনের গণহত্যা: তুতসি ও মধ্যপন্থী হুতুদের ওপর হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডায় গণহত্যার সূচনা: বিমান হামলা ও ৭ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞ
রুয়ান্ডার গণহত্যার পটভূমি: ঔপনিবেশিক বিভাজন থেকে ১৯৯০ সালের গৃহযুদ্ধ
মহাভীতি ও সামন্ততন্ত্রের অবসান: মানবাধিকার ঘোষণা থেকে নারীদের ভার্সাই মিছিল