বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

মহাভীতি ও সামন্ততন্ত্রের অবসান: মানবাধিকার ঘোষণা থেকে নারীদের ভার্সাই মিছিল

সিরিজ: ফরাসি বিপ্লব

মহাভীতি ও সামন্ততন্ত্রের অবসান: মানবাধিকার ঘোষণা থেকে নারীদের ভার্সাই মিছিল
গ্রামের বিদ্রোহ থেকে প্রাসাদের দরজা—অধিকারের দাবিতে বদলে গেল ফ্রান্স।

প্যারিসে বাস্তিলের পতনের পর গ্রামের মানুষ জমিদারি ক্ষমতার দলিল ও দাবির দিকে ফিরেছিল। রাজধানীতে রাজকীয় কর্তৃত্বের পরাজয় তাদের কাছে পরিবর্তনের সম্ভাবনা তৈরি করলেও নিরাপত্তার নিশ্চয়তা দেয়নি। বরং খবরের সঙ্গে ছড়িয়ে পড়ছিল আশঙ্কা: অভিজাতেরা কি প্রতিশোধ নিতে ভাড়াটে দস্যু পাঠাচ্ছেন? পাকা ফসল কি ধ্বংস করা হবে? ১৭৮৯ সালের গ্রীষ্মে এই ভয়, পুরোনো ক্ষোভ এবং রাষ্ট্রের দুর্বলতা একত্র হয়ে ফরাসি গ্রামসমাজকে বিদ্রোহের দিকে ঠেলে দেয়।

জুলাইয়ের দ্বিতীয়ার্ধ থেকে আগস্টের শুরু পর্যন্ত বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়ানো এই আতঙ্ক ইতিহাসে মহাভীতি নামে পরিচিত। এটি একক কেন্দ্র থেকে পরিচালিত আন্দোলন ছিল না; একই দিনে গোটা ফ্রান্সেও ঘটেনি। কোথাও অপরিচিত পথিক, কোথাও ভিক্ষুকের দল, আবার কোথাও দূরের ধুলোর মেঘকেও আক্রমণকারী বাহিনীর লক্ষণ মনে করা হয়। ঘণ্টা বাজিয়ে সতর্কবার্তা দেওয়া হতো, গ্রামের পুরুষেরা অস্ত্র হাতে জড়ো হতেন এবং প্রতিবেশী এলাকায় সাহায্যের খবর পাঠাতেন।

গুজব এত কার্যকর হওয়ার পেছনে বাস্তব কারণ ছিল। খাদ্যসংকট, বেকার মানুষের চলাচল, কর ও পাওনা নিয়ে বিরোধ এবং রাজসেনার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সন্দেহ আগে থেকেই মানুষকে উদ্বিগ্ন করেছিল। স্থানীয় কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণ দুর্বল হয়ে পড়ায় খবর যাচাইয়ের নির্ভরযোগ্য ব্যবস্থাও ছিল না। তবে মহাভীতি এবং কৃষক বিদ্রোহ পুরোপুরি একই ঘটনা নয়। সামন্তীয় দাবির বিরুদ্ধে প্রতিরোধ আগে থেকেই চলছিল; অনেক অঞ্চলে আতঙ্ক সেই আন্দোলনকে ত্বরান্বিত করেছিল।

প্রথমে আত্মরক্ষার জন্য সংগঠিত কৃষকদের একটি অংশ শিগগির জমিদারবাড়ির দিকে অগ্রসর হয়। তাদের লক্ষ্য শুধু খাদ্য বা সম্পত্তি দখল ছিল না। বিশেষ গুরুত্ব পায় জমিদারি পাওনার নথি—কোন জমির জন্য কত অর্থ, ফসল কিংবা সেবা দিতে হবে, তার লিখিত প্রমাণ। এসব দলিল জমা দিতে বাধ্য করা, ধ্বংস করা কিংবা আগুনে পোড়ানো হয়। কৃষকদের চোখে নথি ধ্বংস মানে প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে চলে আসা দাবির ভিত্তি সরিয়ে দেওয়া।

সব অঞ্চলে সহিংসতার মাত্রা এক ছিল না। কোথাও সমঝোতার মাধ্যমে দলিল আদায় করা হয়, কোথাও লুটপাট ও অগ্নিসংযোগ ঘটে। কিছু জমিদার পালিয়ে যান; অন্যরা স্থানীয় প্রতিরক্ষার উদ্যোগ নেন। এই ঘটনাপ্রবাহ জাতীয় পরিষদকে কঠিন অবস্থায় ফেলে। প্রতিনিধিদের অনেকে সামন্তীয় বৈষম্য দূর করতে চাইলেও সম্পত্তির অধিকার ও সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষায় অঙ্গীকারবদ্ধ ছিলেন। গ্রামের বিদ্রোহ তাঁদের বুঝিয়ে দেয়, শুধু ভবিষ্যৎ সংবিধানের প্রতিশ্রুতি দিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করা যাবে না।

এই চাপের মধ্যে ১৭৮৯ সালের ৪ আগস্ট রাতে জাতীয় পরিষদে বিশেষাধিকার বিলোপের ঐতিহাসিক অধিবেশন শুরু হয়। নোয়াইয়ের ভিকোম্ত এবং এগুইয়োঁর ডিউকের মতো অভিজাত প্রতিনিধিরা সংস্কারের প্রস্তাব দেন। এরপর একের পর এক প্রতিনিধি সামন্তীয় অধিকার, করের সুবিধা এবং প্রাদেশিক বিশেষাধিকার ত্যাগের পক্ষে বক্তব্য রাখেন। আবেগময় সেই অধিবেশনে পুরোনো সমাজের বহু প্রতিষ্ঠিত সুবিধা প্রশ্নের মুখে পড়ে। পরবর্তী দিনগুলোতে সিদ্ধান্তগুলোকে বিস্তারিত আইনগত রূপ দেওয়া হয়।

তবে সেই রাতেই কৃষকের সব দায় নিঃশর্তভাবে শেষ হয়েছিল—এমন ধারণা ভুল। ব্যক্তিগত অধীনতা এবং কিছু বিশেষাধিকার বিনা ক্ষতিপূরণে বিলোপ করা হলেও জমির সঙ্গে যুক্ত বহু পাওনা অর্থ দিয়ে মুক্ত করার শর্তে রাখা হয়। পরিষদ এগুলোর একটি অংশকে সম্পত্তিগত অধিকার হিসেবে দেখেছিল। নীতিগতভাবে সামন্তীয় ব্যবস্থা প্রত্যাখ্যাত হলেও বাস্তবে বহু কৃষকের জন্য পাওনা থেকে মুক্তি তখনও ব্যয়সাপেক্ষ ও অসম্পূর্ণ ছিল। এই অসংগতি পরবর্তী সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ কারণ হয়ে থাকে।

তবু আগস্টের সিদ্ধান্তগুলোর ব্যাপ্তি ছিল অসাধারণ। করের ক্ষেত্রে জন্মগত সুবিধা দূর করার নীতি, সরকারি পদে যোগ্যতার ভিত্তিতে প্রবেশ এবং স্থানীয় বিশেষাধিকারের অবসান একটি অভিন্ন নাগরিক রাষ্ট্রের পথ তৈরি করে। চার্চের দশমাংশ আদায়ের ব্যবস্থাও বিলোপের সিদ্ধান্তের অন্তর্ভুক্ত হয়। মানুষকে আলাদা আইনগত মর্যাদার গোষ্ঠীতে ভাগ করে রাখার ভিত্তি দুর্বল হতে থাকে। ফ্রান্সকে আর কেবল রাজা, প্রদেশ ও বিশেষাধিকারপ্রাপ্ত সম্প্রদায়ের সমষ্টি হিসেবে ভাবা সম্ভব হচ্ছিল না।

এই সামাজিক পরিবর্তনের জন্য একটি সাধারণ নীতিগত ভিত্তি দরকার ছিল। ২৬ আগস্ট গৃহীত হয় ‘মানুষ ও নাগরিকের অধিকারের ঘোষণা’। এর শুরুতেই জন্মগত স্বাধীনতা ও অধিকারের সমতার নীতি প্রতিষ্ঠিত হয়। স্বাধীনতা, সম্পত্তি, নিরাপত্তা এবং নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিরোধকে মৌলিক অধিকার হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সার্বভৌম কর্তৃত্বের উৎস হিসেবে জাতিকে স্বীকৃতি দেওয়া রাজতন্ত্রের পুরোনো বৈধতার ওপর সরাসরি আঘাত ছিল: ক্ষমতা আর শুধু রাজবংশের উত্তরাধিকার থেকে আসবে না।

ঘোষণায় আইনকে সাধারণ ইচ্ছার প্রকাশ হিসেবে বিবেচনা করা হয় এবং আইন প্রণয়নে নাগরিকের সরাসরি বা প্রতিনিধির মাধ্যমে অংশগ্রহণের নীতি তুলে ধরা হয়। ইচ্ছামতো গ্রেপ্তার, অপরাধ প্রমাণের আগে দোষী সাব্যস্ত করা এবং নির্বিচার শাস্তির বিরুদ্ধে সুরক্ষার কথা আসে। মতপ্রকাশ ও ধর্মীয় মতের স্বাধীনতা স্বীকৃত হয়, যদিও জনশৃঙ্খলা ও আইনি সীমার উল্লেখ ছিল। করের প্রয়োজন ও ব্যবহার নিয়ে নাগরিকের অংশগ্রহণ এবং সরকারি কর্মকর্তার জবাবদিহিও নতুন রাষ্ট্রের মৌলিক প্রশ্ন হয়ে ওঠে।

কিন্তু ঘোষণার সর্বজনীন ভাষা তাৎক্ষণিকভাবে সবার সমান রাজনৈতিক ক্ষমতা নিশ্চিত করেনি। নারীরা সমান ভোটাধিকার পাননি; উপনিবেশের দাসপ্রথাও এই দলিলের মাধ্যমে সঙ্গে সঙ্গে বিলোপ হয়নি। সম্পত্তি ও কর প্রদানের ভিত্তিতে রাজনৈতিক অংশগ্রহণ সীমিত করার পথও খোলা ছিল। ঘোষণাটি পুরোনো বৈষম্যের বিরুদ্ধে শক্তিশালী মানদণ্ড তৈরি করেছিল, কিন্তু সেই মানদণ্ড বাস্তবায়নের সীমা নিয়েই নতুন সংগ্রাম শুরু হয়। অধিকার ঘোষণা করা এবং তা সবার জীবনে কার্যকর করা আলাদা বিষয় হয়ে দাঁড়ায়।

এদিকে রুটির সংকট কাটেনি। রাজা আগস্টের সিদ্ধান্ত ও অধিকারের ঘোষণায় পূর্ণ সম্মতি দিতে দেরি করছিলেন, ফলে সন্দেহ বাড়ছিল। ১ অক্টোবর ভার্সাইয়ে রাজকীয় দেহরক্ষীদের ভোজকে ঘিরে বিপ্লববিরোধী আচরণের খবর প্যারিসে ছড়ায়। ত্রিবর্ণ ককেডের অবমাননা সম্পর্কে প্রচারিত বিবরণের সব অংশ সমানভাবে নিশ্চিত ছিল না। তবু ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে প্রাসাদের ভোজ এবং রাজনৈতিক অনিশ্চয়তা একসঙ্গে অসহনীয় হয়ে ওঠে। ভার্সাইয়ের দূরত্ব তখন ক্ষমতার বিচ্ছিন্নতার প্রতীক।

৫ অক্টোবর সকালে প্যারিসের বাজার এলাকার নারীরা রুটির দাবিতে সংগঠিত হন। নগরভবনে জমায়েতের পর কয়েক হাজার মানুষের মিছিল ভার্সাইয়ের পথে রওনা হয়। নারীদের পাশাপাশি পুরুষেরাও এতে ছিলেন; পরে লাফায়েতের নেতৃত্বে জাতীয় রক্ষীবাহিনী সেখানে পৌঁছায়। বৃষ্টির মধ্যে দীর্ঘ পথ অতিক্রম করা এই মিছিলের দাবি কেবল খাদ্য ছিল না। রাজাকে জনগণের কাছে আনা, সংস্কারে সম্মতি আদায় এবং রাজদরবারের বিচ্ছিন্নতা ভাঙাও আন্দোলনের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ফল হয়ে ওঠে।

ভার্সাইয়ে প্রতিনিধিদল রাজার সঙ্গে দেখা করে এবং খাদ্য সরবরাহের আশ্বাস পায়। জনতার চাপের মধ্যে রাজা আগস্টের সিদ্ধান্ত ও অধিকারের ঘোষণায় সম্মতিও জানান। কিন্তু রাতভর উত্তেজনা থেকে যায়। ৬ অক্টোবর ভোরে কিছু বিক্ষোভকারী প্রাসাদে প্রবেশ করলে সংঘর্ষ হয় এবং দেহরক্ষী নিহত হন। শেষে রাজপরিবার প্যারিসে যেতে সম্মত হয়। জনতার সঙ্গে তাঁরা তুইলেরি প্রাসাদে পৌঁছান; পরে জাতীয় পরিষদও প্যারিসে স্থানান্তরিত হয়।

এই স্থানান্তর রাজতন্ত্র বিলোপ করেনি, কিন্তু তার স্বাধীনভাবে সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা সংকুচিত করেছিল। গ্রামের কৃষক সামন্তীয় দাবি নাড়িয়ে দিয়েছেন, পরিষদ জন্মগত বিশেষাধিকারের বিরুদ্ধে আইন করেছে, আর বাজারের নারীরা রাজপরিবারকে রাজধানীতে নিয়ে এসেছেন। পুরোনো সমাজব্যবস্থা ভাঙছিল আইনসভা, গ্রাম এবং রাজপথের সম্মিলিত চাপে। এখন বিপ্লবের সামনে নতুন কাজ: ঘোষিত অধিকারকে প্রশাসন, অর্থনীতি ও সংবিধানে রূপ দেওয়া। সেই পুনর্গঠনের মধ্যেই চার্চের অবস্থান এবং রাজার প্রকৃত আনুগত্য নিয়ে আরও গভীর বিরোধ দেখা দেবে।