বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ কত দামে? কোচিং, গৃহশিক্ষা ও শিক্ষার বৈষম্য

সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ কত দামে? কোচিং, গৃহশিক্ষা ও শিক্ষার বৈষম্য
একই পরীক্ষার আগে প্রস্তুতির সুযোগ বদলে দেয় পরিবারের সামর্থ্য।

একই প্রশ্নপত্র, কিন্তু প্রস্তুতির সুযোগ কি একই?

পরীক্ষার হলে দুই শিক্ষার্থী একই প্রশ্নপত্র পায়, একই সময় পায় এবং একই নম্বরের জন্য প্রতিযোগিতা করে। কিন্তু সেখানে পৌঁছানোর আগের কয়েক বছর তাদের অভিজ্ঞতা এক নাও হতে পারে। একজন নিয়মিত বিষয়ভিত্তিক গৃহশিক্ষক, অনুশীলনী পরীক্ষা ও ব্যক্তিগত পরামর্শ পেয়েছে। অন্যজন বিদ্যালয়ের পাঠ বুঝতে না পারলে সাহায্য করার কাউকে পায়নি।

এই পার্থক্য মেধা বা পরিশ্রমের সরল পার্থক্য নয়। পরিবারের আয় নির্ধারণ করতে পারে কে কত দ্রুত নিজের ভুল বুঝবে, কতবার অনুশীলনের সুযোগ পাবে এবং পড়াশোনার জন্য কতটা নিরবচ্ছিন্ন সময় পাবে।

বাংলাদেশের গণসাক্ষরতা অভিযানের শিক্ষা পর্যবেক্ষণ প্রতিবেদনে ২০২২ সালে প্রাথমিকের শিক্ষার্থীপ্রতি পরিবারের গড় বার্ষিক শিক্ষাব্যয় পাওয়া যায় ১৩ হাজার ৮৮২ টাকা। প্রতিবেদনের ব্যয় বিশ্লেষণে গৃহশিক্ষক বা কোচিংকেন্দ্রের জন্য ৪ হাজার ৫৫৬ টাকার কথা রয়েছে। অর্থাৎ বিদ্যালয়ের বাইরের সহায়তাও পারিবারিক শিক্ষাব্যয়ের উল্লেখযোগ্য অংশ।

তবে খরচ বেশি হলেই শেখা বেশি হবে, এমন নিশ্চয়তা নেই। গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো, প্রয়োজনীয় সহায়তা পাওয়ার সুযোগটি কি শিক্ষার্থীর শেখার প্রয়োজন অনুযায়ী তৈরি হচ্ছে, নাকি পরিবারের অর্থ দেওয়ার ক্ষমতা অনুযায়ী?

বিদ্যালয়ের বাইরের পাঠ কেন প্রায় অপরিহার্য মনে হয়?

অতিরিক্ত পাঠের প্রয়োজন একেক শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে একেক রকম। কেউ গণিতের ভিত্তি দুর্বল হওয়ায় সহায়তা চায়, কেউ প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার জন্য অনুশীলন করে। আবার অনেক পরিবার আশঙ্কা করে, অন্যরা অতিরিক্ত পড়ছে বলে নিজের সন্তান পিছিয়ে পড়বে।

শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থী বেশি হলে শিক্ষক সবার ভুল আলাদাভাবে ধরতে পারেন না। আগের শ্রেণির শেখার ঘাটতি রয়ে গেলে নতুন পাঠ বোঝাও কঠিন হয়। এই অবস্থায় গৃহশিক্ষক বা ছোট দলে পাঠদান কার্যকর সহায়তা হতে পারে।

সহায়ক ব্যবস্থা কখন বিকল্প ব্যবস্থায় পরিণত হয়

সমস্যা বাড়ে যখন বিদ্যালয়ের নিয়মিত শিক্ষা বোঝার জন্যও বাইরে অর্থ খরচ করা প্রয়োজন হয়ে দাঁড়ায়। তখন পরিবার একই শিক্ষার জন্য বিদ্যালয়ে এবং বিদ্যালয়ের বাইরে ব্যয় করে।

আবার পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রস্তুতিতে নির্দিষ্ট ধরনের প্রশ্ন, সময় ব্যবস্থাপনা ও উত্তর লেখার কৌশল গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। বিষয় বোঝার পাশাপাশি এসব কৌশল শেখানোর বাজার তৈরি হয়। বিদ্যালয় যদি এই প্রস্তুতি যথেষ্ট না দেয়, সামর্থ্যবান পরিবার তা বাইরে থেকে সংগ্রহ করে।

সব শিক্ষক বা সব অতিরিক্ত পাঠদানকে একইভাবে বিচার করা ঠিক নয়। তবে নিজের শিক্ষার্থীকে অর্থের বিনিময়ে পড়ার জন্য চাপ দেওয়া কিংবা শ্রেণিকক্ষের প্রয়োজনীয় পাঠ বাইরে সরিয়ে নেওয়ার মতো স্বার্থের সংঘাত ঠেকানো জরুরি।

পরিবারের আয় কীভাবে শেখার সুবিধায় রূপ নেয়?

টাকা শুধু অতিরিক্ত একজন শিক্ষক কেনে না; শেখার পরিবেশের একাধিক বাধা কমানোর সুযোগ দেয়। শান্ত ঘর, বই, নির্ভরযোগ্য আন্তর্জালসংযোগ, যাতায়াত এবং অসুবিধা হলে দ্রুত সহায়তা—সবই প্রস্তুতিকে প্রভাবিত করতে পারে।

ভারতের ২০২৫ সালের সরকারি শিক্ষা জরিপে দেখা যায়, বিদ্যালয়শিক্ষায় নথিভুক্ত শিক্ষার্থীদের ২৭ শতাংশ চলতি শিক্ষাবর্ষে বেসরকারি অতিরিক্ত পাঠ নিচ্ছিল বা নিয়েছিল। গ্রামে এই হার ২৫ দশমিক ৫ শতাংশ, শহরে ৩০ দশমিক ৭ শতাংশ।

সব শিক্ষার্থী ধরে অতিরিক্ত পাঠে গড় বার্ষিক ব্যয় শহরে ৩ হাজার ৯৮৮ ভারতীয় রুপি, গ্রামে ১ হাজার ৭৯৩ রুপি। শহরের অঙ্কটি গ্রামের দ্বিগুণের বেশি। এগুলো শুধু অতিরিক্ত পাঠ গ্রহণকারীদের গড় ব্যয় নয়—এই পার্থক্যটি মনে রাখা প্রয়োজন।

কম ব্যয় মানেই কম প্রয়োজন নয়

গ্রামীণ পরিবারের কম ব্যয়ের পেছনে কম আয়, স্থানীয় মূল্য এবং শিক্ষকের প্রাপ্যতা—একাধিক কারণ থাকতে পারে। তাই সংখ্যাগুলোকে সরাসরি আগ্রহ বা মেধার পরিমাপ বলা যাবে না।

আরও একটি ব্যবধান হলো তথ্যের সুযোগ। কোন পরীক্ষার আবেদন কখন, কী ধরনের প্রস্তুতি দরকার এবং কোথায় সহায়তা পাওয়া যায়—এসব জানা পরিবারের শিক্ষার্থী তুলনামূলক সুবিধা পেতে পারে। পরিবারের প্রথম উচ্চশিক্ষাপ্রত্যাশী সন্তানকে অনেক সিদ্ধান্ত নিজেই খুঁজে নিতে হয়।

এভাবে অর্থনৈতিক পার্থক্য ধীরে ধীরে প্রস্তুতির সময়, সহায়তার মান এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার আত্মবিশ্বাসের পার্থক্যে রূপ নেয়।

সন্তানের পড়ার খরচ মেটাতে অভিভাবক কী ছাড়েন?

শিক্ষাব্যয়কে অনেক পরিবার ভবিষ্যতের বিনিয়োগ মনে করে। তাই আয় না বাড়লেও সন্তানের পড়ার খরচ চালাতে অন্য ব্যয় কমায়। নিজের পোশাক কেনা পিছিয়ে দেওয়া, বাড়তি কাজ করা কিংবা জরুরি সঞ্চয় ভাঙার মতো সিদ্ধান্ত নিতে হতে পারে।

একটি কাল্পনিক উদাহরণ ধরা যাক। মাসে পঁচিশ হাজার টাকা আয়ের পরিবার সন্তানের অতিরিক্ত পাঠে তিন হাজার টাকা দিলে আয়ের ১২ শতাংশ ব্যয় করে। এক লাখ টাকা আয়ের পরিবার একই অঙ্ক দিলে ব্যয় হয় ৩ শতাংশ। একই মূল্য দুই পরিবারের ওপর সমান চাপ তৈরি করে না।

হিসাবে না থাকা ত্যাগও গুরুত্বপূর্ণ

শিশুকে পড়াতে নিয়ে যাওয়া, অপেক্ষা করা এবং বাড়ি ফিরিয়ে আনার সময়েরও মূল্য আছে। কোনো অভিভাবক এ কারণে আয়মূলক কাজের সময় কমাতে পারেন। আবার ঘরে পড়াশোনা দেখানোর দায়িত্বও পরিবারের সদস্যদের মধ্যে সমানভাবে বণ্টিত নাও হতে পারে।

একাধিক সন্তান থাকলে সীমিত অর্থ কাকে কতটা দেওয়া হবে, সেই কঠিন প্রশ্ন আসে। একজনের গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষার প্রস্তুতির জন্য অন্যজনের সহায়তা কমিয়ে দিতে হতে পারে।

এই ত্যাগের কথা বারবার সন্তানের সামনে আনলে তার ওপর বাড়তি মানসিক চাপও তৈরি হতে পারে। খারাপ ফল তখন শুধু নিজের হতাশা নয়, পরিবারের বিনিয়োগ নষ্ট করার অপরাধবোধ হয়ে দাঁড়ায়। অভিভাবকের ত্যাগ স্বীকার করার পাশাপাশি শিশুর বয়স, বিশ্রাম ও শেখার বাস্তব প্রয়োজনকে গুরুত্ব দেওয়া দরকার।

উন্নত দেশেও কি পরিবারের অবস্থার প্রভাব থাকে?

উন্নত অর্থনীতিতেও শিক্ষার সুযোগ পুরোপুরি সমান নয়। অর্থনৈতিক সহযোগিতা ও উন্নয়ন সংস্থার ২০২২ সালের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী মূল্যায়নে সদস্যদেশগুলোর গড়ে আর্থসামাজিকভাবে সুবিধাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীরা গণিতে সুবিধাবঞ্চিতদের চেয়ে ৯৩ মূল্যায়ন নম্বর এগিয়ে ছিল।

এখানে সুবিধাপ্রাপ্ত বলতে শুধু বেশি আয়ের পরিবার বোঝানো হয়নি। অভিভাবকের শিক্ষা, পেশা ও ঘরের সম্পদের সমন্বয়ে আর্থসামাজিক অবস্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। তুলনাটি সেই সূচকের ওপরের ও নিচের এক-চতুর্থাংশ শিক্ষার্থীর মধ্যে।

একই মূল্যায়নে সদস্যদেশগুলোর গড়ে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীদের ৪৭ শতাংশ গণিতে মৌলিক দক্ষতার দ্বিতীয় স্তরে পৌঁছাতে পারেনি; সুবিধাপ্রাপ্তদের ক্ষেত্রে হারটি ছিল ১৪ শতাংশ।

তবে এগুলো কোচিংয়ের একক প্রভাবের হিসাব নয়। বিদ্যালয়ের মান, সামাজিক পরিবেশসহ বহু বিষয় ফলের সঙ্গে সম্পর্কিত। বাংলাদেশের সাধারণ পরীক্ষা বা ভারতের বিদ্যালয় পরীক্ষার নম্বরের সঙ্গেও এই মূল্যায়ন সরাসরি তুলনাযোগ্য নয়।

মূল শিক্ষা হলো, জাতীয় আয় বেশি হলেই পারিবারিক পটভূমির প্রভাব মুছে যায় না। বৈষম্য কমাতে বিদ্যালয়কেই প্রয়োজন অনুযায়ী বেশি সহায়তা দিতে হবে—বিশেষ করে যাদের পরিবার বাইরে থেকে সহায়তা কিনতে পারে না।

ভালো ভবিষ্যতের সুযোগকে পারিবারিক সামর্থ্যের বাইরে নেওয়া যাবে কীভাবে?

প্রথম কাজ হলো বিদ্যালয়ের ভেতরে শেখার ঘাটতি শনাক্ত করা। কোন শিক্ষার্থী ভগ্নাংশ বোঝে না, কে সাবলীলভাবে পড়তে পারে না—তা না জেনে সবার জন্য একই অতিরিক্ত পাঠ কার্যকর হবে না।

এরপর প্রয়োজন বিদ্যালয়ভিত্তিক বিনা মূল্যের ছোট দলে সহায়তা, নিয়মিত কাজের ওপর মতামত এবং ব্যবহারযোগ্য পাঠাগার। সহায়তার সময় এমন হওয়া দরকার, যাতে দূরে থাকা বা বাড়িতে দায়িত্ব পালন করা শিক্ষার্থীও অংশ নিতে পারে।

আর্থিক সহায়তায় শুধু ভর্তি ও মাসিক বেতন বিবেচনা করলে চলবে না। বই, যাতায়াত, প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং পরীক্ষার আবেদনব্যয়ও দেখতে হবে। বিনা মূল্যের দূরশিক্ষণ চালু করলেও যন্ত্র ও সংযোগহীন শিক্ষার্থীর বিকল্প ব্যবস্থা প্রয়োজন।

অভিভাবকের জন্যও স্পষ্ট মানদণ্ড দরকার: সন্তান কোথায় আটকে যাচ্ছে, অতিরিক্ত সহায়তায় কী উন্নতি হচ্ছে এবং অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে কি না। শুধু বেশি বিষয়ে গৃহশিক্ষক রাখাকে ভালো প্রস্তুতির প্রমাণ ভাবলে অপ্রয়োজনীয় ব্যয় বাড়তে পারে।

একই প্রশ্নপত্র ন্যায্য প্রতিযোগিতার একটি অংশ। সেই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় শিক্ষা ও সহায়তা পাওয়ার সুযোগও যথাসম্ভব সমান হতে হবে। সন্তানের ভবিষ্যৎ যেন অভিভাবক কতটা ব্যয় করতে পারলেন, তার চেয়ে শিক্ষার্থী কী শিখল এবং কী করতে পারল—তার ওপর বেশি নির্ভর করে।