বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?

সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত

ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দাগু দুর্গের পতনের পর চুক্তির চাপে চীনে বিদেশি প্রবেশাধিকার আরও বিস্তৃত হয়।

ক্যান্টন দখলের পর অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনীর লক্ষ্য আর দক্ষিণ চীনের একটি শহরে সীমাবদ্ধ থাকল না। ব্রিটিশ ও ফরাসি প্রতিনিধিরা বুঝেছিলেন, স্থানীয় কর্মকর্তাকে পরাজিত করলেই চিং সরকারের কাছ থেকে স্থায়ী ছাড় আদায় করা যাবে না। সিদ্ধান্তের কেন্দ্র ছিল বেইজিং, আর সেখানে চাপ পৌঁছানোর কার্যকর পথ ছিল উত্তর চীনের নদীমুখ ও তিয়ানজিন। ১৮৫৮ সালের অভিযান তাই যুদ্ধের ভৌগোলিক বিস্তারের পাশাপাশি তার রাজনৈতিক লক্ষ্যও স্পষ্ট করে: চীনের কেন্দ্রীয় সরকারকে নতুন অধিকার মেনে নিতে বাধ্য করা।

১৮৫৭ সালের ডিসেম্বরের শেষদিকে ক্যান্টন বা গুয়াংঝৌতে ব্রিটিশ-ফরাসি আক্রমণ শুরু হয়। গোলাবর্ষণ ও স্থল আক্রমণের পরে শহরের প্রতিরক্ষা ভেঙে পড়ে। ১৮৫৮ সালের জানুয়ারিতে গভর্নর-জেনারেল ইয়ে মিংচেন বন্দি হন। বিজয়ী বাহিনী শহরের ওপর তত্ত্বাবধান প্রতিষ্ঠা করলেও দৈনন্দিন প্রশাসনের কিছু অংশ চীনা কর্মকর্তাদের হাতেই রাখে। এর মাধ্যমে তারা দখল বজায় রাখা এবং সীমিত নিজস্ব জনবল দিয়ে বড় শহর নিয়ন্ত্রণের ব্যবস্থা করে। কিন্তু ক্যান্টনের পতনেও চিং দরবার নতুন দাবিগুলো সম্পূর্ণ মেনে নেয়নি।

ব্রিটিশ বিশেষ প্রতিনিধি লর্ড এলগিন এবং ফরাসি প্রতিনিধি ব্যারন গ্রো এরপর উত্তরমুখী চাপ বাড়ান। ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন মাইকেল সেমুর, ফরাসি নৌশক্তির নেতৃত্বে শার্ল রিগো দ্য জেনুইয়ি। তাঁদের সামনে প্রধান বাধা ছিল দাগু বা তাকু দুর্গসমূহ। হাই নদীর মোহনায় অবস্থিত এই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা তিয়ানজিনে প্রবেশের জলপথ পাহারা দিত। নদীটি সমসাময়িক ইউরোপীয় বিবরণে পেইহো নামেও পরিচিত। এই পথ খুলে গেলে বিদেশি যুদ্ধজাহাজ রাজধানীর কাছাকাছি অঞ্চলে চাপ সৃষ্টি করতে পারত।

১৮৫৮ সালের ২০ মে দাগু দুর্গে অ্যাংলো-ফরাসি আক্রমণ হয়। অগভীর মোহনায় চলতে সক্ষম ছোট যুদ্ধজাহাজ গোলাবর্ষণ করে এবং নৌসেনারা তীরে নেমে দুর্গ আক্রমণ করেন। চীনা প্রতিরক্ষকরা লড়লেও দুর্গগুলো শেষ পর্যন্ত দখল হয়। এই সাফল্যের পেছনে শুধু কামানের শক্তি ছিল না; জলপথে অগ্রসর হওয়া, উপযুক্ত স্থানে সৈন্য নামানো এবং স্থির প্রতিরক্ষার বিরুদ্ধে সম্মিলিত আক্রমণ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। দাগুর পতনের পরে তিয়ানজিনের পথে বাধা অনেকটাই সরে যায়।

বিদেশি বাহিনীর তিয়ানজিনে পৌঁছানো চিং দরবারের জন্য সরাসরি বিপদের সংকেত ছিল। শহরটি উত্তর চীনের বাণিজ্য ও যোগাযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র এবং বেইজিংয়ের প্রবেশপথের অংশ। সম্রাট শিয়ানফেং আলোচনার জন্য গুইলিয়াং ও হুয়াশানাকে পাঠান। সামরিক চাপের মধ্যে তাঁদের কাজ ছিল পরিস্থিতি সামাল দেওয়া। তবে আলোচনায় বসা মানেই দরবার নতুন ব্যবস্থাকে স্বাভাবিক বা কাম্য বলে গ্রহণ করেছিল না। যুদ্ধ থামানো ও রাজধানী রক্ষা করার তাৎক্ষণিক প্রয়োজনই প্রধান হয়ে ওঠে।

তিয়ানজিন চুক্তি বলতে আসলে একটি মাত্র বহুপক্ষীয় দলিল বোঝায় না। ১৮৫৮ সালের জুনে চীন রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে পৃথক চুক্তি করে। ব্রিটিশ চুক্তি স্বাক্ষরিত হয় ২৬ জুন, ফরাসি চুক্তি ২৭ জুন। রাশিয়া ও যুক্তরাষ্ট্র অ্যাংলো-ফরাসি অভিযানের সমান সামরিক অংশীদার ছিল না, কিন্তু পরিস্থিতির সুযোগে তারাও সুবিধা পায়। পৃথক দলিলগুলোর শর্ত পুরোপুরি অভিন্ন ছিল না; সম্মিলিতভাবে এগুলো চীনে বিদেশি উপস্থিতির ভিত্তি বিস্তৃত করে।

সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ পরিবর্তনগুলোর একটি ছিল বেইজিংয়ে বিদেশি কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের অবস্থানের অধিকার। আগের বিরোধগুলোর সময় ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের প্রায়ই উপকূলীয় প্রশাসনের মাধ্যমে যোগাযোগ করতে হতো। নতুন ব্যবস্থায় বিদেশি দূত সরাসরি কেন্দ্রীয় সরকারের কাছে থাকতে ও যোগাযোগ করতে পারবেন। বিদেশি সম্পর্ককে স্থানীয় বন্দর প্রশাসনের মধ্যে আটকে রাখার সুযোগ এতে কমে যায়। সম্রাটের দরবারে প্রতিনিধির মর্যাদা, সাক্ষাতের রীতি এবং স্থায়ী উপস্থিতি নিয়ে যে পুরোনো বিরোধ ছিল, তা এখন চুক্তির বাধ্যবাধকতায় পরিণত হয়।

বাণিজ্যেও আরও দরজা খোলার ব্যবস্থা হয়। ব্রিটিশ চুক্তিতে নিউচুয়াং, দেংঝৌ, তাইওয়ানের একটি বন্দর, চাওঝৌ ও চিয়ংঝৌসহ অতিরিক্ত বন্দর নির্ধারণ করা হয়। ইয়াংজি নদীপথে বাণিজ্য সম্প্রসারণের ব্যবস্থাও ছিল। পরে বাস্তব কার্যক্রম চালু করতে কোনো কোনো নির্ধারিত স্থানের বদলে কাছাকাছি অধিক উপযোগী বন্দর ব্যবহৃত হয়। ফলে চুক্তির নামের তালিকা এবং বাস্তবে চালু হওয়া বন্দরের তালিকা সব সময় হুবহু মেলে না। এই সম্প্রসারণ ছিল ধাপে ধাপে কার্যকর হওয়া একটি প্রক্রিয়া।

ইয়াংজি নদীর প্রসঙ্গ বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। নদীটি পূর্ব চীনের উপকূলকে দেশের গভীরের জনবহুল ও উৎপাদনশীল অঞ্চলের সঙ্গে যুক্ত করত। সেখানে বিদেশি জাহাজ চলাচল ও বন্দর খোলার অধিকার মানে শুধু আরও একটি উপকূলীয় বাজার পাওয়া নয়; বৃহত্তর অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির কাছে পৌঁছানো। তবে তাইপিং যুদ্ধের কারণে নিরাপত্তার সমস্যা ছিল। তাই নতুন অধিকার স্বীকার করা হলেও সব নদীবন্দর তাৎক্ষণিকভাবে চালু করার শর্ত ছিল না। যুদ্ধ পরিস্থিতি ও পরবর্তী বাস্তবায়নের ওপর অনেক কিছু নির্ভর করছিল।

বিদেশিদের অভ্যন্তরে ভ্রমণের অধিকারও বাড়ে। ব্রিটিশ নাগরিকেরা কনসালের দেওয়া এবং স্থানীয় চীনা কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত পাসপোর্ট নিয়ে ব্যবসা বা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে দেশের ভেতরে যেতে পারবেন। এর ফলে বন্দরকেন্দ্রিক উপস্থিতি থেকে আরও বিস্তৃত চলাচলের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু এটি অনুমতিপত্র ছাড়া যেকোনো স্থানে অবাধ কার্যক্রমের অধিকার ছিল না। চুক্তির বিধান, স্থানীয় পরিস্থিতি এবং নিষিদ্ধ পণ্যসংক্রান্ত সীমাবদ্ধতা বহাল ছিল। কাগজের অধিকার বাস্তবে প্রয়োগ করতে গিয়েও নতুন বিরোধের সুযোগ থেকে যায়।

ধর্মীয় ক্ষেত্রে খ্রিস্টধর্মাবলম্বীদের সুরক্ষা এবং মিশনারিদের কার্যক্রমের সুযোগ সম্প্রসারিত হয়। ফরাসি চুক্তিতে ক্যাথলিক ধর্মপ্রচারের বিষয় বিশেষ গুরুত্ব পায়। ফ্রান্স শাপদেলেনের মৃত্যুকে সামরিক হস্তক্ষেপের কারণ হিসেবে ব্যবহার করেছিল; এখন ধর্মীয় সুরক্ষা তার কূটনৈতিক সাফল্যের অংশ হয়। তবে মিশনারি, স্থানীয় ধর্মান্তরিত মানুষ এবং বিদেশি রাষ্ট্রের সুরক্ষা একই ব্যবস্থায় যুক্ত হওয়ায় ভবিষ্যতে স্থানীয় বিরোধ আন্তর্জাতিক সমস্যায় রূপ নেওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।

চুক্তিতে শুল্ক সংশোধন, পণ্যের চলাচল এবং অতিরিক্ত আদায়ের নিয়ম নিয়েও ব্যবস্থা ছিল। ব্রিটিশ ব্যবসায়ীরা অভ্যন্তরীণ পথে অনিশ্চিত শুল্ক ও নানা আদায়ের বিরুদ্ধে নিশ্চয়তা চাইতেন। নির্ধারিত নিয়মে অর্থ দিয়ে কিছু পণ্য পরিবহনের সুবিধা তাঁদের ব্যয়ের পূর্বানুমান সহজ করতে পারত। অন্যদিকে বিদ্রোহ দমন ও প্রশাসন চালাতে রাজস্বপ্রয়োজনীয় চিং সরকারের জন্য নিয়ন্ত্রণ সীমিত হওয়া ছিল সমস্যা। একই বিধান ব্যবসায়ীর কাছে নিশ্চয়তা এবং প্রশাসনের কাছে রাজস্বসংগ্রহের বাধা হিসেবে দেখা দিতে পারে।

আফিমের প্রশ্নে জুনের চুক্তি ও পরবর্তী ব্যবস্থাকে আলাদা করা জরুরি। ১৮৫৮ সালের নভেম্বরে সাংহাইয়ে সম্পাদিত শুল্ক ও বাণিজ্যবিধিতে আফিম আমদানি শুল্কের আওতায় আসে। এর মাধ্যমে নিষিদ্ধ আমদানিকে কার্যত বৈধ বাণিজ্যিক কাঠামোয় স্থান দেওয়া হয়। তবে বিদেশিরা অভ্যন্তরে গিয়ে আফিমের ব্যবসা করার সাধারণ অধিকার পাননি। বন্দরে বিক্রির পরে দেশের ভেতরে পরিবহন চীনা মালিকানায় ও চীনা ব্যবস্থায় হওয়ার কথা ছিল। নিষেধাজ্ঞার পুরোনো অবস্থান বদলালেও সব নিয়ন্ত্রণ বিলুপ্ত হয়নি।

আর্থিক শাস্তিও ছিল ভারী। ব্রিটিশ চুক্তির সঙ্গে যুক্ত পৃথক ধারায় মোট চল্লিশ লাখ তায়েল এবং ফরাসি ব্যবস্থায় বিশ লাখ তায়েল ক্ষতিপূরণ নির্ধারিত হয়। তায়েল ছিল রুপার ওজনভিত্তিক হিসাবের একক, আধুনিক কাগুজে মুদ্রা নয়। এর সঙ্গে বিদেশিদের বিচারিক সুবিধা ও সর্বাধিক সুবিধাপ্রাপ্ত রাষ্ট্রের অধিকার বহাল থাকে। ফলে নতুন কোনো রাষ্ট্রকে দেওয়া ছাড় অন্যদের দাবিকেও শক্তিশালী করতে পারে। সামরিক সাফল্য এভাবে দীর্ঘস্থায়ী বাণিজ্যিক ও প্রশাসনিক সুবিধায় রূপ নেয়।

তবে চুক্তি স্বাক্ষরেই সব শর্ত নির্বিঘ্নে কার্যকর হয়নি। অনুমোদনপত্র বিনিময় এবং বেইজিংয়ে বিদেশি প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিয়ে চিং দরবারের আপত্তি রয়ে যায়। ১৮৫৯ সালে বিদেশি প্রতিনিধিরা ফিরে এলে দাগুর পথ ও সেখানে অগ্রসর হওয়া নিয়ে নতুন সংঘর্ষ ঘটে; এবার আক্রমণকারী বাহিনী প্রতিরোধের মুখে পরাজিত হয়। তাই তিয়ানজিন চুক্তি যুদ্ধের স্থায়ী সমাপ্তি নয়, একটি অসম্পূর্ণ বিরতি ছিল। ক্যান্টন থেকে উত্তরে আসা অভিযান চীনকে আরও অধিকার ছাড়তে বাধ্য করেছিল, কিন্তু সেই অধিকার কার্যকর করার পরবর্তী সংঘাত এবার সরাসরি বেইজিংয়ের দিকে এগোবে।