লাইপজিগের যুদ্ধ: ‘ব্যাটল অব দ্য নেশনস’-এ যেভাবে ভাঙে নেপোলিয়নের আধিপত্য
সিরিজ: নেপোলিয়নের উত্থান ও পতন
লাইপজিগে সম্মিলিত আঘাতের মুখে ভেঙে পড়ে জার্মানিতে নেপোলিয়নের কর্তৃত্ব।
রাশিয়া থেকে বিপর্যস্ত প্রত্যাবর্তনের পর নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে যে নতুন প্রতিরোধ গড়ে উঠছিল, তা দ্রুত ইউরোপীয় শক্তিগুলোর সম্মিলিত যুদ্ধে পরিণত হয়। ১৮১২ সালে তাঁর প্রধান সেনাবাহিনী ধ্বংস হলেও ফরাসি সাম্রাজ্য তখনো বিস্তৃত এবং প্রশাসন কার্যকর ছিল। তিনি নতুন সৈন্য সংগ্রহ করে আবার জার্মানিতে যুদ্ধ করতে পারতেন। কিন্তু প্রতিপক্ষের কাছে একটি বিষয় স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল: নেপোলিয়নকে পরাজিত করা সম্ভব। ১৮১৩ সালের লাইপজিগের যুদ্ধ সেই উপলব্ধিকে স্থায়ী রাজনৈতিক পরিবর্তনে রূপ দেয়—ফরাসি বাহিনীকে জার্মানি ছাড়তে হয় এবং অধীনস্থ রাষ্ট্রগুলোর আনুগত্য ভেঙে পড়ে।
নতুন জোটের ভিত্তি তৈরি হয় রাশিয়ার অভিযানের শেষ পর্যায়েই। ১৮১২ সালের ডিসেম্বরে প্রুশীয় জেনারেল ইয়র্ক তাউরোগেনের সমঝোতায় নিজের বাহিনীকে নিরপেক্ষ করেন, যদিও প্রথমে তাঁর রাজার অনুমোদন ছিল না। পরে প্রুশিয়া প্রকাশ্যে ফ্রান্সের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয় এবং ১৮১৩ সালের ফেব্রুয়ারিতে রাশিয়ার সঙ্গে কালিশের চুক্তি করে। ব্রিটিশ অর্থসহায়তা জোটের সামরিক প্রস্তুতিকে শক্তিশালী করে। সুইডেনও যুক্ত হয়, যার যুবরাজ বার্নাদোত ছিলেন নেপোলিয়নের সাবেক মার্শাল। তাঁর বর্তমান রাষ্ট্রের স্বার্থ এখন পুরোনো সম্রাটের স্বার্থের বিপরীতে দাঁড়িয়েছিল।
তবে রাশিয়ার বিপর্যয় থেকে লাইপজিগের পরাজয় পর্যন্ত পথ সরল ছিল না। নেপোলিয়ন দ্রুত নতুন বাহিনী গড়ে মে মাসে ল্যুৎসেন ও বাউৎসেনে মিত্রদের পরাজিত করেন। এসব বিজয় দেখায়, তাঁর সামরিক দক্ষতা অক্ষুণ্ণ ছিল। কিন্তু নতুন সৈন্যদের অভিজ্ঞতার অভাব এবং অশ্বারোহী বাহিনীর দুর্বলতা বড় সীমাবদ্ধতা হয়ে দাঁড়ায়। রাশিয়ায় বিপুল ঘোড়া হারানোর ফলে শত্রুর অবস্থান নির্ণয় ও পশ্চাদপসরণকারী বাহিনীকে অনুসরণ করা কঠিন হয়। ফলে যুদ্ধক্ষেত্রের সাফল্যকে প্রতিপক্ষের সম্পূর্ণ ধ্বংসে পরিণত করা সম্ভব হচ্ছিল না।
জুনে যুদ্ধবিরতি হলে উভয় পক্ষ পুনর্গঠনের সুযোগ পায়। নেপোলিয়ন নিজের বাহিনীকে শক্তিশালী করেন, কিন্তু প্রতিপক্ষও সৈন্য ও সহযোগী বাড়ায়। অস্ট্রিয়া প্রথমে মধ্যস্থতার চেষ্টা করে। মেটারনিখ এমন সমঝোতা চাইছিলেন, যা মধ্য ইউরোপে ফরাসি প্রভাব কমিয়ে শক্তির ভারসাম্য ফিরিয়ে আনবে। আলোচনায় নিষ্পত্তি না হলে আগস্টে অস্ট্রিয়া যুদ্ধে যোগ দেয়। এবার নেপোলিয়নকে একসঙ্গে রাশিয়া, প্রুশিয়া ও অস্ট্রিয়ার প্রধান স্থলশক্তির মোকাবিলা করতে হয়। তাঁর অস্ট্রীয় রাজকন্যাকে বিয়ে করাও ভিয়েনার স্বার্থকে স্থায়ীভাবে ফ্রান্সের সঙ্গে বেঁধে রাখতে পারেনি।
মিত্ররা পূর্বের অভিজ্ঞতা থেকে কৌশল বদলায়। নেপোলিয়নের নেতৃত্বাধীন প্রধান বাহিনীর সঙ্গে অপ্রয়োজনীয় সরাসরি সংঘর্ষ এড়িয়ে তাঁর অধীনস্থ সেনাদলগুলোকে আক্রমণ করার ওপর জোর দেওয়া হয়। আগস্টে ড্রেসডেনে নেপোলিয়ন বড় বিজয় পেলেও অন্যত্র ফরাসিরা গ্রসবারেন, কাটসবাখ, কুলম ও পরে দেনেভিৎসে পরাজিত হয়। ফলে সম্রাটের ব্যক্তিগত সাফল্য সামগ্রিক পরিস্থিতি উদ্ধার করতে পারেনি। বিভিন্ন দিকে যুদ্ধ করা তাঁর মার্শালরা প্রতিপক্ষকে ঠেকাতে ব্যর্থ হলে যোগাযোগ ও সরবরাহের ওপর চাপ বাড়তে থাকে।
অক্টোবরে নেপোলিয়ন স্যাক্সনির লাইপজিগের কাছে শক্তি কেন্দ্রীভূত করেন। শহরটি সড়কসংযোগের গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হলেও আশপাশের নদী, জলাভূমি ও সীমিত সেতু পশ্চাদপসরণকে জটিল করে তুলেছিল। দক্ষিণে শোয়ারৎসেনবের্গের নেতৃত্বাধীন বোহেমিয়ার বাহিনী, উত্তরে ব্ল্যুশারের সিলেশিয়ার বাহিনী এবং পরে বার্নাদোতের উত্তরাঞ্চলীয় বাহিনী এগিয়ে আসে। বেনিগসেনের অতিরিক্ত রুশ বাহিনীও যোগ দেয়। নেপোলিয়নের পরিকল্পনা ছিল সব মিত্রশক্তি একত্র হওয়ার আগে তাদের গুরুত্বপূর্ণ অংশকে পরাজিত করা। কিন্তু সময় ও সংখ্যার ভার ক্রমে তাঁর বিরুদ্ধে যাচ্ছিল।
১৬ অক্টোবর দক্ষিণে ভাখাউ, লিবার্টভোল্কভিৎস ও আশপাশের গ্রামগুলোতে প্রচণ্ড যুদ্ধ শুরু হয়। নেপোলিয়ন কামানের গোলাবর্ষণ এবং মুরার নেতৃত্বে বড় অশ্বারোহী আক্রমণ দিয়ে মিত্রদের কেন্দ্র ভাঙতে চেষ্টা করেন। আক্রমণ কিছু সময়ের জন্য বিপজ্জনক অগ্রগতি ঘটালেও প্রতিপক্ষের অতিরিক্ত বাহিনী এসে পরিস্থিতি সামাল দেয়। উত্তরে মেকার্নে ব্ল্যুশারের সৈন্যরা মারমঁর বাহিনীর বিরুদ্ধে কঠিন লড়াই করে। দিনের শেষে নেপোলিয়ন প্রত্যাশিত নির্ণায়ক বিজয় পাননি। বিপুল ক্ষয়ক্ষতির পরও মিত্ররা অবস্থান ধরে রাখে।
১৭ অক্টোবর তুলনামূলক বিরতির মধ্যে আহতদের সরানো, বাহিনী পুনর্বিন্যাস এবং নতুন সৈন্য আনার কাজ চলে। নেপোলিয়ন বন্দি অস্ট্রীয় জেনারেল মেরফেল্টের মাধ্যমে আলোচনার প্রস্তাব পাঠান, কিন্তু তা পরিস্থিতি বদলায়নি। মিত্রদের শক্তি বাড়ছিল, আর ফরাসিদের সামনে নিরাপদে সরে যাওয়ার প্রশ্ন গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছিল। পরবর্তী দিনের জন্য অবস্থান ধরে রাখার সিদ্ধান্ত তাঁকে আরও বড় সম্মিলিত আঘাতের মুখে দাঁড় করায়। লাইপজিগে সমস্যা শুধু একটি প্রতিরক্ষারেখা রক্ষা করা ছিল না; চারদিকের শত্রুর মধ্যে পুরো বাহিনীর বেরিয়ে যাওয়ার পথও খোলা রাখতে হতো।
১৮ অক্টোবর মিত্ররা বিস্তৃত আক্রমণ চালায়। প্রোবস্টহাইদায় ফরাসিরা প্রবল প্রতিরোধ গড়ে তোলে এবং আক্রমণকারীদের বড় ক্ষতি করে। অন্য অংশেও ফরাসি ও সহযোগী সৈন্যরা দৃঢ়ভাবে লড়ে। কিন্তু মিত্রদের অতিরিক্ত সৈন্য তাদের ক্লান্ত অংশগুলোকে সাহায্য করতে পারে, যেখানে নেপোলিয়নের বিকল্প শক্তি সীমিত হয়ে আসছিল। বিভিন্ন পর্যায়ে যুদ্ধক্ষেত্রে যুক্ত মোট সৈন্যের সংখ্যা পাঁচ লক্ষের কাছাকাছি বা তার বেশি ছিল বলে অনুমান করা হয়। সংখ্যা গণনার পদ্ধতি ভিন্ন হলেও মিত্রদের স্পষ্ট সংখ্যাধিক্য নিয়ে সন্দেহ নেই।
সেদিন স্যাক্সন বাহিনীর একটি অংশ কামানসহ পক্ষ পরিবর্তন করে মিত্রদের সঙ্গে যোগ দেয়। এতে যুদ্ধক্ষেত্রে স্থানীয় সংকট সৃষ্টি হয় এবং ফরাসি নেতৃত্বের উদ্বেগ বাড়ে। তবে এই ঘটনাকেই পরাজয়ের একমাত্র কারণ বলা ভুল। সংখ্যাধিক্য, সরবরাহের চাপ, পূর্ববর্তী ক্ষয়ক্ষতি এবং একাধিক দিক থেকে আক্রমণ ইতিমধ্যেই ফরাসি অবস্থান দুর্বল করেছিল। পক্ষ পরিবর্তন সেই সামগ্রিক রাজনৈতিক ভাঙনের প্রকাশও ছিল। স্যাক্সনির রাজা নেপোলিয়নের পাশে থাকলেও তাঁর সব সৈন্য একই আনুগত্য বজায় রাখেনি।
১৮ অক্টোবর রাতে নেপোলিয়ন পশ্চিমদিকে পশ্চাদপসরণ শুরু করেন। ১৯ অক্টোবর শহরের ভেতর দিয়ে সৈন্য, কামান, গাড়ি ও আহতদের সরানোর সময় প্রচণ্ড ভিড় হয়। পশ্চাদরক্ষীরা মিত্রদের অগ্রযাত্রা ঠেকাচ্ছিল। এই অবস্থায় পশ্চিমমুখী প্রধান পালানোর পথের একটি গুরুত্বপূর্ণ সেতু আগেভাগে উড়িয়ে দেওয়া হয়। হাজার হাজার সৈন্য শহরের দিকে আটকা পড়ে; অনেকে বন্দি হয়, অন্যরা নদী পার হতে গিয়ে মারা যায়। পোলিশ সেনাপতি পনিয়াতোভস্কি আহত অবস্থায় নদী পার হওয়ার সময় ডুবে যান। পশ্চাদপসরণের বিশৃঙ্খলা পরাজয়ের ক্ষতি বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।
চার দিনের সংঘর্ষে উভয় পক্ষ মিলিয়ে হতাহত, বন্দি ও নিখোঁজের সংখ্যা এক লক্ষেরও বেশি হয় বলে সাধারণভাবে অনুমান করা হয়। লাইপজিগ ও আশপাশের জনপদ আহত সৈন্য, ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি ও রোগের চাপে বিপর্যস্ত হয়। ‘ব্যাটল অব দ্য নেশনস’ বা জাতিসমূহের যুদ্ধ নামটি বহুজাতিক অংশগ্রহণকে বোঝায়, কিন্তু এটি আধুনিক জাতিরাষ্ট্রগুলোর সরল সংঘর্ষ ছিল না। ফরাসি পক্ষে পোলিশ ও বিভিন্ন জার্মান সৈন্যও লড়েছিল। রাজবংশের স্বার্থ, রাষ্ট্রের নিরাপত্তা এবং জাতীয় আকাঙ্ক্ষা একই যুদ্ধক্ষেত্রে মিলেছিল, কখনো আবার পরস্পরের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়েছিল।
লাইপজিগের পরে নেপোলিয়ন অবশিষ্ট বাহিনী নিয়ে রাইনের দিকে সরে যান। বাভারিয়া যুদ্ধের আগেই পক্ষ বদলেছিল; পরাজয়ের পরে আরও জার্মান রাষ্ট্র ফরাসি ব্যবস্থা ছাড়তে থাকে। রাইন সংঘ ভেঙে পড়ে এবং ওয়েস্টফালিয়ার মতো নির্ভরশীল রাজ্যের ভিত্তি বিলুপ্ত হয়। জার্মানির বিভিন্ন দুর্গে ফরাসি সৈন্য রয়ে গেলেও তারা বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। নেপোলিয়ন শুধু একটি বড় যুদ্ধে হারেননি; জার্মানিতে সৈন্য, কর ও রাজনৈতিক সহযোগিতা সংগ্রহের ব্যবস্থাও হারিয়েছিলেন। মধ্য ইউরোপে তাঁর আধিপত্যের মূল কাঠামো আর টেকেনি।
তবু লাইপজিগেই সাম্রাজ্যের চূড়ান্ত অবসান ঘটেনি। নেপোলিয়ন ফ্রান্সে ফিরে নতুন প্রতিরোধ গড়বেন, আর মিত্রদের মধ্যেও যুদ্ধের লক্ষ্য নিয়ে আলোচনা চলবে। কিন্তু শক্তির ভারসাম্য বদলে গেছে: আগে ফরাসি বাহিনী অন্য রাষ্ট্রের রাজধানীর দিকে যেত, এবার মিত্রবাহিনী ফ্রান্সের সীমান্তের দিকে এগোবে। রাশিয়ায় সেনাবাহিনীর ধ্বংস যে সংকট শুরু করেছিল, লাইপজিগ তাকে ইউরোপীয় কর্তৃত্বের পতনে পরিণত করে। পরবর্তী অধ্যায়ে যুদ্ধ পৌঁছাবে ফ্রান্সের মাটিতে—যেখানে কয়েকটি উজ্জ্বল সামরিক সাফল্যও প্যারিসের পতন এবং সম্রাটের প্রথম সিংহাসনত্যাগ ঠেকাতে পারবে না।
বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
ক্যান্টন থেকে তিয়ানজিন: ১৮৫৮ সালের চুক্তি কীভাবে চীনকে আরও উন্মুক্ত করেছিল?
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ
কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস