বেইজিং অভিযান ও সামার প্যালেস ধ্বংস: ১৮৬০ সালে চিং সাম্রাজ্যের পরাজয়
সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত
১৮৬০ সালের আক্রমণে সামরিক পরাজয়ের সঙ্গে চীন হারায় অমূল্য সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য।
দাগুর সামনে ১৮৫৯ সালে অ্যাংলো-ফরাসি বাহিনীর পরাজয় চিং দরবারকে সাময়িক স্বস্তি দিয়েছিল। তিয়ানজিন চুক্তির অনুমোদনপত্র বিনিময়ের জন্য আসা বিদেশি প্রতিনিধিদের অগ্রযাত্রা নিয়ে বিরোধ শেষ পর্যন্ত যুদ্ধে গড়ায়, আর শক্তিশালী প্রতিরক্ষার মুখে আক্রমণকারীরা পিছু হটে। কিন্তু এই সাফল্য সংকট মেটায়নি। ব্রিটেন ও ফ্রান্স পরের বছর আরও বড় বাহিনী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। ১৮৬০ সালের অভিযান এবার শুধু নদীমুখ খুলতে নয়, বেইজিংয়ের সামনে সামরিক শক্তি দাঁড় করিয়ে চিং সরকারকে বাধ্য করতে পরিচালিত হয়।
নতুন অভিযানে ব্রিটিশ স্থলবাহিনীর নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল জেমস হোপ গ্রান্ট এবং ফরাসি বাহিনীর নেতৃত্বে শার্ল কুজাঁ-মোঁতোবাঁ। রাজনৈতিক আলোচনার দায়িত্বে ফিরে আসেন লর্ড এলগিন ও ব্যারন গ্রো। ব্রিটিশ বাহিনীতে ভারতীয় সৈন্যদের গুরুত্বপূর্ণ উপস্থিতি ছিল। পরিবহন, গোলাবারুদ, খাদ্য ও চিকিৎসার জন্যও বিস্তৃত প্রস্তুতি নেওয়া হয়। আগের বছরের ব্যর্থতা দেখিয়েছিল, শুধু নদীর বাধা ভেঙে জাহাজ এগিয়ে দেওয়া যথেষ্ট নয়; দুর্গকে স্থলপথ থেকেও আক্রমণ করতে হবে।
১৮৬০ সালের ১ আগস্ট যৌথ বাহিনী দাগুর উত্তরে বেইতাংয়ে অবতরণ করে। সরাসরি মোহনার সামনে আক্রমণের পরিবর্তে এই অবস্থান থেকে স্থলপথে এগিয়ে যাওয়া সম্ভব হয়। জলাভূমি, কাদা ও সরবরাহের সমস্যা থাকলেও বাহিনী ধীরে ধীরে চীনা প্রতিরক্ষার দিকে অগ্রসর হয়। এই কৌশল পরিবর্তন ছিল গুরুত্বপূর্ণ: আগের বছরের শক্তিশালী প্রতিরক্ষাকে একইভাবে আক্রমণ না করে তার পাশ দিয়ে পৌঁছে দুর্বল অবস্থান খোঁজা হয়। চিং বাহিনীকে এবার একাধিক দিক সামলাতে হয়।
আগস্টের লড়াইগুলোর পরে ২১ আগস্ট দাগুর উত্তর দিকের গুরুত্বপূর্ণ দুর্গ দখল হয়। চীনা প্রতিরক্ষকেরা কঠোরভাবে লড়েন, কিন্তু গোলাবর্ষণ ও স্থল আক্রমণের সমন্বয় ঠেকাতে পারেননি। অন্য প্রতিরক্ষাস্থানগুলোও পরে আত্মসমর্পণ করে। নদীপথ খুলে গেলে যৌথ বাহিনীর তিয়ানজিনে পৌঁছানো সহজ হয়। ১৮৫৯ সালের বিজয় যে স্থায়ী নিরাপত্তা দেয়নি, তা স্পষ্ট হয়ে যায়। চিং দরবারকে আবার আলোচনা করতে হয়, এবার আগের তুলনায় অনেক বেশি সামরিক চাপের মধ্যে।
তিয়ানজিনে আলোচনার পরেও মূল বিরোধ মেটেনি। বিদেশি প্রতিনিধিরা ১৮৫৮ সালের চুক্তি বাস্তবায়ন, বেইজিংয়ে কূটনৈতিক উপস্থিতি এবং বাড়তি ক্ষতিপূরণ চাইছিলেন। চিং কর্তৃপক্ষ রাজধানীর কাছে বিদেশি সৈন্য ও প্রতিনিধিদের প্রবেশ নিয়ে উদ্বিগ্ন ছিল। সমঝোতার পাশাপাশি দুই পক্ষ সামরিক প্রস্তুতিও ধরে রাখে। বাহিনী উত্তরে তুংঝৌর দিকে এগোলে আলোচনার স্থান, প্রতিনিধিদের চলাচল ও নিরাপত্তা নতুন বিরোধ সৃষ্টি করে। শান্তির আলোচনা ও যুদ্ধের প্রস্তুতি একই সময়ে চলছিল।
সেপ্টেম্বরের মাঝামাঝি হ্যারি পার্কসসহ একটি আলোচনাসংশ্লিষ্ট দল চীনা কর্তৃপক্ষের হাতে বন্দি হয়। তাঁদের সঙ্গে ব্রিটিশ, ফরাসি ও ভারতীয় সদস্য এবং সংবাদপত্রের প্রতিনিধি টমাস বোলবি ছিলেন। বন্দিদের কয়েকজন পরে মুক্তি পান; অন্যরা নির্যাতন ও অমানবিক অবস্থায় মারা যান। ঘটনাটি বিদেশি নেতৃত্বের ক্ষোভ বাড়ায় এবং পরবর্তী প্রতিশোধের যুক্তি হয়ে ওঠে। তবে বন্দিদের ওপর নির্যাতনের দায় এবং সাংস্কৃতিক সম্পদ ধ্বংসের সিদ্ধান্তের দায় আলাদাভাবে বিচার করা জরুরি।
১৮ সেপ্টেম্বর ঝাংজিয়াওয়ানের কাছে চীনা বাহিনী পরাজিত হয়। এরপর ২১ সেপ্টেম্বর পালিচিয়াও বা বালিচিয়াওয়ের যুদ্ধে বেইজিংয়ের বাইরের প্রধান প্রতিরোধ ভেঙে পড়ে। সেনাপতি সেংগে রিনচেনের বাহিনীতে মঙ্গোল অশ্বারোহীরা ছিলেন। তাঁদের আক্রমণ সাহসী হলেও আধুনিক কামান ও নিয়ন্ত্রিত পদাতিক গোলাবর্ষণের সামনে কার্যকর হয়নি। খোলা মাঠে দ্রুত আক্রমণ চালানোর ঐতিহ্যবাহী শক্তি প্রতিপক্ষের অগ্নিশক্তির সঙ্গে অসম লড়াইয়ে পড়ে। রাজধানীর দিকে যৌথ বাহিনীর অগ্রযাত্রা ঠেকানোর ক্ষমতা এরপর অনেকটাই হারিয়ে যায়।
সম্রাট শিয়ানফেং বেইজিং ছেড়ে চেংদের রাজকীয় আবাসে চলে যান। আলোচনার দায়িত্ব পড়ে তাঁর ভাই প্রিন্স গংয়ের ওপর। রাজধানীর নিরাপত্তা, রাজপরিবারের মর্যাদা এবং আরও ধ্বংস এড়ানোর চাপ তাঁকে একসঙ্গে সামলাতে হয়। তবে রাজধানীর সামনে সামরিক পরাজয় মানেই গোটা চিং সাম্রাজ্যের বিলুপ্তি ছিল না। সরকার তখনও বিশাল ভূখণ্ড শাসন করছিল। “চূড়ান্ত পরাজয়” এখানে দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধে চিং দরবারের দাবি প্রত্যাখ্যান করার সামরিক সামর্থ্য ভেঙে পড়াকে বোঝায়।
অক্টোবরের শুরুতে অ্যাংলো-ফরাসি সৈন্যরা বেইজিংয়ের উত্তর-পশ্চিমে ইউয়ানমিংইউয়ানে পৌঁছায়। বিদেশি বিবরণে এটিই পুরোনো সামার প্যালেস নামে পরিচিত। এটি একটিমাত্র ভবন ছিল না; বাগান, জলাধার, প্রাসাদ, গ্রন্থসংগ্রহ ও শিল্পসম্পদে সমৃদ্ধ বিস্তৃত রাজকীয় আবাস ছিল। প্রধান স্থাপত্য ছিল চীনা রীতির, যদিও ছোট একটি অংশে ইউরোপীয় ধাঁচের ভবন ও ফোয়ারা ছিল। আজকের ইহেয়ুয়ান কিংবা বেইজিংয়ের ফরবিডেন সিটির সঙ্গে এই স্থানকে এক করে দেখা ভুল।
প্রায় ৭–৯ অক্টোবর যৌথ বাহিনীর সদস্যরা সেখানে ব্যাপক লুটপাট চালায়। চীনামাটির সামগ্রী, ব্রোঞ্জ, জেড, রেশম, ঘড়ি, অলংকার ও অন্যান্য মূল্যবান বস্তু সরিয়ে নেওয়া হয়। কিছু সম্পদ ভাঙা বা নষ্ট হয়, কিছু পরে বিক্রি ও বণ্টন করা হয়। লুটপাট পরিকল্পিত অগ্নিসংযোগের আগেই ঘটেছিল। তাই প্রাসাদের সব ক্ষতিকে বন্দিদের মৃত্যুর সংবাদ পাওয়ার পরে নেওয়া একটিমাত্র প্রতিশোধমূলক পদক্ষেপের ফল বলা যায় না।
বন্দিদের দুরবস্থা ও মৃত্যুর খবর নিশ্চিত হওয়ার পরে এলগিন প্রাসাদ ধ্বংসের নির্দেশ দেন। তাঁর বক্তব্য ছিল, সম্রাটের প্রিয় আবাসে আঘাত করে শাস্তির বার্তা দিতে হবে। ১৮ ও ১৯ অক্টোবর হোপ গ্রান্টের অধীন ব্রিটিশ সৈন্যরা ব্যাপক অগ্নিসংযোগ করে। ফরাসিরা আগের লুটপাটে অংশ নিলেও এই নির্দেশিত অগ্নিসংযোগে অংশ নেয়নি। কাজেই যৌথ অভিযানের লুটপাট এবং ব্রিটিশ নেতৃত্বে সংগঠিত দহন—দুটি ঘটনার দায় ও সময়ক্রম আলাদা করে বোঝা দরকার।
আগুনে কাঠের হলঘর, অভ্যন্তরীণ সজ্জা, গ্রন্থ ও সংগ্রহের বিপুল ক্ষতি হয়। পাথরের কিছু কাঠামো ও ধ্বংসাবশেষ টিকে থাকলেও রাজকীয় উদ্যানের সামগ্রিক রূপ বিপর্যস্ত হয়। এটি যুদ্ধের মধ্যে দুর্ঘটনাবশত লাগা আগুন ছিল না; রাজনৈতিক বার্তা দেওয়ার উদ্দেশ্যে নেওয়া সিদ্ধান্ত ছিল। বন্দিদের প্রতি নিষ্ঠুরতার প্রতিবাদ সেই সিদ্ধান্তের ব্যাখ্যা দেয়, কিন্তু অমূল্য সাংস্কৃতিক সম্পদ ধ্বংসকে অনিবার্য করে না। শাসককে শাস্তি দেওয়ার নামে ক্ষতি হয় বহুযুগের সঞ্চিত ঐতিহ্যের।
এর মধ্যেই বেইজিংয়ের ওপর সামরিক নিয়ন্ত্রণের চাপ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং শহরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বার যৌথ বাহিনীর হাতে দেওয়া হয়। অক্টোবরের শেষভাগে প্রিন্স গং ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সঙ্গে পিকিং কনভেনশন সম্পাদন করেন। এর মাধ্যমে তিয়ানজিন চুক্তি কার্যকর করার বাধা সরানো হয়। বিদেশি দূতদের রাজধানীতে অবস্থান, ক্ষতিপূরণ বৃদ্ধি এবং অন্যান্য সুবিধা নিশ্চিত হয়। ব্রিটেন কাউলুনের দক্ষিণাংশ ও স্টোনকাটার্স দ্বীপ পায়। যুদ্ধের ফল আবার ভূখণ্ড ও অধিকার হস্তান্তরে রূপ নেয়।
চীনের পরাজয়ের পেছনে ছিল যৌথ বাহিনীর অস্ত্র, প্রশিক্ষণ, সরবরাহ এবং অভিযান পরিচালনার সুবিধা; সঙ্গে চিং প্রশাসনের সীমাবদ্ধতা ও অভ্যন্তরীণ গৃহযুদ্ধের চাপ। কিন্তু ইউয়ানমিংইউয়ানের ধ্বংস সামরিক ফলাফলের বাইরেও গভীর স্মৃতি রেখে যায়। লুট হওয়া বস্তু বিদেশি সংগ্রহে ছড়িয়ে পড়ে, আর ধ্বংসাবশেষ চীনে বিদেশি আগ্রাসনের প্রতীক হয়। ১৮৬০ সালের সমাপ্তি চিং শাসন শেষ করেনি; বিদেশি শক্তির সঙ্গে তার সম্পর্কের অসমতা আরও গভীর করেছিল। এখন যুদ্ধের পরিণতি শুধু চুক্তিতে নয়, অর্থনীতি, সমাজ এবং রাষ্ট্র সংস্কারের প্রশ্নেও ছড়িয়ে পড়বে।
দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
ভিলকাবাম্বার পতন ও তুপাক আমারুর মৃত্যু: ১৫৭২ সালে স্বাধীন ইনকা শাসনের অবসান
কুসকো দখল ও মানকো ইনকার বিদ্রোহ: স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মহাপ্রতিরোধ
কাহামার্কার যুদ্ধ: আতাহুয়ালপার বন্দিত্ব, মুক্তিপণ ও হত্যার ইতিহাস