রুয়ান্ডায় গণহত্যার সূচনা: বিমান হামলা ও ৭ এপ্রিলের হত্যাযজ্ঞ
সিরিজ: রুয়ান্ডার গণহত্যা: ১৯৯৪
একটি বিমান হামলার পর সংগঠিত হত্যাযজ্ঞের সূচনা
শান্তির আলোচনা চলার পাশেই যে সংগঠিত হত্যার রাজনীতি শক্তিশালী হচ্ছিল, ১৯৯৪ সালের এপ্রিলের শুরুতে তা রুয়ান্ডাকে বিপজ্জনক অবস্থানে এনে দাঁড় করায়। সরকারি বাহিনী ও রুয়ান্ডান প্যাট্রিয়টিক ফ্রন্টের মধ্যে যুদ্ধ থামানোর চেষ্টা চলছিল, অথচ উগ্রপন্থী নেতারা ক্ষমতা ভাগাভাগিকে পরাজয় হিসেবে দেখছিলেন। তুতসি নাগরিকদের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিনের প্রচার, মিলিশিয়া সংগঠন এবং রাজনৈতিক প্রতিপক্ষকে শত্রু বানানোর প্রক্রিয়া ইতিমধ্যে সমাজে গভীর প্রভাব ফেলেছিল। ৬ এপ্রিলের বিমান হামলা এই সংকট সৃষ্টি করেনি; ঘটনাটিকে কাজে লাগিয়ে হত্যার অভিযান দ্রুত চালু করা হয়েছিল।
১৯৯৩ সালের আগস্টে স্বাক্ষরিত আরুশা শান্তিচুক্তিতে অন্তর্বর্তী সরকার গঠন, ক্ষমতা ভাগাভাগি এবং সরকারি ও বিদ্রোহী বাহিনীর সমন্বয়ের ব্যবস্থা ছিল। চুক্তির বাস্তবায়নে সহায়তার জন্য জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা মিশন ইউনামির মোতায়েন হয়। কিন্তু কাগজে সমঝোতা হলেও রাজনৈতিক আস্থা তৈরি হয়নি। প্রেসিডেন্ট জুভেনাল হাবিয়ারিমানার ঘনিষ্ঠ ক্ষমতাবলয়ের একাংশ এবং ‘হুতু পাওয়ার’ ধারার নেতারা আশঙ্কা করছিলেন, নতুন ব্যবস্থায় তাঁদের কর্তৃত্ব ও সুবিধা কমবে। এই বিরোধ শান্তিপ্রক্রিয়াকে বারবার আটকে দিচ্ছিল।
৬ এপ্রিল সন্ধ্যায় তানজানিয়ার দার এস সালামে আঞ্চলিক আলোচনা শেষে হাবিয়ারিমানা দেশে ফিরছিলেন। তাঁর বিমানে বুরুন্ডির প্রেসিডেন্ট সিপ্রিয়েন ন্তারিয়ামিরাও ছিলেন। রাত সাড়ে আটটার কিছু আগে বা কাছাকাছি সময়ে বিমানটি কিগালি বিমানবন্দরে নামার প্রস্তুতিকালে ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ভূপাতিত হয়। দুই প্রেসিডেন্টসহ আরোহীরা সবাই নিহত হন। মুহূর্তের মধ্যে রুয়ান্ডায় রাষ্ট্রপ্রধানের শূন্যতা এবং সামরিক নেতৃত্বে সংকট তৈরি হয়। তবে পরবর্তী ঘটনাপ্রবাহকে শুধু আকস্মিক বিশৃঙ্খলা হিসেবে ব্যাখ্যা করলে হত্যাযজ্ঞের সংগঠিত চরিত্র আড়াল হয়ে যায়।
বিমানটি কারা ভূপাতিত করেছিল, সেই দায় নিয়ে চূড়ান্ত ও সর্বজনস্বীকৃত নিষ্পত্তি নেই। বিভিন্ন সময়ে আরপিএফ ও হুতু উগ্রপন্থীদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে; তদন্ত ও রাজনৈতিক বিতর্কও হয়েছে। তাই কোনো একটি অভিযোগকে প্রমাণিত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করা ঠিক নয়। কিন্তু বিমান হামলার দায় অমীমাংসিত থাকার সঙ্গে পরবর্তী গণহত্যার দায়কে গুলিয়ে ফেলা যায় না। নিরস্ত্র মানুষকে শনাক্ত করা, বাড়ি থেকে তুলে নেওয়া এবং জাতিগত পরিচয়ের কারণে হত্যা করার সিদ্ধান্ত ছিল পৃথক অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড।
বিমান বিধ্বস্ত হওয়ার পরপরই কিগালিতে প্রেসিডেনশিয়াল গার্ড ও অন্যান্য সশস্ত্র সদস্যদের তৎপরতা বাড়ে। গুরুত্বপূর্ণ সড়কে অবরোধ বসানো হয়; চলাচল নিয়ন্ত্রণ এবং পরিচয় যাচাই শুরু হয়। পূর্ববর্তী দশকগুলোতে রাষ্ট্র যে পরিচয়পত্রে জাতিগত শ্রেণিবিভাগ লিখে রেখেছিল, সেটিই এখন বিপদের উৎস হয়ে ওঠে। তুতসি পরিচয় পাওয়া গেলে মানুষকে আটকে রাখা বা হামলার শিকার করার ঘটনা ঘটে। স্থানীয় পরিচিতি ও প্রতিবেশীর তথ্যও ব্যবহৃত হয়। ফলে পরিচয়পত্র লুকিয়ে ফেললেই নিরাপত্তা নিশ্চিত হতো না।
একই রাতে সামরিক কর্মকর্তাদের বৈঠকে প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের প্রভাবশালী কর্মকর্তা কর্নেল থেওনেস্ট বাগোসোরা কেন্দ্রীয় ভূমিকা নেন। সংকট মোকাবিলার নামে সামরিক কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠার চেষ্টা চলতে থাকে। কিন্তু সরকারের বৈধ বেসামরিক নেতৃত্বকে কার্যকর রাখার পথ ক্রমে বন্ধ হয়ে যাচ্ছিল। প্রধানমন্ত্রী আগাত উউইলিঙ্গিয়িমানা ছিলেন সেই নেতৃত্বের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিনিধি। জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তাঁকে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দেওয়ার সুযোগ করে দিতে চেয়েছিলেন, যাতে তিনি শান্ত থাকার আহ্বান জানাতে পারেন। তাঁকে সেই ভূমিকা পালন করতে দেওয়া হয়নি।
৭ এপ্রিল সকালে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর স্বামী নিহত হন। তিনি নিজে হুতু হলেও উগ্রপন্থীদের রাজনৈতিক অবস্থানের বিরোধিতা করতেন। তাঁর মৃত্যু দেখিয়ে দেয়, হত্যাকারীদের লক্ষ্য কেবল তুতসি জনগোষ্ঠী ছিল না; হত্যার নীতিকে বাধা দিতে পারেন এমন হুতু রাজনীতিকরাও নিশানা হচ্ছিলেন। তুতসিদের ধ্বংস করার অভিযানের পাশাপাশি সম্ভাব্য রাজনৈতিক প্রতিরোধের নেতৃত্ব সরিয়ে দেওয়া হচ্ছিল। এতে রাষ্ট্রের ভেতর থেকে হত্যাযজ্ঞ থামানোর সুযোগ দুর্বল হয় এবং উগ্রপন্থীদের কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা সহজ হয়ে ওঠে।
প্রধানমন্ত্রীকে রক্ষায় নিয়োজিত ১০ জন বেলজীয় জাতিসংঘ শান্তিরক্ষীও আটক হওয়ার পর নিহত হন। এই হত্যাকাণ্ড আন্তর্জাতিক উপস্থিতির ওপর বড় আঘাত ছিল। বেলজিয়াম পরে তার সেনা প্রত্যাহারের সিদ্ধান্ত নেয়, যা ইউনামিরের সক্ষমতা আরও কমিয়ে দেয়। তবে এই প্রত্যাহার বা মিশন সংকোচনের পরবর্তী সিদ্ধান্তকে ৭ এপ্রিলের ঘটনায় একসঙ্গে বসিয়ে দেওয়া উচিত নয়। প্রথম দিনের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতিকে এমন দিকে ঠেলে দেয়, যার ফলে পরবর্তী দিনগুলোতে আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়া ও শান্তিরক্ষার ব্যবস্থা আরও দুর্বল হয়ে পড়ে।
রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি সাধারণ তুতসি পরিবারগুলোর ওপর হামলা শুরু হয়। সৈন্য, দলীয় মিলিশিয়া এবং স্থানীয় সহযোগীরা বাড়িঘরে তল্লাশি চালায়। আগে থেকে পরিচিত বিরোধী নেতা, মানবাধিকারকর্মী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও খোঁজা হচ্ছিল। এসব তৎপরতা দেখায়, রাষ্ট্রপ্রধানের মৃত্যুতে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত ক্ষোভই সব ঘটনার ব্যাখ্যা নয়। নির্দিষ্ট মানুষকে খুঁজে বের করা, সশস্ত্র দল মোতায়েন করা এবং রাস্তায় পালানোর পথ বন্ধ করা ছিল সংগঠনের লক্ষণ। ভুক্তভোগীরা নিজেদের বাড়িতেও নিরাপদ থাকছিলেন না।
এই পরিবেশ তৈরিতে উগ্রপন্থী প্রচারণার ভূমিকা ছিল গভীর। ‘কাঙ্গুরা’ পত্রিকা আগেই তুতসিদের বিরুদ্ধে বিদ্বেষ ও সামাজিক বিচ্ছিন্নতার বক্তব্য ছড়িয়েছিল। ১৯৯৩ সালে সম্প্রচার শুরু করা রেডিও টেলিভিশন লিব্র দে মিল কোলিন বা আরটিএলএম সেই প্রচারকে কথোপকথন, গান ও রাজনৈতিক মন্তব্যের পরিচিত ভঙ্গিতে মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়। তুতসিদের অমানবিক ভাষায় উপস্থাপন এবং আরপিএফের সঙ্গে সমগ্র জনগোষ্ঠীকে এক করে দেখানো শ্রোতাদের কাছে বৈষম্যকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা ছিল। বিনোদনের সঙ্গে মিশে বিদ্বেষ দৈনন্দিন জীবনে প্রবেশ করছিল।
বিমান হামলার পর আরটিএলএম আরপিএফ এবং জাতিসংঘের কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে দোষারোপ ছড়ায়। যাচাইহীন অভিযোগকে নিশ্চিত খবর হিসেবে প্রচার করে প্রতিশোধের পরিবেশ তৈরি করা হয়। পরবর্তী দিনগুলোতে এই রেডিও মানুষ শনাক্ত করা এবং হত্যাকারীদের উৎসাহ দেওয়ার মাধ্যমেও ভূমিকা রাখে। তবে রেডিও একা গণহত্যা ঘটায়নি। প্রচারণাকে কার্যকর সহিংসতায় বদলাতে অস্ত্রধারী দল, রাজনৈতিক নির্দেশনা, প্রশাসনিক সহযোগিতা এবং স্থানীয় অংশগ্রহণ দরকার হয়েছিল। প্রচার ও সংগঠন একে অন্যকে শক্তি জুগিয়েছিল।
শাসক দল এমআরএনডির সঙ্গে যুক্ত ইন্টারাহামওয়ে এবং উগ্রপন্থী সিডিআর দলের ইমপুজামুগাম্বি মিলিশিয়া এই সহিংস ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিল। যুদ্ধের সময় যুবকদের সংগঠিত করা, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র বিতরণের অভিজ্ঞতা হত্যাযজ্ঞে কাজে লাগে। স্থানীয় নেতাদের প্রভাবও ছিল গুরুত্বপূর্ণ, কারণ তাঁরা জানতেন কোন পরিবার কোথায় থাকে এবং কার ওপর চাপ সৃষ্টি করা যায়। কেউ আদর্শগত বিদ্বেষে, কেউ সুবিধার আশায়, আবার কেউ হুমকি ও সামাজিক চাপে অংশ নেয়। এসব ভিন্ন প্রেরণা অপরাধের ব্যক্তিগত দায় মুছে দেয় না।
৭ এপ্রিল থেকেই রাজধানীর বাইরেও হত্যাকাণ্ডের বিস্তার ঘটে, কিন্তু সব অঞ্চলে একই সময়ে বা একই মাত্রায় নয়। কোথাও স্থানীয় কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক নেতারা দ্রুত সহায়তা করেন; কোথাও প্রতিরোধ বা দ্বিধার কারণে হত্যার অভিযান বিলম্বিত হয়। দক্ষিণের বুতারে অঞ্চলে ব্যাপক গণহত্যা তুলনামূলক পরে তীব্র হয়। এই পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: দেশজুড়ে একই মুহূর্তে সবাই হত্যায় নেমে পড়েছিল—এমন ধারণা ভুল। স্থানীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত মানুষের নিরাপত্তা কিংবা বিপদের মাত্রা বদলে দিতে পারত।
আরপিএফও ৭ এপ্রিল পুনরায় সামরিক অভিযান শুরু করে; ফলে গৃহযুদ্ধ ও গণহত্যা পাশাপাশি চলতে থাকে। কিন্তু যুদ্ধক্ষেত্রের লড়াই এবং নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীকে নিশ্চিহ্ন করার অভিযান আলাদা করে বুঝতে হয়। ইউনামিরের সীমিত সামর্থ্য, রাজনৈতিক নেতৃত্বের হত্যাকাণ্ড এবং কার্যকর আন্তর্জাতিক প্রতিরোধের অনুপস্থিতিতে সাধারণ মানুষ আশ্রয় খুঁজতে থাকে। অনেকেই গির্জা, বিদ্যালয় ও সরকারি ভবনে জড়ো হন, পূর্বের অভিজ্ঞতায় সেসব স্থানকে নিরাপদ ভেবে। পরবর্তী দিনগুলোতে এই আশ্রয়গুলোর বহু স্থানই হয়ে উঠবে গণহত্যার কেন্দ্র।
রুয়ান্ডার গণহত্যায় জাতিসংঘ ও বিশ্বশক্তির ব্যর্থতা: কেন থামেনি হত্যাযজ্ঞ?
মহাভীতি ও সামন্ততন্ত্রের অবসান: মানবাধিকার ঘোষণা থেকে নারীদের ভার্সাই মিছিল
বাস্তিল দুর্গের পতন: ১৪ জুলাই ১৭৮৯ কীভাবে ফরাসি বিপ্লব বদলে দিল
এস্টেটস জেনারেল ও টেনিস কোর্ট শপথ: ১৭৮৯ সালে রাজক্ষমতাকে চ্যালেঞ্জ