বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান

সিরিজ: আফিম যুদ্ধ: চীন ও ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের সংঘাত

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনা: অ্যারো ঘটনা, ব্রিটিশ আক্রমণ ও ফ্রান্সের যোগদান
একটি জাহাজে তল্লাশির বিরোধ থেকে চীনে নতুন সাম্রাজ্যবাদী আক্রমণের সূচনা।

নানকিং চুক্তি যুদ্ধ থামিয়েছিল, কিন্তু চীনের সঙ্গে ব্রিটেনের বিরোধের নিষ্পত্তি করেনি। পাঁচটি বন্দর উন্মুক্ত হওয়া, হংকং দ্বীপ হস্তান্তর এবং বিদেশিদের বিশেষ অধিকার প্রতিষ্ঠার পরেও ব্রিটিশ ব্যবসায়ী ও কর্মকর্তাদের একাংশ আরও সুবিধা চাইছিলেন। অন্যদিকে চিং প্রশাসন চাপিয়ে দেওয়া ব্যবস্থার বিস্তার ঠেকাতে চেষ্টা করছিল। এই অমীমাংসিত পরিস্থিতিতে ১৮৫৬ সালের অক্টোবরে গুয়াংঝৌতে একটি ছোট বাণিজ্যজাহাজে তল্লাশি নতুন সংকট তৈরি করে। অ্যারো ঘটনাটি যুদ্ধের তাৎক্ষণিক উপলক্ষ হয়েছিল; তার পেছনে জমে ছিল বাণিজ্য, কূটনীতি ও সার্বভৌমত্বের দীর্ঘ বিরোধ।

প্রথম যুদ্ধের পরে ব্রিটিশদের প্রত্যাশা ছিল, চীনে তাঁদের তৈরি পণ্যের বিশাল বাজার খুলবে। বাস্তবে বাণিজ্য সেই প্রত্যাশা অনুযায়ী বাড়েনি। স্থানীয় উৎপাদন, ভোক্তার চাহিদা, পরিবহনব্যবস্থা এবং অভ্যন্তরীণ বাজারে প্রবেশের সীমাবদ্ধতা ছিল গুরুত্বপূর্ণ কারণ। কিন্তু ব্যবসায়ীদের অনেকে সমস্যার প্রধান ব্যাখ্যা খুঁজতেন চীনা বিধিনিষেধে। আরও বন্দর, অভ্যন্তরে চলাচলের সুযোগ এবং বাণিজ্যের ওপর কম বাধা তাঁদের দাবিতে পরিণত হয়। আফিমের লাভজনক ব্যবসা চললেও তার আইনগত অবস্থানও অমীমাংসিত ছিল।

গুয়াংঝৌ শহরে ব্রিটিশদের প্রবেশাধিকার নিয়ে বিরোধ বিশেষ তীব্র হয়েছিল। চুক্তিতে বাণিজ্য ও বসবাসের অধিকার থাকলেও প্রাচীরঘেরা শহরে প্রবেশের প্রশ্নে দুই পক্ষের ব্যাখ্যা ও রাজনৈতিক অবস্থান মেলেনি। স্থানীয় বিরোধিতার মুখে চীনা কর্মকর্তারা বিদেশিদের প্রবেশ ঠেকিয়ে রাখেন। ব্রিটিশ কর্মকর্তাদের কাছে এটি হয়ে ওঠে মর্যাদা ও চুক্তি কার্যকরের পরীক্ষা। ফলে একটি স্থানীয় প্রশাসনিক সমস্যা সাম্রাজ্যিক সম্মানের প্রশ্নে রূপ নিতে থাকে, যা সমঝোতার সুযোগ সংকুচিত করে।

চীনের অভ্যন্তরীণ অবস্থাও তখন বিপজ্জনক। ১৮৫০ সালে শুরু হওয়া তাইপিং বিদ্রোহ বিস্তৃত গৃহযুদ্ধে পরিণত হয় এবং ১৮৫৩ সালে বিদ্রোহীরা নানজিং দখল করে। অন্য এলাকাতেও অস্থিরতা চলছিল। চিং সরকারকে সেনাবাহিনী, অর্থ ও প্রশাসনিক মনোযোগ একাধিক সংকটে ভাগ করতে হচ্ছিল। বিদেশি শক্তির চাপ তাই এমন সময় বাড়ে, যখন রাষ্ট্র ভেতর থেকেই দুর্বল হয়ে পড়ছিল। তবে এই দুর্বলতা বিদেশি আক্রমণকে অনিবার্য করেনি; সামরিক শক্তি ব্যবহারের সিদ্ধান্ত ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষই নিয়েছিল।

১৮৫৬ সালের ৮ অক্টোবর চীনা কর্মকর্তারা গুয়াংঝৌর কাছে নোঙর করা অ্যারো জাহাজে ওঠেন এবং বারোজন চীনা নাবিককে আটক করেন। জলদস্যুতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিকে খোঁজার অভিযোগ ছিল অভিযানের পেছনে। অ্যারো ছিল চীনা মালিকানাধীন একটি লরচা—ইউরোপীয় ধরনের কাঠামোর সঙ্গে চীনা পাল ব্যবহৃত ছোট জাহাজ। সেটি হংকংয়ে নিবন্ধিত হয়েছিল এবং তার ব্রিটিশ অধিনায়ক ছিলেন। এই নিবন্ধনই ব্রিটিশ সুরক্ষার দাবির ভিত্তি হয়ে ওঠে।

কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা ছিল নিবন্ধনের মেয়াদ। অ্যারোর অনুমতিপত্র ২৭ সেপ্টেম্বর শেষ হয়েছিল, অর্থাৎ তল্লাশির আগে। ফলে ঘটনাটির সময় জাহাজটি ব্রিটিশ পতাকা ব্যবহার ও সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রাখত কি না, তা গুরুতর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। চীনা মালিকানাধীন জাহাজে চীনা নাগরিকদের গ্রেপ্তারকে সরাসরি ব্রিটিশ জাহাজে আক্রমণ বলা তাই বিভ্রান্তিকর। নিবন্ধন, উপনিবেশের সুরক্ষা এবং চীনের নিজস্ব পুলিশি ক্ষমতা—তিনটি বিষয় এখানে পরস্পরের সঙ্গে জড়িয়ে গিয়েছিল।

গুয়াংঝৌর ব্রিটিশ কনসাল হ্যারি পার্কস দাবি করেন, চীনা কর্মকর্তারা ব্রিটিশ পতাকা নামিয়ে অপমান করেছেন। চীনা পক্ষ সেই অভিযোগ অস্বীকার করে। তল্লাশির মুহূর্তে পতাকা উড়ছিল কি না এবং সেটি নামানো হয়েছিল কি না—এসব নিয়ে বিবরণে বিরোধ আছে। হংকংয়ের গভর্নর জন বাউরিংও নিবন্ধনের মেয়াদ শেষ হওয়ার বিষয়টি জানতেন। তবু ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ ঘটনাটিকে জাতীয় মর্যাদা ও সুরক্ষার প্রশ্ন হিসেবে এগিয়ে নেয়।

পার্কস আটক নাবিকদের ফেরত দেওয়া এবং আনুষ্ঠানিক ক্ষমা চাওয়ার দাবি জানান। গুয়াংডং ও গুয়াংসির গভর্নর-জেনারেল ইয়ে মিংচেন চীনা কর্তৃপক্ষের এখতিয়ারের পক্ষে অবস্থান নেন। শেষ পর্যন্ত নাবিকদের ফেরত দেওয়া হলেও বিরোধ থামেনি। ফেরত দেওয়ার ধরন, ক্ষমাপ্রার্থনা এবং ব্রিটিশ দাবির স্বীকৃতি নিয়ে মতবিরোধ বজায় থাকে। অর্থাৎ আটক ব্যক্তিদের মুক্তির মাধ্যমে সংকটের বাস্তব অংশ মেটানোর সুযোগ থাকলেও বিরোধ ইতিমধ্যে বৃহত্তর রাজনৈতিক দাবির সঙ্গে যুক্ত হয়ে গিয়েছিল।

অ্যাডমিরাল মাইকেল সেমুরের নেতৃত্বে ব্রিটিশ নৌবাহিনী অক্টোবরের শেষভাগে গুয়াংঝৌর প্রতিরক্ষাস্থানে আক্রমণ ও গোলাবর্ষণ শুরু করে। চাপের বিষয় তখন শুধু অ্যারোর নাবিকেরা ছিলেন না; শহরে প্রবেশাধিকারও সামনে আসে। চীনা প্রতিরোধ এবং বিদেশিবিরোধী উত্তেজনা বাড়ে, পরে বাণিজ্যকুঠি এলাকায় অগ্নিকাণ্ড ও ধ্বংস ঘটে। একটি পুলিশি তল্লাশির বিতর্ককে বৃহত্তর দাবি আদায়ের সামরিক অভিযানে পরিণত করাই দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধের সূচনার মূল রাজনৈতিক পদক্ষেপ।

তবে ব্রিটেনের সবাই এই আক্রমণ সমর্থন করেননি। রিচার্ড কবডেনসহ বিরোধীরা অ্যারোর নিবন্ধন, পতাকার অভিযোগ এবং যুদ্ধের নৈতিক ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। ১৮৫৭ সালের মার্চে হাউস অব কমন্সে সরকারের চীননীতি নিন্দার প্রস্তাব পাস হয়। প্রধানমন্ত্রী পামারস্টন এরপর পার্লামেন্ট ভেঙে নির্বাচনের পথে যান এবং নির্বাচনে শক্তিশালী অবস্থান ফিরে পান। যুদ্ধ তাই ব্রিটেনের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত ছিল না; তার ন্যায্যতা দেশটির নিজস্ব রাজনীতিতেও তীব্রভাবে বিতর্কিত হয়েছিল।

ফ্রান্সের যোগদানের পেছনে ছিল আলাদা একটি ঘটনা। ১৮৫৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে গুয়াংসি প্রদেশে ফরাসি ক্যাথলিক মিশনারি অগুস্ত শাপদেলেন স্থানীয় কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হয়ে নিহত হন। তিনি চুক্তিবন্দরগুলোর বাইরে ধর্মপ্রচারে যুক্ত ছিলেন। চীনা কর্তৃপক্ষের কাছে তাঁর উপস্থিতি ও কার্যক্রম বেআইনি ছিল; ফ্রান্স বিষয়টিকে একজন ফরাসি ধর্মযাজকের ওপর অবৈধ নিপীড়ন হিসেবে উপস্থাপন করে। তাঁর মৃত্যু ফরাসি সামরিক হস্তক্ষেপের আনুষ্ঠানিক উপলক্ষ হয়ে ওঠে।

এখানেও চুক্তির সীমা গুরুত্বপূর্ণ। আগের ফরাসি-চীনা ব্যবস্থায় ক্যাথলিকদের কিছু সুরক্ষা মিলেছিল, কিন্তু তার অর্থ সমগ্র চীনে বিদেশি মিশনারিদের অবাধ প্রবেশাধিকার ছিল না। অন্যদিকে অনুমতিহীন উপস্থিতি একজন বন্দির প্রতি যেকোনো আচরণকে গ্রহণযোগ্য করে না। বিরোধটি আইনগত এখতিয়ার, ধর্মীয় সুরক্ষা এবং শাস্তির বৈধতা ঘিরে তৈরি হয়। তৃতীয় নেপোলিয়নের সরকার ক্যাথলিক স্বার্থের রক্ষক হিসেবে নিজের অবস্থান ও পূর্ব এশিয়ায় ফরাসি প্রভাব বাড়ানোর সুযোগও দেখতে পায়।

ফ্রান্স অ্যারো ঘটনার দিন ব্রিটেনের সঙ্গে আক্রমণে নামেনি। ব্রিটিশ সামরিক পদক্ষেপ শুরু হয় ১৮৫৬ সালে; ফরাসি অংশগ্রহণে বড় যৌথ অভিযান গড়ে ওঠে ১৮৫৭ সালে। ব্রিটিশ বিশেষ প্রতিনিধি লর্ড এলগিন এবং ফরাসি প্রতিনিধি ব্যারন গ্রো সহযোগিতা সংগঠিত করেন। মিশনারির মৃত্যু ও জাহাজের বিরোধ আলাদা ঘটনা হলেও চীনের কাছ থেকে আরও অধিকার আদায়ের লক্ষ্যে দুই শক্তির স্বার্থ এক হয়। এই কারণেই যুদ্ধটি অ্যাংলো-ফরাসি অভিযান নামেও পরিচিত।

১৮৫৭ সালের ভারতীয় বিদ্রোহ ব্রিটিশ প্রস্তুতিকে জটিল করে তোলে; চীনের জন্য নির্ধারিত কিছু সামরিক শক্তি ভারতে পাঠাতে হয়। তবু বছরের শেষে ব্রিটিশ-ফরাসি বাহিনী গুয়াংঝৌ আক্রমণ করে দখল করে এবং পরে ইয়ে মিংচেনকে বন্দি করে। স্থানীয় বিরোধ তখন আন্তর্জাতিক জোটের অভিযানে পরিণত হয়েছে। চীনের দক্ষিণে চাপ সৃষ্টি করে শুরু হওয়া যুদ্ধ এবার উত্তরে, চিং সরকারের কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের আরও কাছে নিয়ে যাওয়ার প্রস্তুতি চলে।

দ্বিতীয় আফিম যুদ্ধ নামটি তাই শুধু মাদক নিয়ে একটি লড়াই বোঝায় না। আফিমবাণিজ্য ছিল বৃহত্তর অর্থনৈতিক ব্যবস্থার গুরুত্বপূর্ণ অংশ; সঙ্গে ছিল বাজার সম্প্রসারণ, কূটনৈতিক প্রতিনিধিত্ব, ধর্মপ্রচার ও বিদেশিদের বিশেষ সুরক্ষার দাবি। অ্যারো ঘটনা সেই দাবিগুলোকে শক্তি দিয়ে এগিয়ে নেওয়ার উপলক্ষ দেয়। গুয়াংঝৌ দখলের পরেও বিদেশি প্রতিনিধিদের লক্ষ্য পূরণ হয়নি। এবার যুদ্ধজাহাজ উত্তর চীনের পথে এগোবে, আর চিং দরবারকে নতুন চুক্তির দাবি মোকাবিলা করতে হবে।