বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

আরব বিদ্রোহ ও সাইকস-পিকো চুক্তি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল?

Series: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ: রক্তক্ষয়ী সংঘাতের ইতিহাস ও বদলে যাওয়া পৃথিবী

  • Author: Admin
  • September 01, 2026
আরব বিদ্রোহ ও সাইকস-পিকো চুক্তি: প্রথম বিশ্বযুদ্ধ কীভাবে আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের মানচিত্র বদলে দিয়েছিল?
আরব বিদ্রোহ ও সাইকস-পিকো চুক্তি

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের আগে আজকের সিরিয়া, লেবানন, জর্ডান, ইসরায়েল, ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড এবং ইরাকের অধিকাংশই কোনো স্বাধীন আধুনিক রাষ্ট্র ছিল না। অঞ্চলগুলোর বড় অংশ কয়েক শতাব্দী ধরে অটোমান সাম্রাজ্যের শাসনের অধীনে ছিল। কিন্তু ১৯১৪ সালে অটোমানরা কেন্দ্রীয় শক্তির পক্ষে যুদ্ধে প্রবেশ করার পর মধ্যপ্রাচ্যও বৈশ্বিক সংঘাতের গুরুত্বপূর্ণ রণাঙ্গনে পরিণত হয়। ব্রিটেন অটোমান শাসনের বিরুদ্ধে আরবদের বিদ্রোহে উৎসাহিত করতে শুরু করে, একই সময়ে আবার ফ্রান্সের সঙ্গে গোপনে অটোমান ভূখণ্ডে নিজেদের ভবিষ্যৎ প্রভাবের এলাকা ভাগ করার পরিকল্পনা করে। একদিকে আরব স্বাধীনতার প্রত্যাশা, অন্যদিকে ব্রিটিশ-ফরাসি সাম্রাজ্যবাদী হিসাব—এই পরস্পরবিরোধী রাজনীতির মধ্যেই জন্ম নেয় আরব বিদ্রোহ ও সাইকস-পিকো চুক্তির ইতিহাস।

অটোমান সাম্রাজ্য বহু জাতিগোষ্ঠী ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের সমন্বয়ে গঠিত ছিল। আরবি ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী সাম্রাজ্যের সিরিয়া, মেসোপটেমিয়া, হেজাজ ও অন্যান্য অঞ্চলে বাস করত। উনিশ শতকের শেষভাগ ও বিশ শতকের শুরুতে কিছু আরব বুদ্ধিজীবী ও রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক স্বাতন্ত্র্যের ধারণা শক্তিশালী হতে থাকে। তবে যুদ্ধের আগে সমস্ত আরব জনগোষ্ঠী অটোমান শাসন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে একটি একক স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে ঐক্যবদ্ধ ছিল—এমন ধারণা সঠিক নয়। আরব রাজনীতি ছিল অঞ্চল, পরিবার, গোত্র, ধর্ম এবং রাজনৈতিক লক্ষ্য অনুযায়ী বহুমাত্রিক।

এই প্রেক্ষাপটে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠেন মক্কার শরিফ হুসেইন ইবনে আলী। হাশেমি পরিবারের সদস্য হুসেইন ইসলামের পবিত্র নগরী মক্কার শরিফ ও হেজাজের গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক নেতা ছিলেন। অটোমান সরকারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ক্রমে জটিল হয়ে উঠছিল। বিশেষ করে কমিটি অব ইউনিয়ন অ্যান্ড প্রগ্রেসের কেন্দ্রীকরণ নীতি এবং যুদ্ধকালীন পরিস্থিতি তাঁর উদ্বেগ বাড়ায়।

অন্যদিকে ব্রিটেনের জন্য মধ্যপ্রাচ্যের কৌশলগত গুরুত্ব ছিল বিশাল। সুয়েজ খাল ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের জন্য ভারত মহাসাগর ও এশিয়ার সঙ্গে যোগাযোগের প্রধান পথগুলোর একটি। অটোমানরা যদি মিশর ও সুয়েজকে হুমকির মুখে ফেলতে পারে, তাহলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যিক যোগাযোগ ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। ফলে অটোমানদের অভ্যন্তরে বিদ্রোহ সৃষ্টি করা ব্রিটেনের কাছে অত্যন্ত আকর্ষণীয় কৌশল হয়ে ওঠে।

১৯১৫ থেকে ১৯১৬ সালের মধ্যে শরিফ হুসেইন এবং মিশরে ব্রিটিশ হাইকমিশনার স্যার হেনরি ম্যাকমোহনের মধ্যে ধারাবাহিক গোপন পত্রালাপ হয়। এটি ইতিহাসে হুসেইন-ম্যাকমোহন পত্রালাপ নামে পরিচিত। হুসেইন একটি বৃহৎ স্বাধীন আরব রাষ্ট্রের স্বীকৃতি চেয়েছিলেন। ব্রিটেন নীতিগতভাবে আরব স্বাধীনতাকে সমর্থনের ইঙ্গিত দেয়, কিন্তু কোন অঞ্চল ভবিষ্যৎ আরব রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত হবে—সেই প্রশ্নে ব্যবহৃত ভাষা ছিল জটিল ও অস্পষ্ট।

বিশেষ করে ভূমধ্যসাগরীয় উপকূল ও সিরিয়ার কিছু অঞ্চলের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্যতিক্রমের ভাষা পরবর্তী সময়ে তীব্র বিতর্ক সৃষ্টি করে। আরব নেতৃত্ব ব্রিটিশ প্রতিশ্রুতিকে ব্যাপক স্বাধীনতার আশ্বাস হিসেবে দেখেছিল, অথচ ব্রিটিশ কূটনীতি একই সময়ে অন্য শক্তির কাছেও এমন প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, যেগুলো এই প্রত্যাশার সঙ্গে সংঘর্ষ তৈরি করেছিল।

এর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উদাহরণ ছিল সাইকস-পিকো চুক্তি। ব্রিটিশ কূটনীতিক স্যার মার্ক সাইকস এবং ফরাসি কূটনীতিক ফ্রাঁসোয়া জর্জ-পিকো অটোমান সাম্রাজ্যের আরব ভূখণ্ডের যুদ্ধোত্তর ভবিষ্যৎ নিয়ে গোপন আলোচনা করেন। রাশিয়ার সম্মতিসহ ১৯১৬ সালের মে মাসে এই গোপন সমঝোতা সম্পন্ন হয়।

চুক্তির ধারণা অনুযায়ী অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত হলে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন অঞ্চলে ব্রিটেন ও ফ্রান্সের সরাসরি নিয়ন্ত্রণ অথবা প্রভাব প্রতিষ্ঠিত হবে। ফ্রান্সের জন্য সিরিয়া ও লেবাননসংলগ্ন অঞ্চলে শক্তিশালী প্রভাবের ব্যবস্থা রাখা হয়। ব্রিটেনের জন্য মেসোপটেমিয়ার গুরুত্বপূর্ণ অংশ এবং দক্ষিণের এলাকায় প্রভাব নির্ধারণ করা হয়। মধ্যবর্তী কিছু অঞ্চলে আরব রাষ্ট্র বা আরব রাষ্ট্রসমূহের সম্ভাবনা রাখা হলেও সেগুলো ব্রিটিশ বা ফরাসি প্রভাবক্ষেত্রের সঙ্গে যুক্ত থাকার কথা ছিল। ফিলিস্তিনের জন্য আন্তর্জাতিক প্রশাসনের ধারণা বিবেচিত হয়েছিল।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, সাইকস-পিকো চুক্তির মানচিত্রকে আজকের মধ্যপ্রাচ্যের আন্তর্জাতিক সীমান্তের সরাসরি নকশা বলা অতিসরলীকরণ। চুক্তিটি ব্রিটেন ও ফ্রান্সের যুদ্ধকালীন প্রভাবক্ষেত্র ভাগ করার পরিকল্পনা ছিল; যুদ্ধের পরে এটি হুবহু বাস্তবায়িত হয়নি। পরবর্তী সামরিক দখল, সান রেমো সম্মেলন, ম্যান্ডেট ব্যবস্থা, স্থানীয় রাজনীতি এবং ব্রিটিশ-ফরাসি সমঝোতার মাধ্যমে আধুনিক রাষ্ট্রসীমা ধাপে ধাপে গড়ে ওঠে। তবু সাইকস-পিকো ইউরোপীয় শক্তিগুলো কীভাবে অটোমান-পরবর্তী অঞ্চলকে নিজেদের কৌশলগত স্বার্থে দেখছিল, তার শক্তিশালী প্রতীক হয়ে আছে।

এই গোপন আলোচনা চলার মধ্যেই ১৯১৬ সালের জুনে আরব বিদ্রোহ শুরু হয়। শরিফ হুসেইনের অনুসারীরা মক্কায় অটোমান কর্তৃত্বের বিরুদ্ধে অস্ত্র তুলে নেয়। মক্কা দ্রুত বিদ্রোহীদের নিয়ন্ত্রণে আসে। জেদ্দাসহ হেজাজের আরও কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ স্থানও অটোমানদের হাতছাড়া হয়। কিন্তু মদিনায় অটোমান প্রতিরোধ অনেক বেশি শক্তিশালী ছিল।

মদিনার প্রতিরক্ষায় ফাখরি পাশা দীর্ঘ সময় দৃঢ় অবস্থান ধরে রাখেন। শহরটির সঙ্গে অটোমান সাম্রাজ্যের যোগাযোগের প্রধান মাধ্যম ছিল হেজাজ রেলপথ, যা দামেস্ক থেকে দক্ষিণে মদিনার দিকে নেমে এসেছিল। এই রেলপথ অটোমান সৈন্য, খাদ্য, অস্ত্র ও গোলাবারুদ পরিবহনের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ছিল।

ফলে আরব বিদ্রোহীদের অন্যতম কার্যকর কৌশল হয়ে ওঠে রেলপথে আঘাত করা। সরাসরি শক্তিশালী অটোমান দুর্গ আক্রমণের বদলে ছোট দল রেললাইন, সেতু, ট্রেন ও টেলিগ্রাফ ব্যবস্থায় হামলা চালাত। এতে অটোমানদের বিপুলসংখ্যক সৈন্য রেলপথ পাহারা ও মেরামতে ব্যস্ত রাখতে হতো। একটি রেললাইন সম্পূর্ণ স্থায়ীভাবে ধ্বংস না করেও বারবার ক্ষতিগ্রস্ত করে শত্রুর জনশক্তি ও সরবরাহব্যবস্থার ওপর দীর্ঘমেয়াদি চাপ সৃষ্টি করা সম্ভব হয়েছিল।

আরব বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নেতা ছিলেন শরিফ হুসেইনের পুত্র ফয়সাল ইবনে হুসেইন। তাঁর বাহিনীর সঙ্গে ব্রিটিশ সামরিক মিশনের কর্মকর্তারাও কাজ করতেন। তাদের মধ্যে সবচেয়ে বিখ্যাত হয়ে ওঠেন টি. ই. লরেন্স, যিনি পরে ‘লরেন্স অব অ্যারাবিয়া’ নামে জনপ্রিয় সংস্কৃতিতে কিংবদন্তি মর্যাদা পান।

তবে আরব বিদ্রোহকে শুধুমাত্র লরেন্সের ব্যক্তিগত অভিযান হিসেবে দেখা ইতিহাসকে বিকৃত করে। বিদ্রোহের নেতৃত্ব, যোদ্ধা, গোয়েন্দা যোগাযোগ ও স্থানীয় রাজনৈতিক সমর্থনের কেন্দ্রে ছিল আরবরাই। ব্রিটিশরা অর্থ, অস্ত্র, বিস্ফোরক, সামরিক উপদেষ্টা এবং কিছু ক্ষেত্রে নৌ ও বিমান সহায়তা দিয়েছিল। লরেন্স গুরুত্বপূর্ণ সংযোগকারী ও উপদেষ্টা ছিলেন, কিন্তু আরব বিদ্রোহ তাঁর সৃষ্টি ছিল না।

১৯১৭ সালে বিদ্রোহের একটি বড় সাফল্য আসে আকাবা দখলের মাধ্যমে। লোহিত সাগরের উত্তর প্রান্তে অবস্থিত আকাবা কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দর ছিল। সমুদ্রের দিক থেকে এর অটোমান প্রতিরক্ষা শক্তিশালী হলেও মরুভূমির দিক তুলনামূলকভাবে কম সুরক্ষিত ছিল। আরব বাহিনী দুর্গম মরুভূমি অতিক্রম করে স্থলপথে অগ্রসর হয়ে জুলাই ১৯১৭-তে আকাবা দখল করে।

আকাবা দখলের পর আরব বিদ্রোহ ব্রিটিশদের বৃহত্তর প্যালেস্টাইন অভিযানের সঙ্গে আরও কার্যকরভাবে যুক্ত হয়। মিশর থেকে ব্রিটিশ বাহিনী উত্তরদিকে অগ্রসর হচ্ছিল। জেনারেল এডমন্ড অ্যালেনবির নেতৃত্বে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের বাহিনী ১৯১৭ সালের শেষ দিকে গাজা অঞ্চলের অটোমান প্রতিরক্ষা ভেঙে দেয় এবং ডিসেম্বরে জেরুজালেম দখল করে।

এদিকে আরব বাহিনী অটোমান যোগাযোগব্যবস্থার ওপর হামলা চালিয়ে যেতে থাকে এবং ধীরে ধীরে উত্তরদিকে অগ্রসর হয়। ১৯১৮ সালে অ্যালেনবির বাহিনী মেগিডোর যুদ্ধে অটোমান সেনাবাহিনীকে গুরুতরভাবে পরাজিত করলে পুরো সিরিয়া ফ্রন্ট দ্রুত ভেঙে পড়ে। আরব বাহিনীও এই অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক ভূমিকা পালন করে।

১৯১৮ সালের অক্টোবরের শুরুতে দামেস্ক অটোমান নিয়ন্ত্রণ থেকে বেরিয়ে যায়। ফয়সালের আরব বাহিনী শহরে প্রবেশ করে এবং সেখানে একটি আরব প্রশাসন গড়ে তোলার চেষ্টা শুরু হয়। আরব জাতীয়তাবাদীদের কাছে মনে হচ্ছিল, বহু প্রতীক্ষিত স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মুহূর্ত এসে গেছে।

কিন্তু যুদ্ধের সময়কার গোপন কূটনীতি তখন সামনে আসতে শুরু করেছে। ১৯১৭ সালের রুশ বিপ্লবের পর বলশেভিকরা জার সরকারের গোপন কূটনৈতিক নথি প্রকাশ করে। এর মাধ্যমে সাইকস-পিকো চুক্তির অস্তিত্ব প্রকাশ্যে আসে। আরবদের কাছে এটি ছিল গভীর হতাশার কারণ, কারণ ব্রিটেন একদিকে স্বাধীনতার প্রত্যাশা সৃষ্টি করেছিল, অন্যদিকে ফ্রান্সের সঙ্গে অঞ্চল ভাগাভাগির পরিকল্পনাও করেছিল।

জটিলতা আরও বাড়ায় ১৯১৭ সালের বেলফোর ঘোষণা। ব্রিটিশ সরকার ফিলিস্তিনে ইহুদি জনগণের জন্য একটি ‘জাতীয় আবাস’ প্রতিষ্ঠার পক্ষে সমর্থন জানায়, একই সঙ্গে সেখানে বিদ্যমান অ-ইহুদি সম্প্রদায়ের নাগরিক ও ধর্মীয় অধিকার ক্ষুণ্ণ না করার কথাও বলে। ফলে একই ভূখণ্ডের ভবিষ্যৎ নিয়ে ব্রিটিশ নীতির একাধিক স্তর তৈরি হয়, যা পরবর্তী দশকগুলোতে আরও গুরুতর রাজনৈতিক সংঘাতের ভিত্তি হয়ে ওঠে।

যুদ্ধ শেষে অটোমান সাম্রাজ্যের আরব প্রদেশগুলোর ভবিষ্যৎ নির্ধারণের প্রশ্ন সামনে আসে। ফয়সাল সিরিয়াকে কেন্দ্র করে একটি স্বাধীন আরব রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। ১৯২০ সালের মার্চে দামেস্কে তাঁকে সিরিয়ার রাজা ঘোষণা করা হয়। কিন্তু ফ্রান্স সিরিয়ায় নিজের ম্যান্ডেট ও প্রভাব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেনি।

১৯২০ সালের জুলাইয়ে মাইসালুনের যুদ্ধে ফরাসি বাহিনী সিরীয় প্রতিরোধকে পরাজিত করে এবং দামেস্ক দখল করে। ফয়সালের সিরীয় রাজত্বের অবসান ঘটে। পরে ব্রিটিশদের সমর্থনে তিনি ইরাকের রাজা হন। তাঁর ভাই আবদুল্লাহ ট্রান্সজর্ডানে শাসক হন। এভাবেই হাশেমি পরিবার আরব বিদ্রোহের পর মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ধরে রাখে, যদিও হুসেইনের প্রত্যাশিত বৃহৎ স্বাধীন আরব রাষ্ট্র বাস্তবায়িত হয়নি।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর লীগ অব নেশনসের ম্যান্ডেট ব্যবস্থা মধ্যপ্রাচ্যের নতুন রাজনৈতিক কাঠামোকে আনুষ্ঠানিক রূপ দেয়। ফ্রান্স সিরিয়া ও লেবাননের ওপর ম্যান্ডেট পায়। ব্রিটেন পায় মেসোপটেমিয়া বা ইরাক এবং প্যালেস্টাইনের ম্যান্ডেট। পরে জর্ডান নদীর পূর্বের অঞ্চল ট্রান্সজর্ডান হিসেবে পৃথক প্রশাসনিক কাঠামো লাভ করে।

এখানে একটি বহুল প্রচলিত ভুল ধারণা এড়ানো জরুরি। আজকের ইরাক, সিরিয়া, জর্ডান, লেবানন, ইসরায়েল ও ফিলিস্তিনি ভূখণ্ডের সীমান্ত শুধু সাইকস-পিকো চুক্তির মানচিত্রে একবার কলম দিয়ে টেনে দেওয়া হয়নি। সীমান্তগুলো বিভিন্ন সময়ে যুদ্ধ, ম্যান্ডেট প্রশাসন, ব্রিটিশ-ফরাসি আলোচনা, আন্তর্জাতিক সিদ্ধান্ত এবং স্থানীয় রাজনৈতিক বাস্তবতার মধ্য দিয়ে পরিবর্তিত ও নির্ধারিত হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, মসুলের ভবিষ্যৎ নিয়ে যুদ্ধের পরও বিরোধ চলেছিল এবং শেষ পর্যন্ত সেটি ইরাকের অন্তর্ভুক্ত হয়।

তবু সাইকস-পিকোর ঐতিহাসিক গুরুত্ব কম নয়। এটি দেখিয়েছিল যে ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদী শক্তিগুলো অটোমান সাম্রাজ্যের সম্ভাব্য পতনকে স্থানীয় জনগণের আত্মনিয়ন্ত্রণের প্রশ্নের পাশাপাশি নিজেদের সামরিক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থের দৃষ্টিতেও দেখছিল। ভূমধ্যসাগরের বন্দর, মেসোপটেমিয়ার পথ, পারস্য উপসাগরের প্রবেশাধিকার, ভারতগামী যোগাযোগ এবং পরে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠা তেল—সবকিছুই এই হিসাবের অংশ ছিল।

আরব বিদ্রোহের সামরিক গুরুত্ব নিয়েও ভারসাম্যপূর্ণ মূল্যায়ন প্রয়োজন। বিদ্রোহ একাই অটোমান সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেনি। প্যালেস্টাইন ও সিরিয়ায় ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের নিয়মিত বাহিনীর অভিযান ছিল অটোমান পরাজয়ের প্রধান সামরিক উপাদানগুলোর একটি। কিন্তু আরব বাহিনী হেজাজে অটোমান সৈন্য আটকে রেখেছিল, রেল যোগাযোগে ক্রমাগত আঘাত করেছিল এবং ১৯১৮ সালের অগ্রযাত্রায় গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা দিয়েছিল। রাজনৈতিকভাবে এর প্রভাব আরও গভীর ছিল, কারণ এটি যুদ্ধোত্তর আরব জাতীয়তাবাদের একটি শক্তিশালী প্রতীকে পরিণত হয়।

এই পুরো অধ্যায়ের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উত্তরাধিকার সম্ভবত যুদ্ধকালীন পরস্পরবিরোধী প্রতিশ্রুতি ও প্রত্যাশা। হুসেইন-ম্যাকমোহন পত্রালাপ, সাইকস-পিকো চুক্তি এবং বেলফোর ঘোষণা একই সময়পর্বে ব্রিটিশ মধ্যপ্রাচ্য নীতির ভিন্ন ভিন্ন দিক তুলে ধরে। এগুলোর সুনির্দিষ্ট আইনগত ও ভৌগোলিক ব্যাখ্যা নিয়ে পরবর্তী সময়ে তীব্র বিতর্ক হয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক ফল ছিল স্পষ্ট—যুদ্ধের পরে বিভিন্ন জনগোষ্ঠী নিজেদের প্রত্যাশা পূরণ না হওয়ার অনুভূতি নিয়ে নতুন ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়।

প্রথম বিশ্বযুদ্ধ তাই মধ্যপ্রাচ্যে শুধু অটোমান শাসনের অবসান ঘটায়নি; এটি একটি সম্পূর্ণ নতুন রাজনৈতিক যুগের সূচনা করেছিল। শতাব্দীপ্রাচীন সাম্রাজ্যিক প্রদেশগুলোর জায়গায় ধীরে ধীরে নতুন রাষ্ট্র, ম্যান্ডেট ও সীমান্ত তৈরি হয়। আরব জাতীয়তাবাদ, ইউরোপীয় সাম্রাজ্যবাদ, জায়নবাদ, স্থানীয় পরিচয় এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর কৌশলগত স্বার্থ একই ভূখণ্ডে পরস্পরের মুখোমুখি হতে শুরু করে।

আরব বিদ্রোহের যোদ্ধারা যখন হেজাজ রেলপথে আঘাত করছিল এবং স্বাধীনতার আশায় দামেস্কের দিকে অগ্রসর হচ্ছিল, তখন লন্ডন ও প্যারিসের কূটনীতিকেরা একই অঞ্চলের যুদ্ধোত্তর ভবিষ্যৎ নিয়ে নিজেদের হিসাব কষছিলেন। এই দ্বৈত বাস্তবতাই আরব বিদ্রোহ ও সাইকস-পিকো চুক্তির ইতিহাসকে এত গুরুত্বপূর্ণ করে তোলে। আধুনিক মধ্যপ্রাচ্যের প্রতিটি সীমান্ত সরাসরি সাইকস-পিকো থেকে সৃষ্টি না হলেও, প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় নেওয়া এসব সিদ্ধান্ত অটোমান-পরবর্তী রাজনৈতিক ব্যবস্থা নির্মাণের পথ খুলে দিয়েছিল—এবং সেই ব্যবস্থার বহু প্রশ্ন, বিরোধ ও উত্তরাধিকার আজও মধ্যপ্রাচ্যের ইতিহাস বোঝার ক্ষেত্রে অপরিহার্য।


You may also like