বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট: মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অদৃশ্য করার গল্পের পেছনে আসল সত্য কী?

  • Author: Admin
  • September 01, 2026
ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট: মার্কিন যুদ্ধজাহাজ অদৃশ্য করার গল্পের পেছনে আসল সত্য কী?
ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের রহস্য ও বাস্তব ইতিহাস

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের গল্প আধুনিক যুগের সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী সামরিক রহস্যগুলোর একটি। প্রচলিত কাহিনি অনুযায়ী, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মাঝামাঝি সময়ে মার্কিন নৌবাহিনী এমন এক গোপন পরীক্ষা চালিয়েছিল, যার উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে একটি যুদ্ধজাহাজকে শত্রুর চোখ ও রাডার থেকে অদৃশ্য করে দেওয়া। পরীক্ষার সময় জাহাজটি নাকি অস্বাভাবিক সবুজ কুয়াশায় ঢেকে যায়, এরপর মুহূর্তের মধ্যে সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে শত শত কিলোমিটার দূরের আরেক বন্দরে উপস্থিত হয়। কিছুক্ষণ পর সেটি আবার আগের জায়গায় ফিরে আসে। আরও ভয়াবহ দাবি হলো, এই ঘটনার ফলে জাহাজের নাবিকদের কেউ উন্মাদ হয়ে গিয়েছিলেন, কেউ অদৃশ্য হয়েছিলেন, এমনকি কারও শরীর নাকি জাহাজের ধাতব কাঠামোর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল।

গল্পটি এতটাই নাটকীয় যে কয়েক দশক ধরে অসংখ্য বই, চলচ্চিত্র, প্রামাণ্যচিত্র এবং ষড়যন্ত্রতত্ত্বে এটি ফিরে এসেছে। কিন্তু বিস্ময়কর বিষয় হলো, কথিত পরীক্ষাটি ঘটেছিল বলে যে সময়ের কথা বলা হয়, সেই সময়কার নির্ভরযোগ্য নথিতে এমন কোনো ঘটনার প্রমাণ পাওয়া যায় না। বরং ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের উৎপত্তির ইতিহাস অনুসরণ করলে দেখা যায়, বহুল প্রচলিত গল্পটি ঘটনার সময় প্রকাশিত কোনো প্রত্যক্ষ সামরিক প্রতিবেদনের ওপর দাঁড়িয়ে নেই। এর পরিচিত রূপটি তৈরি হয় অনেক পরে এবং তার কেন্দ্রে ছিলেন রহস্যময় এক ব্যক্তি—কার্লোস মিগুয়েল অ্যালেন্ডে, যিনি কার্ল অ্যালেন নামেও পরিচিত ছিলেন।

প্রচলিত কাহিনির কেন্দ্রীয় জাহাজটির নাম ইউএসএস এলড্রিজ। এটি ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নির্মিত মার্কিন নৌবাহিনীর একটি ডেস্ট্রয়ার এসকর্ট। এই শ্রেণির জাহাজের প্রধান কাজ ছিল বড় জাহাজ ও বাণিজ্যিক বহরকে সাবমেরিন এবং বিমান হামলা থেকে রক্ষা করা। এলড্রিজকে ঘিরেই পরবর্তী সময়ে দাবি করা হয় যে ১৯৪৩ সালের ২৮ অক্টোবর ফিলাডেলফিয়ার নৌঘাঁটিতে একটি অতি গোপন পরীক্ষা চালানো হয়েছিল।

কাহিনির বহুল প্রচারিত সংস্করণ অনুযায়ী, জাহাজটির চারপাশে অত্যন্ত শক্তিশালী তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র তৈরির জন্য বিশেষ ধরনের যন্ত্র বসানো হয়েছিল। পরীক্ষা শুরু হওয়ার পর জাহাজটির চারপাশে সবুজ বা নীলচে-সবুজ কুয়াশা তৈরি হয়। ধীরে ধীরে জাহাজটি দৃশ্যমানতা হারিয়ে ফেলে এবং শেষ পর্যন্ত সম্পূর্ণ অদৃশ্য হয়ে যায়। এখানেই গল্প শেষ নয়। দাবি করা হয়, এলড্রিজ একই সময়ে ভার্জিনিয়ার নরফোক এলাকায় দেখা গিয়েছিল এবং কিছুক্ষণ পর আবার ফিলাডেলফিয়ায় ফিরে এসেছিল।

অর্থাৎ গল্পটিকে সত্য ধরে নিলে এটি শুধু অদৃশ্য হওয়ার পরীক্ষা ছিল না; কোনোভাবে একটি সম্পূর্ণ যুদ্ধজাহাজকে এক স্থান থেকে অন্য স্থানে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করার ঘটনাও ঘটেছিল। এখান থেকেই ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের সঙ্গে টেলিপোর্টেশন, স্থান-কালের বিকৃতি এবং এমনকি আইনস্টাইনের অসমাপ্ত তত্ত্ব সম্পর্কিত নানা ধারণা যুক্ত হতে থাকে।

সবচেয়ে ভয়ংকর অংশটি অবশ্য নাবিকদের নিয়ে। পরবর্তী বিভিন্ন বর্ণনায় দাবি করা হয়, পরীক্ষার সময় জাহাজে থাকা নাবিকদের ওপর মারাত্মক প্রভাব পড়েছিল। কেউ প্রচণ্ড বমি ও মাথা ঘোরায় আক্রান্ত হন, কেউ মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেন, আবার কেউ নাকি হঠাৎ অদৃশ্য হয়ে পরে ফিরে আসতেন। আরও চাঞ্চল্যকর সংস্করণে বলা হয়, টেলিপোর্টেশনের সময় জাহাজের ধাতব কাঠামো এবং মানুষের শরীরের অবস্থান যেন এলোমেলো হয়ে যায়। ফলে কয়েকজন নাবিকের শরীর জাহাজের ইস্পাতের দেয়াল বা ডেকের সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই মিশে যায়।

সমস্যা হলো, এই ভয়াবহ বিবরণগুলোর পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য সমসাময়িক প্রমাণ নেই। কোনো নির্ভরযোগ্য চিকিৎসা প্রতিবেদন, প্রত্যক্ষ সামরিক নথি কিংবা যাচাইযোগ্য আলোকচিত্র এমন ঘটনার সত্যতা প্রতিষ্ঠা করে না। বরং গল্পটির উৎস অনুসন্ধান করলে বোঝা যায়, এর অনেক নাটকীয় উপাদান বহু বছর পরে যোগ হয়েছে।

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের কিংবদন্তি ব্যাপক পরিচিতি পেতে শুরু করে মূলত পঞ্চাশের দশকে। সেই সময় মরিস কে. জেসাপ নামের একজন লেখক অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু এবং অস্বাভাবিক আকাশীয় ঘটনা নিয়ে লিখছিলেন। তাঁর একটি বই প্রকাশের পর কার্লোস মিগুয়েল অ্যালেন্ডে নামে এক ব্যক্তি তাঁকে কয়েকটি চিঠি পাঠান। অ্যালেন্ডে দাবি করেন, তিনি এমন একটি গোপন মার্কিন নৌপরীক্ষা সম্পর্কে জানেন, যেখানে একটি জাহাজকে অদৃশ্য করে দেওয়া হয়েছিল।

অ্যালেন্ডে আরও দাবি করেছিলেন, তিনি নিজেই কাছাকাছি আরেকটি জাহাজ থেকে ঘটনার কিছু অংশ প্রত্যক্ষ করেছিলেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মার্কিন নৌবাহিনী শক্তিশালী তড়িৎচুম্বকীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এমন কিছু অর্জন করেছিল, যা সাধারণ বিজ্ঞানের ধারণাকে অতিক্রম করে যায়। এই চিঠিগুলোই পরবর্তী ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট কিংবদন্তির অন্যতম প্রধান ভিত্তি হয়ে ওঠে।

অ্যালেন্ডের দাবির বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে অবশ্য শুরু থেকেই গুরুতর প্রশ্ন ছিল। তাঁর বক্তব্য ছিল অসংলগ্ন এবং অনেক ক্ষেত্রেই যাচাই করা কঠিন। তিনি যেসব বৈজ্ঞানিক ধারণার কথা বলেছিলেন, সেগুলোর সঙ্গে প্রতিষ্ঠিত পদার্থবিজ্ঞানের সম্পর্কও ছিল অত্যন্ত দুর্বল। তা সত্ত্বেও তাঁর চিঠির গল্পটি দ্রুত রহস্যপ্রেমীদের আকৃষ্ট করে।

এই কিংবদন্তিকে আরও রহস্যময় করে তোলে জেসাপের বইয়ের একটি অদ্ভুত কপি। বইটির পাতার প্রান্তে বিভিন্ন রঙের কালিতে রহস্যময় মন্তব্য লেখা ছিল। মন্তব্যগুলোতে অজ্ঞাত উড়ন্ত বস্তু, উন্নত প্রযুক্তি এবং অস্বাভাবিক বৈজ্ঞানিক ধারণা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছিল। মার্কিন নৌবাহিনীর গবেষণাসংশ্লিষ্ট একটি দপ্তরের কয়েকজন কর্মকর্তা বইটির প্রতি আগ্রহ দেখান এবং সীমিত সংখ্যায় এর অনুলিপি তৈরি করা হয়। পরবর্তী সময়ে এই ঘটনাটিকেই অনেক ষড়যন্ত্রতাত্ত্বিক এমনভাবে উপস্থাপন করেন যেন নৌবাহিনী ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের সত্যতা গোপনে স্বীকার করেছিল। বাস্তবে কোনো অদ্ভুত দাবির প্রতি সামরিক গবেষকদের কৌতূহল থাকা এবং সেই দাবি সত্য বলে সরকারি স্বীকৃতি দেওয়া এক বিষয় নয়।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—এমন গল্প তৈরি হওয়ার মতো বাস্তব কোনো সামরিক প্রযুক্তি কি তখন ছিল? উত্তর হলো, ছিল। তবে সেটি জাহাজকে মানুষের চোখ থেকে অদৃশ্য করার প্রযুক্তি ছিল না।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় নৌযুদ্ধের একটি গুরুতর বিপদ ছিল চৌম্বকীয় মাইন। কোনো জাহাজের ইস্পাত কাঠামোর কারণে আশপাশের চৌম্বকীয় ক্ষেত্রে পরিবর্তন ঘটলে বিশেষ ধরনের মাইন সেই পরিবর্তন শনাক্ত করে বিস্ফোরিত হতে পারত। এই ঝুঁকি কমানোর জন্য যুদ্ধজাহাজে চৌম্বকীয় প্রভাব হ্রাসের ব্যবস্থা ব্যবহার করা হতো। জাহাজের চারপাশে বৈদ্যুতিক তার স্থাপন করে নিয়ন্ত্রিত বিদ্যুৎপ্রবাহের মাধ্যমে জাহাজের সামগ্রিক চৌম্বকীয় স্বাক্ষর কমানো সম্ভব ছিল।

এ ধরনের ব্যবস্থা দূর থেকে দেখলে রহস্যময় মনে হওয়া অস্বাভাবিক নয়। একটি যুদ্ধজাহাজের চারপাশে মোটা বৈদ্যুতিক তার, শক্তিশালী বৈদ্যুতিক সরঞ্জাম এবং চৌম্বকত্ব নিয়ন্ত্রণের পরীক্ষা—এসব সম্পর্কে অসম্পূর্ণ তথ্য কারও কাছে পৌঁছালে সেখান থেকে সহজেই ‘তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্র ব্যবহার করে জাহাজ অদৃশ্য করার পরীক্ষা’র গল্প তৈরি হতে পারে।

এখানে ‘অদৃশ্য’ শব্দটিও বিভ্রান্তির উৎস হতে পারে। সামরিক প্রযুক্তিতে কোনো বস্তু বা যানকে নির্দিষ্ট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা থেকে কম দৃশ্যমান করার ধারণা নতুন নয়। একটি জাহাজকে চৌম্বকীয় মাইনের কাছে কম শনাক্তযোগ্য করে তোলা মানে মানুষের চোখ থেকে সেটিকে অদৃশ্য করে দেওয়া নয়। একইভাবে আধুনিক স্টেলথ প্রযুক্তি কোনো বিমানকে আক্ষরিক অর্থে চোখের সামনে অদৃশ্য করে না; বরং রাডারে তার শনাক্ত হওয়ার সম্ভাবনা কমায়।

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের গল্পে সম্ভবত এই ধারণাগুলো একসময় পরস্পরের সঙ্গে মিশে যায়। চৌম্বকীয় স্বাক্ষর কমানো থেকে রাডারে অদৃশ্য হওয়া, রাডার থেকে অদৃশ্য হওয়া থেকে দৃশ্যমান আলোতে অদৃশ্য হওয়া এবং সেখান থেকে সম্পূর্ণ জাহাজ টেলিপোর্ট হয়ে যাওয়া—কিংবদন্তির বিবর্তনে ধাপে ধাপে এমন নাটকীয় সম্প্রসারণ দেখা যায়।

ইউএসএস এলড্রিজের ইতিহাসও কিংবদন্তিটির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ সূত্র দেয়। জাহাজটির কার্যক্রমের যে নথি ও সময়রেখা নিয়ে গবেষণা হয়েছে, তা প্রচলিত গল্পের সঙ্গে সহজে মেলে না। কথিত পরীক্ষার সময় জাহাজটি ফিলাডেলফিয়ায় ছিল কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন। এলড্রিজের সাবেক নাবিকদের বক্তব্যেও এমন কোনো অদৃশ্য হওয়া বা টেলিপোর্টেশনের ঘটনার সমর্থন পাওয়া যায়নি।

এমনকি ফিলাডেলফিয়া থেকে নরফোক পর্যন্ত হঠাৎ জাহাজ চলে যাওয়ার গল্পের পেছনেও একটি তুলনামূলক সাধারণ ব্যাখ্যা প্রস্তাব করা হয়েছে। সে সময় পূর্ব উপকূলের বিভিন্ন জলপথ এবং খালের মাধ্যমে কিছু নৌযানের যাত্রার সময় সাধারণ পর্যবেক্ষকের ধারণার তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম হতে পারত। ফলে কোনো জাহাজকে এক জায়গায় দেখার পর প্রত্যাশার চেয়ে দ্রুত অন্য জায়গায় দেখা গেলে সেটি সম্পর্কে অতিরঞ্জিত গল্প তৈরি হওয়ার সুযোগ ছিল।

আরেকটি আকর্ষণীয় বিষয় হলো, ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টকে পরে আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যুক্ত করা হয়। দাবি করা হয়, তাঁর কথিত ‘একীভূত ক্ষেত্র তত্ত্ব’ ব্যবহার করেই নাকি জাহাজটির চারপাশে আলো বাঁকিয়ে তাকে অদৃশ্য করা হয়েছিল। কিন্তু এই দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক ভিত্তি নেই। আইনস্টাইন প্রকৃতপক্ষে মহাকর্ষ ও তড়িৎচুম্বকত্বকে একটি একক তাত্ত্বিক কাঠামোর মধ্যে ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করেছিলেন। কিন্তু তাঁর সেই গবেষণা থেকে যুদ্ধজাহাজ অদৃশ্য করা বা টেলিপোর্ট করার কার্যকর প্রযুক্তি তৈরি হয়েছিল—এমন কোনো গ্রহণযোগ্য প্রমাণ নেই।

পদার্থবিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকেও প্রচলিত গল্পটি গুরুতর সমস্যায় পড়ে। কোনো বড় বস্তুকে মানুষের চোখ থেকে অদৃশ্য করতে হলে তার ওপর পড়া দৃশ্যমান আলোকে এমনভাবে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে যেন আলো বস্তুটির চারপাশ দিয়ে ঘুরে গিয়ে পর্যবেক্ষকের চোখে ঠিক পেছনের দৃশ্যের তথ্য পৌঁছে দেয়। আধুনিক যুগে বিশেষ উপাদান ও ক্ষুদ্র পরিসরের পরীক্ষায় আলো নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ গবেষণা হয়েছে, কিন্তু দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি পূর্ণাঙ্গ যুদ্ধজাহাজকে চারদিক থেকে দৃশ্যমান আলোতে অদৃশ্য করে দেওয়ার দাবি সম্পূর্ণ ভিন্ন মাত্রার।

আর টেলিপোর্টেশনের দাবি আরও বড় সমস্যা সৃষ্টি করে। একটি যুদ্ধজাহাজ মানে শুধু হাজার হাজার টন ধাতু নয়; এর মধ্যে রয়েছে মানুষ, জ্বালানি, অস্ত্র, যন্ত্রপাতি, বৈদ্যুতিক ব্যবস্থা এবং অসংখ্য জটিল উপাদান। এমন একটি সম্পূর্ণ ব্যবস্থাকে মুহূর্তের মধ্যে শত শত কিলোমিটার দূরে স্থানান্তর করে আবার ফিরিয়ে আনার কোনো পরিচিত প্রযুক্তি ১৯৪৩ সালে ছিল—এমন প্রমাণ নেই।

তবু প্রশ্ন থেকে যায়, এত দুর্বল প্রমাণের একটি গল্প এত জনপ্রিয় হলো কেন? এর উত্তর খুঁজতে হলে সময়কালটি বুঝতে হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ এবং পরবর্তী শীতল যুদ্ধের সময় সামরিক গবেষণার বিশাল অংশ সাধারণ মানুষের কাছ থেকে গোপন রাখা হতো। রাডার, সংকেত গোয়েন্দাগিরি, পারমাণবিক অস্ত্র, ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিভিন্ন বৈদ্যুতিক ও চৌম্বকীয় প্রযুক্তিতে এমন সব অগ্রগতি হচ্ছিল, যা সাধারণ মানুষের কাছে প্রায় কল্পবিজ্ঞানের মতো মনে হতে পারত।

ফলে কোনো রহস্যময় সামরিক পরীক্ষার গল্প মানুষের কাছে একেবারে অসম্ভব বলে মনে হয়নি। এর সঙ্গে যখন গোপন নথি, অজ্ঞাত সাক্ষী, অদ্ভুত চিঠি, আইনস্টাইনের নাম এবং যুদ্ধকালীন নৌবাহিনী যুক্ত হলো, তখন গল্পটি আরও আকর্ষণীয় হয়ে উঠল। পরবর্তী বই ও চলচ্চিত্র এটিকে আরও নাটকীয় করে তুলেছে। এক সংস্করণ থেকে অন্য সংস্করণে যেতে যেতে নতুন নতুন উপাদান যোগ হয়েছে—টেলিপোর্টেশন, সময়ভ্রমণ, মানসিক নিয়ন্ত্রণ, ভিনগ্রহের প্রযুক্তি এবং গোপন সরকারি প্রকল্প।

ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা সম্ভবত এখানেই। একটি কিংবদন্তির ভেতরে বাস্তব ইতিহাসের কিছু অংশ থাকা মানেই পুরো গল্পটি সত্য নয়। ইউএসএস এলড্রিজ সত্যিকারের জাহাজ ছিল। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় মার্কিন নৌবাহিনী গোপন প্রযুক্তি নিয়ে কাজ করেছিল। জাহাজের চৌম্বকীয় স্বাক্ষর কমানোর প্রযুক্তিও বাস্তব ছিল। কার্লোস অ্যালেন্ডে সত্যিই জেসাপকে অদ্ভুত দাবি-সংবলিত চিঠি লিখেছিলেন। কিন্তু এসব সত্য ঘটনা একত্র করলেই যুদ্ধজাহাজ অদৃশ্য বা টেলিপোর্ট করার প্রমাণ তৈরি হয় না।

বরং পাওয়া তথ্যগুলো থেকে অনেক বেশি গ্রহণযোগ্য চিত্র হলো—বাস্তব নৌপ্রযুক্তি, যুদ্ধকালীন গোপনীয়তা, ভুল ব্যাখ্যা, একজন বিতর্কিত দাবিদারের গল্প এবং পরবর্তী কয়েক দশকের জনপ্রিয় সংস্কৃতি একসঙ্গে মিশে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টের কিংবদন্তি তৈরি করেছে। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে গল্পটি এতবার পুনর্কথিত হয়েছে যে কোন অংশটি প্রথম দিকের দাবি এবং কোন অংশটি পরে যোগ হওয়া অলংকরণ, সেটিও সাধারণ পাঠকের কাছে আলাদা করা কঠিন হয়ে পড়েছে।

আজ পর্যন্ত এমন কোনো নির্ভরযোগ্য প্রমাণ সামনে আসেনি যা দেখায় যে ১৯৪৩ সালে মার্কিন নৌবাহিনী ইউএসএস এলড্রিজকে দৃশ্যমান আলোতে অদৃশ্য করেছিল, ফিলাডেলফিয়া থেকে নরফোকে তাৎক্ষণিকভাবে স্থানান্তর করেছিল কিংবা নাবিকদের শরীর জাহাজের ধাতুর সঙ্গে মিশে গিয়েছিল। ঐতিহাসিক ও বৈজ্ঞানিক বিচারে ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টকে বাস্তব গোপন পরীক্ষার প্রমাণিত ইতিহাসের চেয়ে আধুনিক সামরিক কিংবদন্তি হিসেবেই দেখা অধিক যুক্তিসঙ্গত।

তবে সেই সিদ্ধান্ত গল্পটির গুরুত্ব কমায় না। বরং ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্ট দেখায়, বাস্তব প্রযুক্তির একটি অস্পষ্ট ধারণা কীভাবে গোপনীয়তার পরিবেশে জন্ম নিয়ে কয়েক দশকের মধ্যে বিশাল ষড়যন্ত্রতত্ত্বে পরিণত হতে পারে। চৌম্বকীয় মাইন থেকে যুদ্ধজাহাজকে রক্ষার বাস্তব প্রযুক্তি একসময় মানুষের কল্পনায় এমন এক পরীক্ষায় রূপ নেয়, যেখানে জাহাজ অদৃশ্য হয়, মুহূর্তে শত শত কিলোমিটার পাড়ি দেয় এবং মানুষ ও ধাতুর সীমানাই যেন বিলীন হয়ে যায়। আর সম্ভবত এই বাস্তবতা ও কল্পনার অস্পষ্ট সীমারেখাই ফিলাডেলফিয়া এক্সপেরিমেন্টকে আশি বছরেরও বেশি সময় পর আজও এত রহস্যময় করে রেখেছে।


You may also like