বাংলায় জানার নতুন ঠিকানা

ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান

Series: ওয়াটারলুর যুদ্ধ: নেপোলিয়নের শেষ লড়াই ও এক যুগের অবসান

  • Author: Admin
  • August 30, 2026
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন: দ্বিতীয়বার সিংহাসন ত্যাগ, সেন্ট হেলেনায় নির্বাসন ও ইউরোপে এক যুগের অবসান
ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতন

১৮১৫ সালের ১৮ জুন রাতে ওয়াটারলুর যুদ্ধক্ষেত্র থেকে নেপোলিয়ন বোনাপার্ট যখন দক্ষিণের দিকে সরে যাচ্ছিলেন, তখনও আনুষ্ঠানিকভাবে তিনি ফরাসিদের সম্রাট। তার হাতে তখনও রাষ্ট্রযন্ত্র ছিল, ফ্রান্সের ভেতরে আরও সৈন্য সংগঠনের সম্ভাবনা ছিল এবং দেশের বিভিন্ন দুর্গ ও সামরিক ইউনিট তার সরকারের অধীনেই ছিল। কিন্তু বাস্তবে ওয়াটারলুর পরাজয় নেপোলিয়নের রাজনৈতিক ক্ষমতার ভিত্তিটিই ধ্বংস করে দিয়েছিল। মাত্র কয়েক মাস আগে এলবা থেকে ফিরে প্রায় অবিশ্বাস্য গতিতে সিংহাসন পুনর্দখল করা মানুষটির সামনে এবার প্রশ্ন ছিল আরেকটি সেনাবাহিনী গঠন করা নয়—ফ্রান্স আদৌ তাকে আর যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সুযোগ দেবে কি না।

ওয়াটারলু থেকে পশ্চাদপসরণ ছিল বিপর্যয়কর। ওয়েলিংটনের অ্যাংলো-মিত্র বাহিনী সারাদিনের যুদ্ধে অত্যন্ত ক্লান্ত ও ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় রাতের প্রধান অনুসরণ পরিচালনা করে প্রুশিয়ানরা। ভেঙে পড়া ফরাসি ইউনিট, পরিত্যক্ত কামান, সরঞ্জাম ও যানবাহনের মধ্যে দিয়ে সৈন্যরা দক্ষিণে ছড়িয়ে পড়ছিল। নেপোলিয়নের পরিকল্পনা ছিল দ্রুত প্যারিসে ফিরে রাজনৈতিক কর্তৃত্ব ধরে রাখা এবং নতুন বাহিনী সংগঠনের ব্যবস্থা করা। তিনি যুদ্ধ হেরেছিলেন, কিন্তু তখনও নিজেকে সম্পূর্ণ যুদ্ধহারা শাসক হিসেবে মেনে নিতে প্রস্তুত ছিলেন না।

২১ জুন নেপোলিয়ন প্যারিসে ফিরে আসেন। কিন্তু যে রাজধানী মার্চে তাকে বিজয়ীর মতো গ্রহণ করেছিল, তিন মাসের মধ্যে সেই একই শহরের রাজনৈতিক পরিবেশ আমূল বদলে গেছে। ওয়াটারলুর পরাজয়ের সংবাদ ছড়িয়ে পড়েছে এবং আইনসভায় তার বিরোধীরা সক্রিয় হয়ে উঠেছে। ফ্রান্সের রাজনৈতিক নেতৃত্বের অনেকেই আশঙ্কা করছিলেন, নেপোলিয়ন ক্ষমতায় থাকলে সপ্তম জোট যুদ্ধ বন্ধ করবে না; বরং বিশাল রুশ, অস্ট্রিয়ান, প্রুশিয়ান ও অন্যান্য বাহিনী ফ্রান্সের গভীরে প্রবেশ করবে।

নেপোলিয়নের সামনে একটি সম্ভাবনা ছিল আইনসভা ভেঙে দিয়ে জরুরি ক্ষমতা গ্রহণ করা। তার ভাই লুসিয়েনসহ কয়েকজন সমর্থক শক্ত অবস্থান নেওয়ার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু ১৭৯৯ বা ১৮০৪ সালের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আর ছিল না। ফ্রান্স দুই দশকের বেশি সময় ধরে বিপ্লব ও যুদ্ধে ক্লান্ত। নেপোলিয়নের ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা এবং সেনাবাহিনীতে প্রভাব থাকলেও রাজনৈতিক শ্রেণির বড় অংশ আর তার জন্য নতুন গৃহসংঘাতের ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত ছিল না।

বিশেষ করে প্রতিনিধি পরিষদ নিজেদের স্থায়ী অধিবেশনে ঘোষণা করে এবং রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎ নির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকা নেয়। নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে সবচেয়ে দক্ষ রাজনৈতিক ব্যক্তিদের একজন ছিলেন জোসেফ ফুশে। বহু শাসনব্যবস্থার মধ্যে নিজের অবস্থান টিকিয়ে রাখা এই অভিজ্ঞ রাজনীতিক দ্রুত বুঝতে পারেন যে সম্রাটের ক্ষমতা আর দীর্ঘস্থায়ী হবে না। নেপোলিয়নের সামরিক পরাজয়কে রাজনৈতিক ক্ষমতা হস্তান্তরের দিকে ঠেলে দিতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।

চাপ দ্রুত এতটাই বেড়ে যায় যে নেপোলিয়ন বুঝতে পারেন আইনসভাকে শক্তি দিয়ে দমন করার চেষ্টা করলে গৃহসংঘাত তৈরি হতে পারে। তার সামনে আবার সেই সিদ্ধান্ত এসে দাঁড়ায়, যা তিনি এক বছর আগে নিয়েছিলেন। ২২ জুন ১৮১৫ নেপোলিয়ন দ্বিতীয়বারের মতো ফরাসি সিংহাসন ত্যাগ করেন। তিনি নিজের পুত্র নেপোলিয়ন দ্বিতীয়ের পক্ষে সিংহাসন ছাড়ার ঘোষণা দেন। কিন্তু বাস্তবে তার ছোট ছেলে তখন অস্ট্রিয়ায় ছিল এবং তাকে ফ্রান্সের কার্যকর সম্রাট হিসেবে প্রতিষ্ঠার রাজনৈতিক বা সামরিক সুযোগ ছিল না।

এই দ্বিতীয় সিংহাসনত্যাগ প্রথমটির চেয়ে অনেক বেশি চূড়ান্ত ছিল। ১৮১৪ সালে নেপোলিয়ন এলবা দ্বীপে নিজের ক্ষুদ্র শাসন ও সীমিত সামরিক বাহিনী নিয়ে গিয়েছিলেন এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো তাকে ভূমধ্যসাগরের কাছাকাছি রেখেছিল। সেই সিদ্ধান্তের ফল তারা ইতিমধ্যেই দেখেছে। ১৮১৫ সালে বিজয়ীরা আর এমন কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না, যা নেপোলিয়নকে আবার ইউরোপীয় রাজনীতিতে ফিরে আসার সুযোগ দিতে পারে।

সিংহাসন ত্যাগের পর একটি অস্থায়ী সরকার গঠিত হয়। কিন্তু নেপোলিয়নের উপস্থিতি তখনও রাজনৈতিকভাবে বিপজ্জনক। তিনি প্যারিসের কাছে মালমেজোঁতে অবস্থান করেন—সেই প্রাসাদটি তার প্রথম স্ত্রী জোসেফিনের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত ছিল। সেখানে তিনি কয়েক দিন কাটান, যখন মিত্রবাহিনী দ্রুত রাজধানীর দিকে এগিয়ে আসছিল। কিছু সামরিক কর্মকর্তা তাকে আবার সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব নেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছিলেন বলে বিভিন্ন বিবরণে উল্লেখ রয়েছে, কিন্তু রাজনৈতিক সরকার তাকে আর স্বাধীন সামরিক ভূমিকা দিতে আগ্রহী ছিল না।

২৯ জুন নেপোলিয়ন মালমেজোঁ ত্যাগ করেন এবং পশ্চিম ফ্রান্সের রোশফোরের দিকে যাত্রা করেন। তার নতুন লক্ষ্য ছিল ইউরোপ ছেড়ে যুক্তরাষ্ট্রে চলে যাওয়া। আমেরিকায় নির্বাসিত জীবন কাটানোর ধারণা তখন বাস্তব সম্ভাবনা বলে মনে হচ্ছিল। আটলান্টিক পাড়ি দেওয়ার জন্য ফরাসি জাহাজ প্রস্তুত করার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু একটি গুরুতর সমস্যা ছিল—ব্রিটিশ রয়্যাল নেভি ফরাসি উপকূলের ওপর নজর রাখছিল।

রোশফোর ও কাছাকাছি অঞ্চলে অপেক্ষা করতে করতে নেপোলিয়নের সময় ফুরিয়ে যাচ্ছিল। বিভিন্ন পালানোর পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনা হয়। ছদ্মবেশে ছোট জাহাজে বেরিয়ে যাওয়া, ব্রিটিশ অবরোধ ফাঁকি দেওয়া কিংবা অন্য কোনো উপায়ে আটলান্টিক অতিক্রম করার সম্ভাবনাও বিবেচিত হয়। কিন্তু নেপোলিয়ন এমন একটি ঝুঁকিপূর্ণ পলায়নের পথ বেছে নেননি, যেখানে তাকে গোপনে বা সাধারণ পলাতকের মতো পালাতে হবে।

এদিকে ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজগুলো সমুদ্রপথ কার্যত বন্ধ করে রেখেছিল। শেষ পর্যন্ত নেপোলিয়ন সিদ্ধান্ত নেন ব্রিটিশদের কাছে নিজেকে সমর্পণ করবেন। তিনি আশা করেছিলেন ব্রিটিশ আইন ও রাজনৈতিক ঐতিহ্যের অধীনে তাকে হয়তো সম্মানজনকভাবে ইংল্যান্ডে বসবাসের অনুমতি দেওয়া হবে। ব্রিটিশ প্রিন্স রিজেন্টের উদ্দেশে লেখা বার্তায় তিনি নিজেকে এমন একজন ব্যক্তি হিসেবে উপস্থাপন করেন, যিনি শত্রুদের নির্যাতন থেকে সরে এসে ব্রিটিশ জনগণের আতিথ্যের আশ্রয় চাইছেন।

১৫ জুলাই ১৮১৫ নেপোলিয়ন ব্রিটিশ যুদ্ধজাহাজ এইচএমএস বেলেরোফনে ওঠেন। এর মধ্য দিয়ে তার স্বাধীন রাজনৈতিক ও সামরিক জীবন কার্যত শেষ হয়ে যায়। তিনি ব্রিটিশদের কাছে আশ্রয় প্রত্যাশা করলেও ব্রিটিশ সরকার তাকে সাধারণ রাজনৈতিক আশ্রয়প্রার্থী হিসেবে দেখতে প্রস্তুত ছিল না। তাদের কাছে নেপোলিয়ন ছিলেন এমন একজন ব্যক্তি, যিনি একবার নির্বাসন থেকে ফিরে পুরো ইউরোপকে আবার যুদ্ধে নিয়ে গেছেন।

বেলেরোফন ইংল্যান্ডের উপকূলে পৌঁছালে নেপোলিয়নকে দেখতে বিপুল মানুষের আগ্রহ তৈরি হয়। কিন্তু তাকে ইংল্যান্ডের মাটিতে স্বাধীনভাবে নামতে দেওয়া হয়নি। শিগগিরই ব্রিটিশ সরকার সিদ্ধান্ত জানায়—নেপোলিয়নকে দক্ষিণ আটলান্টিকের দূরবর্তী সেন্ট হেলেনা দ্বীপে পাঠানো হবে। এটি ছিল এলবার সম্পূর্ণ বিপরীত ধরনের নির্বাসন।

সেন্ট হেলেনার অবস্থানই ছিল তার সবচেয়ে বড় কারাগার। আফ্রিকার পশ্চিম উপকূল থেকে বহু দূরে দক্ষিণ আটলান্টিকের বিচ্ছিন্ন আগ্নেয় দ্বীপটি ইউরোপ থেকে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে। সেখানে পৌঁছাতে দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রা প্রয়োজন, আর ব্রিটিশ নৌবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে থাকা দ্বীপ থেকে পালিয়ে ইউরোপে ফিরে আসা কার্যত অসম্ভব। ইউরোপীয় শক্তিগুলো এবার শুধু নেপোলিয়নের ক্ষমতা কেড়ে নেয়নি; তারা তাকে ইউরোপীয় রাজনৈতিক ভূগোল থেকেই সরিয়ে দিয়েছিল।

নেপোলিয়নকে পরে এইচএমএস নর্থাম্বারল্যান্ডে করে সেন্ট হেলেনায় নেওয়া হয়। দীর্ঘ সমুদ্রযাত্রার পর ১৮১৫ সালের অক্টোবরে তিনি দ্বীপে পৌঁছান। প্রথমে সাময়িকভাবে থাকার পর তাকে লংউড হাউসে রাখা হয়। এলবায় তিনি একটি ক্ষুদ্র রাষ্ট্রের শাসক ছিলেন; সেন্ট হেলেনায় তিনি ব্রিটিশ নজরদারির অধীন নির্বাসিত বন্দি।

তার সঙ্গে অল্পসংখ্যক অনুগত ব্যক্তি থাকার অনুমতি পেয়েছিলেন। তাদের মধ্যে ছিলেন জেনারেল অঁরি-গাসিয়াঁ বের্ত্রাঁ, শার্ল ত্রিস্তাঁ দ্য মঁতোলোঁ এবং কাউন্ট দ্য লাস কাসসহ কয়েকজন। নির্বাসনের বছরগুলোতে নেপোলিয়ন দীর্ঘ সময় নিজের অতীত নিয়ে আলোচনা করেন। তার যুদ্ধ, রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত, বিপ্লব, সাম্রাজ্য এবং শত্রুদের সম্পর্কে স্মৃতিচারণ লিপিবদ্ধ হতে থাকে। এসব স্মৃতিচারণ পরবর্তীকালে ‘নেপোলিয়নিক কিংবদন্তি’ নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।

সেন্ট হেলেনায় নেপোলিয়নের সঙ্গে ব্রিটিশ গভর্নর স্যার হাডসন লোয়ের সম্পর্ক ছিল অত্যন্ত তিক্ত। নেপোলিয়ন নিজেকে এখনো সম্রাট হিসেবে বিবেচনা করতেন, অথচ ব্রিটিশ কর্তৃপক্ষ তাকে সেই মর্যাদা দিতে চাইত না। তার চলাফেরা, যোগাযোগ এবং দর্শনার্থীদের ওপর বিধিনিষেধ ছিল। এই নিয়ন্ত্রণকে নেপোলিয়ন অপমানজনক মনে করতেন এবং তার অনুগতদের লেখায় লো প্রায়ই কঠোর কারারক্ষকের মতো উপস্থাপিত হন।

লংউডের জীবন ছিল তার আগের জীবনের সঙ্গে এক নির্মম বৈপরীত্য। যে মানুষটি একসময় কয়েক লক্ষ সৈন্য পরিচালনা করেছেন, রাজাদের সিংহাসনচ্যুত করেছেন এবং ইউরোপের মানচিত্র পুনর্গঠন করেছেন, তিনি এখন একটি দূরবর্তী দ্বীপে সীমাবদ্ধ। তিনি পড়াশোনা করতেন, স্মৃতিচারণ করতেন, সঙ্গীদের সঙ্গে আলোচনা করতেন এবং মাঝে মাঝে বাইরে বের হতেন। কিন্তু সময়ের সঙ্গে তার শারীরিক অবস্থার অবনতি ঘটে।

১৮২১ সালের ৫ মে, মাত্র ৫১ বছর বয়সে নেপোলিয়ন সেন্ট হেলেনায় মৃত্যুবরণ করেন। তার মৃত্যুর কারণ নিয়ে পরবর্তীকালে নানা বিতর্ক ও বিষপ্রয়োগের তত্ত্ব তৈরি হলেও প্রচলিত ঐতিহাসিক ও চিকিৎসাবিষয়ক মূল্যায়নে পাকস্থলীর ক্যানসারকে প্রধান ব্যাখ্যা হিসেবে দেখা হয়। তাকে প্রথমে সেন্ট হেলেনাতেই সমাহিত করা হয়। বহু বছর পর, ১৮৪০ সালে, তার দেহাবশেষ ফ্রান্সে ফিরিয়ে আনা হয় এবং পরে প্যারিসের লেজ আঁভালিদে সমাধিস্থ করা হয়।

কিন্তু ওয়াটারলুর পর নেপোলিয়নের পতনের তাৎপর্য শুধু একজন মানুষের নির্বাসনে সীমাবদ্ধ ছিল না। তার পরাজয়ের মাধ্যমে ১৭৯২ সাল থেকে প্রায় অবিরাম চলতে থাকা ফরাসি বিপ্লবী ও নেপোলিয়নিক যুদ্ধের দীর্ঘ অধ্যায় কার্যত শেষ হয়। ইউরোপীয় শক্তিগুলো এরপর ফ্রান্সের সঙ্গে নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত তৈরি করে এবং বুরবোঁ রাজতন্ত্র পুনরায় ক্ষমতায় ফিরে আসে। লুই অষ্টাদশ আবার প্যারিসে প্রবেশ করেন।

ভিয়েনা কংগ্রেসের মাধ্যমে যে ইউরোপীয় ব্যবস্থা তৈরি হচ্ছিল, ওয়াটারলু সেটিকে কার্যকর করার সুযোগ দেয়। অস্ট্রিয়ার মেটারনিখসহ ইউরোপের রক্ষণশীল রাষ্ট্রনায়কেরা শক্তির ভারসাম্য, রাজবংশীয় বৈধতা এবং পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে মহাদেশে স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। পরবর্তী দশকগুলোতে এই ব্যবস্থা ‘কনসার্ট অব ইউরোপ’ নামে পরিচিত কূটনৈতিক কাঠামোর ভিত্তি হয়ে ওঠে।

তবে নেপোলিয়নের পতনের অর্থ তার প্রভাবের অবসান ছিল না। ফরাসি বিপ্লব ও নেপোলিয়নিক শাসনের মাধ্যমে আইনি সংস্কার, প্রশাসনিক কেন্দ্রীকরণ, যোগ্যতার ভিত্তিতে পদোন্নতির ধারণা এবং জাতীয়তাবাদের মতো শক্তি ইউরোপের বহু অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছিল। রাজতন্ত্রগুলো নেপোলিয়নকে পরাজিত করতে পারলেও তার যুগে সৃষ্টি হওয়া সামাজিক ও রাজনৈতিক পরিবর্তন সম্পূর্ণভাবে মুছে দিতে পারেনি। যে ইউরোপ নেপোলিয়নের বিরুদ্ধে জয়ী হয়েছিল, সেটি আর ১৭৮৯ সালের আগের ইউরোপ ছিল না।

একই সঙ্গে ওয়াটারলুর পর থেকেই নেপোলিয়ন বাস্তব শাসক থেকে ক্রমশ কিংবদন্তিতে পরিণত হতে থাকেন। সমর্থকদের কাছে তিনি বিপ্লবের অর্জন রক্ষাকারী, অসাধারণ সামরিক প্রতিভা এবং ইউরোপের পুরোনো রাজতন্ত্রের বিরুদ্ধে আধুনিকতার প্রতীক হয়ে ওঠেন। বিরোধীদের কাছে তিনি ছিলেন সীমাহীন উচ্চাকাঙ্ক্ষী বিজেতা, যার যুদ্ধ লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে প্রভাবিত করেছে। এই দুই বিপরীত স্মৃতি আজও নেপোলিয়নের ঐতিহাসিক মূল্যায়নের কেন্দ্রে রয়েছে।

ওয়াটারলু তাই শুধু একটি যুদ্ধের নাম নয়। এর পরবর্তী কয়েক সপ্তাহে ঘটে যাওয়া ঘটনাগুলো দেখায় কীভাবে যুদ্ধক্ষেত্রের পরাজয় রাজনৈতিক পতনে রূপ নেয়। ১৮ জুন ওয়াটারলু, ২২ জুন দ্বিতীয় সিংহাসনত্যাগ, জুলাইয়ে ব্রিটিশদের কাছে আত্মসমর্পণ এবং অক্টোবরে সেন্ট হেলেনায় পৌঁছানো—মাত্র কয়েক মাসের মধ্যে ইউরোপের সবচেয়ে ক্ষমতাবান ব্যক্তিদের একজন পৃথিবীর সবচেয়ে বিচ্ছিন্ন রাজনৈতিক বন্দিদের একজন হয়ে যান।

নেপোলিয়ন একবার এলবা থেকে ফিরে প্রমাণ করেছিলেন যে পরাজয় মানেই তার সমাপ্তি নয়। সেই কারণেই বিজয়ী শক্তিগুলো দ্বিতীয়বার কোনো ঝুঁকি নেয়নি। সেন্ট হেলেনার হাজার হাজার কিলোমিটার সমুদ্রই এবার তার শেষ কারাগারের প্রাচীর হয়ে দাঁড়ায়। ওয়াটারলুর ময়দানে যে পতন শুরু হয়েছিল, সেন্ট হেলেনার নিঃসঙ্গ লংউড হাউসে সেটিই পূর্ণতা পায়। নেপোলিয়নের সাম্রাজ্য শেষ হয়েছিল, তার শেষ সেনাবাহিনী পরাজিত হয়েছিল এবং ইউরোপ প্রবেশ করেছিল নতুন এক রাজনৈতিক যুগে—কিন্তু ইতিহাসে নেপোলিয়নের প্রভাব, বিতর্ক ও কিংবদন্তির সমাপ্তি আর কখনো ঘটেনি।


You may also like