মেরি উলস্টোনক্রাফট: নারীর সমঅধিকারের আধুনিক আন্দোলনের বুদ্ধিবৃত্তিক পথিকৃৎ
Series: ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীরা
- Author: Admin
- August 30, 2026
নারীশিক্ষা ও সমঅধিকারের পক্ষে আধুনিক চিন্তার পথিকৃৎ মেরি উলস্টোনক্রাফট
আঠারো শতকের ইউরোপে স্বাধীনতা, যুক্তি, নাগরিক অধিকার এবং মানুষের প্রাকৃতিক অধিকার নিয়ে যখন নতুন রাজনৈতিক দর্শনের বিস্ফোরণ ঘটছিল, তখন সেই আলোচনার একটি মৌলিক অসঙ্গতি খুব কম মানুষই প্রকাশ্যে তুলে ধরেছিলেন। দার্শনিকেরা বলছিলেন, মানুষ জন্মগতভাবে স্বাধীন; বিপ্লবীরা ঘোষণা করছিলেন, স্বৈরশাসনের পরিবর্তে নাগরিকের অধিকার প্রতিষ্ঠিত হওয়া উচিত। অথচ সমাজের প্রায় অর্ধেক মানুষ—নারী—শিক্ষা, সম্পদ, পেশা ও রাজনৈতিক জীবনের অধিকাংশ ক্ষেত্রেই পুরুষের অধীন বলে বিবেচিত হচ্ছিল। এই বৈপরীত্যের বিরুদ্ধে সবচেয়ে শক্তিশালী বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জগুলোর একটি ছুড়ে দিয়েছিলেন ইংরেজ লেখক ও চিন্তাবিদ মেরি উলস্টোনক্রাফট। তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ এ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান আধুনিক নারী-অধিকার চিন্তার ইতিহাসে একটি যুগান্তকারী দলিল হয়ে ওঠে।
মেরি উলস্টোনক্রাফট জন্মগ্রহণ করেন ১৭৫৯ সালের ২৭ এপ্রিল, লন্ডনের স্পিটালফিল্ডসে। তাঁর পরিবার প্রথমদিকে তুলনামূলকভাবে স্বচ্ছল ছিল, কিন্তু তাঁর বাবা এডওয়ার্ড জন উলস্টোনক্রাফটের আর্থিক অব্যবস্থাপনা ও ব্যর্থ বিনিয়োগের কারণে পরিবারের অবস্থার অবনতি ঘটে। বাবার মদ্যপান ও সহিংস আচরণও পারিবারিক পরিবেশকে অস্থির করে তুলেছিল। মেরি খুব অল্প বয়সেই দেখেছিলেন, বিবাহিত নারীর অর্থনৈতিক ও সামাজিক নির্ভরতা তাকে কতটা অসহায় করে তুলতে পারে।
সেই সময় ব্রিটিশ সমাজে মধ্যবিত্ত ও উচ্চবিত্ত নারীদের জন্য শিক্ষার লক্ষ্য সাধারণত স্বাধীন মানুষ তৈরি করা ছিল না। তাদের শেখানো হতো এমন দক্ষতা, যা ভবিষ্যতে একজন পুরুষের কাছে তাদের আকর্ষণীয় স্ত্রী হিসেবে উপস্থাপন করবে। সংগীত, অঙ্কন, পোশাক, আচরণ ও সামাজিক সৌজন্যের ওপর গুরুত্ব থাকলেও দর্শন, রাজনীতি, বিজ্ঞান বা গভীর যুক্তিবিদ্যাকে নারীর জন্য প্রয়োজনীয় বলে মনে করা হতো না। উলস্টোনক্রাফট পরবর্তীকালে এই শিক্ষাব্যবস্থাকেই নারীর অধীনতার অন্যতম প্রধান কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেন।
তাঁর নিজের আনুষ্ঠানিক শিক্ষা খুব বিস্তৃত ছিল না। কিন্তু ব্যক্তিগত অধ্যয়ন, বন্ধুত্ব এবং বুদ্ধিবৃত্তিক কৌতূহলের মাধ্যমে তিনি নিজেকে শিক্ষিত করেন। তাঁর জীবনে বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ ছিলেন ফ্যানি ব্লাড, যার সঙ্গে তাঁর গভীর বন্ধুত্ব গড়ে উঠেছিল। নারীরা নিজেদের শ্রম ও শিক্ষার মাধ্যমে স্বাধীন জীবন গড়তে পারে—এই আকাঙ্ক্ষা তাঁদের সম্পর্কের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়েছিল।
উলস্টোনক্রাফট জীবনের প্রথম পর্যায়ে নারীদের জন্য উপলব্ধ সীমিত পেশাগুলোর বিভিন্নটিতে কাজ করেন। তিনি একজন ধনী নারীর সঙ্গিনী ছিলেন, পরে শিক্ষকতা করেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে নিউইংটন গ্রিনে একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেন। এরপর আয়ারল্যান্ডে কিংসবোরো পরিবারের গভর্নেস হিসেবেও কাজ করেন। এসব অভিজ্ঞতা তাঁকে বিভিন্ন শ্রেণির নারীর জীবন কাছ থেকে দেখার সুযোগ দেয়।
তিনি উপলব্ধি করেন, নারীদের এমনভাবে শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে যেন তাদের জীবনের প্রধান উদ্দেশ্য একজন উপযুক্ত পুরুষকে বিয়ে করা। এর ফলে একজন নারীর বুদ্ধি, ব্যক্তিত্ব ও নৈতিক স্বাধীনতা বিকাশের পরিবর্তে সৌন্দর্য এবং পুরুষকে সন্তুষ্ট করার ক্ষমতা গুরুত্ব পাচ্ছে। তাঁর কাছে এটি শুধু অন্যায় ছিল না; এটি সমাজের জন্যও ক্ষতিকর ছিল, কারণ অশিক্ষিত ও নির্ভরশীল নারীকে আবার ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সন্তানদের শিক্ষার গুরুদায়িত্ব দেওয়া হচ্ছিল।
১৭৮৭ সালে তাঁর প্রথম উল্লেখযোগ্য বই থটস অন দ্য এডুকেশন অব ডটার্স প্রকাশিত হয়। এতে নারীশিক্ষা, নৈতিকতা এবং আত্মনির্ভরতার বিষয়ে তাঁর প্রাথমিক চিন্তা উঠে আসে। একই সময়ে তিনি অনুবাদ, বই পর্যালোচনা এবং বিভিন্ন ধরনের লেখালেখির মাধ্যমে জীবিকা অর্জন করতে শুরু করেন। নিজের লেখনী দিয়ে জীবিকা নির্বাহের সিদ্ধান্ত নিজেই ছিল সেই যুগের একজন মধ্যবিত্ত নারীর জন্য ব্যতিক্রমী স্বাধীনতার ঘোষণা।
লন্ডনে প্রকাশক জোসেফ জনসনের বুদ্ধিবৃত্তিক পরিমণ্ডলের সঙ্গে যুক্ত হওয়া তাঁর জীবনে বড় পরিবর্তন আনে। জনসনের মাধ্যমে তিনি সেই সময়ের বিভিন্ন লেখক, শিল্পী, বিজ্ঞানী ও রাজনৈতিক চিন্তাবিদের সঙ্গে পরিচিত হন। এই পরিবেশে তাঁর রাজনৈতিক দর্শন আরও পরিণত হয়।
১৭৮৯ সালে শুরু হওয়া ফরাসি বিপ্লব ইউরোপীয় বুদ্ধিবৃত্তিক জগৎকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিল। ব্রিটেনে বিপ্লব নিয়ে তীব্র বিতর্ক শুরু হয়। রক্ষণশীল রাজনীতিবিদ ও চিন্তাবিদ এডমন্ড বার্ক ১৭৯০ সালে ফরাসি বিপ্লবের সমালোচনা করে রিফ্লেকশনস অন দ্য রেভল্যুশন ইন ফ্রান্স প্রকাশ করেন। এর প্রতিক্রিয়ায় উলস্টোনক্রাফট দ্রুত এ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব মেন লেখেন।
এই বইয়ে তিনি বংশগত বিশেষাধিকার, সামাজিক শ্রেণিবিন্যাস এবং অভিজাততান্ত্রিক ক্ষমতার বিরুদ্ধে যুক্তি দেন। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এখান থেকেই তাঁর চিন্তা আরও বড় একটি প্রশ্নের দিকে এগিয়ে যায়। যদি জন্মগত অভিজাতত্ব অন্যায় হয়, তাহলে শুধু নারী হয়ে জন্মানোর কারণে একজন মানুষকে পুরুষের অধীন রাখা কীভাবে ন্যায়সংগত হতে পারে?
এই প্রশ্নের পূর্ণাঙ্গ উত্তর আসে ১৭৯২ সালে, যখন প্রকাশিত হয় তাঁর সবচেয়ে বিখ্যাত গ্রন্থ এ ভিন্ডিকেশন অব দ্য রাইটস অব ওম্যান। নারী-অধিকার চিন্তার ইতিহাসে এটি একটি মৌলিক গ্রন্থ। উলস্টোনক্রাফট সেখানে যুক্তি দেন, নারী স্বভাবগতভাবে পুরুষের তুলনায় কম যুক্তিবাদী বা বুদ্ধিমান—এমন সিদ্ধান্তের কোনো যথার্থ ভিত্তি নেই। বরং নারীদের যদি সমান শিক্ষা ও স্বাধীনতার সুযোগ না দেওয়া হয়, তাহলে তাদের সম্ভাব্য সক্ষমতা সম্পর্কে বিচার করাই অন্যায়।
তাঁর যুক্তির কেন্দ্রে ছিল যুক্তিবোধ। আলোকায়ন যুগের দার্শনিকেরা যুক্তিকে মানুষের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হিসেবে দেখেছিলেন। উলস্টোনক্রাফট সেই ধারণাকেই নারীর ক্ষেত্রে প্রয়োগ করেন। নারীও যদি যুক্তিবোধসম্পন্ন মানুষ হয়, তাহলে তার নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের অধিকারও থাকতে হবে।
তিনি ফরাসি চিন্তাবিদ জঁ-জাক রুশোর নারীশিক্ষা সম্পর্কিত ধারণার তীব্র সমালোচনা করেন। রুশোর শিক্ষাবিষয়ক চিন্তায় নারীকে মূলত পুরুষের সঙ্গী ও সন্তুষ্টিদাতা হিসেবে গড়ে তোলার প্রবণতা ছিল। উলস্টোনক্রাফটের আপত্তি ছিল মৌলিক—একজন নারীর অস্তিত্বের উদ্দেশ্য কেন অন্য একজন মানুষকে খুশি করা হবে?
তিনি এমন শিক্ষা ব্যবস্থার পক্ষে যুক্তি দেন যেখানে ছেলে ও মেয়ে উভয়েই সুসংগঠিত শিক্ষা পাবে। তাঁর মতে, শিক্ষিত নারী ভালো স্ত্রী বা মা হওয়ার জন্যই শুধু প্রয়োজনীয় নয়; নারী নিজেই একজন স্বাধীন নৈতিক ব্যক্তি। এই ধারণাই তাঁর চিন্তাকে সেই সময়ের অনেক সংস্কারপন্থীর তুলনায় অনেক বেশি বিপ্লবী করে তোলে।
উলস্টোনক্রাফট বিবাহের প্রচলিত কাঠামোরও সমালোচনা করেন। তাঁর মতে, শুধু অর্থনৈতিক নিরাপত্তার জন্য নারীদের বিয়ের ওপর নির্ভরশীল করে রাখলে বিবাহ প্রকৃত বন্ধুত্ব বা সমমর্যাদার সম্পর্ক হতে পারে না। একজন নারী যদি শিক্ষা ও জীবিকা অর্জনের সুযোগ পায়, তাহলে সে বাধ্যতামূলক নির্ভরতার পরিবর্তে সম্মানের ভিত্তিতে সম্পর্ক গড়তে পারবে।
তাঁর চিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল নারীর ওপর চাপিয়ে দেওয়া সৌন্দর্যকেন্দ্রিক সংস্কৃতির সমালোচনা। তিনি মনে করতেন, সমাজ যখন নারীদের শেখায় যে তাদের প্রধান শক্তি সৌন্দর্য ও আকর্ষণ, তখন নারীও নিজের বুদ্ধি বিকাশের পরিবর্তে পুরুষের প্রশংসা অর্জনে মনোযোগ দিতে বাধ্য হয়। তিনি নারীদের পুরুষের ওপর আধিপত্য চাননি; তিনি চেয়েছিলেন নারীরা নিজেদের ওপর কর্তৃত্ব অর্জন করুক। তাঁর রাজনৈতিক দর্শনের সারমর্ম এই ধারণার মধ্যেই নিহিত।
১৭৯২ সালের শেষদিকে উলস্টোনক্রাফট ফ্রান্সে যান। তিনি এমন সময় প্যারিসে উপস্থিত হন, যখন বিপ্লব দ্রুত আরও সহিংস পর্যায়ে প্রবেশ করছিল। রাজা ষোড়শ লুইয়ের পতন, প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রাজনৈতিক সংঘর্ষ এবং পরবর্তীকালের সন্ত্রাসের শাসন তিনি কাছ থেকে প্রত্যক্ষ করেন। বিপ্লবের আদর্শ তাঁকে আকৃষ্ট করলেও বাস্তব সহিংসতা তাঁকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে।
ফ্রান্সে তাঁর পরিচয় হয় আমেরিকান ব্যবসায়ী ও অভিযাত্রী গিলবার্ট ইমলের সঙ্গে। তাঁদের সম্পর্ক থেকে ১৭৯৪ সালে একটি কন্যাসন্তান জন্ম নেয়, যার নাম রাখা হয় ফ্যানি। কিন্তু সম্পর্কটি স্থায়ী হয়নি। ইমলের সঙ্গে বিচ্ছেদ উলস্টোনক্রাফটকে মানসিকভাবে বিপর্যস্ত করে এবং তিনি আত্মহত্যার চেষ্টাও করেছিলেন।
এই ব্যক্তিগত সংকটের পরও তাঁর লেখালেখি থেমে যায়নি। ইমলের ব্যবসায়িক বিষয়ে অনুসন্ধানের জন্য তিনি স্ক্যান্ডিনেভিয়া ভ্রমণ করেন। সেই অভিজ্ঞতা থেকে ১৭৯৬ সালে প্রকাশিত হয় লেটারস রিটেন ডিউরিং আ শর্ট রেসিডেন্স ইন সুইডেন, নরওয়ে, অ্যান্ড ডেনমার্ক। বইটিতে ভ্রমণ, প্রকৃতি, বাণিজ্য, সমাজ এবং ব্যক্তিগত অনুভূতিকে তিনি অসাধারণভাবে একত্রিত করেন।
পরবর্তীকালে তাঁর সম্পর্ক গড়ে ওঠে রাজনৈতিক দার্শনিক ও লেখক উইলিয়াম গডউইনের সঙ্গে। দুজনেই প্রচলিত বিবাহপ্রথা সম্পর্কে সমালোচনামূলক ছিলেন। কিন্তু উলস্টোনক্রাফট গর্ভবতী হওয়ার পর তাঁরা ১৭৯৭ সালে বিয়ে করেন। একই বছরের ৩০ আগস্ট তাঁদের কন্যা মেরি জন্মগ্রহণ করেন—যিনি পরবর্তীকালে ফ্রাঙ্কেনস্টাইন উপন্যাসের লেখক মেরি শেলি হিসেবে বিশ্বসাহিত্যের ইতিহাসে অমর হয়ে ওঠেন।
কিন্তু সন্তান জন্ম দেওয়ার পর উলস্টোনক্রাফটের শরীরে মারাত্মক সংক্রমণ দেখা দেয়। সেই যুগে প্রসবজনিত সংক্রমণ ছিল নারীদের মৃত্যুর একটি বড় কারণ। ১৭৯৭ সালের ১০ সেপ্টেম্বর, মাত্র ৩৮ বছর বয়সে মেরি উলস্টোনক্রাফট মারা যান। তাঁর জীবন ছিল সংক্ষিপ্ত, কিন্তু তাঁর ধারণার যাত্রা তখন মাত্র শুরু।
তাঁর মৃত্যুর পর উইলিয়াম গডউইন স্ত্রীর জীবনী প্রকাশ করেন এবং সেখানে তাঁর প্রেম, অবিবাহিত মাতৃত্ব ও আত্মহত্যার চেষ্টাসহ ব্যক্তিগত জীবনের বিভিন্ন ঘটনা অকপটে তুলে ধরেন। আঠারো শতকের শেষের ব্রিটিশ সমাজে এসব তথ্য বড় ধরনের কেলেঙ্কারি সৃষ্টি করে। রক্ষণশীল সমালোচকেরা তাঁর ব্যক্তিগত জীবনকে ব্যবহার করে তাঁর রাজনৈতিক ও দার্শনিক চিন্তাকে আক্রমণ করতে শুরু করেন।
ফলে কিছু সময়ের জন্য উলস্টোনক্রাফটের নাম বিতর্কের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ে। কিন্তু উনিশ ও বিশ শতকে নারীশিক্ষা, সম্পত্তির অধিকার, ভোটাধিকার এবং রাজনৈতিক সমতার আন্দোলন শক্তিশালী হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাঁর লেখাকে নতুনভাবে মূল্যায়ন করা শুরু হয়। পরবর্তী নারীবাদী চিন্তাবিদেরা তাঁর মধ্যে এমন একজন পূর্বসূরিকে দেখতে পান, যিনি সংগঠিত নারী ভোটাধিকার আন্দোলনের বহু দশক আগেই সমস্যার বুদ্ধিবৃত্তিক ভিত্তি চিহ্নিত করেছিলেন।
তবে তাঁকে সরাসরি একবিংশ শতকের নারীবাদের ধারণায় বিচার করাও ঠিক হবে না। তাঁর চিন্তা ছিল আঠারো শতকের আলোকায়ন দর্শনের সন্তান এবং তাঁর কিছু দৃষ্টিভঙ্গিতে সেই যুগের সামাজিক সীমাবদ্ধতাও ছিল। তিনি আধুনিক নারীবাদী আন্দোলনের পূর্ণাঙ্গ কর্মসূচি তৈরি করেননি। ভোটাধিকারসহ পরবর্তী যুগের সব রাজনৈতিক দাবি তাঁর প্রধান আলোচ্যও ছিল না। তাঁর সবচেয়ে বিপ্লবী অবদান ছিল আরও মৌলিক—তিনি নারীর সমঅধিকারের প্রশ্নকে যুক্তিবাদ, শিক্ষা, নৈতিক স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের প্রশ্নে পরিণত করেছিলেন।
এই কারণেই মেরি উলস্টোনক্রাফট ইতিহাস বদলে দেওয়া নারীদের মধ্যে অনন্য। তিনি কোনো সেনাবাহিনীর নেতৃত্ব দেননি, কোনো সাম্রাজ্যের সিংহাসনে বসেননি এবং জীবদ্দশায় কোনো বৃহৎ নারী আন্দোলনের নেতৃত্বও দেননি। তাঁর অস্ত্র ছিল কলম, যুক্তি এবং প্রচলিত ধারণাকে প্রশ্ন করার সাহস। তিনি এমন এক সময়ে লিখেছিলেন, যখন একজন নারীর স্বাধীনভাবে চিন্তা করা পর্যন্ত অনেকের কাছে সামাজিক শৃঙ্খলার জন্য বিপজ্জনক মনে হতো।
তাঁর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উত্তরাধিকার তাই একটি সাধারণ কিন্তু যুগান্তকারী প্রশ্নে নিহিত—যে অধিকারকে আমরা মানুষের স্বাভাবিক অধিকার বলি, সেখানে নারীকে বাদ দেওয়ার যুক্তি কী? এই প্রশ্নের মাধ্যমে উলস্টোনক্রাফট নারীকে করুণা বা পুরুষের সুরক্ষার দাবিদার হিসেবে নয়, স্বাধীন বুদ্ধি, মর্যাদা ও অধিকারসম্পন্ন পূর্ণাঙ্গ মানুষ হিসেবে দেখার দাবি তুলেছিলেন। পরবর্তী দুই শতকের নারী-অধিকার আন্দোলন সেই দাবিকে বহুদূর এগিয়ে নিয়ে গেছে, কিন্তু তার আধুনিক বুদ্ধিবৃত্তিক ইতিহাসের গোড়ায় মেরি উলস্টোনক্রাফটের কলমের ছাপ আজও স্পষ্ট।
প্রুশিয়ানদের আগমন ও ইম্পেরিয়াল গার্ডের পতন: ওয়েলিংটন ও ব্লুশার কীভাবে ওয়াটারলুতে নেপোলিয়নকে চূড়ান্তভাবে পরাজিত করেছিলেন?
ওয়াটারলুর যুদ্ধ ১৮১৫: হুগোমোঁ, লা হে সাঁত, ফরাসি অশ্বারোহী আক্রমণ ও নেপোলিয়নের শেষ লড়াইয়ের পূর্ণ ইতিহাস
লিনি ও কোয়াত্র-ব্রার যুদ্ধ: ওয়াটারলুর দুই দিন আগে নেপোলিয়নের বিজয় কীভাবে হারানো সুযোগে পরিণত হয়েছিল?
সপ্তম জোট ও বেলজিয়াম অভিযান: ওয়েলিংটন ও ব্লুশারকে আলাদা করে ধ্বংস করার নেপোলিয়নের শেষ সামরিক পরিকল্পনা
এলবা থেকে প্রত্যাবর্তন ও ‘হান্ড্রেড ডেজ’: নেপোলিয়ন কীভাবে আবার ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করে ইউরোপকে যুদ্ধে ঠেলে দিয়েছিলেন?
ভার্দুনের যুদ্ধ: ১৯১৬ সালের দীর্ঘতম রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ে ফ্রান্সকে রক্তশূন্য করার জার্মান পরিকল্পনা